নারী Posted on October 12, 2022 “সরি ভাই।” পা মাড়িয়ে দেওয়া আঠারো-উনিশ বছরের ছেলেটি শশব্যস্ত হয়ে বললো। ঢিলেঢালা শার্ট, কাঁধে একটা ঢাউস ব্যাগ। ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে তার খুব ঝামেলা হচ্ছে। পায়ের ব্যথাটা টের পেলাম কয়েক সেকেন্ড পর। অমায়িক হাসি দিয়ে ছেলেটাকে বললাম, “ইট’স ওকে।” কাদামাখা জুতো পায়ে পড়লে এতো মধুর কন্ঠে আমি ইট’স ওকে বলি না। তবে আজকের কথা আলাদা। দুই ভদ্রলোক পরে বাদামি ফতুয়া পরা এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে বেশ, সিল্কি চুলে লালচে ভাব, দুধসাদা ত্বক। তালতলা থেকে উঠেছে, তখন থেকে তার দিক থেকে আর চোখ সরাতে পারছি না। মেয়েদের দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকা আমার স্বভাবের বাইরে। এই মেয়ে আমাকে স্বভাবের বাইরে বের করে এনেছে। চারপাশে আড়চোখে তাকালাম, তবে সরাসরি তাকালেও সমস্যা হতো না। বাসের প্রতিটি পুরুষের দৃষ্টি এখন তার দিকে। মেয়েটির ভিউয়ারের সংখ্যা লক্ষ্য করলে সালমান মুক্তাদিরও ঈর্ষান্বিত হতেন। এদের মধ্যে একজনের মনোযোগ অন্যদিকে দেখা গেলো। কর্কশ ভাষায় কটুক্তি করে বসলেন বাঁদিকে বসে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক। “সরি আংকেল।” দ্বিগুণ শশব্যস্ত হয়ে বললো ঢাউস ব্যাগওয়ালা ছেলেটা। “ব্যাগটা হাতে রাখতে পারো না!” কড়া গলায় বললেন যাত্রীটি, “মুগুরের বাড়িতেও তো কম ব্যথা লাগে। ভেতরে কি কামানের গোলা নিয়ে ঘুরছো নাকি?” সদ্য তারুণ্যে পা রাখা ছেলেটির মুখ কাঁচুমাচু হয় গেলো। খুব সম্ভব ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া কোনো যোদ্ধা। কোচিং থেকে ফিরে আসছে। বাইরে বিকেলের শেষ আলো। হট্টগোলের শব্দ শুনে দুধসাদা মেয়েটি ফিরে তাকালো। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য তার চোখে আটকে গেলো আমার চোখ। হাল্কা বাদামি চোখ একেবারে ম্যাচ করে গেছে ফতুয়ার সাথে। দুম করে প্রেমে পড়ে গেলাম। মেয়েরা নাকি ছেলেদের চোখ দেখে সব বুঝে ফেলে। তাচ্ছিল্যের একটা ভঙ্গি করলো সে, পেছনে আমার প্যাকাটির মতো ফিগার আর বাদুড়ের মতো চেহারা দায়ী। তাও খানিকটা আশাভঙ্গের শিকার হলাম। মেয়েটি আবারও সামনের দিকে মুখ ফেরাতেই ঘটে গেলো ঘটনাটা। তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা চট করে ডান হাত বাড়িয়ে পেলব নিতম্বে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। দৃশ্যটা দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো। মেয়েটি আবারও ফিরে তাকিয়েছে, তবে এবারের লক্ষ্য আমি নই, যার একটি লম্বা হাত আছে, সে। তার দিকে আমিও তাকালাম। সুপারম্যানের টি-শার্ট পরা এক যুবক। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে। ভুরভুর করে পারফিউমের গন্ধ বের হচ্ছে, চুল স্পাইক করা। ‘স্মার্ট-অ্যাস’ ভঙ্গি চেহারায়। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। যেনো ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। দুধসাদা ত্বকের সুন্দরীও বিষয়টিকে দুর্ঘটনা হিসেবে ধরে নিলো। বাসের মধ্যে এখন মাছের বাজারের মতো ভিড়। তার মধ্যে উচ্চস্বরে হেল্পারের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে, “বাড়াগুলা হাতে হাতে লন, ভাই। বাড়াগুলা হাতে হাতে লন!” আমার নিঃশ্বাস এখনও বন্ধ হয়ে আছে। হেল্পার এখন মেয়েটির সামনে। গলা যতোদূর সম্ভব ভদ্র-লয়ে নামিয়ে এনে সে বললো, “আফা, ভাড়াটা দিয়েন।” আমি নিশ্চিত শাপলা চত্বর থেকে তার হুঙ্কার শোনা যাবে তাও। হৃপিণ্ডটা গলার কাছে লাফিয়ে উঠে এলো। ত্রিশ-ছুঁই-ছুঁই করা যুবক আবারও হাত বাড়িয়েছে। এবার মেয়েটির নিতম্বে চেপে বসলো তার হাত। নরম মাংস ভেতরে দেবে যেতে দেখলাম পরিষ্কার। কানের নিচে আগুনের হল্কা বয়ে গেলো আমার। খানিক বাদে বুঝতে পারলাম, ওটা ক্রোধ ছিলো! মেয়েটি এবার সরাসরি তাকালো না, ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরেছে। এখান থেকে দেখতে পেলাম, তার দুধসাদা ত্বক লালচে হয়ে উঠেছে অপমানে, লজ্জায়। ঢাউস ব্যাগটা আমার বুকে দড়াম করে বাড়ি খেলো। হার্ড ব্রেক কষেছে বাস। ছেলেটা মুখ থেকে থুতু ছিটাতে ছিটাতে বললো, “সরি ভাইয়া!” তার দিকে আমি তাকালাম পর্যন্ত না। আমার চোখের খুনে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছেলেটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। এক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলো, সে দৃষ্টি তার জন্য নয়। ফিরে তাকালো সে, এবং বিশ্বাস করুন, পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, ছেলেটির শরীর শক্ত হয়ে গেছে। হার্ডব্রেকের সুযোগ নিয়ে মেয়েটির পেছনের লম্পট আরও কাছে ঘেঁষে গেছে। তার হাত এখন মেয়েটির কোমরে যেনো অধিকারবলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাত সরিয়ে নেওয়ার অভিনয় করতে করতে পেছন থেকে হাল্কা করে তার স্তনের একপাশ ছুঁয়ে দিলো দিব্যি। আমার দু’হাত এখন মুষ্ঠিবদ্ধ। যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণ হারাবো, ঝাঁপিয়ে পড়বো লোকটার ঘাড়ে, ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দেবো নাক, থেঁতলে দেবো ইতরটির চেহারা, গলা টিপে ধরবো যতোক্ষণ পর্যন্ত তার জিভ বেরিয়ে না আসে! অজান্তেই ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছি, রাগ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছে। সামনে থেকে বেআক্কেল রিকশাওয়ালা সরে যেতেই বাস আবারও ছুটতে শুরু করলো। লোকটি মেয়েটির শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে, তবে যথেষ্ট দূরে নয়। অতি লোভে তাঁতী নষ্ট, এই প্রবচন তার জানা। ধরা পড়তে সে চাইছে না। যাত্রীদের দিকে তাকালাম। মুগ্ধ পুরুষগোষ্ঠির প্রায় সবারই চেহারা এখন টকটকে লাল। কোনো সন্দেহ নেই, বিষয়গুলো তারা লক্ষ্য করেছে। ঢাউস ব্যাগটা আরেকবার আংকেলের মাথায় গিয়ে লাগলো। বেমক্কা আঘাতে ভদ্রলোকের মগজ নড়ে গেলেও তিনি তরুণ ছেলেটিকে এবার আর কিছু বললেন না। তাঁর চোখ স্পাইক করা চুলের ভুরভুরে সুবাস ছড়িয়ে দেওয়া লম্পটের ওপর নিবদ্ধ। ব্যাগ বহন করা ছেলেটিও লক্ষ্য করেনি তার ‘আংকেল’কে সে ফাটিয়ে দিয়েছে। তার নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পেলাম, আমার মতোই ভারি আর গাঢ়, ফোঁস ফোঁসে। মেয়েটির চামড়া টকটকে লাল হয়ে গেছে এখন, ঘাড়ের কাছটা পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছি। তাকে আর দুধসাদা বলার উপায় নেই। সামনের নিউ ভিশনটিকে ওভারটেক করার সময় সামান্য হেলে গেলো বাস, কোনোমতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে যা দেখলাম তাতে করে মাথার ভেতর কিছু একটা ছিঁড়ে গেলো। ত্রিশের কাছাকাছি বয়সের যুবক পড়ে যাওয়ার অভিনয় করতে করতে মেয়েটির একপাশের স্তন খামচে ধরেছে। নিমেষের জন্য, তারপরই ছেড়ে দিলো। আমার সামনের ঢাউস ব্যাগ নিয়ে থাকা ছেলেটির দুই হাত এখন মুষ্ঠিবদ্ধ। আমারই মতো। ব্যাপারটা সে আর সহ্য করতে পারছে না। আবার এগিয়েও যেতে পারছে না। এই ছেলে নেহায়েত পড়ুয়া একজন মানুষ, তার অভিব্যক্তিতে অনভিজ্ঞতা পরিষ্কার। মানুষ পেটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা দু’জনেই জানি সামনে দাঁড়ানো লোকটা মানুষ নয়, পিশাচ। তবুও তার গায়ে হাত তোলা আমাদের অনভ্যস্ততার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। গাড়ি এখন আসাদগেটের একটু পেছনে। মেয়েটি হেল্পারকে উদ্দেশ্য করে বললো, “মামা, নামায় দিয়েন।” তার গলায় ক্রোধ কিংবা লজ্জার ছোঁয়া নেই, একদম নিস্তেজ, পরাজিত এক কন্ঠস্বর! ড্রাইভার গাড়ির গতি কমাচ্ছে। অপমানে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসছে। নিজেকে এখন আর পুরুষ মনে হচ্ছে না, কাপুরুষের রক্ত বইছে সারা শরীরে। সুপারম্যানের টি-শার্ট পরা লম্পটও তরুণীর পেছনে পেছনে রওনা দিলো। নধর শরীরের নেশা তার দেহে, বাস থেকে মেয়েটিকে একা একা নামতে দিতে সে চাইছে না। বাসের গতি পুরোপুরি কমে যেতেই ঘটনাটা ঘটে গেলো। নিচে এক পা রাখা তরুণী আচমকা ঘুরে দাঁড়ালো, শেষ পা-দানিতে তখন স্পাইক করা বদমাশ। হাত ব্যাগ থেকে ছয় ইঞ্চি ফলার একটি ছুরি চোখের পলকে তার গলায় বিঁধিয়ে দিলো মেয়েটি। সামান্য সরে এসে সর-সর করে টেনে নিলো আবার। ঘরঘর জাতীয় শব্দ উঠছে, লম্পটের রক্তে ভেসে গেলো রাস্তা। সামনে টলে উঠেই দড়াম করে পিচঢালা পথে আছড়ে পড়লো তার দেহ। মেয়েটি ছুরি হাতব্যাগে ভরে দ্রুত উঠে এলো বাসে। হেল্পারকে বললো, “আরেকটু সামনে নামবো।” স্থবির বাস, তার মধ্যেই পেছনের সিট থেকে একজন চিৎকার করে উঠলো, “খুন! খুন!” দুইপাশ থেকে দুইজন তরুণ তাকে মৃদু ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো। পাল্টা কোনো প্রশ্ন হেল্পার বা ড্রাইভার করছে না, এক ফোঁটা রক্তও তাদের বাসে পড়েনি, লম্পটের রক্তে কলুষিত হয়নি যানবাহন, কৃতজ্ঞতার সাথে বাস ছাড়লো ড্রাইভার। “আসাদগেটে নাইমেন না, চেকপোস্ট আছে। ওইহানে গাড়ি থামানো যাইবো না।” হেল্পার এখন আসলেই মৃদুস্বরে বলছে। এই লোক তাহলে গলা নামিয়ে কথা বলতেও পারে! “আপনারে আমরা ফার্মগেটে সাইড কইরা নামায়া দিমু।” কোনো প্রশ্ন ভেসে আসলো না, কোনো আপত্তিও না। ঘটনা সবাই দেখেছে। মেয়েটি একবার ঘুরে তাকালো বাসের ভেতরে, উদ্ধত তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, গর্ব ঝিলিক দিচ্ছে চোখেমুখে, নারীর রূপ তো এমনই হওয়া চাই! গালের ওপর রক্তের মৃদু ছোপটুকু বাদে, দুধসাদা ত্বক আবারও তার জৌলুস ফিরে পেয়েছে। মানাচ্ছে বেশ। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে এলো। রচনাকাল – মে ০৮, ২০১৬ Please leave this field emptyচতুরঙ্গ আমার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে স্বাগতম! সাপ্তাহিক চতুরঙ্গ ইনবক্সে পাওয়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন! এতে আপনি প্রতি সপ্তাহে পাচ্ছেন আমার বাছাইকৃত চার লেখা! আপনার কাছে কোন স্প্যাম ইমেইল যাবে না। নিউজলেটার ইমেইল ইনবক্সে খুঁজে না পেলে স্প্যাম কিংবা প্রমোশনাল ফোল্ডার চেক করুন! Check your inbox or spam folder to confirm your subscription. ক্রাইম গল্প জীবনধর্মী সাসপেন্স
খুন Posted on January 2, 2014February 26, 2023 মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করলাম। প্রথমে ফয়সালের হাতের নার্ভ অনুভব করার চেষ্টা করলাম। নেই। Read More
মানুষ জিতবেই Posted on July 15, 2018July 21, 2022 ভারতের আদালত থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, জানেন তো? প্রকাশ্যে একটা ছেলে একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে পারবে – সেই ঘোষণা। এটা কোনও অপরাধ নয়। রাষ্ট্র এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। অন্য নাগরিকরাও নয়। আমরা যদি আগামিকাল ঠিকমতো আন্দোলনটা করতে পারি, এমন একটা ঘোষণা বাংলাদেশেও হবে। Read More
গরু Posted on November 25, 2013June 20, 2022 কসাই মামা এখনও ছুরি ধার দিচ্ছে। গরুর লোভে অনেকেই এসেছে আজ এখানে। মেম্বারশিপের চাঁদার একটা গতি হল ভেবেই তারা খুশি। আর আজ যদি গরু না পায় তবে ওই ছুরির ব্যবহার কোথায় হতে পারে অনুমান করে হনুমান হয়ে গেলাম। Read More