KP Imon

Words Crafted

ইরোনিয়াস

১.
দরজা খোলার সাথে সাথে মধ্যবয়েসি ভদ্রলোকের মুখে হতাশার ছাপ পড়ল।
এমনটা দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে – রায়হান স্বাভাবিকভাবেই তাকায় মানুষটার দিকে। চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি ঝুলিয়ে রাখতে ভোলেনি।

‘মি. রায়হানের কাছে এসেছি আমি। আবু মোহাম্মদ রায়হান।’ ভদ্রলোকের চোখগুলো ব্যস্ত হয়ে ঘরের এদিক থেকে ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।

আলতো করে মাথা দোলায় রায়হান, এই মানুষটি ক্লায়েন্ট সেটা ও দরজা খোলার সাথে সাথেই বুঝে ফেলেছিলো। হতাশার দৃষ্টি এই গোত্রটির চোখেই ফোটে – কারণ, এরা আসেন বড় কোন প্রত্যাশা নিয়ে।

‘আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। প্লিজ, ভেতরে বসুন।’ সাদরে আমন্ত্রণ জানায় রায়হান।

ইতস্তত পায়ে ভদ্রলোক ঢুকে পড়লেন। নোংরা সোফা সেটটার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেন তিনি। দামী পোশাকে ময়লা লেগে যাবে না কি – তাই ভাবছেন হয়ত। সেই সাথে হাল্কা কুঁচকে যাওয়া নাক দেখেই রায়হান বুঝতে পারে – এঁকে চা বা কফি সাধা চলে। কঠিন বা তরলেই এর সীমাবদ্ধতা। ধূমপান ইনি সহ্যই করতে পারেন না।

‘চা অথবা কফি?’ জানতে চায় রায়হান।
পাল্টা প্রশ্ন করেন ভদ্রলোক, ‘মি. রায়হান কি ঘরে নেই? আমার আসলে তাড়া ছিলো।’
স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়, ‘আগেই খোলাসা করা উচিত ছিলো। আমিই আবু মোহাম্মদ রায়হান।’
হতাশার চিহ্নগুলো আরও প্রকটভাবে ফুটে উঠল এবার ভদ্রলোকের চেহারায়। তবুও হাত মেলালেন ভদ্রতার খাতিরে।
‘আমার নাম মোস্তফা কামাল। আপনাকে আরও বয়স্ক কেউ হবেন ভেবেছিলাম।’

রায়হান সামান্য হাসলো। কথাটার পিঠে কোনরকম মন্তব্য না করে আবার জানতে চাইলো, ‘তাহলে কফি চলতে পারে? আপনি কি কফিতে দুধ নেন?’
কাঁধ ঝাঁকান মোস্তফা, ‘দুটোই চলে।’

রান্নাঘরে ঢুকে তাকের দিকে এগিয়ে যায় ও। তিনটি ফ্লাস্কে ভর্তি করাই আছে এখানে চা আর কফি। সারা দিনে প্রচুর চা পান করে রায়হান। মাঝে মাঝে স্বাদ পাল্টাতে কফির দিকে ঝুঁকে যায়, তবে সেটা সচরাচর সকালের দিকে। কফির ফ্লাস্কটা হাতে নিতে নিতে এপর্যন্ত ভদ্রলোক থেকে যা জানা গেছে তা একবার ভাবে ও।
এঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, টাকার খুব একটা অভাব তার নেই। তবুও বিশেষজ্ঞের কাছে না গিয়ে রায়হানের কাছে এসেছেন। অর্থাৎ এমন কিছু ঘটে গেছে যেটা তিনি গোপন রাখতে চান। সম্মানরক্ষার অদ্ভুত এক ধারণা এই উচ্চশ্রেণির মানুষগুলো ধারণ ও বহন করেন।

আরেকটি ঘটনা হতে পারে, বিশেষজ্ঞ দিয়ে ইনার কাজ হয়নি। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো হিসেবে রায়হানের কাছে এসে ধর্ণা দিয়েছেন।

বয়েস চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ – যে কোন একটা হতে পারে। কোন ধরনের সমস্যা সমাধান করতে এসেছেন বলাটা শক্ত। এই বয়েসের মানুষদের যে কোন মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। অল্পবয়েসীদের কেসগুলো ধরাবাঁধা ছকের মধ্যে পড়ে। এদেরগুলো নয়। তবে সম্মানরক্ষার ব্যাপারটি এলে, খুব সম্ভব নিজের জন্য নয় সেই নাটক।

দুটো কাপ ট্রে-তে সাজানোর ফাঁকে রায়হানের মনে হলো, সমস্যাটা এই ভদ্রলোকের ছেলে অথবা মেয়ের হতে পারে। এঁর বয়েস থেকে অনুমান করা চলে, ছেলেটি বা মেয়েটি হবে একজন টিন এজার।

ট্রে-টা সামনের টি-টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে জানতে চায় রায়হান, ‘আপনার কি একটাই সন্তান?’

মোস্তফা কামাল হাল্কা চমকেছেন। মুখের ভাবটা গোপন করার চেষ্টা না করে উত্তর দিলেন, ‘না। দুইজন।’
একটা কাপ তুলে নেয় রায়হান হাতে, ‘চমৎকার। আপনার সমস্যাটি নিয়ে তাহলে আলাপ করা যায় এখন।’

দেখাদেখি কফির কাপ হাতে নিলেন মোস্তফা কামালও, ‘তার আগে আপনার ব্যাপারে বলুন। আপনি কি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ?’
মাথা নাড়ে রায়হান, ‘উঁহু। নিজেকে আমি বলে থাকি সাইক-ইনভেস্টিগেটর। মনোরোগ নিয়ে আমার কোন একাডেমিক পড়াশোনাই নেই। ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলাম। অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি। দুই বছর পর ছেড়ে দিয়েছি – আগ্রহ পাচ্ছিলাম না।’

‘সে থেকেই এই শহরে চলে এসেছেন?’ সন্দিহান কণ্ঠে বলেন ভদ্রলোক, ‘আপনার গল্পটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।’

‘কাওকে খুন টুন করে ভার্সিটি থেকে বের হয়ে আসিনি আমি – যদি তাই জানতে চেয়ে থাকেন।’ মুচকি হেসে মানুষটার প্রশ্ন আন্দাজ করে নেয় রায়হান, ‘বাবার টাকা পয়সার অভাব ছিলো না – এই বাড়িটা দেখতেই পাচ্ছেন। ও ছাড়াও শেয়ারগুলো থেকে প্রচুর টাকা আসে। কাজেই আমার অপছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ার কোন মানে খুঁজে পাই নি।’
‘সাইকোলজি নিয়ে পড়লেই পারতেন। অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট যখন – সাবজেক্ট চয়েজে ওটা নেওয়া খুব কঠিন কিছু হওয়ার তো কথা না।’
‘নিতে পারি নি সে সময়। আমার মা চান নি ওটা আমি নেই। বয়েস কম ছিল, বাবা-মা যেদিকে চালিয়েছে সেদিকে ঘোড়া দাবড়েছি।’ কাটা কাটা ভাবে জবাব দেয় রায়হান।

এই লোককে নিজের ব্যাপারে বলতে হচ্ছে দেখে বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। একটা কেস একজনের হাতে তুলে দেওয়ার আগে তার ব্যাপারে জানতে চাইবে ক্লায়েন্ট এটা খুবই স্বাভাবিক।

‘এ বাসায় তাহলে আপনি মায়ের সাথেই থাকেন?’ মোস্তফা কামালের প্রশ্ন শেষ হয় না।
‘না। একাই থাকি।’ শান্তভাবেই বলে রায়হান, ‘বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই আমার।’
‘কিভাবে মারা গেলেন তাঁরা?’ হাল্কা চালে জানতে চাইলেন তিনি।

‘এ নিয়ে কথা বলি না আমি। কেসটা যদি আমাকে না দিতে চান – সেক্ষেত্রে কফিটা শেষ করে আসতে পারেন।’ উঠে দাঁড়ায় রায়হান। মেজাজ একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে ওর।

মোস্তফা কামাল একটু হাসলেন।
‘বসুন, প্লিজ। আপনার ওপর ভরসা করা ছাড়া আমার আসলে উপায়ও নেই। বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর।’

‘আপনার মেয়ের বয়েস কত?’ চট করে জানতে চায় রায়হান।
ফ্যাকাসে হয়ে গেল মোস্তফা কামালের মুখ, ‘কিভাবে জানলেন-’
‘বয়েস কত?’
‘এগারো।’
‘আপনার ছোট মেয়ে।’
ফ্যাকাসে মুখটা আরেকটু বাড়ে ভদ্রলোকের, তারপর হেসে ফেললেন, ‘মাহফুজ আমার ব্যাপারে বলেছে আপনাকে ফোনে? তাই না? আর সেসব তথ্য গড় গড় করে বলে চমকে দিতে চাইছেন আমাকে?’
অবাক হয় রায়হান, ‘ওয়েস্ট-ইস্ট ইউনিভার্সিটির লেকচারার মাহফুজ? তার সাথে গত কয়েক মাসে আমার যোগাযোগ হয়নি। আপনার ব্যাপারে যা বলেছি সেটা আপনিই আমাকে জানিয়েছেন। মুখে না জানালেও আপনাকে হাল্কা পর্যবেক্ষণ করলে এটা অনুমান করতে পারবে যে কেউ।’
থমথমে মুখে মাথা দোলালেন মোস্তফা, ‘অর্থাৎ আপনি নিজের কাজে আসলেই ভালো। আপনাকে আমার সমস্যা খুলে বলবো। তবে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, কাওকে এ বিষয়ে সামান্যও জানাতে পারবেন না। আপনার বন্ধু মাহফুজকেও না।’
‘আমার ক্লায়েন্টের ব্যাপারে আমি কাওকে কিছু জানাই না।’

বুঝতে পারছে, মাহফুজের সাথে কোনভাবে এই ভদ্রলোকের পরিচয় আছে। তিনি হয়ত ব্যতিক্রমী কোন সাইকিয়াট্রিস্ট খুঁজছিলেন – বেচারাকে সে রায়হানের ঠিকানা ধরিয়ে দিয়েছে। নিজের অজান্তেই মাথা দোলালো একবার ও।
পুলিশ বাদে এই প্রথম মালদার পার্টি এভাবেই ওর কাছে এসেছে একারণেই!

‘সফল কেসের ক্ষেত্রে আপনাকে কত দিতে হয়?’ আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানতে চাইলেন মোস্তফা কামাল।
‘ত্রিশ হাজার। কেস শেষে লিখে দেবেন । কেস ব্যর্থ হলে কোন টাকা-পয়সা আমি নেই না।’
‘ফাইন। আমার কোন আপত্তি দেখছি না।’ ঘাড় কাত করে বলেন তিনি, ‘তাহলে সরাসরি আমাদের সমস্যাতে চলে আসতে পারি?’
কিছু না বলে মাথা দুলিয়ে সায় দেয় রায়হান।

‘নতুন ডক তৈরী হয়েছে এদিকে একটা। জানেন বোধহয়, কৈলাকুটিরে। ওটা আমাদের।’ গলা খাঁকারি দেন তিনি, ‘মানে, মালিকানা আমাদের পাঁচজনের। ওখান থেকে ভালো লাভ আসতে যাচ্ছে – আর আমার পূর্বপুরুষের অঢেল জমি আছে এদিকে। কাজেই ঢাকা থেকে চাকরী ছেড়ে পরিবার নিয়ে আপনাদের শহরে চলে এসেছি আমি – মাস দুয়েক হল। উদ্দেশ্য – এখানে আরও কিছু বিজনেস সেক্টর বের করে নেওয়া।’

কফিতে চুমুক দিতে বিরতি নিলেন তিনি, তারপর আবার শুরু করলেন, ‘আমিও আপনার মত কিছুটা। পূর্বপুরুষের অঢেল সম্পত্তির বদৌলতে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু তাদের সম্পত্তির পরিমাণ আমি ভোগ করে ফুরিয়ে দিতে চাই না – বরং চাই আরও বেড়ে যাক ওটা। তাছাড়া শুয়ে বসে খাওয়ার অভ্যেস আমার নেই। তাই দশ বছর শুধু চাকরী করে গেছি এক কোম্পানিতে।’
কথা কেড়ে নেয় রায়হান, ‘অবশেষে ইচ্ছে হয়েছে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে আরও ভালো কিছু বের করা সম্ভব কি না – সেটা খতিয়ে দেখতে। এটুকু আমি বুঝতে পারছি, মি. কামাল। আপনি আসল কথাতে চলে আসুন।’

একটু বিভ্রান্ত মনে হয় এবার তাঁকে, ‘এ শহরে আমাদের পুরোনো বাড়িটিতেই উঠেছি আমরা। বাড়িটাকে নিয়ে অনেক গুজব আছে । গুজবটা মূলতঃ আমার প্র-পিতামহ মানে আমার দাদার বাবাকে নিয়ে।’
‘উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকের কথা তারমানে। বলে যান।’ তেমন আগ্রহ দেখা যায় না রায়হানের ভেতরে।
‘প্রচণ্ড নিষ্ঠুর ছিলেন তিনি। জমিদারী প্রথার প্রচলন তখন ছিলো। সমুদ্রের কিনারে এ এলাকাতে তেমন কেউ মনোযোগ দিতো না। এখানকার প্রজাদের হর্তাকর্তা ছিলেন আমার গ্রেট গ্রান্ডফাদার।’
সোফাতে হেলান দেয় রায়হান আরাম করে, ‘তাকে নিয়ে গুজবটা ঠিক কি ছিলো?’
‘গুজবটা তাকে নিয়ে নয়। ওটা আমাদের বাড়িটি নিয়ে। কয়েকবার ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমি ঢাকা থেকে। কিন্তু পারিনি। প্রতিটা পরিবার সরে গেছে। তাদের অভিযোগ – বাড়ির নারীসদস্যরা অস্বস্তি অনুভব করেছে সব সময়।’
‘নারী-প্রজাদের ওপর জমিদারবাবুর নিষ্ঠুরতার পরিমাণ কি পুরুষের চেয়েও বেশি ছিলো নাকি?’

মাথা নাড়লেন মোস্তফা কামাল, ‘পুরুষের ওপর অত্যাচারের কোন মাত্রা ছিলো না আমার গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের। খাজনা দিতে একদিন দেরী হলেই প্রজাদের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার অভিনব নজির তিনি রেখেছিলেন। তবে বাড়ির গুজব পুরুষাঙ্গ নিয়ে নয়।’
বুঝতে পারল রায়হান, তবে একমত হল না। বরং মাথা হাল্কা দুলিয়ে প্রশ্ন করল, ‘পুরুষাঙ্গবিহীন প্রজাদের স্ত্রীরা ঠিক কোথায় থাকতো তখন?’

গম্ভীর হয়ে যান কামাল, ‘গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার স্ত্রীদের দিকে চোখ দিতেন ঠিকই – তবে রতিক্রিয়াতে মেতে উঠতেন কন্যাদের সাথে। তাঁর পদ্ধতি ছিলো খুবই অভিনব। মা-মেয়েকে নিয়ে এসে মেয়ের ওপর চড়াও হতেন তিনি মাকে বেঁধে রেখে। ধর্ষণের ফাঁকে ফাঁকে নিজের যৌনসঙ্গীর মাকে ছুরি দিয়ে বার বার আঘাত করতেন। এটাই ছিলো উনার রুচি।’
“যে নারীর মেয়ে নেই?”
“তাদের মাকে ধরে আনা হতো, বয়েস যতই হোক।”
“যার মা এবং মেয়ে কোনটাই নেই?”
“স্বামীর পুরুষাঙ্গের সাথে যেত তাদের গর্দানখানাও।”
সামনের টেবিলে কাপ নামিয়ে রাখল রায়হান, ‘কাজেই – অসহায় সেসব নারী মারা পড়েছিলো আপনাদের ওই বাড়িতে। গুজবের শুরু ওখানে হওয়া মোটেও বিচিত্র নয়। কিন্তু ইতিহাস নিশ্চয় সমস্যা নয় আমাদের জন্য? আজ আমার বাড়িতে আপনি এসেছেন বাস্তব কিছু নিয়ে আলোচনা করতে। সে প্রসঙ্গে চলে আসতে পারেন।’

‘কিন্তু ইতিহাসের একটা ভূমিকা আছে। জমিদার-পূর্বপুরুষটি সব বয়েসী নারীদের সাথে বিছানাতে যেতেন না। শিশু আর কিশোরীদের সাথেই তিনি মিলিত হতেন।’ শান্ত কণ্ঠে আগের প্রসঙ্গেই ফিরে যান মোস্তফা কামাল, ‘আমার মেয়েটির বয়েস এখন ওই বয়েসসীমার ভেতরে।’
‘আপনি আপনার মেয়ের নাম এখনও বলেন নি।’ হঠাৎ বাঁধা দেয় রায়হান।
‘ঈপ্সিতা।’
‘কি ধরনের আচরণ করেছে আপনার মেয়ে?’

এক মুহূর্ত ইতস্তত করেন মোস্তফা কামাল। রায়হানকে বিশ্বাস করা যায় কতটুকু তা ভাবছেন।
তারপর গলা খাঁকারি দিলেন একবার।

‘কাজের ছেলে ছিলো একজন আমার বাসাতে। বয়েস বেশি না।’ চোখ পিট পিট করে তাকালেন ভদ্রলোক, ‘তিন রাত আগে ছেলেটির পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়েছে ঈপ্সিতা।’

২.
‘এই ঘরে থাকতেন আফনে।’

যোবাইদা নামের কাজের মেয়েটা দেখিয়ে দিতে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে রায়হান। শহরের একেবারে অন্যপাশে এই বাড়িটা। ছোট একটা টিলার ওপরে। এখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়।
নিঃশব্দে যোবাইদা বের হয়ে গেছে – রায়হান ধীরে সুস্থে নিজের কাপড়গুলো বের করে করে খালি আলনাতে তুলে রাখে। বাইরের ঘরের মত এই ঘরের দেওয়ালেও ঝুলছে ছবি। ছবিগুলোর ভেতরের নারীরা প্রত্যেকে নগ্ন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটে এসে বসে রায়হান। এই ছবিগুলো দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন কেন মোস্তফা কামাল আজও? দুইজন আন্ডারএজড ছেলে মেয়ে এখানে বাস করে!

প্রশ্নটা ভদ্রলোকের সাথে দেখা হলেই জেনে নেওয়া যাবে।
গতকাল তাঁর সাথে তেমন কথা হয়নি। শুধু ঈপ্সিতার সমস্যাগুলো শুনেই আগ্রহী হয়ে উঠেছে ও কেসটার ব্যাপারে। কাজের ছেলেটার মৃত্যুর কথা একেবারেই চেপে যাওয়া হয়েছে। সবাই জানে, ছেলেটি বিশ হাজার টাকা সাথে নিয়ে পালিয়ে গেছে। পুলিশ জমিদারের বাড়িতে ঢুকে তদন্ত করবে না। তাদের কাছে বড়লোকের মুখের কথাই কাফি।

মোস্তফা কামাল থানায় ওই গল্পটিই জানিয়েছেন। যে কোন মূল্যে যেন ছোকরাকে গ্রেফতার করা হয়। নিজের মেয়ের কীর্তি ঢাকতে এটুকু তাঁকে করতেই হত – এ বলে কৈফিয়ত দিয়েছেন তিনি রায়হানকে। ও অবশ্য তেমন একটা গায়ে মাখে নি বিষয়টা। মানসিক কোন রহস্য থাকলে সেটা সমাধানে রায়হান আগ্রহী। কে কোথায় খুন হলো না পুরুষাঙ্গ হারালো তা দিয়ে তার কিছু এসে যায় না। পুলিশ মাঝে মাঝে তার সাহায্য নিয়ে থাকে – তার মানে সে ওদের একজন নয়। কাজেই আইনের দিক থেকে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা নিয়ে চিন্তা করার প্রশ্নই আসে না।

ঘরের প্রতিটা আসবাবই জমিদারবাড়ির সমান বয়স্ক। অথবা ওরকম বলেই মনে হচ্ছে। এমনও হতে পারে মোস্তফা কামালের বাবার সময়কার এসব। আর ওটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে বড়। প্রাচীন যে কোন কিছুর মতই।

ভালো করে তদন্ত করে দেখার জন্য রায়হান তিনদিন এই বাড়িতে থাকতে চেয়েছে। ঈপ্সিতা তার কর্তন-কর্ম সেরেছে রাতের বেলাতে। কাজেই রাতে থাকাটা বিশেষ জরুরী। আর একটা কেস নিলে সাবজেক্টের মানসিক অবস্থা কী থেকে প্রভাবিত হতে পারে, তা জানা রায়হানের দরকার। সে জন্য সাবজেক্টের পরিবেশে দুই একদিন কাটানোটা দরকার। সতর্কতার জন্য একদিন বেশি নিয়েছে ও। তিন দিন তিনরাতের মাঝেই এই কেসটা সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।

একটা ভাঁজ করার মত টেবিল নিয়ে যোবাইদা ঢুকে পড়ল। তার দিকে মুখ তুলে তাকালো রায়হান। মেয়েটা একবারও এদিকে নজর দিল না, চুপচাপ টেবিলটা ঘরের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে বের হয়ে যায়।
ঘরটার বিশালত্ব প্রথমবারের মত চোখে পড়ে ওর এবার। খাট, কাপড় রাখার বিশাল আলমারি, আয়না সহ একটা বড় ড্রেসিং টেবিল, আলনা আর বুক সেলফ রাখার পরও অনায়াসে ইনডোর ক্রিকেট খেলা যাবে। কাজের মেয়েটা এরই মাঝে আবার ফিরে এসেছে। হাতে বড় একটা ট্রে, নাস্তাগুলো টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।

‘আমি নাস্তা করেই এসেছিলাম।’ মৃদু কণ্ঠে বলে রায়হান।
মুখ ফিরিয়ে তাকালো যোবাইদা, তবে সরাসরি ওর দিকে নয়, কেমন অস্বস্তিকর একটা ভঙ্গী যেন – রায়হান ঠিক ধরতে পারে না, ‘সাহেবে বলছেন আপনের লগে নাস্তা বইবেন।’
মাথা দোলায় ও , ‘ঠিক আছে।’

প্রায় সাথে সাথেই ঘরে ঢুকে পড়লেন মোস্তফা কামাল। চমৎকার চুলগুলো আজ ব্যাকব্রাশ করা, গাল হাল্কা নীলাভ হয়ে আছে। সম্ভবতঃ সদ্য শেভ করেছেন। চুল আর ত্বক দেখে মনে হচ্ছে মাত্রই গোসল করে এসেছেন। রায়হান বোঝে সাত সকালে এঁর গোসলের অভ্যাস আছে।
উঠে দাঁড়ায় ও, হাত বাড়িয়ে দেয় – নিঃসংকোচে হাত মেলালেন মোস্তফা।

‘আপনাকে খুব বেশি সময় বসিয়ে রাখিনি তো? গোসলে একটু দেরী হয়ে গেল।’ দুঃখপ্রকাশের ভঙ্গীতে নয়, যেন বলার জন্য বলছেন এভাবে বলেন তিনি।
‘না না, মাত্রই এলাম।’ আশ্বস্ত করে রায়হান।
চেয়ার এনেছে যোবাইদা একটা, ওটা টেনে নেন মোস্তফা, ‘হাত ধুয়ে বসে পড়ুন। আর বেলা করে কাজ নেই।’

কাজেই বসে পড়ে ও। ঢাকনা সরাতেই দেখা গেল মিহিভাবে বেলা রুটি আর নাম না জানা অসংখ্য পদের রান্না পরিবেশন করা হয়েছে।
‘চিনতে পারছেন না?’ রায়হানের বিভ্রান্ত দৃষ্টি লক্ষ্য করে হেসে ওঠেন মোস্তফা, ‘কচ্ছপের মাংস।’
চোখ কুঁচকে গেছে ওর, লক্ষ্য করে দ্রুত আবার বলেন তিনি, ‘স্যামন ফিশ। টিনে করে আনা। ডক কাছে হওয়াতে হয়েছে সুবিধে। সবকিছুই সামুদ্রিক। ওই মাছগুলো কেমন অদ্ভুত রকমের সুস্বাদু হয় খেয়াল করেছেন?’
একটু হাসে রায়হান, ‘কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে এদের। মিঠেপানির মাছ থেকে আলাদা লাগে খেতে। ভালোই।’

মোস্তফা কামাল চরিত্রটাকে ঠিক বুঝে উঠে না ও, গতকাল ছিলেন নিখুঁত ভদ্রলোক। ময়লা সোফাতে বসতে চাইছিলেন না। তারপর আজকে আতিথেয়তার চূড়ান্তে এসে মেহমানের ঘরে এসে একসাথে নাস্তা করতে চাইলেন এবং একেবারেই হঠাৎ খাবারের সময় বাজে রসিকতা – ঠিক শোভন নয় সেটা। স্বাভাবিক মোস্তফা কামালের সাথে যাচ্ছে না।
এক মানুষের ভিন্নরূপ দেখতে পেলে সেটা মাথার ভেতর নোট করে রাখতে হয় – অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটা জানে রায়হান।

মোস্তফা কামাল সম্ভবতঃ রায়হানের অস্বস্তির কারণটা বুঝলেন। চট করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেন তিনি।

‘আপনাকে কেন ডেকেছি তা আশা করি বুঝতে পারছেন?’
রুটির টুকরোটা গিলে ফেলার আগে রায়হান উত্তর দেয় না, ‘আপনি চাইছেন ঈপ্সিতার ব্যাপারটা একটা সমাপ্তিতে আসুক। নিজের মেয়েকে চিনতে পারছেন না আপনি। হঠাৎ করে তার অচেনা হয়ে যাওয়ার কারণটাও ঠিক বুঝতে পারছেন না। কাজেই এখানে আমাকে দরকার হয়েছে।’
মাথা নাড়লেন মোস্তফা, ‘সেটা বড় ব্যাপার না। বড় কথা হল ঈপ্সিতা একজন মানুষ খুন করেছে। সে আবারও আঘাত হানবে কি না আমি জানি না। আপনার কথা সত্য – আমার মেয়েকে আমি চিনতে পারছি না। কিন্তু আমার চোখ থেকে দেখুন – আমার মেয়ে একজন খুনী। এই অনুভূতিটা আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। তার বিচারের জন্য পুলিশের কাছে আমি যাবো না। তার কারণ এই না, ঈপ্সিতা আমার মেয়ে। তার কারণ এটাও না, ঈপ্সিতার বয়েস মাত্র এগারো। আমি পুলিশের কাছে বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই নি – কারণ আমার মনে হয়, বিষয়টা একেবারেই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে নি, মানে-’

শব্দের অভাব বোধ করছেন মোস্তফা কামাল, বোঝে রায়হান, তাঁর কথাটা সে নিজেই শেষ করে দেয়, ‘আপনি ভাবছেন এখানে অতিলৌকিক কিছু একটা আছে। নিজের জমিদার পূর্বপুরুষের বিদেহী আত্মা এই বাড়িতে আটকে গেছে এরকম কিছু একটা ভাবছেন আপনি।’
হাল্কা মাথা দোলান মোস্তফা কামাল, ‘বলতে পারেন। আসলে, আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছি না এমন কিছু। নিজেকে বাস্তববাদী মানুষ হিসেবেই চিনি। আবার উড়িয়েও দিতে পারছি না একেবারে।’
পানির গ্লাসটা টেনে নেয় রায়হান, ‘আপনার পূর্বপুরুষটি সম্পর্কে বলুন। আগে তেমন বিশদ জানা হয় নি।’

‘রুদ্রপ্রতাপ রায়। নামের প্রতি তিনি অবিচার করেন নি। জীবনটা কাটিয়েছেন প্রতাপের সাথে। রুদ্রমূর্তি ধারণে ইনার জুড়ি ছিলো না।’ মৃদু হাসলেন মোস্তফা কামাল, হাসিটা তিক্ততার, ‘হাল্কা ভাবে বলছি বটে, তবে নিজের পূর্বপুরুষের আচরণ নিয়ে আমি মোটেও গর্ব করার মত কিছু দেখি না। নিজের বংশ তো আর পাল্টানো যায় না। তাই না?’
‘তা বটে। জমিদারবাবুই কি এই বাড়ির পত্তন ঘটিয়েছেন?’
‘হুঁ। তার এই একটা কাজই লজ্জা পাবার মত নয়। আর সবই -’

এই বাড়ি তৈরি করতে যে পয়সা আর শ্রম নেয়া হয়েছে তা যে তার লজ্জাস্কর কর্মকাণ্ডের ফলাফল তা রায়হান মনে করিয়ে দিল না আর। যার বাড়িতে দাওয়াত, তাকে চটানো স্বাস্থ্যের জনয সব সময় উপকারী নয়।

‘স্বভাবের দিকে এঁর মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরতে পারবেন? খেয়ালী হন এঁরা। ইনার খেয়ালটা কোনদিকে ছিলো?’
একটু ভাবলেন মোস্তফা কামাল, ‘আলাদা করে এভাবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিন প্রজন্ম আগের কথা – বুঝতেই পারছেন। তবে পারিবারিক ডায়েরী থেকে যা জানতে পেরেছি – ইনার খেয়ালের অভাব ছিলো না। তীর ধনুক দিয়ে মানুষ শিকার করতেন ইনি। অযোগ্য বলে প্রমাণিত চাকর বাকর আর প্রজাদের হতে হত শিকার। ময়দানে তাদের পালানোর সুযোগ দেওয়া হত। ঘোড়া চড়ে একে একে সবাইকে শিকার করতেন। খাওয়ার ব্যাপারেও তাঁর খামখেয়ালীপনা ছিলো। মাসে একদিন রাজভোজ হত। সে ভোজে তিনি মেয়ে মানুষের বুকের মাংস খেতেন। অবশ্যই রান্না করা হত সেটা। কাঁচা মাংস আবার উনার পছন্দ ছিলো না।’
‘প্রজাদের ভোগের সামগ্রী ছাড়া আর কিছু ভাবেন নি দেখছি ইনি!’ তিক্ত কণ্ঠে বলল রায়হান, ‘আপনাদের পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো কবে?’
‘আমার দাদা করেছিলেন।’

চুপচাপ খাওয়াতে মন দেয় ওরা আবার।
রায়হানের মাথাতে নতুন তথ্যগুলো ঘুরছে। পারিবারিক ডায়েরীর কথা উল্লেখ করেছেন মোস্তফা কামাল। তবে সেটা রায়হানকে পড়তে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। অথচ ও জানে, সমস্যাটার গোড়া রুদ্রপ্রতাপ রায়ের ইতিহাসে থাকলে ওই ডায়েরী পড়া লাগবে ওকে। তবে এই মুহূর্তে ওটা না হলেও চলবে।

‘ঈপ্সিতাকে বলেছি আজ স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই।’ খেতে খেতে জানালেন মোস্তফা।
‘তা কেন?’ অবাক হয় রায়হান, ‘ওর স্বাভাবিক জীবনে বাঁধা দেওয়া যাবে না। ওকে অবশ্যই স্কুলে পাঠান।’
‘কিন্তু ভেবেছিলাম তার সাথে আপনি কথা বলতে চাবেন।’ অবাক হন মোস্তফা।
‘তা অবশ্যই বলবো।’ একমত হয় রায়হান, ‘তবে স্কুল থেকে ও ফিরে আসার পরও তা বলা যাবে। নয় কী?’
“অবশ্যই। সে কথাই রইলো তবে। তবে দয়া করে আপনি নিজের সত্যিকারের পরিচয় দেবেন না। আমি চাই না মেয়েটা জানুক আপনি তাদের পাগলামি সারাতে এসেছে। বিগড়ে যেতে পারে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন?”
মাথা দোলালো রায়হান, “অবশ্যই। চিন্তা করবেন না এ নিয়ে।”

আর কিছু বলল না ও। ঈপ্সিতা নামক সাবজেক্টটার রুমে একবার ঢুঁ মারতে হবে ওকে যখন সে তার ঘরে থাকবে না। স্কুলে গেলে সেই টাইম গ্যাপটা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। মূল লক্ষ্য ওটাই ছিল রায়হানের। মেয়ে স্কুলে গিয়ে বিদ্যাবাগীশ হবে এমন সদিচ্ছা থেকে স্কুলে পাঠাতে তোড়জোড় করেনি সে।

৩.
ছোট্ট মেয়েটা দুই হাত সামনে ছেড়ে দিয়েছে। ও অবস্থাতেই একে অপরের সাথে আটকে রেখেছে ওদের।
মুখটা একেবারেই নিষ্পাপ – এগারো বছরের শিশুদের মাঝে যেটা থাকে। চুলগুলো ছেড়ে রেখেছে – কাঁধের ওপর এলিয়ে আছে ওগুলো। চোখের মাঝে নিরীহ একটা দৃষ্টি। বাবা যখন বলেছিল তার বন্ধু কথা বলবে ওর সাথে, ভেবেছিল অনেক বয়স্ক কেউ হবে। রায়হানকে দেখে অবাক হয়েছে। এরপর এরকম একটা নিরীহ দৃষ্টিই ফুটে উঠেছে ঈপ্সিতার মুখে।
অস্বাভাবিক কোন আচরণ রায়হান এখন পর্যন্ত দেখেনি।

‘দাঁড়িয়ে কেন? বস তুমি।’ একটু হাসে রায়হান, ‘তোমার নাম তো ঈপ্সিতা, তাই না?’
মাথা দোলায় মেয়েটা। কথা বলে উত্তর দেয় না, অথবা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না।
‘আগে ঢাকার কোথায় থাকতে তোমরা?’ ঘরোয়া আলাপের ভঙ্গিতে জানতে চায় ও।
প্রথমবারের মত কথা বলে ঈপ্সিতা, ‘ধানমন্ডি। তুমি চেন?’
‘হুঁ। সুন্দর জায়গা। ওখান থেকে এখানে এসে তোমার মন খারাপ করে না?’
চুল দুলিয়ে মাথা নাড়ে বাচ্চা মেয়েটা, ‘না। এ জায়গাটা আরও ভালো।’
‘পুরোনো বাড়ি ভালো লাগার কথাই অবশ্য। তোমাদের এই বাড়িটা বিশাল। তাই না?’
চোখ সরু হয়ে যায় ঈপ্সিতার, এতটাই আচমকা রায়হানও প্রস্তুত ছিলো না, ‘আপনি আমাকে কেন প্রশ্ন করছেন? আমি কি কিছু করেছি?’

রায়হান চাইলে বলতে পারতো, ‘প্রশ্ন নয়, ঈপি, তোমার সাথে এমনি আলাপ করছি।’ তবে এসব ভুজুং ভাজুং দিয়ে এই মেয়েকে ভোলানো যাবে না। মোস্তফা কামালের ধারণা ছিলো কাজের ছেলের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার ঘটনাটা ঈপ্সিতার মনে নেই। শকে চলে গেছিলো তখন মেয়েটা।
তবে এই মুহূর্তে রায়হানের মনে হয়, পুরো বিষয়টা সে মনে রেখেছে। কাজেই, বিপদের সম্ভাবনা দেখা মাত্র আক্রমণে চলে গেছে। মেয়েটি বয়সে ছোট বলে ওকে হাল্কাভাবে নেওয়ার কোন কারণ নেই আর। একে মুখ খোলাতে ভালো বেগ পেতে হবে।

কাজটা করার সময় কি এই ভূতুড়ে মেয়েটা ব্যাপারটিকে উপভোগ করেছিলো? ভাবনাটা মাথাতে আসতেই রায়হানের মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে শীতল প্রবাহ টের পায় ও।

‘তোমাকে প্রশ্ন করছি, কারণ – তোমার সাহায্য আমার প্রয়োজন, ঈপ্সিতা।’ সোজাসাপ্টা কথা বলছে এভাবে জবাব দেয় রায়হান, ‘আমি একজন লেখক। আর এবারে যে উপন্যাসটা লিখতে চলেছি – সেটা একটা পুরোনো বাড়ি নিয়ে। তোমাদের বাড়িটার মতই। আরও মজার ব্যাপার কি জানো? ’
ঈপ্সিতাকে দেখে মনে হয়, এই ব্যাখ্যাতে সে সন্তুষ্ট হয়েছে, জানতে চায়, ‘কী?’
‘গল্পের নায়িকা তোমার মত ছোট্ট একটা মেয়ে। কাজেই – তোমার সাথে কথা বললে মেয়েটাকে চেনা আমার জন্য সহজ হবে।’

মাথা দোলায় ঈপ্সিতা, যেন বুঝেছে সবই। রায়হান প্রশ্ন চালিয়ে যায়, ‘কাজেই, আমার জানা দরকার – বড় একটা শহর থেকে আমার নায়িকাটি যখন প্রাচীন এই জায়গাতে আসল, তখন তার ঠিক কেমন লেগেছে। মন খারাপ কতটুকুই লেগেছে পুরোনো জায়গা ছেড়ে আসতে, কতটুকু ভালো লেগেছে নতুন জায়গাতে আসতে। অথবা -’
‘আমি এখানে আমার পরিবারকে ফীল করি।’ উদাস একটা ভঙ্গীতে বলে মেয়েটা।
একটু গভীরভাবে ভাবে রায়হান, ‘পরিবার মানে, তুমি তোমার পূর্বপুরুষের কথা বলছ?’
‘ভালোবাসে আমাকে ও। অন্যরকম ভালোবাসা। জায়গাটা আমার খুব পছন্দ।’ মুচকি হাসে ঈপ্সিতা।

হাসির ধরন দেখে ভেতরটা কেঁপে ওঠে রায়হানের।
চারপাশে একবার তাকায় দ্রুত। দিনের আলো স্পষ্ট। তারওপর কথা বলছে একজন বাচ্চা মেয়ের সাথে। আচমকা কেন নার্ভাস লাগছে ওর – সেটা বুঝতে পারে না সে।
তবে একটা ভালো দিক হল, হঠাৎ নিজেকে খুলে দিয়েছে সাবজেক্ট। একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে অল্প সময়েই ক্লু দিয়েছে। এটুকু পেতে কারও কারও পেছনে সপ্তাহখানেক ব্যায় করা লাগে।

ও তাকে ভালোবাসে। ওকে মেয়েটা ফীল করে! ও হল পরিবার।

“ও” টা কে?

‘জায়গাটা আমারও ভালো লেগেছে।’ একটু হাসে রায়হান, ‘ও তোমাকে অন্যরকম ভালোবাসে – ব্যাপারটা ভালো।’
চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঈপ্সিতার, যদিও কণ্ঠে রুক্ষতা এনে ফেলেছে, ‘আপনি কিছুই জানেন না।’
‘ওর নামটা বলবে আমাকে?’
‘তা দিয়ে আপনার দরকার কী?’ একেবারে হঠাৎ আক্রমণে চলে গেলো আবার ঈপ্সিতা।
‘তোমাকে বলতেই হবে, এমন কিছু না। ইচ্ছে না হলে থাকুক। তবে আমার গল্পের মেয়েটাও পরিবারের একজনের বিশেষ ভালোবাসা পায়। সেজন্য জানতে চেয়েছিলাম।’
সরু চোখে মেয়েটা তাকায় ওর দিকে, ‘আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না। ওর নাম বলতে পারি – তবে ভবিষ্যতে আমার সাথে কথা বলতে আসবেন না, এই কথা আপনাকে দিতে হবে।’
একটু ভেবে রাজি হয়ে যায় রায়হান, ‘কথা দিলাম।’
‘আমার বাবাকে বলে আমাকে কথা বলতে বাধ্য করাবেন না?’
‘করাবো না। তোমাকে আর ঘাঁটাবো না আমি।’ একটু হাসে রায়হান, ‘জোর করার মত মানুষ বলে ভাবছ হয়তো, আমি ওরকম নই।’

জ্বলন্ত চোখে চেয়ে থাকে মেয়েটি। ঠোঁটদুটো একে অন্যের সাথে চেপে বসেছে।
রায়হানের মনে হল এখনই চেয়ার থেকে উঠে বেড়িয়ে যাবে মেয়েটা, তাকে বিশেষ ভালোবাসতে থাকা মানুষটির নাম না বলেই।

ওর ধারণা সত্য প্রমাণ করার জন্যই উঠে দাঁড়ায় মেয়েটা। চেয়ারটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় একপাশে। ঢোকার সময় যে শান্ত মূর্তি নিয়ে ঢুকেছিলো ও – তার ছিঁটেফোঁটাও এখন অবশিষ্ট নেই। চরিত্র যেন আচমকাই পাল্টে গেছে ওর।

দরজা দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার আগে ফিরে তাকায় ঈপ্সিতা।
হিস হিস করে হিংস্র একটা কণ্ঠে উচ্চারণ করে, ‘ওর নাম রুদ্র।’

৪.
বাগানের এক কোণে বসে সবুজ রঙের পেয়ালা থেকে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন মোস্তফা কামাল। সেদিকে এগিয়ে যায় রায়হান।
মোস্তফার সঙ্গে অসামান্যা সুন্দরী এক মহিলা আছে এখন। আর আছে চৌদ্দ-পনের বছরের এক কিশোর।
কাছাকাছি গিয়ে মুখে হাসি ফোটায় রায়হান।

‘যাক, আসতে পারলেন তাহলে।’ বিশাল এক হাসি দিয়ে রায়হানের হাসির জবাব দেন মোস্তফা, ‘বসুন। বসে পড়ুন। নিজে না গিয়ে যোবাইদাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছি বলে কিছু মনে করেননি তো?’
হাসিটা মোছে না রায়হানের মুখ থেকে, ‘আমি বাঙালী অতিথেয়তার চেয়ে ইংরেজ আতিথেয়তাকে বেশি পছন্দ করি। এটাই ঠিক আছে। নিজের বিকেল বেলার জগিং বাদ দিয়ে যদি আমার ঘরে গিয়ে ডেকে আনতেন– তবেই বিরক্ত হতাম।’
সোজা হয়ে বসেন মোস্তফা, ‘দারুণ লাগলো আপনার এই চিন্তাটা। আমিও এভাবেই ভাবি, বুঝলেন। অথিথিপরায়ণতার নাম করে আমরা আসলে পর-অধিকারচর্চা করে থাকি। তবে বাংলাদেশি সবাই এরকম ভাবে না। মানে ভাবতে চায় না… পরিচয় করানো হয় নি – মাফ করবেন।’
মহিলার দিকে ফিরলেন তিনি, ‘দিস ইজ মাই বিউটিফুল ওয়াইফ, রাইসা।’
মাথা দোলায় রায়হান, ‘প্লেজার টু মীট ইউ, মিসেস কামাল। ’
‘আর এ হল আমার বড় ছেলে, জাহিদ। জাহিদ, উনি হলেন মি. আবু মোহাম্মদ রায়হান, এসেছেন ঈপ্সিতার চিকিৎসার জন্য।’

ছেলেটা ভদ্র আছে, নিজের সীট থেকে উঠে এসে হাত বাড়িয়ে দেয়, ‘আপনার ব্যাপারে শুনেছি, স্যার। মাহফুজ ভাইয়া বলেছে, নিজের কাজে আপনার মত দক্ষ আর কেউ নেই।’
হাত মেলায় রায়হান, মুখে হাসি, ‘বন্ধুর ব্যাপারে যখন কোন বন্ধু প্রশংসা করে – হয়তো চাপাবাজি সেটা নয়, তবে বেচারা বন্ধুর প্রতি তার উচ্চধারণা থাকতে পারে। কাজেই সবকিছু বিশ্বাস করতে নেই।’
‘আপনার বিনয়ের ব্যাপারেও বলেছেন তিনি।’
‘আমাকে স্যার বলে ডাকবে না আশা করি। নাম ধরেই ডাকতে পারো। ওই যে বলেছিলাম – বাংলাদেশি-’
‘বুঝেছি।’ হেসে ফেলে জাহিদ, ‘আ’ম ওকে উইথ রায়হান।’
‘ঈপ্সিতার ব্যাপারে কি দেখলেন, মি. রায়হান?’ জানতে চাইলেন মোস্তফা কামাল।

মিসেস কামাল এক কাপ চা বাড়িয়ে দিয়েছেন ওটা হাতে তুলে নেয় রায়হান, ‘মেয়েটির ব্যাপারে আমার পক্ষে এখনও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব না। তবে তার মুড ডিজঅর্ডার আছে। ঠিক কোনদিকে যাবে তা বের করতে সময় তো লাগবেই, এখনতক আমার বেট, ডিপ্রেশন।’
‘এগুলো কি খারাপ কিছু?’ শঙ্কিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন মিসেস কামাল।
‘খুব গুরুতর কিছু হতেই হবে এমন নয়। মেয়েদের পিএমএস থেকে শুরু করে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার সবই এর মধ্যে পড়তে পারে। আগেই ভয় পাবার কিছু নেই। তবে ঈপ্সিতার কয়েকদিন আগের ইতিহাস যেহেতু আমরা জানি, হাল্কা করে নেবার উপায়ও থাকছে না। তবে এই মুহূর্তে আমি জানি না, এই মুড ডিজঅর্ডার ঠিক কি মীন করছে।’

পাশ থেকে প্রশ্ন করে জাহিদ, ‘এতে কি হয়, মুড পাল্টে যায় বার বার সাবজেক্টের?’
‘মুড স্বাভাবিক মানুষেরও পাল্টে যায়। তবে মুড ডিজঅর্ডার বলতে আরও স্পেসিফিক কিছু বোঝানো হয়। এটা বেশ ধ্বংসাত্মকও হতে পারে। ধর এই যে তুমি শান্ত ভঙ্গীতে চা খাচ্ছো – হঠাৎ প্রচণ্ড রাগ উঠলো তোমার – আমার মাথাতে চায়ের কাপটা আছড়ে ভেঙ্গে ফেললে। এটাই হল-’
‘মুড ডিজঅর্ডার।’ মাথা দোলায় জাহিদ, বোনকে নিয়ে বেশ চিন্তিত – বোঝাই যাচ্ছে।
‘কপাল খুব ভালো হলে ঈপ্সিতার কেসটা হল সিজো-অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার। কিন্তু এভাবে হুট করে রোগ নির্ধারণ করাটা আমার নীতি বিরুদ্ধ – তবুও এটা জানিয়ে রাখছি, কারণ আপনারা যতটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন তা থেকে সরে আসতে হবে। নিজেরা সুস্থ না থাকলে অসুস্থ মেয়েকে কীভাবে সহায়তা করবেন?’

ভ্রু কুঁচকে গেছে মোস্তফা সাহেবের, ‘তারমানে ও সিজোফ্রেনিক?’
মাথা নাড়ে রায়হান, ‘না। সিজো-অ্যাফেকটিভ। অর্থাৎ সিভিয়ার বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং মাইল্ড সিজোফ্রেনিয়ার মিশেল। বাইপোলার ডিজঅর্ডার থাকলে সাবজেক্টের মুড ম্যানিয়া আর ডিপ্রেশনের মাঝে সুইচ করে বার বার। সেই সাথে সিজোফ্রেনিয়ার হাল্কা উপসর্গ – প্যারানয়া, মিডিয়া অবসেশন, নিজের সম্পর্কে শারীরিক ভুল ধারণা আর ভিজুয়াল এবং অডিটরি হ্যালুসিনেশন। সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ বলতে অনেকেই শুধু এই হ্যালুসিনেশনটুকুকেই ধরে নেয় – অজ্ঞতা। যাই হোক, এই ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে চাই একান্তে। যদি সম্ভব হয়।’

ইঙ্গিতটা সাথে সাথে বুঝে যায় জাহিদ, ক্লাস এইটে পড়ে ও, একেবারে শিশু নেই এখন। বড়রা একা একা কথা বলতে চাইতে পারে। তখন ওদের থেকে দূরে চলে যাওয়া নিয়ম।

আস্তে করে উঠে দাঁড়ায় ও, হেসে জানালো, ‘আমার একটু ঘরে যেতে হচ্ছে। ডাউনলোড করতে দিয়েছিলাম একটা ফাইল – হয়ে গেছে বোধহয়। আপনারা কথা বলুন।’
রায়হান মাথা কাত করে সায় দিলো। ছেলেটাকে বেশ ভালো লেগেছে ওর। এই বয়েসেও ভদ্রতাবোধ শিখেছে বেশ।

চোখের সামনে থেকে জাহিদ দূর হতেই মোস্তফা কামালকে প্রশ্ন করে, ‘ঈপ্সিতা রুদ্রপ্রতাপ রায়ের ব্যাপারে কতটা জানে?’
‘ও ব্যাপারে খুব বেশি আলোচনা ছেলেমেয়ের সামনে তো করি নি।’ অবাক হয়ে যান মোস্তফা কামাল, ‘কেন?’
‘বাইরের মানুষ কেউ জানে?’
‘অনেক পুরোনো অধিবাসী যারা আছে। আর যারা আমার বাসায় ভাড়া থাকতে গিয়ে সাফার করেছে। তবে তাদের সাথে তো আমার ছেলে-মেয়েদের দেখা হয়নি। তখন ওরা ঢাকায় ছিল।’ অস্থির হয়ে উঠলেন মোস্তফা, ‘ঈপ্সিতা রুদ্রপ্রতাপের কথা জানে?’
‘শুধু জানে না। মেয়েটা ওকে দেখতেও পায় – যতদূর বুঝলাম।’

ঈপ্সিতার সাথে যা কথা বার্তা হয়েছে খুলে বলে রায়হান ওদের।
শুন্য চোখে তাকিয়ে থাকেন দম্পতি। মেয়ের সমস্যাটা কোনদিকে গেছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না এখনও।

‘তা কি করে সম্ভব? আপনি নিশ্চিত ঈপ্সিতা রুদ্র বলতে আমাদের পূর্বপুরুষকে বুঝিয়েছে?’
‘জমিদারবাবু ছাড়া আপনাদের পরিচিত আর কোন রুদ্র কি আছে?’ পাল্টা প্রশ্ন করে রায়হান, ‘তাছাড়া সে শুধু রুদ্রের কথাই বলেনি – বলেছে এ বাড়িতে এসে সে তার পরিবারকে ফিরে পেয়েছে। এর অর্থ একটাই – ঈপ্সিতা রুদ্রকে দেখতে পায়।’

কেঁপে উঠলেন মিসেস মোস্তফা, ‘লোকটা একশ আগে মারা গেছে!’
হাসল রায়হান, ‘এবং মরেই আছে। ঈপ্সিতা দেখতে পায় বলে আমি বোঝাইনি সে মানুষটি এখনও হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। অথবা তার আত্মা এই বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব আজগুবি কিছু দেখিনি আমি আজতক। কাজেই – সমাধানটা সহজ, মেয়েটির ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।’

‘এ থেকে ওকে কিভাবে বাঁচাবো, মি. রায়হান!’ প্রায় কেঁদে ফেলেন মিসেস মোস্তফা।
‘শান্ত হও।’ পাশ থেকে আলতো করে বলেন মোস্তফা সাহেব।

দুইজনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রায়হান, ‘ওকে সুস্থ করতে হলে আমাকে তার সমস্যাটা পুরোপুরি জানতে হবে। ঈপ্সিতা যখন স্কুলে ছিলো ওর ভেন্টিলেটরের কিছু অংশ ভেঙ্গে ফোকরটা বড় করেছি।’
‘আপনি নিশ্চয় আমার মেয়ের ওপর –’
‘জ্বি, নজর রাখতেই চাইছি।’ মেয়ের বাবার আপত্তিকে দুই পয়সার মূল্যও না দিয়ে বলল রায়হান, ‘পেরিস্কোপের সাহায্যে। ওকে টের পেতে দেওয়া যাবে না। রাতের বেলাতে যেহেতু পাগলামি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো ওর – কাজেই ওকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে তখনই।’

৫.
আড়াল থেকে একজন মানুষের দিকে তার অনুমতি ছাড়া তাকিয়ে থাকার চেয়ে অসভ্য কাজ আর নেই। আর যদি সেটা কোন মেয়ের দিকে তাকানো হয় – মানসিক রোগী হোক আর যাই হোক – সেটি আরও বিতৃষ্ণার। তার ওপর সে তাকাচ্ছে একজন মেয়ে-শিশুর দিকে। এগারো বছর বয়স যার। এর থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না।

রায়হানের ভদ্রতাবোধ বাংলাদেশীদের মত না হতে পারে – অন্যের ব্যক্তিগত অধিকার নিয়ে সে একটু বেশিই সচেতন। কাজেই যখন পেরিস্কোপে রাত সাড়ে বারোটার সময় ও চোখ রাখল, ভেতর থেকে কেউ একজন বলে উঠল, ‘কাজটা ঠিক করছো না, রায়হান।’

অস্বস্তিটা কিছুক্ষণের মাঝেই কাটিয়ে ফেলা যায়। পেরিস্কোপে চোখ রাখাটা একটা সময় স্রেফ দায়িত্ব বলে মনে হতে থাকে।
মেয়েটা অসুস্থ। তাকে তোমার সাহায্য করতে হবে!

প্রথম এক ঘণ্টাতে ঈপ্সিতার মাঝে কোন অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করে না রায়হান। ছোট্ট একটা মেয়ে যেভাবে ঘুমায় ঠিক সেভাবেই ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। বুকের কাছে চেপে রেখেছে একটা পুতুল।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল কবে থেকে ঈপ্সিতা তার ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমায় – সেটা তার বাবা-মা লক্ষ্য করেননি। হঠাৎ এটা শুরু হয়েছে। একদিক দিয়ে এটা ভালো হয়েছে। তার অজান্তে তার ওপর চোখ রাখা যাচ্ছে। তবে এগারো বছরের একটা বাচ্চার কাছ থেকে এই দরজা লাগিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস ও আশা করে নি।

কিশোরীর কোন বৈশিষ্ট্য তার শরীরে ফুটে ওঠেনি এখনও। ঘুমালে ঈপ্সিতার মুখে নিষ্পাপ একটা ভঙ্গী ফুটে ওঠে – ওদিকে পেরিস্কোপ ঘুরিয়ে তাকাতে রায়হানের ভীষণ মায়া হয়। এই মেয়েটি একজন পুরুষের গোপন অঙ্গ কেটে নিয়েছে এটা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না। কোন পর্যায়ের মানসিক চাপে থাকলে কোন শিশু এই কাজটি করতে পারে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, হাতের কাছে ছুরিই বা সে পেল কোথায় প্রয়োজনের সময়? এমন হতে পারে – কাজের ছেলেটা এখানে ভিক্টিম নয়, হয়তো মেয়েটিকে একা পেয়ে কোন কু-ইচ্ছে চরিতার্থ করতে চেয়েছিল সে। কাজেই প্রতিরক্ষার জন্য মেয়েটিকে কাজটা করতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। কিন্তু ও ব্যাপারে পরে ঈপ্সিতা কিছুই মনে করতে পারে নি। ব্যাপারটা পোস্ট-ট্রমাটিক ডিজঅর্ডার হতে পারে।

নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। আরও কিছু থাকার সম্ভাবনা দেখে বলেই আজকে পেরিস্কোপে এসে দাঁড়াতে হয়েছে ওকে। মোস্তফা কামাল অবশ্য তাকে বসার জন্য একটা চেয়ার দিয়ে গেছেন।

একেবারেই হঠাৎ চোখ মেলে উঠে বসে ঈপ্সিতা এসময়। এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে হল ব্যাপারটা – চমকে উঠল রায়হান। সাধারণতঃ ঘুম থেকে উঠলে একজন মানুষ কিছুক্ষণ সময় নেয় নড়ে ওঠার ক্ষেত্রে। আর সাথে সাথে নড়ে উঠলেও এক ধরনের জড়তা কাজ করে। ঈপ্সিতার মাঝে কোনটাই কাজ করে না। সে এমনভাবে উঠে বসেছে – যেন চোখ বন্ধ করে গত দুই ঘণ্টা শুয়ে ছিলো। এখন শুধু তাকিয়েই উঠে পড়েছে।

ঘড়ি দেখে রায়হান – রাত তিনটা বাজে প্রায়।
বিষয়টা ডানহাতের কাছে রাখা নোটবুকে টুকে রাখল ও। ঈপ্সিতার দিকে মনোযোগ দিল আবার, ভূতে পাওয়া মানুষের মত বিছানা থেকে নেমে পড়েছে মেয়েটা। বিড় বিড় করছে – এখান থেকে তাই মনে হয় রায়হানের। ও ঠিক করে রেখেছে, মেয়েটা দরজার দিকে এগিয়ে আসলেই পেরিস্কোপ নিয়ে সটকে পড়বে পাশের বাথরুমে। যত দ্রুত সম্ভব। দরজা খুলতে ওর একটু সময় লাগার কথা। সেই সময়ের মধ্যে পগার পার হয়ে যেতে পারবে।

ভেন্টিলেটরের খুব কাছ দিয়ে পায়চারী করে যায় মেয়েটা।
ঠিক তখনই স্পষ্ট শুনতে পায় রায়হান, মেয়েটা বলছে, ‘রুদ্র! অ্যাই রুদ্র। আজ আসবে না তুমি। রাগ করেছ, না? অ্যাই, রুদ্র ডাকছি তো তোমাকে -’

অতিপ্রাকৃত কিছুতে বিশ্বাস করে না রায়হান – তবে এই মুহূর্তে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর। রোজ কি এসময় আসে ঈপ্সিতার ‘রুদ্র’? আজ ও নজর রাখছে বলে আসতে পারছে না?
মৃত্যুর পর কি যোগাযোগ করা সম্ভব এই জগতের সাথে? আসলেই সম্ভব?

ঘাড়ের কাছে কাঁপা দীর্ঘশ্বাসটা শোনার সাথে সাথে জ্ঞান হারায় রায়হান।

৬.
চোখ মেলতেই রায়হান দেখতে পেল, ঠাণ্ডা একটা মেঝেতে শুয়ে আছে ও। দেওয়ালের কাছে ঝুলছে ওর ডিজিটাল পেরিস্কোপ। অন্যমাথা ভেন্টিলেটরের সাথে আটকানো।

এক মুহূর্ত লেগে যায় একটু আগে ঠিক কি হয়েছে সেটা মনে করতে – তবে মনে পড়তেই লাফিয়ে ওঠে ও। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার সময় হাত থেকে ছুটে গিয়ে দেওয়ালের সাথে বাড়ি খেয়েছে – ডিসপ্লের কাছে কিছু আঁচরের দাগ – এছাড়া ঠিক আছে যন্ত্রটা। পেরিস্কোপের নজর ঘুরে আছে ছাদের দিকে।

দ্রুত হাতে ওটাকে সরিয়ে আনতে থাকে রায়হান, খাটে দৃষ্টি দিতে ঈপ্সিতাকে ওখানে দেখা যায় না। ব্যস্ত হাতে ঘোরায় ওটা আবার। দূরবর্তী দেওয়ালের কাছে পড়ে আছে শরীরটা – দেখেই কেঁপে ওঠে রায়হান।
ঈপ্সিতার শরীরে একটি সুতোও নেই।

হাত থেকে পেরিস্কোপটা ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে উঠেছে ও – দরজাটা ভাঙ্গতে হবে।
তখনই প্রথমবারের মত লক্ষ্য করে – খুলে আছে ওটা। ভেতর থেকে এখন লাগানো নেই।

ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ে রায়হান, ব্যস্ত পায়ে মেয়েটার কাছে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। শ্বাস ফেলছে এখনও।
তলপেটের নীচটা ভিজে আছে। বোঝা যাচ্ছে সামান্য সময় আগে যৌনসংগম করা হয়েছে মেয়েটার সাথে। জামা কাপড়গুলোকেও এবার দেখতে পায় রায়হান। কাছেই পড়ে আছে।

আচমকা ওর নিজেকে হতবুদ্ধি লাগে। এ অবস্থাতে মোস্তফা কামাল ওকে দেখতে পেলে তিনি কি ভেবে বসবেন না – রায়হান নিজেই অপকর্মটা করে বসেছে মেয়ের একাকীত্ব আর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে? আর যদি এখান থেকে ও বের হয়ে গিয়ে মোস্তফা সাহেবকে খুলে বলে ঘটনাটা – তাতেই কি তাঁকে বিশ্বাস করানো যাবে আর কিছু?

ঈপ্সিতাকে নজরে রাখছিলো রায়হান – তাকে চোখ এড়িয়ে আর কারও ঢোকার কথা নয় ভেতরে। রায়হান নিশ্চিত – অন্যকোন মানুষ ওই ঘরের সামনে আসে নি। চোখ পেরিস্কোপের ডিসপ্লের দিকে থাকলেও সামান্য নজর ও রেখেছিলো আর কেউ আসে কি না দেখার জন্য।

যে বা যা তাকে অজ্ঞান করেছে সে কী কোন বাস্তব কিছু? না – হলে ও দেখতে পেতো। আবার সেটা যদি সত্য হয়, সে কীভাবে অজ্ঞান হতে পারে? মানসিক কোন জটিলতা?

যদি মানসিক কোন সমস্যা তাকে ‘ব্ল্যাক আউটে’ নিয়ে যায় সেটাও ভালো কোন লক্ষণ নয়! প্রথমতঃ রোগির চিকিৎসা করতে এসে নিজের রোগ নিয়ে লড়াই করার মুডে ছিল না সে।

দ্বিতীয়তঃ ব্ল্যাকআউটে থাকা অবস্থাতে সাবজেক্ট অনেক কিছু করে আসতে পারে। সেটা তার স্মৃতিতে থাকে না।

এমন কি হতে পারে – অচেতন রায়হান হয় নি – বরং ওখানে সে অন্য একটা সত্ত্বাতে ঠিকই কর্মক্ষম ছিলো? ছোট্ট মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছে, নিজেকে পরিষ্কার করে বাইরে গিয়ে আবার শুয়ে পড়েছে? বাবা-মার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা ওর মনে পড়ে।
ঘাড় ঝাঁকিয়ে চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরিয়ে ফেলে ও, এখন নিজের সাথে নিজের লড়াইয়ের সময় নয়।

ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে বাড়ির অন্য কোণে ছোটে ও – মোস্তফা কামাল নিশ্চয় স্টাডি রুমে আছেন। মেয়ের কর্তন-কর্মের পর থেকে তিনি ঘুমাতে পারেন না। রায়হানের সাথে তিনিও বসতে চেয়েছিলেন, তবে তাকে মানা করে দিয়েছিল সে। রোগির আত্মীয়স্বজন তদন্তে নামলে বায়াস বাড়ে। কাজের কাজ কিছু হয় না, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জানে।

স্টাডিরুমের দরজা ধাক্কিয়ে যখন ভেতরে ঢুকে ও – লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।

রায়হানকে ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কি হয়েছে? কোন প্রগ্রেস?’
ও এবার চুপ হয়ে যায় , একজন বাবাকে কিভাবে সে বলবে, ‘আপনার মেয়েকে একটু আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। আমি দেওয়ালের ওপাশে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। তাই কিছুই করতে পারিনি।’

চুপ থাকতে দেখে মোস্তফা কামালের মুখ প্রথমে দুশ্চিন্তার ছাপ– তারপর আতঙ্ক এসে ভর করে। কিছু একটা বলা দরকার, রায়হান শুধু বলে, ‘চলুন, আপনি দেখতে চাবেন এটা।’

মোস্তফা সাহেব ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলেন। তারপরই জোরে পা চালালেন মেয়ের ঘরের উদ্দেশ্যে। তাঁকে হেঁটে অনুসরণ করতে গিয়ে হাঁফ ধরে যায় রায়হানের। বুকের ভেতরটা দুপ দাপ লাফাচ্ছে।

আরও জটিল হয়েছে রহস্য। আর বলা চলে ঈপ্সিতার বলা কথাগুলোর অর্থ ও খুঁজে পেয়েছে।

এজন্য জায়গাটাকে তার ভালো লাগে। রুদ্রের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে সে নিজের ঘরে। এই রুদ্র তার কল্পনার অংশ হতে পারে – তবে রতিক্রিয়ার চরম পুলকে এই কল্পনাটি নিয়ে যেতে পেরেছে ঈপ্সিতাকে। বিষয়টাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই।

এমন একটা অবস্থা হয়েছে – রায়হান নিজেই বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা কি স্বতঃমিলন ছিলো? নাকি একজন সঙ্গী ছিলো ওখানে মেয়েটির? ও নিজেই অজ্ঞান হয়ে গেছিলো কেন?
নাকি ওটা অজ্ঞান ছিলো না? নিজেই সে ধর্ষণ করে বসেনি তো ছোট্ট মেয়েটাকে?

ওর ভেতরে কি রুদ্রের আত্মা ভর করেছিলো?

জোর করে চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিল রায়হান। এখন রুদ্রের প্রেতাত্মা-কাহিনী বিশ্বাস করার অর্থ এই রহস্যের সমাধান কখনোই হবে না।

মোস্তফা কামাল থেকে বেশ পিছিয়ে গেছে রায়হান। আগে ভাগে পৌঁছে গেছেন তিনি পেরিস্কোপের কাছে। ডিসপ্লেতে চোখ রাখছেন।
রায়হান তাঁকে বলতে গেছিলো, ‘দরজা খোলাই আছে।’

থেমে যায় ও দরজার দিকে চোখ পড়তেই।
অনড় দরজা একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। একটা ধাক্কা দিয়ে দেখে রায়হান। একচুল নড়ল না বিশাল পাল্লা।

‘মি. রায়হান?’ গমগমে কণ্ঠে ডাকলেন মোস্তফা কামাল। ‘এসব কী? কোন ধরনের প্র্যাংক?’

চমকে ওঠে রায়হান। মেয়ের অবস্থা তিনি দেখে ফেলেছেন, এবং বিশ্বাস করতে পারছেন না? তাঁর দিকে এগিয়ে যায় ও। আস্তে করে ওর হাতে ডিসপ্লেটা ধরিয়ে দেন মোস্তফা।

চোয়াল ঝুলে পড়ে রায়হানের।
ঈপ্সিতা বুকের মাঝে একটা পুতুল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। চোখে মুখে নিষ্পাপ একটা ছাপ।
পোশাক সব পরেই আছে মেয়েটা। এটা স্বস্তি দেয় রায়হানকে।

কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়।
রুদ্রপ্রতাপ রায় তার ট্রেস মুছে ফেললেও – রায়হান জানে, একটু আগে ও ভুল দেখেনি।

৭.
ডায়েরীর পাতা খুলে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে রায়হান। এখন ওর ঘুমানো উচিত। ভোর হতে শুরু করেছে। মোস্তফা কামাল তাঁর ঘরে ফিরে গেছেন।

ইতস্তত হলেও মোস্তফা কামালকে সবকিছু খুলে বলেছে ও। শুনে তিনি মুখে কিছু না বললেও রায়হান জানে এক বর্ণও বিশ্বাস করেন নি তিনি। ধরেই নিয়েছেন ওই ভাড়া নিতে আসা বেকুবগুলোর মতো মাথা গেছে এই ছেলেরও। রায়হান জানে না, তবে মোস্তফা কামাল ওই মুহূর্তেই ঠিক করে ফেলেছেন, এই ছেলেকে তিনদিনের বেশি প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। বাঁদরকে কোলে বসতে দিলে ঘাড়ে উঠে বসে। বাঁদর বিদেয় করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। নিজের এগারো বছরের মেয়েকে নিয়ে রতিক্রিয়ার বাজে গল্প শোনার জন্য একে তিনি ভাড়া করেন নি।

এ বাসাতে ঢোকার পর থেকে দুটো চরিত্র রায়হানকে ভাবাচ্ছে। ডায়েরীতে সাবধানে কলম চালায় ও।

মোস্তফা কামালঃ
শুচিবায়ু। সৌখিন। মেয়েকে ভালোবাসেন। কুসংস্কারে বিশ্বাসী, তবে স্বীকার করেন না। পারিবারিকভাবে সুখী। পারিবারিক তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে স্পর্শকাতর। দরকার ছাড়া বহিরাগত কাউকে বলতে অনাগ্রহী। জমিদার রুদ্রপ্রতাপের ডায়েরিতে কি এমন কিছু ছিলো যা বাইরের কেউ পড়লে মোস্তফা কামালের পরিবারকে ঘৃণা করবে? তিনি ঠিক কি লুকোচ্ছেন?

ঈপ্সিতাঃ
কল্পনাবিলাসী। অতিকল্পনার ফলে হ্যালুসিনেশনের শিকার।
ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। শ্রেণিতে প্রথম।
বয়ঃসন্ধিকাল পেরুচ্ছে, শারীরিকভাবে এ বয়েসেই সক্ষম।

দুই সেকেন্ড লেখাটির দিকে তাকিয়ে থাকে রায়হান। একটু ভেবে বাকিদের ব্যাপারেও তুলে ফেলে।

রাইসা (মিসেস মোস্তফা কামাল)ঃ
সাধারণ গৃহিণী। স্বামীর প্রতি অন্ধবিশ্বাস আছে। ছেলের সাথে একটা কথাও বলেননি বিকেলে। অর্থাৎ মেয়েকে নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছেন। নিশ্চয় তাকে অতিমাত্রায় ভালোবাসেন। অতি ভালোবাসা সাবজেক্টের ক্ষতির কারণ?

জাহিদঃ
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলে। পারিবারিক মায়া-মমতা প্রবল। খোলা মনের। বন্ধু মাহফুজের সাথে এর সম্পর্ক ভালো।

কলম থামায় রায়হান। মনে পড়ে একবার মাহফুজের সাথে দেখা করাটা দরকার। শহরের এপ্রান্তে এসেছে, তার রেকমেন্ডেশনেই এই কেস পেয়েছে, এরপর তার সাথে দেখা না করা অভদ্রতা হবে। কেসটা সলভ করেই দেখা করবে – ঠিক করল।

বিছানাতে পিঠ ঠেকানোর সাথে সাথেই ঘুমের অতলে চলে যায় রায়হান। তারমাঝেই যেন মনে পড়ে কিছু একটা নেই – কিছু একটা নেই –

*
মাত্র এক ঘণ্টা পর ঘুম ভেঙ্গে গেল ওর। এখন সে কোথায়? বুঝতে কিছুক্ষণ লাগলো রায়হানের। তারপর আরও গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নটা জাগল, ঘুম ভাঙ্গল কেন?

দরজার নকটা শুনতে পেয়ে লাফিয়ে উঠে ও। দরজা খুলে যোবাইদাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। চোখের নিচে আচরের দাগ।

‘সাহেব অপেক্ষা করতেছেন। খাওয়ার টেবিলে।’ শুকনো কণ্ঠে জানায় মেয়েটা।
‘চোখে কি হয়েছে?’ জানতে চায় ও ভদ্রতার খাতিরে।
‘রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়া কাটছে একটু।’

মেয়েটা একদিকে রওনা হয়ে গেলো। আর কথা বলার ইচ্ছে নেই। অদ্ভুত প্রশ্নটি রায়হানের মাথাতে আচমকাই উদয় হয়, ‘ভাড়াটেদের মাঝে নারী সদস্যারা অস্বস্তি বোধ করত।’ – বলেছিলেন মোস্তফা কামাল।
ঈপ্সিতাকে কেমন অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে সেটা দেখেছে ও। যোবাইদাও কি এরকম কোন সমস্যায় ভুগছে?

প্রশ্ন করলে জবাব মেলার সম্ভাবনা নেই। এই মেয়ে মুখে তালা মেরে রাখবে সেটা তাকে স্পষ্টই বুঝিয়ে দিয়েছে।
একটু প্রস্তুত হয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে রওনা দেয় ও। বাইরের রোদটা আজকে কড়া।
ডাইনিং টেবিলে ভেজা চুলে মোস্তফা কামালকে বসে থাকতে দেখা গেলো। রায়হানকে দেখে আগের দিনের মত হাসলেন না তিনি। চারপাশে তাকিয়ে মিসেস কামালকে খুঁজল রায়হান। তাঁকে দেখা গেলো না।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে টেবিলে বসে পড়ে ও, ‘গুড মর্নিং, মি. কামাল।’
মোস্তফা চোখ তুলে তাকালেন, দায়সারা ভাবে বললেন, ‘গুড মর্নিং।’
‘আর কাওকে দেখছি না।’
‘ওরা দেরী করে নাস্তা করে।’ আগের ভঙ্গীতেই বললেন ভদ্রলোক।
‘বেশ।’ রায়হান বসে পড়ল।

গতকাল রাতের কথা মনে পড়তে ভদ্রলোকের অস্বস্তির কারণ বুঝতে পারে ও। মেয়ের ব্যাপারে ওভাবে বলার পর যে কোন বাবাই স্বাভাবিকভাবে নেবেন না, যে বলেছে তাকে যত দ্রুত সম্ভব চিরস্থায়ীভাবে খেদাতে চাইবেন। কাজেই বিষয়টা এখানেই চাপা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হল রায়হান।

‘মি. কামাল, একটা বিষয় আমি খোলাখুলি জানিয়ে দিতে চাই।’ শুরু করল ও, ‘আপনার যদি আমার ওপর আস্থা না থাকে – আমাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল জন্মেছে এই কেসটা নিয়ে। তার অর্থ এই না – এই কাজটা আমি করতে বাধ্য। আপনি সাবজেক্টের বাবা এবং আমার কেসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আপনার সাথে মন কষাকষি করে এই কেসটা সলভ করার ক্ষমতা আমার নেই। আসলেই নেই। এখন আপনার বিবেচনা।’

মোস্তফা কামাল ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকালেন। সময়ের সাথে সাথে সেই দৃষ্টি উষ্ণ হয়। অবশেষে একচিলতে হাসি ফোটে তাঁর মুখে।
‘সত্যিই দুঃখিত। আসলে, বাবা হলে বুঝতে পারবেন। গতকাল রাতটা ছিলো আমার জন্য শকিং।’
এবার একটু হাসে রায়হানও, ‘আপনার মেয়ে একটা সমস্যায় আছে। যতই ঝামেলার হোক, যতই অস্বস্তির হোক, এই সমস্যাটা আমরা সমাধান করব। কিন্তু সেজন্য আপনাকে শক্ত হতে হবে।’

মোস্তফা কামাল এই স্বল্প পরিচিত যুবকের দিকে তাকিয়ে থাকেন এক মুহূর্তের জন্য। নেহায়েতই তরুণ একজন মানুষ। জাহিদের চেয়ে দশ বছরের বড়ও হবে না। সুদর্শন বলা চলে একে অনায়াসে। তবে সেটা নয় – যে কারণে এই ছেলেকে ঈপ্সিতার কেসটা দিয়েছেন তিনি, সেটা এর চোখ।

ছেলেটা জানে তার কোন অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট নেই, তবুও সে যে কাজটা করেছে তাকে অনেকটা জীবনে মেডিকেল কলেজে না গিয়ে ক্লিনিক খুলে ডক্টর হিসেবে বসার মত বলা চলে। তার পরও তার পসার হয়েছে যথেষ্ট। তিন দিনের জন্য সে ত্রিশ হাজার দাবী করে নিঃসংকোচে। পুলিশ যখন কোন অপরাধীকে ধাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় এর কাছেই তারা আসে। সাসপেক্টের নেক্সট মুভ এই ছেলে অনায়াসে বলে দেয়।
এই সাফল্যের পেছনে আছে ওই চোখ দুটো। ওখানে জ্বল জ্বল করছে আত্মবিশ্বাস। এ জানে কোনদিন পরাজিত হবে না সে। এবং সম্ভবতঃ এখন পর্যন্ত হয়ওনি।

এই মুহূর্তে ওই চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, আসলেই মেয়ের সমস্যা তেমন কিছু তো নয়! দুইজনে একসাথে কাজ করলে কি এর সমাধান করা যাবে না?

মৃদু কণ্ঠে মোস্তফা কামাল শুধু বললেন, ‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, মি. রায়হান। ঈপ্সিতার মেন্টাল সাপোর্ট দরকার। আর আপনাকে সে জিনিস দিতে হচ্ছে তার বাবাকে। আমি দুঃখিত। এরপর থেকে বাস্তববাদী আচরণই পাবেন আমার কাছ থেকে।’

পরিবেশ হাল্কা হয়ে যেতে রায়হান হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। খাওয়ার ব্যাপারে দুইজনই মন দিতে পারে এবার।
সুযোগটা দেখতে পেয়ে ছাড়ে না ও, দৃঢ় গলাতে বলে, ‘আপনাদের পারিবারিক ডায়েরিটা আমাকে পড়তে হবে। রাত ছাড়া ঈপ্সিতা কিছু করবে না। কাজেই দিনের বেলাটা সময় পাচ্ছি। রুদ্রপ্রতাপ সম্পর্কে ভালোমত না জানতে পারলে আমার কিছুই করার থাকবে না। ঈপ্সিতা তাকে দিয়ে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত।’
শান্তভাবে পানি খেলেন মোস্তফা কামাল, ‘আমি দুঃখিত। ডায়েরিটা আপনাকে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাকে প্রশ্ন করবেন। আমি আপনাকে জানিয়ে দেবো যা জানতে চান।’

রায়হান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। প্রচণ্ড রাগে চোখ কুঁচকে উঠেছে ওর। এই লোক কি পারিবারিক ইতিহাস লুকিয়ে রাখার জন্য নিজের অসহায় মেয়েটির চিকিৎসাতেও অসহযোগিতা করবে নাকি? প্রাচীন ইতিহাস গোপন করা তার কাছে বেশি জরুরী নাকি বর্তমান সময়ের নিজের সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষা?

‘আমার ডায়েরিটা দরকার।’
‘আপনাকে আমি অযথা হয়রানি করছি না, মি. রায়হান।’ মোস্তফার গলা এখনও শান্ত, ‘ডায়েরিটা আমার কাছে গত কয়েক মাস ধরেই নেই। হারিয়ে ফেলেছি।’

রায়হানের মাথা যেভাবে হুট করে গরম হয়ে গেছিলো – সেভাবেই ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মিথ্যে বলছেন মোস্তফা কামাল? চুরি হয়ে গেলে আগের বার কেন উল্লেখ করেননি?

মোস্তফা সাহেবের চেহারাতে অবশ্য শঠতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অসহায় একটা অনুভূতির ছাপ ওখানে। সম্ভবতঃ এই মুহূর্তে ডায়েরিটা দিতে পারলে রায়হানের তথা তাঁর মেয়ের কাজে আসতো। দিতে না পারার কারণে তিনি দুঃখিত?

নাকি ডায়েরি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করার পরও বার বার রায়হান ওটা চাইছে দেখে অসহায় লাগছে তাঁর নিজেকে?

কোন একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারে না রায়হান। তবে আপাতত এই তথ্যটিকে সত্য ধরেই এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল সে। মাথা দোলাল নিজের অজান্তেই।

‘চমৎকার। খেয়ে চলুন বের হই। আপনাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি দেখা যাক। সেই সাথে ডায়েরির যা মনে আছে – আমাকে শোনাবেন।’

৮.
তবে বের হতে হতে বিকেল হয়ে গেলো।

ডক থেকে জরুরী ভিত্তিতে ফোন এসেছিলো। কাজেই নাকে মুখে নাস্তাটা ঠেসে ছুটতে হয়েছিলো কামালসাহেবকে। দুপুরে খাওয়ার পর রোদের তেজ কমে আসার জন্য ঘণ্টাদুয়েক অপেক্ষা করেছে ওরা। জমিদার রুদ্রপ্রতাপ রায়ের সম্পত্তির পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। রোদে রোদে ঘুরে দেখতে হলে বাষ্প হয়ে যেতে হবে।

শহরের শেষ প্রান্তে ওদের এলাকাটা। এখনও মফস্বলের কাতার থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি পুরোপুরি। দূরে শুধুই পাহাড় আর পাহাড়। এদিকটাতেও টিলার অভাব নেই। মাটি এখানে পাথুরে। শক্ত মাটির সাথে পাকা রাস্তার তেমন কোন পার্থক্য নেই।

দূরের পাহাড়গুলর মাথায় থাকা গাছগুলোর গোড়া কোনটার কোথায় – বোঝার বৃথা চেষ্টা করল রায়হান। অন্যপাশে সমুদ্রের দিকে তাকায় চোখ কুঁচকে। সূর্য ওই বিশাল জলাধারে ডুব মারতে যাচ্ছে। রায়হানের প্রিয় দুটো প্রাকৃতিক উপহার এই সমুদ্র আর ওই পাহাড়। সেই সাথে চলছে প্রিয় বিষয় সাইকোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন।

এই মুহূর্তে মন মেজাজ খাসা হয়ে আছে। মোস্তফা কামালের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল হুট করে। এ বাড়িতে আসার পর থেকে সিগারেট তেমন খাওয়া হয়নি।

‘রুদ্রপ্রতাপ রায়ের ইতিহাসে রক্ত আর প্রজাদের চোখের পানির পরিমাণটাই বেশি। একটা ব্যাপার জেনে অবাক হবেন, একবার এই জমিদার প্রজাসংকটে পড়ে গেছিলেন।’ নাক কুঁচকে ফেললেন মোস্তফা কামাল সিগারেটের ধোঁয়া নিজের দিকে আসতে দেখে, ‘কয়েক বছরে এত পরিমাণ নরহত্যা চালিয়েছিলেন তিনি, চাষবাসের জন্য প্রজা পাওয়া যাচ্ছিলো না।’
‘এই সমস্যার সমাধান কিভাবে হল?’ চোখ কুঁচকেছে রায়হানেরও, তবে প্রবল বাতাসে। সিল্ক সুতোর মত উড়ছে চুল।
‘তাঁর এলাকাতে যত নারীপ্রজা ছিলো তাদের মাঝে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য যাদের আছে – তাদের বেছে নিলেন তিনি। পুরুষের সমান মাঠে খাটতে বাধ্য করলেন নিজের বাহিনীকে দিয়ে।’
‘এমনটাই ভেবেছিলাম।’ মুখ বাঁকায় রায়হান, এই জমিদারের ব্যাপারে যতই শুনছে ততই বিতৃষ্ণা এসে যাচ্ছে ওর।

‘আরেকটা দিক ছিলো ডায়েরীতে।’ বলে চললেন মোস্তফা কামাল, ‘তিনি নিজের বাদে আর সব ধর্মবিদ্বেষী ছিলেন। গোঁড়া হিন্দু ছিলেন তিনি। দেবতাদের সবাইকে না মানলেও কারও কারও প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা ছিলো নজর কাড়ার মত।’
‘এলাকাতে অন্য ধর্মের কারা ছিলো?’
‘মুসলমান ছিলো কিছু। ওই যে ওই দিকে।’ হাত বাড়িয়ে দেখালেন মোস্তফা কামাল, ‘আর বৌদ্ধদের একটা মঠ ছিলো ওদিকে।’
‘মঠ গেছে কোথায়?’ চোখ কুঁচকে বিরানভূমিটার দিকে তাকায় রায়হান।
‘আগুন লাগিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিলেন তিনি সবাইকে। মঠের ভেতরে। তারপর মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন ওটা।’
সিগারেট বাতাসের কারণে দ্রুত শেষ হয়ে গেছে, প্যাকেট থেকে আরেকটা বের করতে করতে জানতে চায় রায়হান, ‘কেন?’
‘মঠপ্রধান এই বিপুল পরিমাণ নরহত্যা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। নিজে এসে জমিদারবাবুকে আহ্বান জানিয়েছিলেন নৃশংসতা বন্ধের জন্য।’
তিক্ত হাসিটা ফিরে আসে রায়হানের মুখে, ‘এহেন ঔদ্ধত্য দমন করতে জমিদারবাবুর তো তৎপর হওয়ার কথা ছিলোই।’

‘মঠের চেয়ে এলাকাবাসী মুসলমানদের ভাগ্যই ভালো বলতে হয়।’
‘এঁরা জমিদারবাবুর মতিগতি বুঝে আগে থেকেই ‘ভদ্র’ হয়ে গেছিলেন নিশ্চয়?’ অনুমান করে রায়হান সিগারেটে টান দিতে দিতে।
‘ঠিক তা নয় – গোপনে কোরবানীর সময় গরু জবেহ করেছিলেন মুসলিমদের মাঝে কয়েকজন। কিভাবে জানি খবরটা চাউর হয়ে গেছিলো।’

উঁচু আরেকটি ঢিপির কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন মোস্তফা কামাল – ‘এই জায়গাটাকে বলা হত দেবীকাঠ। এখানে নাকি কাঠের তৈরী একটা মঞ্চ ছিলো সে সময়। মুসলিম সেসব প্রজাদের ধরে আনেন জমিদার রুদ্রপ্রতাপ রায়। মুসলমানদের মাঝে সবাই পশু জবাইয়ে দক্ষ ছিলেন না। পাঠা বলির মত মাথা কেটে ফেলাটা তো আর ইসলাম ধর্মের নিয়ম না। গলা কাটার সময় পশুর সুবিধার্থে সর্বোচ্চ আরামের মৃত্যুর ব্যবস্থা করার কথা কোরবানীর সময়। বুড়ো এক কসাই ছিলেন মুসলিমপাড়ায় – তাকে নিয়েই পড়লেন জমিদারবাবু।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটে লম্বা টান দেয় রায়হান। পরের ঘটনা কেমন হবে সেটা ও ভালোই বুঝতে পারছে।
‘বুড়ো কসাইকে উলঙ্গ করে দেবীকাঠে বাঁধেন জমিদার। একে একে দুটো পা-ই কেটে নেন বড় একটা ছুরি দিয়ে। অত্যাধিক রক্তক্ষরণে লোকটা মারা যাওয়ার আগে হাত দুটোও কেটে নেন মাংসের তালের মত করে। গোটাগ্রামবাসীকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে বাধ্য করা হয়েছিলো দৃশ্যটা। রক্তক্ষরণে সামান্য সময় পরই মারা যায় বুড়ো। তখন শুরু হয় জমিদারের আসল খেলা। হাড্ডি কোপানোর দা দিয়ে মৃত কসাইয়ের শরীরটা কেটে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেন তিনি। ডায়েরি লেখেছিলেন আমার দাদা – তাঁর মতে, লাশটার প্রতিটা টুকরোই ছিলো হাতের মুঠোর চেয়েও ছোট। অসংখ্য টুকরো নিজ হাতে করে দেবীকাঠের ওপর সেগুলো সাজিয়ে রাখেন তিনি। একতাল মাংসের মতো।’
‘ভয়ংকর প্রতিশোধ।’ মন্তব্য করে রায়হান।
‘শেষ হয় নি তো।’ মাথা নাড়েন মোস্তফা কামাল, ‘পুরো গ্রাম ওখানে উপস্থিত ছিলো – জমিদার বলী কাঠে দাঁড়িয়ে জানতে চান সবচেয়ে সমর্থ পুরুষদের ভেতর থেকে আটজনকে এগিয়ে আসতে। স্বাভাবিকভাবেই আটজন যোগাড় হয়ে যায়। বুড়ো কসাইয়ের মাঝবয়েসী স্ত্রীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করতে হুকুম করেন তিনি। মহিলা গর্ভবতী ছিলো। আটজন পালাক্রমে ধর্ষণ শুরু করলে ঘণ্টা দেড়েক পর ওখানেই অত্যাধিক রক্তক্ষরণে মারা যায় মহিলা।

জমিদারের খেলা সেদিন তখনও শেষ হয় নি – কোরবানীর সাথে জড়িত থাকা আরও নয়জন পুরুষ ছিলো বলীকাঠের সাথে বাঁধা। প্রত্যেকে ভয়ে কাপড় খারাপ করে ফেলেছে। দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে আমার দাদা নাক চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাছেই।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরেকটা সিগারেট ধরায় রায়হান। বাংলাদেশের জমিদারদের ইতিহাসে এরকম নিষ্ঠুর জমিদারের কথা আগে সে কখনও শোনেনি। ডায়েরিটা উদ্ধার করা গেলে অবশ্যই এটা প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

‘জমিদার এবার একজন একজন করে উলঙ্গ করলেন। তারপর আধহাতি একটি চাকু দিয়ে একজন একজন করে পুরুষাঙ্গ কাটা শুরু করেন আধ ঘণ্টা অন্তর অন্তর। আগের মতই আটজন করে সমর্থ পুরুষ এনে পুরুষাঙ্গ কাটা স্বামীর সামনে জমিদারের শিকারের স্ত্রী অথবা কন্যাকে ধর্ষণ করা হয় ওখানে। গ্রামবাসীরা আতংকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলো।’

‘একেবারে ডিটেইলস মুখস্থ করে রেখেছেন। কতবার পড়েছেন?’ প্রশ্নটা করেই ফেলে রায়হান।

‘গুণিনি। শ’খানেকবার হবেই।’ নির্লজ্জের মত হাসলেন মোস্তফা কামাল, ‘যে কোন হরর বইয়ের চেয়ে ওই ডায়েরি আপনার কাছে বেশি ভয়ংকর লাগবে। কারণ ওসবই ঘটেছিলো বাস্তব জীবনে। যাই হোক, এ ঘটনার পর থেকেই মুসলমানদের প্রতি একটা আগ্রহ জন্মে আমার দাদার ভেতরে। পরে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি।’
‘ধর্ম সম্পর্কে আপনার মতামত কি?’ রায়হান জানতে চায়।
‘আমি নাস্তিক।’ সংক্ষেপে জানালেন মোস্তফা সাহেব। একটু বিরতি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘এই যে, এটা হল গোলা-ঘর। গুদামও বলতে পারেন। শুনেছি ওই সময় আস্তাবল ছিলো এখানে একটা। এখন এই আধ-ধ্বংস বাড়িটাই দাঁড়িয়ে আছে।’

রায়হান ভালো করে তাকাল। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে এসেছে ওরা। এদিকে কোন বাড়ি ঘর নেই। ঘন ঘন গাছপালা চলে গেছে এখান থেকে পাহাড়ের দিকে। মোস্তফা কামালের দিকে একবার তাকায় ও, চকচকে চোখে তাকিয়ে আছেন তিনি বাড়িটার দিকে। একটা প্রায় ভেঙ্গে পড়া বাড়ি। এখানে সারা বছরের খাদ্য মজুদ রাখা হত এক সময়। এখন পুনর্নির্মাণ আবশ্যক।

‘নিশ্চয় এখানেও অসংখ্য অত্যাচারের কাহিনী আছে। আমরা জানি না হয়ত, তবে আছে, নিশ্চয় আছে!’ লোভীর মত একবার তাকালেন তিনি রায়হানের দিকে।

রায়হান সতর্কভাবে তাকায় তার দিকে। ভদ্রলোকের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। যেরকম দৃষ্টি তার মাঝে ফুটে উঠেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে পূর্বপুরুষের আচরণ তাকে ভালোই প্রভাবিত করেছে। লোকটা কি ছুরি-টুরি নিয়ে বের হয়েছে নাকি? রায়হানকে এতদূরে নিয়ে এসেছে কেন? এখানে নিজেকে রুদ্রপ্রতাপের মত খেলিয়ে দেখতে চায়?

মোস্তফা কামাল চকচকে চোখে আরেকবার রায়হানকে দেখে একধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেললেন। ভেতরের অবস্থা বাইরের মতই করুণ। পেছনের দিকের দেওয়ালের বড় একটা অংশ তো ধ্বসেই পড়েছে। স্মাগলারদের জন্য স্বর্গ হতে পারে। বর্ডারও তো মাত্র ছিয়াশি কিলোমিটার দূরে!

বাইরের আকাশে আরেকবার চোখ বোলায় রায়হান। রাত প্রায় নেমে এসেছে। গোধূলির আলো চারপাশে। এসময় একজন মুড ডিজঅর্ডার সাবজেক্টের সাথে পরিত্যক্ত গোলাঘরে ঢুকে পড়াটা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে সেটা ভেবে দেখল। খুব একটা নয়।

তবে উপায় কী? এই চরিত্রটিকে চূড়ান্তভাবে জানার জন্য কাজটা করতেই হবে ওকে। দীর্ঘশ্বাসের সাথে সিগারেটটা ফেলে দেয় রায়হান।

মোস্তফা সাহেব মাথা ঘুরিয়ে ডাক দিয়েছেন, ‘কই আসুন?’
এর পরে আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না।

ভেতরে অন্ধকার বেশ। কালিগোলা। চৌবাচ্চায় দুই পিঁপে আলকাতরা ছুঁড়ে মারার মতো। এই আধবুড়ো লোকের মাথায় কি ধরনের সমস্যা থাকলে সে এই অন্ধকার এক পুরোনো গোলাবাড়িতে ঢুকতে পারে? অন্তত সাপের ভয় তো থাকা উচিত।

মুখ ফুটে কথাটা বলতে যাবে ও মোস্তফা কামালকে – ঠিক তখনই হোঁচট খেলেন তিনি। তারপর সড়াৎ-জাতীয় একটা শব্দের সাথে সাথে দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়লেন।

দ্রুত তার দিকে এগুতে যাবে রায়হান – পা পিছলে গেল তারও। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় নি ও – কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলো, পা কিসে পিছলেছে।
রক্ত!
মানুষের রক্ত!

গুঙিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করছেন মোস্তফা কামাল – রায়হান পকেট থেকে মোবাইলটা দ্রুত বের করল। পিছলে গেলেও মাটিতে আছড়ে ও পড়েনি। ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়েছে কাঁপা হাতে।

আলোটা প্রথমে পড়ল যোবাইদার বিস্ফোরিত দুই চোখের ওপর। তারপর কেটে আলাদা করে ফেলা স্তনদুটোতে সরে আসে আলো। রক্তে গোলাঘরের মেঝে একেবারে ভিজে চুপসে আছে এদিকটা।

হেঁচকি তোলার মত একটা শব্দ করে বমি করে দিলেন মোস্তফা কামাল।

৯.
বুম বুম বুম।

দ্বিতীয়বার দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিলেও কেউ খুলে দিলো না। মোস্তফা কামালের চেহারা হয়েছে দেখার মত। কাতল মাছের মত হাঁফাচ্ছেন তিনি। একটু আগে অতি সাহসী আর যন্ত্রণার রসালো বর্ণনা দিতে থাকা মানুষটা সত্যিকারের নৃশংসতার একটিমাত্র দৃশ্য দেখেই চুপসে গেছেন।

বাড়িটাতে এখনও সব জায়গাতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়নি। কলিংবেল এখনও বসাতে পারেননি। দরজার ওপরের কড়া আবার জোরে জোরে নাড়েন মোস্তফা কামাল।

গোলাঘরের লাশটা আবিষ্কারের পর প্রথম যে কাজটি রায়হান করেছে তা হল – টেনেহিঁচরে ওখান থেকে ভদ্রলোককে বের করে এনেছে। তারপর গোলাঘর থেকে সরেও এসেছে যত দূরে পারে, খুনী অন্ধকারে ওত পেতে বসে থাকতে পারতো। না জেনে নিজেদের নিরাপত্তার ওপর ঝুঁকি নেওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না।

তারপর মূল বাড়িতে ফিরে এসে পাগলের মতো দরজায় থাবাথাবি শুরু করেছে ওরা।

দরজা খুলে গেল তৃতীয় ধাক্কার পর। সব মিলিয়ে হয়ত মিনিটখানেক দেরি হয়েছে। বড় বাড়ি। এটা স্বাভাবিক সময়। কিন্তু ওদের মনে হয় কয়েক যুগ লেগে গেছে ওটা খুলতে।

জাহিদের মুখটা দেখা যায় মৃদু আলোতে, পিটপিট করে তাকিয়ে ওদের একবার দেখে সরে ঢোকার জায়গা করে দেয়। পেছনে আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এগিয়ে আসছিলেন মিসেস কামাল – রায়হানকে দেখে সামলে নিলেন।

‘কি হয়েছে – তোমার এই রকম চেহারা কেন?’ রীতিমত আঁতকে উঠলেন পরের মুহূর্তেই। স্বামীপ্রবরের জামায় লেগে থাকা রক্ত দেখে ফেলেছেন।

মোস্তফা সাহেবকে একটা শব্দ উচ্চারণেরও সময় দেয় না রায়হান, বোমা ফাটানোর মত জোরালো কণ্ঠে জানতে চায়, ‘ঈপ্সিতা কোথায়?’
বিভ্রান্ত দেখায় মহিলাকে, ‘ওর ঘরেই তো ছিলো।’
‘যোবাইদার সাথে আজ বিকেলে বের হয়ে ছিলো ও?’ দ্রুত জানতে চায় ও, কপালের শিরা ফুলে উঠেছে একটা।
‘প্রতিদিনই তো বের হয়।’ সমস্যাটা কি হয়েছে এতে বুঝলেন না মিসেস কামাল। যোবাইদা ছেলেও নয় যে মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববেন।

যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে ওর। ছুটে যায় ঈপ্সিতার ঘরের দিকে।
পেছনে হাহাকার করে ওঠেন মোস্তফা কামাল, ‘যাবেন না! শেষ হয়ে যাবেন, ওদিকে যাবেন না!’

নিজের মেয়েকে কি পরিমাণ ভয় পেয়ে মানুষটা একথা বলছে বুঝতে পেরে মনটা খারাপ হয়ে যায় ওর। বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে ঈপ্সিতার বদ্ধ ঘরের দরজাতে ধাক্কা দেয় ও।
ভেজানো ছিলো। ভেতর থেকে ছিটকিনি তোলা ছিলো না। হা হয়ে খুলে যায় দরজাটা। মুখ ঘুরিয়ে পড়ার টেবিল থেকে ওর দিকে তাকায় মেয়েটা। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

‘আপনাকে বলেছিলাম – আর কখনও আমাকে প্রশ্ন করতে আসবেন না।’ চোখ পাকায় সে।
গায়েই মাখে না রায়হান, হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘বিকেলে কোথায় ছিলে তুমি?’
‘তা দিয়ে তোমার দরকার কি?’ আচমকা গম্ভীর হয়ে ওঠে মেয়েটা। ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে এলো সে।

পেছন থেকে ওকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়েছেন মিসেস কামাল, মেয়ের দিকে ছুটে যান তিনি, ‘কোথায় ছিলে তুমি?’
মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঈপ্সিতা, ‘আম্মু দেখো, ভদ্র মেয়ের মত হোমওয়ার্ক করছি না আমি? ওই লোকটাকে সরাও তো এখান থেকে। অসহ্য লাগছে আমার ওকে।’

আস্তে করে বের হয়ে যায় রায়হান। এখানে থেকে এখন কোন লাভ হবে না। হয়ত মেয়েটা কিছু জানেই না। সত্ত্বার পরিবর্তনের সাথে সাথে সবকিছু ভুলে যায় ও। অথবা, জেনে শুনেও না বোঝার ভান করছে!
মনে মনে শুধু মেয়েটাকে বলল ও, ‘যতই চালাক হও তুমি, বিচ্ছু মেয়ে! কাল রাতের মাঝেই এর সমাধান করে তারপর এই বাড়ি থেকে বের হবো আমি।’

*
আধশোয়া হয়ে নিজের ডায়েরিটা খুলেছে রায়হান – দরজা দিয়ে মাথা গলিয়ে দিলো জাহিদ।

‘রায়হান ভাই, আপনি নাকি রাতে খাবেন না? আরেকবার ভেবে বলেন। আম্মু পাঠালো জানার জন্য।’
হাসে রায়হান ছেলেটার দিকে তাকিয়ে, ‘ধন্যবাদ তোমাদের। আসলেই খাবো না। খিদে নেই।’
জাহিদ ভেতরে ঢুকে পড়ে, ‘এগুলো রাখেন। কারেন্ট গেলে কাজে দেবে।’

মোমবাতির মত কিন্তু কাঠের দুটো জিনিস টেবিলে নামিয়ে রাখে ও। অবাক হয় রায়হান, ‘আগুন জ্বলবে কিসে?’
লাইটারটা বের করে মুখের কাছে ধরতেই আগুন জ্বলে ওঠে ওপরে, ঝকঝকে হাসি দেয় জাহিদ, ‘টেকনিকটা আমাদের বিজ্ঞান স্যারের শেখানো। দাহ্য কেমিকেল আছে ভেতরে। ওটাই জ্বলে। তারপর শেষ হয়ে গেলে রিফিল করে নেওয়া যায়।’
‘কাঠে আগুণ ধরে না কেন?’
‘অদাহ্য পদার্থের প্রলাপ আছে ওখানে। জটিল ব্যাপার স্যাপার। ক্লাসে বসে তিনদিন চেষ্টা করে দুটো করে বানিয়েছি আমরা।’

দেশের এই কোণে এমন অভিনব বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হচ্ছে জেনে মন ভালো হয়ে গেল রায়হানের। বাংলাদেশে স্কুল লেভেল থেকে প্র্যাকটিকাল শিক্ষাটা হওয়া প্রয়োজন। বই পড়ে পড়ে ছাইপাশ বিদ্যে অর্জনে দেশের বা জাতির কোন উন্নতি ঘটার প্রশ্নই আসে না।

মোস্তফা কামাল ঢুকলে এসময় ঘরে। বাবার দিকে একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় জাহিদ।

মোস্তফা সাহেবও বলে দিলেন এর ফাঁকে, ‘বেশি রাত জেগো না, জাহিদ।’

জাহিদকে যোবাইদার কথা জানানো হয় নি। আড়ালে ডেকে শুধু রাইসাকে বলেছেন মোস্তফা সাহেব। সব শুনে সিঁটিয়ে গেছেন মহিলা। রাতে না খাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছে রায়হান। তবে মোস্তফা সাহেবকে ডেকে পাঠিয়েছে খাওয়া হয়ে গেলে।

এই মুহূর্তে খাটে আয়েশ করে বসলেন তিনি। মুখে এখনও রঙ ফিরে আসে নি।
অনুমতির তোয়াক্কা না করে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলে রায়হান। মোস্তফা কামাল কিছু বললেন না। ভাষা ইনি হারিয়েছেন।

‘আমার মেয়েটা কি এরকম দানব হয়েই থাকবে, মি. রায়হান?’ একেবারেই ভেঙ্গে পড়া একজন মানুষের মত মনে হয় তাঁকে এই মুহূর্তে।
‘আপনার মেয়ের সমস্যাটা আমি ধরতে পেরেছি খুব সম্ভব।’ ধীরে ধীরে বলে রায়হান, ‘মন্দের ভালো নয়। বেচারির কপাল মন্দ। সিজোফ্রেনিয়াতেই আক্রান্ত হয়েছে সে।’
‘রুদ্রপ্রতাপ বলে কাওকে দেখতে পাচ্ছে, তার কথা শুনতে পাচ্ছে তাহলে আমার মেয়ে।’ চোখ বড় বড় করে ফেলেন মোস্তফা সাহেব।
‘শুধু তাই নয়, নিজেকে সক্ষম একজন নারী বলে মনে করছে সে। নিয়মিত তার কল্পনার সাথে যৌনমিলন ঘটাচ্ছে।’ বাবার সামনে মেয়েকে নিয়ে এভাবে বলতে খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই রায়হানের, বলে যায় ও, ‘রুদ্রপ্রতাপ রায়ের চুরি হয়ে যাওয়া ডায়েরিটা আপনার মেয়ের ঘরের কোথাও আছে – এ ব্যাপারে দুইশভাগ নিশ্চিত হতে পারেন। মেয়েটি ওই ডায়েরি চুরি করে নিয়ে পড়েছে। তারপর সেখানে লেখা কথাগুলো তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। যে মেয়ের বয়েস মাত্র এগারো তাকে ওরকম কথা প্রভাবিত করবেই। আপনার মত বয়স্ক লোককেও প্রভাবিত করতে পেরেছে সেটা। তাছাড়া যতটা বুঝতে পেরেছি বেশ রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাগুলো লিখেছেন আপনার দাদা।’

প্রতিবাদ করলেন না মোস্তফা কামাল। রায়হান বোঝে ওর অনুমান এক্ষেত্রেও সত্য হতে যাচ্ছে।

‘কাজেই – ঈপ্সিতা লক্ষ্য করল, ডায়েরির সাথে একটা বিষয়ে তার মিল আছে। রুদ্রপ্রতাপ দশ থেকে বারো বছরের সুন্দরী মেয়ে পেলে তার সাথে সঙ্গম করেই ছাড়তেন। তখন একজন পূর্ণবয়স্কা নারীকে যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করতেন, কন্যাসন্তানের মাকে। কারণ, আপনিই বলেছেন – ডায়েরি অনুযায়ী ওটাই ছিলো জমিদারবাবুর রুচি। বিষয়টা ঈপ্সিতাকে আকৃষ্ট করলো।’

মোস্তফা কামাল হাল্কা হাল্কা কাঁপছেন। গোটা বিষয়টাই তাঁর কাছে দুঃস্বপ্নের মত লাগছে।
সিগারেটের গোড়ায় বার দুয়েক জোরে টান দেয় রায়হান।

‘ঈপ্সিতা রুদ্রকে তার কাল্পনিক প্রেমিক বানিয়ে ফেলে। রাত হলেই নিজের কাল্পনিক প্রেমিকের সাথে রতিলীলাতে মেতে ওঠে সে। প্রাথমিকভাবে ব্যাপারটা এরকমই ছিলো। কিন্তু এতে করে রুদ্রপ্রতাপের ব্যাপারটা সে ঠিকমতো উপভোগ করতে পারল না। রুদ্র ছিলেন নিষ্ঠুর। নিজের সাথে নিজে সঙ্গম করলে নিষ্ঠুরতা করা যায় না। এখানেই আসল বাদল নামের কাজের ছেলেটি। আবার বলুন, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তাকে আক্রমণ করে ঈপ্সিতা?’

‘চা বানাতে দেরী করে ফেলেছিলো ছেলেটা। ভুলে গেছিলো আসলে। রান্নাঘরে গিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে ওকে ঈপ্সিতা। আমরা গিয়ে দেখতে পাই ছুরি নিয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে ও, তার পায়ের কাছে ছটফট করছে বাদল।’
‘নিজে সে আক্রমণ করেনি – এমনটাই তার ধারণা।’ হাল্কা ভাবে বলে রায়হান, ‘এজন্যই তার মাঝে অপরাধবোধ দেখিনি কখনও। ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন দিয়ে সে দেখেছিল তার প্রেমিক, পূর্ণবয়স্ক এক পুরুষ, রুদ্রপ্রতাপ আক্রমণ করছে তার শিকারকে। ঠিক যেভাবে রুদ্র আক্রমণ করেছিলো তার প্রজাদের। কাজের ছেলেটির পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার পেছনে একটাই যুক্তি – আপনার ডায়েরি মেয়েটির হাতে আছে।’
‘তাহলে, নিজেকে রুদ্রের প্রেমিকা মনে করছে ও। রুদ্র চরিত্রটাকে বাস্তব করে তোলার জন্য সে যা করেছে তা নিজেই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে?’
‘কিন্তু -’ মোস্তফা কামালকে সায় দেয় রায়হান, ‘-সে নিজেও জানে না কাজগুলো তার করা। ও দেখতে পায় রুদ্র ছুরি তুলছে। রুদ্র আক্রমণ করছে।’
শুনতেই পেলেন না যেন মোস্তফা, ‘রুদ্রের কাছাকাছি নিয়ে গেছে সে তার কাল্পনিক মানুষটিকে। বয়েসে তার চেয়ে বড় যোবাইদাকে ভিক্টিম বানিয়েছে গোলাঘরে। নির্ঘাত তখন তার মনে হয়েছে জমিদারবাবু তার সাথে যৌনসঙ্গমের ফাঁকে পূর্ণবয়স্ক যোবায়দাকে হত্যা করেছে?’
‘এক্স্যক্টলি।’ মাথা দোলায় রায়হান।
‘এর সমাধান কি, মি. রায়হান?’ প্রায় ফিস ফিস করে জানতে চাইলেন মোস্তফা।

‘অবশ্যই – মেয়েটির কাছ থেকে ডায়েরিটা উদ্ধার করা। তবে সেটা আগামীকালের কাজ। আজ রাতে আমরা আবার চোখ রাখবো ঈপ্সিতার ওপর।’
‘আমরা? গতকাল আমাকে স্টাডিরুমে বসিয়ে রেখেছিলেন।’ মুখ বাঁকান তিনি।
‘গতকালের মত অদ্ভুতভাবে জ্ঞান হারাতে আমি চাই না। আমি চাই আজ আপনি আমার দিকে একটা চোখ রাখবেন। তবে একটু দূরে থেকে। ডাইনিং রুম থেকে চেষ্টা চরিত্র করলে তো ঈপ্পির দরজাটা দেখা যায়। ওখানেই থাকবেন আপনি। আমি হুঁশ হারালে আপনি ইন করবেন। সারা রাত অবজার্ভে রাখতে হবে ওকে। ’

এক মুহূর্ত ভাবলেন মোস্তফা কামাল, তারপর মাথা ঝাঁকালেন, ‘ফাইন।’

১০.
ভদ্রলোককে তার পজিশন বুঝিয়ে দিয়ে ঈপ্সিতার ঘরের কাছে চলে আসে রায়হান। দরজা আজকেও ভেতর থেকে বন্ধ। পেরিস্কোপটা ভেন্টিলেটরের ওপরে জায়গা মত লাগায় ও চেয়ারে দাঁড়িয়ে। তারপর চোখ রাখে আবারও।

গতকালের মতই শান্ত মেয়ের মত ঘুমুচ্ছে মেয়েটা। বুকের কাছে তার প্রিয় পুতুলটাকে ধরে রেখেছে।

দৃশ্যটা দেখে মন খারাপ হয়ে যায় রায়হানের। মেয়েটা নিজেও জানে না তার জীবনটা স্বাভাবিক নয়। ও জানে না সে এমন কিছু দেখতে পায় যার কোন বাস্তবতা নেই। চোখের সামনে সে একটা মানুষকে দেখতে পায়, তাকে স্পর্শ করতে পারে, তাকে আদর করতে পারে, তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে – অথচ তার কোন অস্তিত্বই নেই – এটা সে কিভাবে মেনে নেবে?
রায়হান জানে তাকে সব কিছু খুলে বলা হলেও সে মেনে নেবে না। এখন মোস্তফা কামালকে যদি বলা হয়, ‘আপনার জীবনে কোনদিনও রাইসা বলে কেউ আসে নি। ছেলে মেয়েগুলো আপনার নয়, আপনি তাদের কল্পনা করে এসেছেন আজীবন।’
মোস্তফা নিঃসন্দেহে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। একই ব্যাপার ঘটবে ঈপ্সিতাকে বোঝাতে গেলেও। কাজেই এখন তার ওপর চোখ রাখাটা দরকার।

আজকে এখানে এসেছে গতকাল অদ্ভুতভাবে জ্ঞান হারানোর ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে।
ঈপ্সিতা কি করবে সে ব্যাপারে ধারণা হয়ে গেছে ওর। রাত তিনটের সময়ই উঠে বসবে কি না তা ও জানে না। তবে আজকেও রুদ্রকে কল্পনা করবে মেয়েটা। তার সাথে বিছানাতে বা মেঝেতে রতিক্রিয়াতে লিপ্ত হবে। তারপর বেহুঁশের মত ঘুমাবে কিছুক্ষণ। এরপর ঘোর কেটে যেতে পোশাক পরে আবার বিছানাতে ফিরবে সে।
গতকাল এটাই হয়েছে – জানে রায়হান। আর কোন ব্যাখ্যা থাকতে পারে না। চোখে যা দেখেছে তা ভুল কিছু ছিলো না। যদিও মোস্তফা কামাল পুরোপুরি কথাগুলো বিশ্বাস করেছেন বলে মনে হয় না। তাঁকে রায়হান দোষ দেয় না। নিজের এগারো বছর বয়েসের মেয়েটির ব্যাপারে আজেবাজে কিছু ভাবার ব্যাপারে কোন বাবাই শতভাগ নিশ্চিত হতে পারবেন না।

তিনটার দিকে যতই এগিয়ে আসছে ঘড়ির কাঁটা – ততই উত্তেজনা বোধ করছে রায়হান। আজও কি আগের মতই আচরণ করবে মেয়েটা? নাকি ওকে ভুল প্রমাণ করে স্বাভাবিক একটা রাত কাটাবে সে? চোখ আটকে রাখে ও পেরিস্কোপের ডিসপ্লেতে।

তিনটা বাজলো।
নড়ল না মেয়েটা। দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকল রায়হান।
দুই মিনিট পেরিয়ে গেল।
তিন।

ঝট করে চোখ দুটো খুলে গেল মেয়েটার। আগের রাতের মতই স্বাভাবিকভাবে উঠে বসে ও। আগেও দেখেছে – তবুও দৃশ্যটা মেরুদণ্ড শীতল করে দেয় রায়হানের।
মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করে না মেয়েটা – সোজা হেঁটে যায় টেবিলের দিকে। তারপর এগিয়ে আসতে থাকে দরজার দিকে।
পিলে চমকে গেছে রায়হানের – মেয়েটা ঘুম থেকে উঠেই এভাবে বের হয়ে আসতে চাইবে – এটা তার মাথাতে একবারের জন্যও আসে নি।
সরে যাওয়ার সুযোগ ও পায় না – খট করে ছিটকিনি খোলার শব্দ পায়। নিজের জায়গাতে জমে যায় রায়হান।

এলোমেলো চুলে হেঁটে বের হয়েছে ঈপ্সিতা, এই ঘুম ঘুম অবস্থাতেও পরীর মত লাগছে মেয়েটাকে।
‘আড়াল থেকে নজর রাখছিলেন!’ ফেটে পড়ে মেয়েটা।
সাবধানে এক পা পিছিয়ে যায় রায়হান, ঈপ্সিতার রুদ্রমূর্তি নয়, তার হাতের ছুরিটা দেখে পেছানো ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না ওর।

ছুরিটা সামনে তুলে ধরে না মেয়েটা । আলগোছে ধরে আছে এমনভাবে – বোঝা যায়, আগেও ব্যবহার করেছে অস্ত্রটা এই মেয়ে।
‘ঈপ্সিতা, তুমি ঘুমের ঘোরে আছো।’ শান্ত কণ্ঠে বলে রায়হান, কে জানতো টেবিলে একটা ছুরি লুকিয়ে রেখেছে এ?
চোখ জ্বলে ওঠে ওর, ‘নজর রাখার জন্য তোমাকে ফল পেতে হবে, রায়হান!’
‘আজ বিকেলে যোবাইদাকে খুন করেছো কেন?’ সরাসরি প্রশ্ন করে রায়হান।

মেয়েটা চমকে গেছে।
থমকে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে পড়ল ও, ‘আমি কাওকে খুন করিনি।’
‘প্রথমে বাদল। পরে যোবাইদা।’ মেপে মেপে শব্দ গুলো উচ্চারণ করে রায়হান।
বিস্ময়ের ভাব ফুটে ওঠে ওর মুখে, ‘আমি তো ওদের ছুঁইনি।’
‘তবে কি রুদ্র করেছে খুনগুলো?’ ঠাণ্ডা গলাতে জানতে চায় রায়হান, জানে উত্তরটা কি হবে।

ঝাঁঝিয়ে ওঠে মেয়েটা, ‘রুদ্র তার কাজের জন্য কাওকে জবাব দিতে বাধ্য না। তোরা সবাই ওর কুকুর। পোষা কুকুর। কথাটা মনে রাখবি!’

চোখ সরায় না রায়হান, কড়া করে তাকায় মেয়েটার দিকে। ঈপ্সিতাও তাকিয়ে আছে ওর দিকে সরাসরি। এবার গলার সুরটাই পাল্টে যায় ওর, ‘আমাকে বিছানায় নিয়ে যাবি তুই এখন। সুখ দিবি। যেভাবে দিতো রুদ্র। তোর জন্যই আজকে আমার কাছে আসতে পারেনি ও। চল, ঘরের ভেতরে চল। আমার জামা খুলবি।’

রায়হান থমকে গেছে একেবারে। শরীরের প্রতিটা পেশী প্রস্তুত একটা আক্রমণের জন্য। যে কোন সময় ছুরি চালাবে মেয়েটা। আর কেটে নিতে চেষ্টা করবে ওর পুরুষাঙ্গ। এটুকু বুঝতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই! সরে যাওয়ার সময় নেই, এখনও ঈপ্সিতার নাগালের ভেতরেই আছে সে। ওরকম মতলব টের পেলেই হামলা করতে পারে মেয়েটা।

বাদলকেও কি একই প্রস্তাব দিয়েছিলো মেয়েটা?
বাদল কি জবাব দিয়েছিলো?
“হ্যাঁ” বলায় আক্রমণ করেছিল ঈপ্সিতা?
নাকি “না” বলায়?

রায়হান আর কিছু ভাবার সময় পায় না। ডাইনিং রুমের অপর প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন মোস্তফা কামাল। মেয়ের প্রতিটা কথা কানে গেছে তার। রায়হানের প্রতি যেটুকু অবিশ্বাস ছিলো – সবটুকু সরে গেছে তাঁর ভেতর থেকে।

‘হারামজাদী! তোর মুখ থেকে এধরনের কথা কিভাবে বের হল?’ ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে হুংকার ছাড়েন তিনি।
সমান তেজে জবাব দেয় ঈপ্সিতা, ‘তুই চুপ থাক, কুত্তার বাচ্চা!’
‘ঈপ্সিতা!’ মোস্তফা কামালের চিৎকার বোধহয় ছাদ উড়ে যাবে, ‘মুখ সামলিয়ে কথা বল তুই! আমি তোর বাবা!’

দূরে খটাখট আরও দুটো দরজা খুলে যায়। ঘুম ঘুম চোখে বের হয়ে আসেন মিসেস কামাল আর জাহিদ।
ছুরি নিয়ে ঈপ্সিতার একক প্রদর্শনী দেখে প্রত্যেকেরই ঘুম ছুটে যায়। ছুটে আসছে ওরা। ঈপ্সিতার নাম ধরে ডাকছে। বার বার বলছে ছুরিটা ফেলে দিতে।
মেয়েটার মনোযোগ সরে যেতেই দুই পায়ের সব শক্তি একত্র করে দৌড় দেয় রায়হান – ঝড়ের বেগে সরে গেছে ঈপ্সিতার নাগালের বাইরে।

ছুটতে ছুটতেই চিৎকার দেয় ও, ‘জাহিদ, মাই বয়, বোনের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নাও তো। সবাইকে নিয়ে ড্রইং রুমে বস। ঈপ্সিতার ছুরি সরানো হলে আমাকে ডাক দেবে! কেসটার সমাধান করে ফেলেছি আমি।’

সামনে যে ঘরটা পেলো তাতে বুলেটের মত সেঁধিয়ে যায় ছেলেটা। দড়াম করে দরজা লাগিয়ে ছিটকিনি তুলে দিয়েছে।
রায়হানের গমনপথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন মোস্তফা কামাল, ছেলেটাকে অনেক কিছুই ভেবেছিলেন তিনি।

কাপুরুষ ভাবেননি।

১১.
ড্রইং রমে যখন ফিরে আসে রায়হান – প্রত্যেকের চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেছে।

ঈপ্সিতা ভদ্রসমাজে শোনার তো দূরে থাকুক – পড়ার অযোগ্য গালি গালাজ ছুড়ছে সবাইকে। বাকি সবাই চুপচাপ তা শুনছে। মেয়েটার হাত থেকে জাহিদ চাকুটা সরিয়ে নিয়েছে। কাজেই আপাতত তার গালি শোনার ব্যাপারে কারও আপত্তি নেই।

মোস্তফা কামাল রায়হানকে দেখেই লাফিয়ে উঠলেন, ‘প্লিজ বলবেন এর কোন সলিউশন আছে? সমস্যাটা আমরা জানি এখন। আমাদের সলিউশন দরকার – প্লিজ!’
ঈপ্সিতা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চোখের সামনে থেকে দূর হ, বাইনচোদ!’
মিসেস কামাল কেঁদে ফেললেন।

রায়হান বসল না, দাঁড়িয়ে থেকেই মিসেস কামালের দিকে তাকায় ও। মোস্তফা কামালই বরং বসে পড়লেন দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা দেখে।
‘কান্না করার অধিকার এখানে সবার আছে। আপনার নেই, মিসেস কামাল। আপনার উচিত ছিলো আমাকে সহযোগিতা করা – সন্তানের মঙ্গল চাইলে। অথচ তথ্য লুকিয়ে রেখেছিলেন আপনি।’
মোস্তফা সাহেব অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন দেখে তার দিকে তাকায় রায়হান, প্রথমবারের মত রীতিমত গম্ভীর এখন ও।
‘আপনার জন্য শকিং কিছু ব্যাপার জানবেন এখন, মি. কামাল। কাজেই মানসিক প্রস্তুতি নিন, আপনি ছাড়া এই সিচুয়েশনটা কেউ হ্যান্ডল করতে পারবে না।’

ঈপ্সিতাও গালি দিতে ভুলে গেছে। রায়হানের এই মূর্তিটা একেবারেই অন্যরকম। তেমন কিছুই বলে নি ও – কিন্তু ঘরের সবার ওপর একটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে হেঁটে আসে রায়হান। দুই হাত পেছনে বেঁধে রেখেছে।

‘রুদ্রপ্রতাপ রায় – আপনাদের পূর্বপুরুষ। মানুষটির জমিদারি ছিলো। সেই সাথে ছিলো নিষ্ঠুরতার ক্ষেত্রে নামডাক। এঁর ছেলে বাস্তবজীবনে নিষ্ঠুরতা পছন্দ না করলেও – কল্পনা করতে ভালো বাসতেন সেসব। এই মানুষটি হলেন আপনার দাদা, মি. কামাল। রসিয়ে রসিয়ে তা লিখেছিলেন তিনি। আর বলতে হচ্ছে, বংশগত ভাবে নিষ্ঠুরতার এই অংশটা আপনিও পেয়েছেন। আপনি বাস্তবজীবনে কাওকে নিষ্ঠুরের মত কষ্ট দেওয়ার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। তবে এসব নৃশংসতা কল্পনা করতে আপনার অসম্ভব ভালো লাগে। ঠিক যেমনটা লাগত আপনার দাদার। তিনি সেজন্য তেল-ঝাল-মশলা দিয়ে বাবার কুকীর্তির কথা লেখে গেছেন। প্রতিটা শব্দ লেখার সময় তিনি উপভোগ করেছেন বিষয়গুলো। আর আপনি উপভোগ করেছেন প্রতিটা লাইন পড়ে পড়ে।’

মিসেস কামাল একটা তেরছা দৃষ্টি দেন এবার মোস্তফা কামালের দিকে। ওদিকে রায়হান বলে চলেছে-

‘আপনার কাছ থেকে পূর্বপুরুষের ডায়েরিটা হাতছাড়া হয়ে গেলো কয়েক মাস আগে। এ বাসার কেউই চুরি করল সেটা। তার পূর্বপুরুষও রুদ্রপ্রতাপ রায় – কাজেই বিষয়টাকে ঠিক চুরি বলা চলে না অবশ্য। রুদ্রের জীবনকাহিনী খুব বেশি আকর্ষণীয় মনে হল তার কাছে। বংশধারাতে আপনার এই সন্তানও নিষ্ঠুরতার ব্যাপারটা পেয়েছেন, মি. কামাল। আপনাদের মাঝে কমন একটা মেন্টাল ডিজঅর্ডার আছে। অ্যান্টিসোশিয়াল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার।’

সবার মুখের দিকে তাকায় রায়হান, ‘অ্যান্টিসোশিয়াল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারদের একাংশকে সাইকোপ্যাথ বা সোশিওপ্যাথ বলা হয়। এরাই মানসিক রোগের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এদের মাঝে এমপ্যাথির ব্যাপারটাই নেই। আর সহানুভূতি না থাকলে যা হয়, একটা অন্যায় আচরণ দেখলে আপনাদের মনে অনুকম্পার সৃষ্টি হয় না। অন্যায় ভাবনাতেও আপনাদের মনের কোন ধরনের অনুশোচনা আসে না। মিসেস কামালের ব্যাপারে জানি না – তবে আপনারা তিনজনই এই বৈশিষ্ট্য পেয়েছেন।’

গুষ্টিশুদ্ধ দোষারোপ করে যাচ্ছে ভেবে রায়হানের কানেই কেমন জানি ঠেকে কথাগুলো। কিন্তু কিছু করার নেই – এখানে একটা দায়িত্ব নিয়ে এসেছে ও আর তা শেষ না করে যাবার উপায় নেই।

‘মি. কামাল শতবার ডায়েরি পড়েছেন আনন্দ পেতে। বিকৃতিরুচির একজন মানুষের ডায়েরি শতবার পড়ে আনন্দ পায় কে? আরেকজন বিকৃতরুচি। তবে যোবাইদার লাশ দেখার পর আপনার প্রতিক্রিয়া আমি দেখেছি। আপনি শুধু কল্পনাতেই নিষ্ঠুর। বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ করার মত নার্ভই আপনার নেই।’
‘কিন্তু ঈপ্সিতার আছে।’ থমথমে গলাতে বলেন মোস্তফা, ‘আগেই সব নিয়ে কথা হয়েছে আমাদের। সিজোফ্রেনিয়া আছে আমার মেয়ের। এর চিকিৎসা কিভাবে করা যেতে পারে – সেটা বলুন।’

পেছন থেকে হাত সামনে আনে রায়হান। মাঝখানে রাখা টি-টেবিলটার ওপর দড়াম করে আছড়ে ফেলে একটি পুরোনো ডায়েরি।

‘চন্দ্রপ্রতাপ রায়ের ডায়েরি।’ ঘোষণা দেয় রায়হান, ‘এই বাড়িতে একজন সিজোফ্রেনিয়ার রোগীও নেই, মি. কামাল।’
‘আপনি আজ রাতেই বলেছিলেন -’
‘আমার ভুল হয়েছিলো।’ শান্ত কণ্ঠে স্বীকার করে ও।

‘ডি আই ডি। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার। এ রোগটাও ভয়ংকর। রোগী নিজেকে দুটো বা তার চেয়ে বেশি চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে এখানে। নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কোন মানুষ ভেবে বসে এবং সেভাবেই চালিয়ে চায় কর্মকান্ড। দেখা যাবে একজন বৃদ্ধ মানুষ নিজেকে পাশের বাসার শিশুটি মনে করছেন – এবং সেরকম আচরণই করছেন। তাকে বোঝাতে পারবেন না আপনি যে সে ঠিক ওই চরিত্রটি নয় – কারণ যখন সে একটি চরিত্রের মাঝে থাকে – অন্য চরিত্রগুলো সে হয়েছে, এমনটা মনেই করতে পারে না ও।’

‘একে তো মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বলা হত?’ ভ্রু কুঁচকে ফেলেন মোস্তফা কামাল।

‘এখন আর বলা হয় না। ডিআইডিই বলে একে। যা হোক, আপনাদের সমস্যা এখানেই। আপনার মাঝে পর্যাপ্ত নিষ্ঠুরতা না থাকলেও ডায়েরি-চোরের মাঝে ছিলো। সে বাস্তবেও প্রয়োগ করে দেখাতে পেরেছে সবকিছু – কারণ সে পরিমাণ নার্ভ ছিলো তার। যদিও তার কিছুই মনে পড়বে না এখন – কারণ, যখন ও রুদ্র হয়, তখন অন্য চরিত্রটার কথা তার মনেই থাকে না। আবার যখন যে জাহিদ হয় – সে মনে করতে পারে না কোনদিনও নিজেকে রুদ্র বলে পরিচয় দিয়েছিলো সে।’

জাহিদ এবার ভয়ানক চমকে গেছে, ‘আমি – আমি রুদ্র বলে নিজের পরিচয় দেব কেন – এসব কি বলছেন?’

ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় রায়হান, ‘ডায়েরিটা তোমার টেবিলের ড্রয়ারের ফলস বটমে পেয়েছি, জাহিদ। ঈপ্সিতা নয় – চুরিটা করেছিলে তুমি। আমাদের রোগী ঈপ্সিতা নয়, এ বাড়িতে মূল সমস্যা তোমার। রোগি নির্ণয়ে ভুল করেছি আমি প্রথমেই, রোগ নির্ণয়ে নয় – কাজেই সবকিছু ঘোলাটে মনে হচ্ছিলো। ঈপ্সিতার একটি মানসিক সমস্যা এখন হয়েছে বটে– তবে সেসবই তোমার আচরণের রেজাল্ট।’
অবাক হয়েছেন মোস্তফা কামালও, ‘ও কিভাবে -’
‘গত কয়েক মাস ধরে ডায়েরি ওর কাছে। রুদ্রপ্রতাপের চরিত্র জাহিদকে শিহরিত করে ও। চৌদ্দ বছর বয়স ওর – মানসিক অস্থিরতার জন্য সময়টা একেবারে নিখুঁত। কাজেই পা পিছলালো জাহিদ, তাছাড়া জেনেটিক কারণে ভেতরে তার নিষ্ঠুর সত্ত্বাটা লুকিয়ে ছিলোই। এবার সেটা আত্মপ্রকাশ করলো। বয়েসটা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রবল টান আসার – জাহিদ ডায়েরির যৌনতার অংশগুলোকে প্রাধান্য দিলো সবার প্রথমে।’

কপালে ঘাম জমেছে রায়হানের, একহাতে মুছে নেয় ও সেটা, ‘সবার সামনেই বলছি – কারণ এখন আর লুকোছাপার কারণ নেই কোন। ডায়েরি থেকে জাহিদ জেনেছে রুদ্রপ্রতাপের সদ্য বালিকা শয্যাসঙ্গীনি হিসেবে বিশেষ পছন্দ। জাহিদ নিজেকে ততদিনে রুদ্র আর জাহিদের মাঝে গুলিয়ে ফেলছে। সে নিজেও জানে না কোন সময় নিজের মাঝে আরেকটা আইডেন্টিটি তৈরী করে ফেলেছে ও – রুদ্র! আর তারপর সদ্য বালিকাকে সঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার জন্য রুদ্ররূপ একেবারে উন্মাদ হয়ে ওঠে। হাতের কাছেই সমাধান পেয়ে সেদিকেই এগিয়ে যায় জাহিদের ‘রুদ্র’ ভার্সন। ঈপ্সিতার বয়েস মেলে সেসব মেয়েদের সাথে।’

‘ওহ গড!’ বিড় বিড় করেন মোস্তফা কামাল।
‘ঈপ্সিতার বয়েস কম, মেয়েটা ভালোমত এসব বোঝেও না। জাহিদ তাকে বোঝায় সে জাহিদ নয়, সে রুদ্র। রুদ্রের হাতের মুঠোতে সব কিছু। প্রতিটা মানুষ তার পোষা কুকুরের অধম। আর মেয়েরা রুদ্রের কথামত মরতেও রাজি থাকবে – এটাই স্বাভাবিক। ঈপ্সিতার সাথে নিয়মিত সঙ্গম করতে থাকে জাহিদ।’

মুখ চেপে ধরেছেন মোস্তফা কামাল, দুই চোখে স্রেফ অবিশ্বাস।

‘মেয়েটা প্রথমে এটা একটা খেলা হিসেবেই নিয়েছিলো। ধীরে ধীরে বাচ্চাটার মস্তিষ্কে চাপ পড়ে – দিনের বেলাতে জাহিদকে জাহিদ, নিজের ভাই হিসেবে দেখতে পায়। রাত হলেই জাহিদকে সে ‘রুদ্র’ নামে চেনে। ফলে বাস্তবতা আর কল্পনার মাঝে হারিয়ে যেতে শুরু করে ঈপ্সিতাও। কয়েক মাস ধরে নিয়মিত সঙ্গমের ফলে বিষয়টা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ততদিনে দুইজনের। কিন্তু এবার রুদ্ররূপের মনে হতে শুরু করে – কিছু একটা মিসিং। রুদ্রপ্রতাপ রায়ের চরিত্রটা নিয়েছে সে – অথচ শুধু নারীসঙ্গের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে।’
‘অতি সামান্য কারণে বাদলের পুরুষাঙ্গ কেটে নেয় এবার জাহিদ। রুদ্রের মত আচরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায় ওর। ভুল সময়ে পৌঁছেছেন আপনারা – ছুরিটা তুলে নিয়ে অপরাধীর নজরে পড়ে যায় বেচারি ঈপ্সিতা। নিষ্ঠুরতার আনন্দ ওদিকে জাহিদ পেয়ে গেছে ততদিনে। রতিলীলাতে নিষ্ঠুরতা আনতে পারে নি তখনও – তৃতীয় বলী সঙ্গী যোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে রাতের জাহিদ। ধারণা করছি – সম্ভবতঃ এই স্টেজে এসেই নিজের মায়ের সাথে অশালীন আচরণ করে বসে ও। প্রথমে ভেবেছিলাম মেয়ের দুশ্চিন্তাতে তিনি ছেলের সাথে কথা বলছেন না। তবে ডিআইডির ব্যাপারে নিশ্চিত হতেই জাহিদের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার কারণ আমি বুঝে ফেলি। যেটার কথা মিসেস কামাল চেপে গেছেন।’

মিসেস কামাল এবারও কোন কথা বললেন না। সন্তানের মুখ থেকে অশ্লীলতা শোনার একটা সীমা আছে । তার বাইরে কিছু শুনলে মুখ থেকে কথা বের হওয়ার কথা নয়।

‘মায়ের কাছ থেকে সাহায্য না পেয়ে যৌনসঙ্গী হিসেবে যোবাইদাকে বেছে নেয় জাহিদরূপী রুদ্র। মেয়েটা গ্রুপ সেক্সে রাজি হয় নি বলে মারধর করে রাজি করায় তাকে। সম্ভবতঃ মোটা অংকের টাকার অফারও দিয়ে থাকবে সে। এরপরে যোবাইদা ঈপ্সিতাকে নিয়ে গোলাঘরের দিকে গেলে ছুরি নিয়ে চলে আসে জাহিদও। ওরা তিনজন মিলে ওখানে যা ইচ্ছে তাই করে – তারপর যোবাইদাকে আক্রমণ করে জাহিদ – ঠিক রুদ্রের মতই। মেয়েটিকে হত্যা করে রেখে ওরা দুইজনে ফিরে আসে বাড়িতে।’

‘আমি -’ দুই হাতে চুল খামচে ধরেছেন মোস্তফা কামাল। কিছু বলতে পারলেন না।
জাহিদের মুখ মেঝের দিকে এখন। ঈপ্সিতাও চুপচাপ তাকাচ্ছে সবার দিকে। সব কথা মেয়েটা বুঝেছে বলে মনে হয় না।
আর মিসেস কামাল কাঁদছেন। রায়হান সবার দিকে তাকায় একবার।

‘রোগটা মূলতঃ জাহিদের মাঝে ছিল। তবে দিনের পর দিন তার এধরনের বিকৃত রুচির শিকার হয়ে ঈপ্সিতার ওপরও বাজে প্রভাব পড়েছে। মেয়েটা এখন জানে না সে যে পৃথিবীতে আছে তাতে এটা স্বাভাবিক নয়। ভাইবোনের সম্পর্কের ব্যাপারে গভীর ধারণা আসার আগেই একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে ওর।’
‘এর উপায় কি, কিভাবে ওদের নরমাল লাইফে ফিরিয়ে আনবো আমি?’ চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি বেয়ে পড়ে মোস্তফা কামালের।
‘সাইকোলজিক্যাল থেরাপিস্টের কাজ এটা। হয়তো কগনিটিভ বিহ্যাভিয়রাল থেরাপি বা সিবিটি দেয়া লাগবে ওদের। আমি সমস্যা কোথায় ধরিয়ে দিতে পারি – তবে ভুলে যাচ্ছেন, ডাক্তার নই আমি। থেরাপিস্ট তো নই-ই। একজন স্বঘোষিত সাইক-ইনভেস্টিগেটর মাত্র।’

‘এক সেকেণ্ড – মি. রায়হান, আপনাকে তাহলে অজ্ঞান করেছিলো কে? আমি?’ প্রশ্ন করে জাহিদ শান্ত গলাতেই, ‘কিভাবে?’
‘কেমিস্ট্রিতে তুমি একজন জিনিয়াস, জাহিদ। মোমবাতির বিকল্প আবিষ্কার – বাংলাদেশের স্কুলের ক্লাস এইটের বাচ্চাদের কোন শিক্ষকই ক্লাসরূপে করতে দেবেন না, তাও তিনদিন ধরে। কাজটা তোমার নিজের করা। তোমার ঘরে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম একটু আগে – সবার বিমূঢ় ভাবটা কাজে লাগাতে হয়েছিলো। অনুমতি তুমি দিতে না আমাকে কখনই। ঘরভর্তি কেমিক্যালের মজুদ দেখে বুঝেছি – ও ব্যাপারে তোমার প্যাশন আছে। আমাকে কোনধরনের কেমিক্যালের সাহায্যে অজ্ঞান করেছ তুমি, খুব কাছে থেকে স্প্রে করে। এটাও অনুমান।’
‘চমৎকার।’ উঠে দাঁড়ায় জাহিদ, আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই এখন ওর মাঝে, ‘এই মুহূর্তে বেড়িয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে এবার।’

অবাক হয়ে তার দিকে তাকান মোস্তফা কামাল, তাকে ইশারাতে কিছু বলতে মানা করে রায়হান।

শান্ত গলাতে জাহিদের উদ্দেশ্যে বলে ও, ‘তুমি মরে গেছ, রুদ্র। মরে গেছ ১৯০৩ সালে। প্রজাদের একাংশ তোমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলো, মাই ডিয়ার।’
‘আমি বাঁচতে এসেছি, মি. ইনভেস্টিগেটর।’ হাল্কা চালে হাসে জাহিদ। পেছনের পকেটে হাত দিয়েছে।

এক সেকেন্ড লেগে যায় রায়হানের ব্যপারটা বুঝতে – তবে এর মাঝেই ভাঁজ করা ছুরিটা এক ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলেছে ছেলেটা। তারপরই নাক মুখ কুঁচকে ছুটে আসতে থাকে নরকের পিশাচটা। গর্জন ছেড়েছে, ‘হারামজাদা, তোর মুখে মুখে তর্ক আমি -’

অন্যপাশের সোফা থেকে জোরে টি-টেবিলের ওপর লাথি কষালেন মিসেস কামাল – মেঝের ওপর বিশ্রী শব্দ করে পিছলে এগিয়ে এল ওটা জাহিদের গতিপথে – হাঁটুর নীচে খারাপভাবে বেঁধে গেল।

কোনমতে সরে গেছে রায়হান – বাতাসে উড়ে ওর পাশ দিয়েই চলে যায় ছেলেটা। এর মাঝেই দুর্বলভাবে কোপ বসাতে চেষ্টা করে ওর শরীরে। বাম হাতের বাহু চিরে গিয়ে টপাটপ রক্ত গড়িয়ে আসে – সেটা অগ্রাহ্য করে রায়হান এগিয়ে যায় ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে মাত্র পড়ে যাওয়া ছেলেটার দিকে।
এক লাথিতে ছুরিটা সরিয়ে দিয়েছে – ওর টুঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁপ দেয় জাহিদ। ডান হাত মুষ্ঠিবদ্ধই ছিলো – এবার প্রকাণ্ড ঘুষিটা বসিয়ে দেয় রায়হান। মেঝেতে ফিরে গেল জাহিদ।

‘ক্লিনিকে নিয়ে যাবার আগতক বেঁধে রাখুন ওকে। সবার নিরাপত্তার জন্য এটি জরুরী।’ দম্পতির দিকে তাকিয়ে বলল ও, ‘থ্যাংকস, মিসেস কামাল।’
বাচ্চা ছেলেটাকে আঘাত করার জন্য খারাপই লাগছে ওর।

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ঈপ্সিতা ভাইয়ের দিকে, ফিস ফিস করে বলল, ‘রুদ্র! আমার রুদ্র!’

_ পরিশিষ্ট _
‘চলে যাচ্ছেন?’ বিষন্ন গলাটা শুনে তাকিয়ে মিসেস কামালকে দেখতে পায় রায়হান।
মৃদু হাসে ও, ‘তিনদিনের আল্টিমেটাম নিয়ে এসেছিলাম। এর মাঝে কাজও শেষ হয়েছে। কাজেই -’

জিনিসপত্র গুছানো হয়ে গেছে। এক হাতে তুলে নেয় রায়হান বড় ট্রাভেল ব্যাগটা।

রাইসার দিকে তাকায় ও, ‘আপনাদের জীবনটা হয়ত তছনছ করে দিয়ে গেলাম। সেজন্য দুঃখপ্রকাশ করছি না। সবকিছু ভালোর জন্যই হয়েছে।’
সামনে এগিয়ে আসে মহিলা, চোখে স্পষ্ট কৃতজ্ঞতা।
‘আপনার কাছে আমরা চিরঋণী হয়ে থাকলাম, মি. রায়হান। দুঃখপ্রকাশের কোন দরকার দেখি না।’

চোখ দিয়ে মহিলাকে মাপে রায়হান। বয়েস ত্রিশের বেশি হবে না। মোস্তফা কামাল বিয়ের সময় বয়েসের ভালো ব্যবধান রেখেছিলেন মনে হয়। বিয়ে করেছিলেন এক কিশোরীকে! সন্তানও নিয়েছিলেন ঐ বয়সেই। রুদ্রপ্রতাপ রায়ের প্রভাব কি তাঁর মাঝেও ছিলো?

কাঁধ ঝাঁকায় রায়হান নিজের অজান্তেই – হয়ত। এখন গুরুত্ব দেওয়ার মত ব্যাপার ওটা নয়।

‘একটা কথা, মিসেস -’
‘আমি বাঙ্গালী অতিথেয়তার চেয়ে ইংলিশ আতিথেয়তাকে বেশি পছন্দ করি। আমাকে মিসেস কামাল বলে ডাকবে না আশা করি। নাম ধরেই ডাকতে পারো।’ একটু হেসে রায়হানের অনুকরণ করেন তিনি।
হেসে ফেলে রায়হান, ‘ঠিক আছে, রাইসা, এসব নোংরা ছবি সরিয়ে ফেললে ভালো হয়।’ ঘরের চারপাশটা দেখিয়ে বলে ও, ‘আন্ডারএজড দুটো বাচ্চা আছে এ বাড়িতে।’
‘সরিয়ে ফেলবো।’ বিষন্নতা নেমে আসে চোখদুটোতে, ‘আরেকবার বলছি – তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।’

পরক্ষণেই এগিয়ে আসলেন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। দুই হাতে আলিঙ্গন করলেন রায়হানকে। ও কিছু বোঝার আগেই নিজের ঠোঁটে ভদ্রমহিলার ঠোঁট অনুভব করে। ভিজিয়ে ছেড়ে দিলেন একেবারে।

তারপর রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যান মিসেস মোস্তফা কামাল।

মিনিট দুয়েক নিজের জায়গাতে স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে থাকে রায়হান।
ঘটনার আকস্মিকতাতে হতভম্ব।
এক মুহূর্ত পরেই মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর। মহিলাটি ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার। ডিজঅর্ডার এঁর মাঝেও আছে। ঠিক কি ডিজঅর্ডার সেটাই ধরতে পারছে না ও – কাজেই হাসিটা ফুটেছে।
সহজে বোঝা যায় না – এমন কোন কেস পেলে এধরনের একটা হাসিই ফুটে ওঠে আবু মোহাম্মদ রায়হানের ঠোঁটে।

এলোমেলো চুলগুলোতে একবার হাত চালিয়ে দুই হাতে ব্যাগগুলো তুলে নেয় ও। তারপর লম্বা পায়ে বেড়িয়ে যায় ঘরটা থেকে।

— ০ —

রচনাকাল : অক্টোবর ০৩, ২০১৪

চতুরঙ্গ

আমার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে স্বাগতম!

সাপ্তাহিক চতুরঙ্গ ইনবক্সে পাওয়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন! এতে আপনি প্রতি সপ্তাহে পাচ্ছেন আমার বাছাইকৃত চার লেখা!

আপনার কাছে কোন স্প্যাম ইমেইল যাবে না। নিউজলেটার ইমেইল ইনবক্সে খুঁজে না পেলে স্প্যাম কিংবা প্রমোশনাল ফোল্ডার চেক করুন!

কিশোর পাশা ইমন

Website: http://kpwrites.link

১২টি ক্রাইম থৃলারের লেখক কিশোর পাশা ইমন রুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ছিলেন, এখন টেক্সাস ষ্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছেন মেকানিক্যাল অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বর্তমানে টেক্সাসের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ইউটি ডালাসে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডির ছাত্র। ছোটগল্প, চিত্রনাট্য, ও উপন্যাস লিখে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন। তার লেখা প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে। তার বইগুলো নিয়ে জানতে "প্রকাশিত বইসমূহ" মেনু ভিজিট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *