পৌনপুনিক Posted on October 7, 2026 ১. ‘আমি আমার মাকে রান্না করে খেয়ে ফেলেছি।’ ডক্টর মাহবুবুর রহমান এই প্রথমবারের মত আগ্রহ নিয়ে সামনে বসা মেয়েটার দিকে তাকালেন। কথাটা বলার সময় চোখের পাতা পর্যন্ত কাঁপল না। নাকি কাঁপল? মাহবুবুর রহমান নিশ্চিত হতে পারেন না। তিনি ধীরে ধীরে তাঁর চায়ের কাপটা সামনের টি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখেন। এই মেয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা দরকার। সেই সাথে তার বর্ণনাভঙ্গীতে কোন ধরনের ফাঁক থাকছে কি না – সেটাও একই সাথে নিশ্চিত হতে হবে। তবে মনোযোগ এখানে দেওয়াটা যাচ্ছে না। বাইরে সারাদিন ধরে বৃষ্টি পড়ছে। মাহবুবুর রহমানের বাড়িটি দোতলা। মোনালিসা নামক একুশ বছরের এক তরুণীকে নিয়ে তিনি সেই দোতলার বারান্দাতে বসে আছেন। বেতের টেবিলের ওপর একটা চিনেমাটির কেতলিতে ভর্তি চা। তরুণী চায়ের কাপে মুখ ঠেকায় নি এখনও। সম্ভবতঃ নিজের মাকে রান্না করে খেয়ে ফেলার পর থেকে তার রুচি বিকৃতি ঘটেছে। ডক্টর মাহবুব নিজের চায়ের কাপটা আবার হাতে তুলে নিলেন। একজন মানুষ তার মাকে খেয়ে ফেলেছে বলে তাঁর চা খাওয়া বন্ধ হয়ে থাকবে এটা অন্য কোন দিন মানা যেত। তবে আজকে বৃষ্টি বিলাসী দিন। কাপের পর কাপ গরম চা খেতে খেতে অদ্ভুত রকমের কোন মানসিক সমস্যার কথা শোনার চেয়ে ভালো ভাবে আজকের দিনটা পার করা সম্ভব না। কাজেই তার চেম্বারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট খুঁজতে থাকা মেইল গুলো তিনি আজ সকালে একে একে চেক করেছেন। আগ্রহ জাগানোর মতো কেস পেলে এরকম বন্ধের দিনগুলোতে রোগীকে নিজের বাসাতে দাওয়াত দিয়ে থাকেন তিনি। সময়টা কাটে ভালো। “মোনালিসা মিনালি” নামক এই অদ্ভুত মেয়েটির মেইল তাঁর মনোযোগ আকৃষ্ট করেছিলো। ডক্টর, আপনি ব্যস্ত আমি জানি। আপনার সাথে আমার চেম্বারের বাইরে দেখা করা দরকার। সম্ভব হলে আপনার বাসাতে? আমি একজন মানুষকে খেয়ে ফেলেছি। তবে সেটা আপনার সাথে দেখা করার মূল কারণ নয়। যেটা মূল কারণ সেটা আপনার সাথে মেইল বা চেম্বারে ডিসকাস করা যাবে না। আগ্রহবোধ করার মত কেস এটা হয়ত না। তবে আপনি যদি মনে করেন আমাকে সময় দেওয়া যায়, জানাবেন। মোনালিসা মিনালি, শেখেরটেক, ঢাকা। ডক্টর মাহবুবুর রহমান মোটেও আশ্চর্য হন নি একজন মানুষকে খেয়ে ফেলার কথা মেয়েটি লেখাতে। কারণ ওর পেছনে কোন যুক্তি নেই। বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাহবুবুর রহমানের সাথে দেখা করার জন্য এর চেয়ে জঘন্য বানোয়াট কোন কথা লেখতে পারে কেউ। দেখা হওয়ার পর ইনিয়ে বিনিয়ে জানাবে, ‘ওটা ছিল একটা ভুল। নরখাদকের ফ্লেভার না দিলে তো আর আপনি আমাকে সময় দিতেন না।’ কথাটা শেষ করে পিত্তি জ্বালা করা একটা হাসিও তারা দিতে পারে। এটা ডক্টর দেখে শেখেন নি। ঠেকে শিখেছেন। গত বছর একজনের মেইলে লেখা ছিল রোগী কুকুরের রক্ত ছাড়া আর কিছু খেতে পারছে না। প্রতিদিন রাতে রোগী ক্ষুধাতে পাগল হয়ে পথে নামছে। রাস্তাতে রাস্তাতে কুকুরদের পেছনে ছুটে ছুটে শিকার করছে। তারপর মৃত কুকুরের রক্ত খেয়ে পেটের জ্বালা মেটাচ্ছে। রোগী কাতর কণ্ঠে জানতে চেয়েছে, এর সমাধান কি? মাহবুবুর রহমান ঠিক করলেন পরের উইক এন্ডে এই লোককে নিজের বাসাতে দাওয়াত দিয়ে আনতে হবে। দুপুরে একসাথে খাওয়া দাওয়া করা যাবে। সেই সাথে শোনা যাবে কুকুর শিকারের কাহিনী। ভদ্রলোক আমন্ত্রণ পেতেই দুই লাফে চলে আসলেন। তবে তারপর কাঁচুমাচু মুখে জানালেন, আসলে, তাঁর মেয়েটি প্রতিদিন রাতেই দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে তাঁর আলাপ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভালো একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে সময় পাওয়া আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার। কাজেই হালকা চাতুরী তাঁকে করতে হয়েছে। মাহবুবুর রহমান এই লোককে কয়েকটা ঘুমের ওষুধের নাম লেখে বিদেয় করেছিলেন। একটি চমৎকার ছুটির দিন মাটি হয়ে গেছিলো তাঁর। কিন্তু মোনালিসা মেয়েটির ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ এটা হবে না। মেয়েটির প্রতি ডক্টরের আগ্রহের উৎস তার অদ্ভুত খাদ্য অভ্যাস না। বরং ঠিক যে সময়ে মাহবুবুর রহমান নিজের মেইল অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিলেন – ঠিক তখনই মেয়েটি তাঁকে মেইল করে। তিনি যখন আশা করছিলেন একটা ইন্টারেস্টিং কেস নিজের বাসাতে টেনে আনবেন – ঠিক তখনই মেয়েটিও প্রস্তাব দিয়েছে সেখানে আসার। ঘটনাটিকে শুধু কাকতালমাত্র বলে উড়িয়ে না দিয়ে – আজকের ছুটির দিনটা কাটানোর জন্য ডক্টর মেয়েটিকে বেছে নিয়েছেন। মোনালিসাকে দেখে মনে হচ্ছে না এই মেয়ে নিজের ওপর এক ফোঁটা বিরক্ত। এতক্ষণে সে তার চায়ের কাপটা নিয়ে নিজের ঠোঁটে ছোঁয়ায়। তারপর বাইরের গাছগাছালি ছাড়িয়ে নজর মেলে দেয় তিন রাস্তার মোড়টার দিকে। ভিজে চক চক করছে রাস্তাগুলো। কিছুক্ষণ সেই ভেজা পথ দেখে মেয়েটি ফিরে তাকায় মাহবুবুর রহমানের দিকে, ‘আপনার বয়েস সাঁইত্রিশ বছর। তাই না?’ মাহবুবের ভ্রু কুঁচকে গেলেও তিনি কোন রকম বিরূপ মন্তব্য করলেন না। অপরিচিত মানুষ ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে তিনি বিরক্ত হন। তবে সম্ভাব্য একজন ইন্টারেস্টিং কেসের সামনে বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেন তিনি, ‘আটত্রিশ।’ হাত উল্টে ফেলে মেয়েটা, ‘বয়েসের তুলনাতে সামান্য ছোট দেখায় আপনাকে। এত অল্প বয়েসে বাংলাদেশের সেরা সাইকিয়াট্রিস্ট হলেন কি করে?’ মুচকি হাসলেন ডক্টর, ‘বয়েসের চেয়ে এই পেশাতে বেশি দরকার হল – অন্তর্দৃষ্টি। আর ওটা আমার বেশ প্রখর। সম্ভবতঃ এজন্যই বয়েসটা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি নিজের কাজে আমার দক্ষ হতে। আপনি নিঃসংকোচে নিজের সমস্যার কথা খুলে বলতে পারেন।’ অবাক হয় মোনালিসা, ‘আমি তো একবারও বলি নি আমি কোন সমস্যাতে আছি।’ ডক্টর মাহবুবের মুখ থেকে হাসিটা ধীরে ধীরে মুছে যায়। ‘আম্মুকে আমি ছয় রাত আগে জবাই করি। টুকরো টুকরো করছিলাম প্রচণ্ড ক্ষোভে। তবে একেবারে ছোট ছোট করে ফেলার পর মাথাতে রান্না করার আইডিয়াটা আসলো। লাশ গুম-টুম করার চেয়ে খেয়ে হজম করে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যায় – সাধারণ যুক্তি। আবেগ দেখানোর কিছু দেখি নি। আমি শুধু যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে অবশ্যই – ঘটনাটা আমার জন্য কোন সমস্যা না।’ নিঃশ্বাস নেয় মোনালিসা, ‘কাজেই – প্লিজ আমাকে নিজের সমস্যার কথা খুলে বলতে বলবেন না। আমি কোন সমস্যাতে নেই।’ মাহবুবুর রহমান নিজের কাপটা চিনেমাটির কেতলি থেকে চা ঢেলে ভরে নিলেন। নিজের মুখে ফিরিয়ে এনেছেন অমায়িক হাসিটা আরেকবারের জন্য। মোনালিসার চ্যালেঞ্জকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে কেতলি তুলে জানতে চাইলেন, ‘রিফিল?’ মাথা নাড়ে মোনালিসা, ‘নো, থ্যাংকস। বিষয়টা অদ্ভুত।’ বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে বাইরের টুপটাপ বৃষ্টি দেখতে দেখতে প্রশ্ন করেন ডক্টর, ‘কোন বিষয়টা?’ ‘আপনাকে আমি এখন পর্যন্ত তিনবার বলেছি, আমি কাওকে খেয়ে ফেলেছি। শেষের দুইবার জানিয়েছি মানুষটি আমার নিজের মা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে একটা প্রশ্নও করেন নি ’ দুই সেকেন্ড ইতস্তত করেন ডক্টর, ‘চাই নি, প্রশ্ন করে আপনার কথার ধারা অন্য দিকে সরিয়ে নিতে। তারচেয়ে ঠিক যতটুকু আর যেভাবে বলতে চাইছেন সেটা শোনাটাই দ্বিপাক্ষিক মঙ্গল।’ মুচকি হাসলো মোনালিসা এবার। মাহবুবুর রহমান তাকিয়ে থাকেন। মেয়েটি সুন্দরী, শরীরের সাথে সেঁটে আছে পোশাক, সব মিলিয়ে অদ্ভুত রকমের আকর্ষণীয় একটা উপস্থাপনা এর আছে। অথচ হাসিটা কেমন জানি অশুভ। চোখ দুটো একটুও হাসে না মুখের সাথে। ও দুটোতে সাপের দৃষ্টি। ডক্টরের বিশ্লেষণী দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে তাঁর চোখে চোখ রাখে মেয়েটি, ‘ভাবছেন, যা বলছি বানিয়ে বলছি? আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে আরও বেশি কিছু বানিয়ে ফেলবো – সে ভয়েই প্রশ্ন করছেন না। তাই তো।’ অস্বীকার করেন না মাহবুব, ‘একরকম।’ টেবিলের ওপর দিয়ে কিছু একটা ছুঁড়ে মারে মেয়েটা আচমকাই, ‘লেফট ওভার, ফর ইউ, ডক্টর।’ এতটাই চমকে গেছেন ডক্টর মাহবুবুর রহমান, হাতের চায়ের কাপ ছলকে চা ছিটকে পড়ে তাঁর শরীরে। শক্ত হয়ে থাকা একটা মাংসপিণ্ড ছুঁড়ে মেরেছে মোনালিসা টেবিলের ওপর দিয়ে। কয়েকদিন ডীপ ফ্রিজে রেখে সংরক্ষণ করলে প্রাণীদেহের অংশের চেহারা এমন হতে পারে। নখের গোড়া হাল্কা কালো হয়ে এসেছে। বাম হাতের তর্জনী ওটা। সম্ভবতঃ একজন মহিলার। ২. ‘অ্যানথনি বাউচারের নাম শুনেছেন?’, মিটিমিটি হাসছে এখন মোনালিসা। কাঁধ ঝাঁকালেন ডক্টর, ‘কস্মিনকালেও না।’ ‘শোনাটা উচিত ছিল। যাই হোক, সময় পেরিয়ে যায় নি আপনার এখনও।’ পকেট থেকে টিস্যু বের করে শার্টের কাছে চায়ের দাগের ওপর বৃথাই ঘষলেন ডক্টর মাহবুবুর রহমান। দাগ ওঠানো গেলো না। বাইরের বৃষ্টির পানির গতিপথ ঠিক রেখেই হাতের টিস্যুটিকেও ছুঁড়ে মারেন তিনি। মোনালিসা নীরবে দেখলো কাজটা। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। ‘আমার প্রতি আগ্রহ সরিয়ে রাখার চেষ্টা কেন করছেন, ডক্টর? স্বীকার করুন, প্রশ্ন জমেছে আপনার মাথাতে, অনেকগুলোই।’ মাথা নাড়লেন মাহবুবুর রহমান, ‘আমার মনে হয়, আপনার কাছে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আছে। আমার মনে কোন প্রশ্ন জমে নি, তবুও আপনার অবচেতন মন চাইছে আমি একটা বা দুটো প্রশ্ন আপনাকে করি। তবে প্রশ্ন আমি করতে যাচ্ছি না। আপনার কাছে যে সব প্রশ্নের উত্তর আছে তা আপনি বলতে পারেন। সে সুযোগটা দেওয়ার জন্যই আজকে লাঞ্চ পার্টির ব্যবস্থা করেছি এ বাসাতে।’ মোনালিসার মুখটা রাগে একটু কুঁচকে যায়, ‘আপনাকে বলা লাগছে না। আপনার মনে কি কি প্রশ্ন ধাক্কা দিচ্ছে বার বার – সেটা আমি নিজেই বলে দিতে পারি।’ মুচকি হেসে সম্মত হয়ে যান ডক্টর মাহবুব, ‘বলুন তাহলে।’ ‘আমি আমার মাকে কেন খুন করেছি? এর আগেও এরকম কাওকে খুন করেছি কি না? আমার মা কি অপরাধ করেছিল? অ্যানথনি বাউচার কে? আপনার কাছে আমি এসেছি কেন? আপনাকে সবকিছু নির্দ্বিধাতে খুলে বলছিই বা কেন?’ আঙুল মটকালেন ডক্টর, ‘যদি আপনার মনে হয় এসব প্রশ্নের জবাব আপনার কাছে আছে, তাহলে বলে ফেলুন। অনেকগুলো কেন, কে এবং কি – আপনার লিস্টে।’ বৃষ্টি এখন আরও জোরে পড়ছে বাইরে। মোনালিসা এক নজর ওদিকে তাকিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফেলে। ‘সিগারেট ধরালে আপনি মনে কিছু করবেন?’ মাথা নাড়েন মাহবুব, ‘মোটেও না। ধূমপানের উপযোগী আজকের আবহাওয়াটা।’ ব্যাগ থেকে ছোট আকারের একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে আনে মেয়েটা। আগুন ধরিয়ে ফেলে কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই। এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘অ্যানথনি বাউচার সম্পর্কে আপনার জানার কথা না। মানুষটা ছিলেন একজন লেখক। তাঁর লেখা উপন্যাস “নাইন টাইমস নাইন” ছিল নাইনথ বেস্ট ‘লকড রুম মিস্ট্রি’। যে কোন সময়ের জন্য। এই লোকটার জন্যই আমার মাকে জবাই করেছি আমি।’ ধীরে সুস্থে নিজের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করেন ডক্টর মাহবুবও, ‘নাইন টাইমস নাইনে কি নিজের মাকে হত্যা করা কোন তরুণির চরিত্র আছে?’ ‘না, স্যার। বাউচার পরিবার অভিশপ্ত। কাজটা আমাকে করতেই হত। আর এজন্যই আমার মনে কোন অপরাধবোধ আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। আমি কোন সমস্যাতেও নেই।’ ফিক করে হেসে ফেললেন এবার ডক্টর মাহবুবুর রহমান, ‘অভিশাপের কথা শুনিয়ে প্লিজ আমার সময় আর নষ্ট করবেন না। আপনি এর চেয়ে আমাকে বলুন, মায়ের ওপর ক্ষোভ জন্মাবার কারণ কি? আপনার বাবা এখন কোথায়?’ গোলাপী গালগুলো থেকে কপাল বেয়ে এসে পড়া চুল সরায় মোনালিসা, ‘বাবা … আমার বাবা কে আমি জানি না।’ ‘চমৎকার। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম নিজেকে অ্যানথনি বাউচারের বংশধর বলে দাবি করবেন আপনি।’ ‘দাবি করার সময় এখনও শেষ হয়ে যায় নি।’, শান্ত কণ্ঠেই বলে মেয়েটা। ‘অ্যানথনি বাউচার সাহেবের নাম আপনি শুধু শুধু তোলেন নি – ইনার ঘটনাটি কি বলবেন? অভিশাপটিই বা ইনি কুড়োলেন কি করে?’ ডক্টর মাহবুবকে একটা তীরের মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেয় মোনালিসা, ‘এই মাত্র বলেছিলেন অভিশাপ নিয়ে আপনার আগ্রহ নেই।’ ‘কিন্তু আপনার আছে। আপনি আমার পেশেন্ট -’ ‘আমি আপনার পেশেন্ট নই। আমি আপনার কাছে এসেছি – কারণ আসতেই হত।’ রহস্যময় কথাটার মানে বুঝতে পারলেন না ডক্টর মাহবুব। কিন্তু এ নিয়ে আর কথা বাড়ান না তিনি। মোনালিসা কথা বলতে শুরু করেছে। ‘অ্যানথনি বাউচার – লোকটি ছিলেন একজন জিনিয়াস। দুর্দান্ত কিছু মিস্ট্রি নভেল লিখেছেন তিনি। সেই সাথে সম্পাদনা করেছেন সায়েন্স ফিকশন। খেলাধুলোতেও তাঁর আগ্রহ ভালোই ছিল এবং এদিকেও বেশ ভালো করেছিলেন তিনি। তবে প্রতিবছর আগস্ট মাসে তিনি পাল্টে যেতেন – স্বাভাবিক বাউচার তিনি তখন থাকতেন না।’ ‘আগস্ট মাসে কি ছিল?’, চায়ের কাপে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে জানতে চান মাহবুব। মোনালিসা বুক ভরে ধোঁয়া টানে এবার, ধীরে ধীরে ওগুলোকে ঠোঁটের কোণ দিয়ে বের করে দিতে দিতে জবাবটা দেয়, ‘আগস্ট মাসেই অ্যানথনি বাউচারের জন্ম।’ ‘জন্মমাসে উৎফুল্ল হয়ে থাকে মানুষ সাধারণতঃ। ইনার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন?’ ‘কারণ, অ্যানথনি বাউচারের জন্ম হয়েছিল – একটা অভিশাপের মাধ্যমে।’ বিরক্ত লাগলেও চেপে যান ডক্টর মাহবুব, ‘কার অভিশাপ?’ সিগারেটে ঠোঁট চেপে ধরে মোনালিসা, ‘লিওনার্ডো দ্য ভিঞ্চির। বাউচারের জন্ম হয়েছিলো নির্ধারিত সময়ের আগেই। এক সপ্তাহ আগে।’ ‘তো?’ ‘লিওনার্ডো দ্য ভিঞ্চির সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি মোনালিসা। আর এই ছবি কেউ চুরি করার দুঃসাহস দেখালে কি হবে সেটা আর্টিস্ট জীবদ্দশাতেই বলে গেছেন। সেদিনই জন্ম নেবে একজন অকাল-জন্ম-শিশু। চোরের বংশ একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে – কয়েকশ বছরে। এবং আসলেই একদিন মোনালিসা চুরি হয়ে গেলো।’ সাথে সাথে কথা কেড়ে নিলেন ডক্টর মাহবুবুর রহমান, ‘ভিনসেনজো পেরুজ্জিয়া হল সেই চোর। ইতালীয় সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য সে চুরিটা করেছিলো। তার বংশ নিরাপদ আছে বলেই আমার বিশ্বাস। সবচেয়ে বড় কথা – ভিঞ্চি অভিশাপ দিয়েছিলেন বলেও শুনিনি কোথাও।’ মাথা নাড়ে মোনালিসা আলতো করে, ‘পেরুজ্জিয়া ছবি চুরির ইচ্ছে করেন নি। কাজেই অভিশাপ তার ওপর খাটে না। চুরির ব্যাপারে একবারই অ্যাপ্রোচ নেওয়া হয়েছিলো – আর সেটা নিয়েছিলেন বাউচার পরিবারের একজন।’ ‘অভিশাপ অ্যানথনি বাউচারের গায়ে কেন লাগল তাহলে?’, অবাক হয়ে জানতে চান ডক্টর। ‘কারণ, মোনালিসা চুরি হয়েছিলো যেদিন সেদিনই জন্ম হয় বাউচারের। স্বাভাবিক সময়ের আগেই। ২১শে আগস্ট, ১৯১১ সালে।’ ৩. ‘সরাসরি চুরির অংশটা শোনাবেন আমাকে। বিষয়টা অস্পষ্ট হয়ে আছে এখনও।’, আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলেন ডক্টর মাহবুব। ‘সবাই কি জানে? সবাই জানে ল্যুভর মিউজিয়ামের কর্মচারী পেরুজ্জিয়া ভিঞ্চির ছবিটা চুরি করার জন্য ওয়ার্কিং আওয়ারেই ঢুকেছিল। ছবিটা সরিয়ে রেখেছিলো একটা ঝাড়ু রাখার ছোট ঘরে। তারপর কোটের আড়ালে নিয়ে বের হয়ে এসেছিলো সুযোগ বুঝে। ইতালীয় দেশপ্রেমিক পেরুজ্জিয়া নিজের জন্য কিছুই করে নি।’ ‘তাহলে ঘটনা এটা ছিল না? আরও কিছু আছে?’ নিঃশ্বাস ফেলে মোনালিসা, ‘শুধু হাতে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সাথেই ঝামেলার শেষ না। মোনালিসা চুরি হওয়া নিয়ে হই চই হয়েছিলো ভিন্ন কারণে। পুরো পোট্রেইটটাই উধাও হয়ে ছিল লম্বা একটা সময় ধরে। সেই সাথে একজন মানুষকে তারা সন্দেহের কাতারে ফেলে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছিলোঃ Police have clues to lost Mona-Lisa, এ হল আগস্ট ২৫ এর কথা। সাক্ষীরা বলেছিলো দীর্ঘদেহী, শক্তসমর্থ এক ব্যক্তিকে কম্বল জড়িয়ে একটা প্যানেল নিয়ে বেরিয়ে যেতে তারা দেখে।’ ‘সেটা কি অ্যানথনি বাউচারের পূর্বসূরিদের কেউ ছিল?’, মাঝপথে প্রশ্ন করা অনুচিত হলেও করে ফেললেন ডক্টর মাহবুব। ‘না। বরং পুলিশ হামলে পড়েছিলো অ্যাপোলিনেয়ারের পিছে। কবি মানুষ তিনি। চাপে পড়ে ঘটনার মাঝে জড়িয়ে ফেলেছিলেন এই সাসপেক্ট, তার নিজের বন্ধুকে।’ ‘বন্ধুটি?’ ‘পাবলো পিকাসো।’, মুচকি হাসে মোনালিসা, ‘পুলিশ ঠেসে প্রশ্ন করেছিল এই আর্টিস্টকেও। পরে অবশ্য ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু আসল চোরটি থেকে গেছে সব সময়ই ধরা ছোঁয়ার বাইরে।’ মুখ শক্ত হয়ে যায় ডক্টরের, ‘যদি পেরুজ্জিয়ার কাছে মোনালিসা থাকে – তাহলে আর কেউ কিভাবে চুরি করতে পারে সেটা?’ লাইটার জ্বালিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরায় এবার মেয়েটা, ‘পারে। নকল একটা ছবি নিয়েই ঢুকেছিল পেরুজ্জিয়া। তারপর দেওয়ালের আসল ছবিটা সরিয়ে শুধুই পেইংটিংটা ঝুলিয়ে দিয়েছিলো ও। এক পিস পার্চমেন্ট বেশি জায়গা দখল করে না – আসল ‘মোনালিসা’ নিয়ে কেটে পড়েছিলো ও। দেওয়ালে তখন ঝুলছে নকল পেইন্টিং।’ ‘অসম্ভব, আরেকজন পেইন্টার লুইস ব্যারুদ রিপোর্ট করেছিলেন – ‘মোনালিসা মিসিং’। কারণ, তিনি কোন ছবিই দেখতে পাননি। নকলটা দেখতে পেলে তো আর রিপোর্ট করার কিছু থাকতো না – চুরি হওয়ার কয়েক মাস পর হয়ত জানা যেত, আসল পেইন্টিং ওটা না।’ মাথা নাড়ে মোনালিসা, ‘নকল পেইন্টিংটা নিখাদ চুরি করার উদ্দেশ্যেই আরেকজন নিয়ে সটকে পড়েছিলেন যে। নকলটা দেখা যাবে কি করে?’ ‘একজন বাউচার?’ ‘অ্যানথনির বাবার কাজিন। বিসমার্ক বাউচার।’ মেয়েটি নিজে থেকেই কাপের মাঝে চা ঢেলে নেয়, চিনি নাড়তে নাড়তে চকচকে চোখ মেলে তাকায় ডক্টরের দিকে, ‘সেই থেকে অভিশপ্ত বাউচার ফ্যামিলি।’ আগেই বলা কথাটা আরেকবার বলেন ডক্টর, ‘ভিঞ্চি এমন অভিশাপ দিয়েছেন বলেই তো শুনি নি।’ ‘শোনার কথাও না। অভিশাপ যখন দিয়েছিলেন – তখন তিনি ছিলেন অর্ধ মাতাল। কাজেই কেউ গুরুত্ব দিয়ে এটাকে নেয় নি। হয়তো।’ ‘তাহলে, মনের উদ্দেশ্যটার ওপর নির্ভর করেছে অভিশাপ। পেরুজ্জিয়া পেইন্টিং সরালেও ভিঞ্চির আপত্তি তাতে ছিল না – কারণ কাজটা সে করেছে ইতালির জিনিস ইতালিতে ফিরিয়ে দিতে। অথচ বিসমার্ক বাউচারের কাওকেই কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল বলে মনে হয় না।’ সম্মতি সূচক মাথা দোলায় মেয়েটা। আর কিছু বলছে না দেখে পরের প্রশ্নটাও ডক্টরকেই করতে হয়, ‘তার সাথে আপনি আর আপনার মা ঢুকলেন কিভাবে?’ ‘১৯১১ সালের অভিশাপ কতটা কাজে লেগেছে জানার কথা তো আমার ছিল না। জেনেছিলাম নতুন ঘটনা থেকে।’, উত্তর না দিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে ঢুকে যায় মোনালিসা, ‘২০০৮ সালের সবচেয়ে আলোড়ন তোলা কেসগুলোর একটা ছিল কেইলী অ্যানথনির মৃত্যুর। ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে থাকতো মেয়েটা। মায়ের সাথে।’ ‘অ্যানথনি – বাউচার নয়? বংশ এক হওয়ার সেক্ষেত্রে কোন সম্ভাবনাই দেখি না। কোন এক অ্যানথনির মৃত্যুর সাথে বাউচারের ওপর অভিশাপ কিভাবে এসে বর্তাচ্ছে?’ ‘কেইলী অ্যানথনি মাত্র ২ বছরের বাচ্চা একটা মেয়ে, ডক্টর। মেয়েটির খুনী খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়ে উঠেছিল পুলিশ। তারপর আবিষ্কার করতে পারে ওরা সহজ আর স্বাভাবিক সত্যটা।’ ‘সেটা কি ছিল?’ ‘কেইলীকে খুন করেছে তার আপন মা। কেসী অ্যান্থনি। এই দুর্বৃত্ত মহিলাকে সাপোর্ট দিয়েছিলো জর্জ অ্যানথনি। কেসীর বাবা।’ প্রায় এক মিনিটের জন্য নীরব হয়ে যান এবার মাহবুবুর রহমান। অনেক প্রশ্ন আসলেই জমা হচ্ছে এখন মনের ভেতর। তবে ঘন ঘন প্রশ্ন না করে শুধু জানতে চাইলেন, ‘এক সেকেন্ড। কেসী যদি কেইলীর মা হয়ে থাকে – তাহলে অ্যানথনি টাইটলটা তাদের পারিবারিক টাইটল। কেসী অ্যানথনি যেহেতু জর্জ অ্যানথনির মেয়ে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কেসীর স্বামী প্রবরটি কোথায়? তার ফ্যামিলি নেইম না কেসী আর কেইলীর নামে লাগার কথা।’ থমথমে মুখে উত্তর দেয় মোনালিসা, ‘কেইলীর বাবা কে সেটা জানা যায় নি। পুলিশের ধারণা – আন ওয়ান্টেড চাইল্ড রাখতে না পেরে হত্যা করেছে কেসী নিজের মেয়েকে।’ ‘মেয়েটি মারা গেছিলো কবে?’, জানতে চান মাহবুব। ‘জানার উপায় নেই। কারণ, প্রথমত কেসী নিজের মেয়েকে নিখোঁজ বলতে যথেষ্ট দেরি করেছেন। তারপর লাশটা পাওয়া গেছে ডিসেম্বর ২০০৮ এ। কংকালটা বাকি ছিল।’ ‘পোস্ট মর্টেম?’ ‘তাদের ধারণা, কেইলী অ্যানথনি মারা গেছে আগস্ট মাসে। দিন নিশ্চিত করে বলতে পারে না।’ ‘আপনার ধারণা কি?’ ‘আগস্টের ২১ তারিখে কেসী অ্যানথনি নিজের মেয়েকে হত্যা করে। এটা আমার ধারণা নয়। আমি জানি এটাই হয়েছিলো।’, আস্তে করে দাঁত বের করে মেয়েটা, হাসছে। ‘কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন?’ নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে মোনালিসা, ‘দেড় মাস আগে কেসী অ্যানথনি আমাকে ফোন দিয়েছিলো। কেইলী কার সন্তান সে জানতো। কিন্তু কখনও প্রকাশ করে নি।’ ‘বাউচার?’ ‘ক্লাউস বাউচার। ২০০৪ এর সামারে প্রেম ছিল ক্লাউসের সাথে কেসীর। পরে একেবারেই উধাও হয়ে যায় ক্লাউস। তবে কেসী আর নিজের সন্তান থেকে দূরে থেকেও ভিঞ্চির অভিশাপ থেকে বাঁচতে পারে নি তার মেয়ে।’ ‘ক্লাউস জানতো?’, অবাক হয়ে গেলেন ডক্টর। ‘অফকোর্স। সেজন্যই নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছিলো সে, কেসীর সন্তান মানে বাউচার বংশের একজন। আর বাউচার বংশে গত একশ বছর ধরে একের পর এক অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে, স্যার। আপনি অভিশাপে বিশ্বাস না করতে পারেন – বাউচারদের করতে হয়।’ ‘ক্লাউস নিজেকে কেসী আর কেইলীর জীবন থেকে সরিয়ে ফেলার পর তাদের নামে বাউচার শব্দটা ওঠে নি। তবুও ভিঞ্চি আড়াল থেকে প্রতিশোধ নিয়ে গেছে। বাউচার রক্ত বয়ে যাচ্ছিল কেইলীর শরীরে – তাই তাকে হত্যা করতে ভিঞ্চি ব্যবহার করেছে তার মাকে।’ ‘আগেই বলেছিলাম, আমি একজন মানুষকে খেয়ে ফেলেছি। তবে সেটা আপনার সাথে দেখা করার মূল কারণ নয়। যেটা মূল কারণ সেটা আপনার সাথে মেইল বা চেম্বারে ডিসকাস করা যাবে না। ’ আঙুল মটকালেন ডক্টর আরেকবার, ‘মূল কারণ ছিল ঘটনাটুকু আমার সাথে শেয়ার করা। কিন্তু কিছু একটা বলেন নি এখনও আপনি আমাকে। কেসী অ্যানথনি আপনাকে কি বলেছে? আপনি কিভাবে বাউচার বংশের একজন? এবং, আপনার মাকে আপনি কেন খুন করেছেন? আপনার মা নিশ্চয় বাউচারদের একজন নয়?’ ‘অক্সফোর্ড।’, বিড় বিড় করে বলে মোনালিসা। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন ডক্টর। ‘অক্সফোর্ডে দেখা হয়েছিলো মার সাথে ক্লাউস বাউচারের। ১৯৮৯ সালের কথা। মা ওখান থেকে গ্রাজুয়েশনের পর আর ক্লাউসকে দেখেন নি। সেই সাথে অনুভব করেছিলেন – তিনি অন্তসত্বা।’ ‘আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আপনার মা। এবং বিশ বছর পর্যন্ত বেঁচে আছেন আপনি। এসব জানলেন কিভাবে?’ ‘কেসী জানিয়েছে আমাকে মার সাথে ক্লাউসের আগের প্রেমের সম্পর্কের কথা। ক্লাউস সামান্যই জানিয়েছিল। মায়ের নাম আর জাতীয়তাটুকু জানতো কেসী। বাংলাদেশে আমাকে খুঁজে সে বের করেছে।’ ‘নিজের মাকে হত্যা করলেন কেন?’, অবাক হন ডক্টর মাহবুব। মেয়েটির মাথাতে আসলেই বড় ধরনের সমস্যা আছে। প্যারানয়েড হয়ে বড় ধরনের ভুল সে করেছে। ‘বুঝতে পারছেন না এখনও?’, প্রায় গর্জে ওঠে মোনালিসা, ‘বাউচার রক্ত বইছে আমার শরীরে। আজ যদি আমি তাকে খুন না করি – কাল সে আমার গলা কাটতো! কেসী আমাকে বলেছে কি রকম ঘোরের মাঝে চলে গেছিলো সে নিজের সন্তানকে জবাই করার সময়। কেইলীকে খুব ভালোবাসত কেসী। কিন্তু পারে নি – ভিঞ্চির সাথে সে পারে নি।’ মোনালিসার চোখে এখন পানি। ডক্টর মাহবুবের খুব ইচ্ছে করে আলতো করে মেয়েটির চোখের পানি মুছিয়ে দিতে। কিন্তু পারলেন না। বাঁধা দিচ্ছে পনের বছরের বয়স ব্যবধান। ‘ভিঞ্চির আত্মা বাউচারদের পুরো পরিবারকে তাহলে নির্বংশ করে দিয়েছে। বাকি আছেন আপনি?’ ‘ক্লাউস বাউচারের ব্যাপারে জানি না। লোকটা বেঁচে আছে কি না কে জানে! কিন্তু কেসীর ফোনকল পাওয়ার পর আমি নিজেকে কেইলীর জায়গাতে দেখতে চাই নি। মা কিছু করার আগেই আমি স্টেপ নিয়েছি।’ সহানুভূতির সাথে মাথা দোলালেন ডক্টর মাহবুবুর রহমান। খুবই সতর্ক তিনি এখন। গালগল্পের আড়ালে তিনি বেশ বুঝতে পারছেন একজন ঠাণ্ডা মাথার খুনী এই মেয়ে। বৃষ্টির দিনে আটকে আছেন তিনি একজন ঠাণ্ডা মাথাতে খুন করতে জানা একটি মেয়ের সাথে! মেয়েটি শুধু খুন করেই ক্ষান্ত দেয় না – অনায়াসে রান্না করতে পারে মানুষের মাংস। তারপর অবলীলায় দাঁত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে পারে সেগুলো। পেছনে কাজ করছে বাউচার-অভিশাপ আর কেসী-ফোনকলের ভীতি। কি হতে পারে এর সমস্যা? সিজোফ্রেনিয়া? মাল্টি পার্সোনাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার? মেয়েটি নিজেকে মোনালিসা কেন বলে? তার আসল নাম কি? নিজের বাংলাদেশি পরিচয় ছাপিয়ে মাঝে মাঝে নিজেকে সে ক্লাউস-কন্যা মনে করছে না তো? ঘটনা যাই হোক – ‘সাবজেক্ট’ এক্সট্রিমলি ডেঞ্জারাস। ‘ফ্রিজে ভদকা আছে। খাঁটি জিনিস। চলবে নাকি?’, আচমকা দরাজ গলাতে প্রস্তাবটা দেন তিনি। চমকে উঠে তাকায় মোনালিসা। ‘ঘটনাগুলো খুবই ট্র্যাজিক। পূর্বপুরুষের দায় কেন আপনাকে বয়ে বেড়াতে হবে?’, সহমর্মী কণ্ঠে বলেন তিনি আবারও, ‘ভদকা এখানে কিছুটা উপকারে আসতে পারে।’ আলতো হেসে সম্মতি দেয় মেয়েটি। হাল্কা পায়ে হেঁটে বারান্দা থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। শেষবারের মত বাইরে তাকাতে দেখতে পান, বৃষ্টি থেমে গেলেও রাস্তা ভিজে চক চক করছে। ফ্রিজের দরজা খুলে রাশিয়ান বোতলটা এড়িয়ে পাশে ব্রেডের মাঝে মুখ গুঁজে থাকা ছুরিটা তুলে নিলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর মাহবুবুর রহমান। _ পরিশিষ্ট _ চুলোতে ফ্রাইং প্যান চট চট শব্দ করছে। সম্ভবতঃ তেলের মাঝে কয়েক ফোঁটা পানি ছিল ওতে। হাসিমুখে ওটার আঁচ বাড়িয়ে দিলেন ডক্টর মাহবুব। আজ রান্না হবে। স্পেশাল রান্না। একা থাকার আনন্দ এখানেই। কেউ খবরদারি করতে আসে না। কেউ আসবেও না। ইচ্ছেমত রান্না করতে পারবেন তিনি। স্বাদ খারাপ হলে কেউ বলবে না, ‘লবণ হয়েছে? এত হলুদ দেয় কেউ মাংসে? এতদিনেও তো রান্না কিছু শেখো নি দেখছি!’ কিচেন লাল করে পড়ে আছে সুন্দরী মেয়েটি। নাম মোনালিসা বলেছিলো ঠিকই – তবে ওই নামে নিজেকে পরিচয় দেওয়ার অধিকার এই মেয়ের নেই। বাউচার রক্ত বইছে তার শরীরে। চামড়া আগেই ছিলে রেখেছিলেন, এবার সাবধানে মেয়েটির বাম স্তন কেটে আলাদা করে ফেললেন ডক্টর। সীনার গোস্তের স্বাদ সব সময় বেশি হয়। কুচি কুচি করে কাটার সময় বার বার চর্বিতে হাত মাখামাখি হয়ে যাচ্ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি থামেন না। থামা তো যুক্তিতে খাটে না। এভিডেন্স লুকাতে হতই। খুন করে তো আর পার পেয়ে যাওয়া যাবে না। কাজেই শরীরটা লুকাতে হবে। নো বডি – নো ক্রাইম। তাই না? খুনটা কেন করেছিলেন – প্রশ্নটা বার বার খোঁচাতে থাকে ডক্টর মাহবুবুর রহমানকে। পরক্ষণেই মনে পড়ে যায় – বাউচারের রক্ত ছিল মেয়েটার শরীরে। পরের প্রশ্নটা নিজেকে স্তব্ধ করে দেয় আবারও, ‘বাউচারের রক্ত থাকলে মাহবুবুর রহমানের কি আসে যায়?’ প্রশ্নটার উত্তর তিনি এবার আর পেলেন না। তবে এজন্য কোন রকম অপরাধবোধ অবশ্য কাজ করে না তাঁর ভেতরে। কেউ একজন ওই প্রশ্নটার আধ খাপচা একটা উত্তর ঠিকই দিয়েছে এরই মাঝে। ‘ভিঞ্চি জানে।’ ক্রাইম গল্প রহস্য সাইকোলজিক্যাল সাসপেন্স
সন্তান Posted on May 25, 2023 কান চুলকানি পুলিশ উঠে দাঁড়ায় আমার ব্যাগের ওপর থেকে। বলে, ‘বাচ্চা দেখলাম না, স্যার।’ স্যার মাথা দোলালেন, ‘টাকাটা রেখে দাও। শিওর তো?’ দাঁত কেলায় সোহরাব, ‘ওই কাজে আমরা কোনকালে শিওর ছিলাম না, স্যার?’ Read More
ক্ষিধে Posted on July 3, 2022 ‘সরি আপনি ভুল করছেন।’ ভ্যাবাচেকা খেয়ে উঠে দাঁড়ায় তরুণ। ’আমার নাম আরিফ না। ’ Read More
পোয়েটিক জাস্টিস Posted on February 27, 2014November 13, 2022 ‘ওপরের লেভেলে লোক আছে নাকি আপনার?’ অবাক হয়ে জানতে চান রিজওয়ান সাহেব। ‘না।’ স্বীকার করেন সিরাজ সাহেব, ’তবে নিচের লেভেলে আছে!’ Read More