KP Imon

Words Crafted

রিপুচক্র

১.

সাদাতের ডানহাতের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো পলাশ। চোখের পাতা না নড়িয়ে এভাবে তাকিয়ে থাকা পলাশের জন্য বিরল। কখনোই সে নিজের দৃষ্টি একদিকে বেশিক্ষণের জন্য ধরে রাখতে পারে না। দীর্ঘদিন নিয়মিত ইয়াবা সেবনের ফলে তার দৃষ্টি সব সময় থাকে চঞ্চল। আড়ালে আবডালে পলাশকে এজন্য “ছুপা পলাশ” নামেও ডাকা হয়।

ছুপা পলাশের দৃষ্টি আজ থেমে গেছে। কয়েক সেকেন্ড তার উত্তরের আশায় তাকিয়ে থাকল সাদাতও। তবে নীরবতা ভাঙ্গে পলাশই, “কিভাবে হলো?”

রুমাল দিয়ে রক্তপাত বন্ধের বৃথা চেষ্টা করতে করতে উদাসী কণ্ঠে উত্তর দিলো সাদাত, “লামিয়া কামড়ে দিয়েছে।”

ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো পলাশ, “টিটেনাস শেষ কবে নিয়েছিলি?”

“দুই বছর আগে। কেন?” অবাকই হলো সাদাত।

“ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে কিন্তু।” জবাব দিলো পলাশ।

এবার নিঃশ্বাস ফেললো সাদাত, “লামিয়া কুকুর না।”

হাত নেড়ে ওর কথা উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করলো পলাশ, “কামড়ালো কেন?”

গুম হয়ে বসে থাকলো সাদাত। উত্তর দিলো না।

“লামিয়া যাকে তাকে কামড়ানোর মেয়ে না।” আবারও বললো পলাশ।

“তাই তো দেখলাম।” হতাশ ভঙ্গিতে বললো সাদাত, “আর কাওকে না কামড়ালেও আমাকে ঠিক ঠিক কামড়ে দিয়েছে।”

“করেছিলি কি?”

এবারও পলাশের প্রশ্ন না শোনার ভান করে এড়িয়ে গেল সাদাত। লামিয়া পলাশেরই খালাতো বোন। প্রশ্ন শোনার প্রশ্নও আসে না। তবে বিনা ব্যাখ্যায় পলাশকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার চেয়ে টাইটানিকের আইসবার্গ এড়ানোর প্রচেষ্টা বেশি সফল ছিলো। এক সুদীর্ঘ হাই তুলে প্রশ্নটাকে দমিয়ে দেওয়ার এক শেষ চেষ্টা করতে সাদাতকে অবশ্য দেখা যায়।

“কুকুরের মতো হা করে না থেকে ঘটনা খুলে বল্!” সাদাতকে উৎসাহ দিতে বললো পলাশ।

“আরে ওই যে!” এতটুকু থেকেই যেন সবটা বুঝে ফেলবে পলাশ।

“কোন যে?”

“প্রেমে পড়ার চেয়ে ঝামেলার কিছু নাই।”

ধীরে ধীরে মাথা দোলালো পলাশ। ঘটনা সে যেমনটা ভেবেছিলো, তেমনই ঘটতে যাচ্ছে। সাদাত-লামিয়ার প্রেমকাহিনী এলাকাতে বিখ্যাত। বিখ্যাত ঘটনাবলীর কিছু সাইড ইফেক্ট আছে। সাইড ইফেক্টের আবর্তনে পড়ে গেছে সাদাত। লামিয়া তাকে কামড়ে দিয়েছে।

“বুঝতে পেরেছি। আবারও মারামারি করে এসেছিস।” পলাশও একমত হল, “তবে এটা আমার প্রশ্নের উত্তর হল না। কি এমন করেছিলি যে মারামারি বাঁধলো? এটা ছিলো আমার প্রশ্ন।”

“ওই যে।”

“প্রেমের ঝামেলা?”

“হুঁ।”

“আগেও একবার বলেছিস। ঘটনা পরিষ্কার হয়নি। প্রেম করলে ঝগড়া কিছু হবেই। অযথা ভূমিকা দীর্ঘায়িত করছিস।”

“ভূমিকার কি হলো?” বিষণ্ন ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললো সাদাত, “প্রেমে পড়েছি। তাই লামিয়া রেগে গেছে।”

“প্রেমে পড়লে লামিয়া রাগবে কেন? ও কি তোকে ভালবাসে না?”

পলাশের চোখ এখন আগ্রহের আতিশয্যে জ্বল জ্বল করছে। যেন লামিয়া সাদাতকে ভাল না বাসলেই সে খুশি হয়! সন্দেহের দৃষ্টিতে পলাশের দিকে তাকালো সাদাত। বছর তিনেক আগে লামিয়ার সঙ্গে প্রেমের সূত্রপাত তার। তখন পলাশকে নিয়ে বাজারে গুজব ছিলো। বাজার মানে এলাকার একমাত্র ক্ষুদে বাজার। হাশেম চাচার চায়ের দোকানে রোজ বিকেলে আসর বসতো। সেখানে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটা ছিলো পলাশ-লামিয়ার। পলাশ নাকি তের বছর বয়সে লামিয়াকে বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলো। একবস্ত্রে ইলোপ। গন্তব্য ঢাকা শহর। নতুন সংসার, সুখ, ইত্যাদি। দিন দিন লামিয়া সুন্দর হচ্ছিলো দেখেই ওই গল্পের ঘন ঘন অবতারণা। চায়ের সাথে সিগারেটের ধোঁয়া মিশে একাকার, সেই সাথে একাকার হতো কৌতুক আর ঈর্ষা। 

কথাটা অবশ্য মিথ্যা না। পলাশও কোনদিন অস্বীকার করেনি। এ নিয়ে একবার পলাশের উপস্থিতিতে কথা হচ্ছিলো। ও শুধু বলেছিলো, “আরে ব্যাটা, রাজ্জাক-শাবানার ছায়াছবি দেখে আমার মাথা আউলা হয়ে গেছিলো। মাথা আউলা বুঝিস?”

সাদাত মাথা আউলা বুঝে। এই মুহূর্তে পলাশের মাথা ঠিক আছে। তারপরও তার চোখ জ্বল জ্বল করে উঠবে কেন? মুখে এসব কথা অবশ্য বলা গেল না। ছুপা পলাশের সাথে ইয়ার্কি চলে কম। ইয়ার-দোস্তদের জন্যও এ কথা প্রযোজ্য।

সুতরাং উদাস ভঙ্গিতে সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে সত্য কথাটাই বলে দিলো সাদাত, “প্রেমে তো পড়েছি ব্যাটা আরেক মাইয়ার।”

২.

তানিশা মেয়েটা এলাকাতে নতুন এসেছে। শহরের শেষ মাথার হলদে দোতলা বাড়িতে এসে উঠেছে তারা। বাবা রিটায়ার্ড কর্ণেল। সুতরাং নো ধানাই-পানাই। বাজারে নতুন গুজব এসেছে। কর্ণেল সাহেব নাকি বাড়ির লকারে বন্দুক রাখেন। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে এসে পরিবারের শহর পরিবর্তনের ঘটনার সঙ্গে লকারের বন্দুকের যোগাযোগ আছে। আগের শহরের জনৈক ছুপা সালমানের চোখ পড়েছিলো মেয়ের ওপর। কর্ণেল সাহেব গুড়ুম করে দিয়েছেন। আইনী ঝামেলা সামলাতে শহর পরিবর্তন।

গুড়ুম তত্ত্বে বিশ্বাস করতে পারেনি সাদাত। তার ধারণা এই ঘটনাটা ছড়িয়েছে লুচ্চা শফিক। লুচ্চা শফিকের নামের পেছনে লুচ্চা টাইটল এমনি লাগেনি। যথেষ্ট আস্থা আর দক্ষতা ধরে রেখে চারটি বছর ধরে টানা করে যাওয়া লুচ্চামির ফসল হিসেবে নামের পেছনে চিরস্থায়ী এক পদ বাগিয়েছে সে। গত তিন বছর ধরে আটকে আছে এইচএসসির ফাঁদে। একবার দিয়ে ফেল মেরেছে। এবার আবার দিবে। 

লুচ্চা শফিকের নজর থেকে তার ছোটবোন কেয়াও বেঁচেছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। শফিকের জনপ্রিয়তার পেছনে কারণটা সহজ। ছেলেটা ক্ষতিকর নয়। নজর দিয়েই ক্ষান্ত দেবে সে। কোনদিনও কাওকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। রূপসী কাওকে রাস্তাতে দেখলে সেকেন্ড দশেক তাকিয়ে থাকবে। তারপর বলবে, “পাছাটা জোস!”

শফিককে সন্দেহ করার পেছনে সাদাতের কারণটা যৌক্তিক। ছুপা পলাশ একবার তাকে পিটিয়েছিলো। পাছা থিওরি তখন সে কাজে লাগিয়েছিলো লামিয়া সম্পর্কে। পলাশের কানে উঠে গেছিলো অচিরেই। বাজারের সেই ইলোপ কাহিনী এর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকবে। তবে লামিয়ার যে অঙ্গ নিয়ে তার মহামূল্যবান মন্তব্য রেখেছিলো শফিক, একই অঙ্গে হকিস্টিক দিয়ে গোটা ছয়েক ঘা বসিয়ে দেওয়ার নজির পলাশ রেখেছিলো। কাজেই, আচমকা শহরের নতুন সুন্দরীর পুরোনো ইতিহাসের চরিত্র সালমানের পেছনে পরিচিত এক “ছুপা” টাইটল দেখা গেলে শফিককে সন্দেহ না করে উপায় থাকে না।

লুচ্চা শফিক গত সপ্তাহের প্রতিটি দিন নতুন মেয়েটিকে নিয়ে বয়ান ছাড়ছে শিডিউল ধরে। এসব বয়ান সব হাশেম চাচার দোকানে হচ্ছে না। বিভিন্ন জনপ্রিয় ভেন্যু ধরে ধরে বয়ানের শিডিউল ঠিক করছে সে। তার কোন এক ফাঁকেই ছুপা পলাশের ডুপ্লিকেট ক্যারেকটার ছুপা সালমানের কাহিনী পয়দা করে ফেলেছে সে।

তানিশাকে প্রথমবার সাদাত দেখেছিলো শহরের একমাত্র শপিং মলের সামনে। ফ্যাকাসে নীল জিন্সের সাথে গোলাপী ফতুয়া। গোলাপী রঙ দেখলেই ঘৃণায় মুখ বাঁকিয়ে যায় সাদাতের। গোলাপী আবার একট রঙ হলো নাকি? সেদিন অবশ্য তার মুখ বাঁকিয়ে যায়নি, হয়ে গেছিলো হা। মেয়েটার চুল তাকে পাগল করেছিলো, রেশমী আর কোকড়ার মাঝামাঝি কিছু। সাদাতের মনে হয়েছিলো এই ত্রিশ মিটার দূরে দাঁড়িয়েও ওই চুলের ঘ্রাণ পাচ্ছে সে। পোড় খাওয়া চেহারার এক প্রৌঢ় তাকে নিয়ে বের হয়ে আসছিলো। শপিং মলের সামনে রাখা সবুজ রঙের এক পাজেরোতে উঠে গেছিলো তারা।

নাকের সামনে দিয়ে পাজেরো চলে যাওয়ার পর সম্বিত ফিরে পেয়েছিলো ও। ততক্ষণে কাজ যা হওয়ার হয়ে গেছে। দুই লাফে হাশেম চাচার দোকানে এসে একটা সিগারেট কিনে নিয়েছিলো সাদাত। সিগারেটটা ধরেছে নতুন। নতুন সিগারেট ধরা তরুণের জীবনের প্রায় সব কিছুতেই সিগারেট ভাল ভূমিকা রাখে।

পরীক্ষায় বাঁশ খাওয়া থেকে শুরু করে কাজিনের বিয়েতে হাঁস খাওয়া, সবকিছুর পরই তাদের একটা সিগারেট ধরাতে হয়। এই আইনের বাইরে যেতে পারেনি সাদাতও। নিয়মিত টানছে। দিনে দুইবার করে লামিয়ার সঙ্গে লাগছেও তার।

সেদিন প্রথমবারের মতো সিগারেটে টান দিয়েছে, কোথা থেকে হেলেদুলে এসে উপস্থিত হলো লুচ্চা শফিক। লুচ্চা শফিক সাদাতের মত নতুন “খোড়” না। স্টিমারের মতো ধোঁয়া ছাড়ার জন্য এলাকাতে তার একটা আলাদা সম্মান আছে। একই বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকে দেখেই সাদাতের মনটা খারাপ হয়ে গেল। শফিক জীবনেও একটা সিগারেট কিনে খেয়েছে বলে শোনা যায়নি।

“আরে ছোটভাই!” অবাক হয়ে যাওয়ার ভান করতে করতে বললো লুচ্চা শফিক, “ভর দুপুরে বিড়ি ধরাইলা কি মনে করে? সর্বনাশ কইরা দিলা তো মিয়া।”

সর্বনাশের বৃত্তান্ত জানতে চাওয়ার ইচ্ছে শফিকের ছিলো না। এসব ঢঙের মানে তার জানা আছে। ধীরে ধীরে সিগারেট দখলের একটা প্রক্রিয়া শুরু করবে শফিক, এটা তারই সূচনা।

“বদর বদর কইরেন না তো, শফিক ভাই।” বিরক্ত মুখে বলে দিলো সাদাত, “স্কুল ছুটির সময় হয়ে গেছে। গিয়ে মেয়েদের পাছা দেখেন গা। এইখানে বদর বদর কইরেন না।”

লুচ্চা শফিকের চোয়াল ফাঁক হয়ে গেছে। সাদাতের মত জুনিয়র একটা ছেলে তার সাথে এমন ভাষাতে কথা বলবে এটা সে ভাবতেও পারেনি। অন্য কোন সময় হলে এখানেই একটা কেলেঙ্কারী হয়ে যেত। তবে সাদাতের সঙ্গে ছুপা পলাশের আত্মীয়তার সম্পর্ক তার জানা আছে। কষ্ট করে হলেও নিজের জ্বিহ্বা সংযত রাখলো সে।

“বউয়ের লগে ঝগড়া করে আসছো নাকি, মিয়া? মেজাজ এতো উঁচুতে ক্যান?” সরু চোখে জানতে চাইলো শফিক, “অবশ্য যে মাইয়ার সাথে সম্পর্ক করতে গেছো, ঝগড়াঝাঁটি তো কিছু লাগবোই। মাথা গরম ফ্যামিলি।”

পিচিক করে চায়ের দোকানের মাটিতে থুতু ফেললো লুচ্চা শফিক। আড়চোখে দূরে হেঁটে যাওয়ার একটা মেয়ের পেছনে তাকিয়ে নিলো। হাশেম চাচা অবশ্য ব্যাপারটা সমর্থন করতে পারলেন না। বললেন, “কতবার বলছি মিয়া, দোকানের ভিতরে থুতু ফেলবা না! আজকালকার পোলাপাইনরে এক কথা দশবার বললেও মনে রাখে না।”

হাশেম চাচার দিকে গরম চোখে তাকালো শফিক। হাশেম চাচাই বা কম যাবেন কেন? পাল্টা তাকিয়ে রইলেন তিনিও। চোখে  সাদাতের কাজ অবশ্য সাদাত করে যাচ্ছে। লুচ্চা শফিকের হাত বাঁচিয়ে যতটা সম্ভব সিগারেট টেনে নিচ্ছে সে। শেষ রক্ষা অবশ্য হল না। ধপ করে সাদাতের পাশে বসে পড়লো লুচ্চা শফিক, তারপর হাতটা আনমনে বাড়িয়ে দিলো, “দাও, বিড়িটা দাও। মন মেজাজ ভাল নাই।”

বিড়ি দেওয়ার ইচ্ছা সাদাতের ছিলো না। কাজেই আবারও জানতে চাইলো, “কি হইছে ভাই?”

“কেয়া প্রেম করতেছে।” উদাস হয়ে বললো শফিক।

“ফাটাফাটি খবর।” হাসিমুখে বললো সাদাত, সিগারেট টেনে নিলো আরেকবার, “আপনার বোনটা দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়ে গেল।”

নিজের বোন সম্পর্কে এমন মন্তব্য কোন বড় ভাইয়ের সামনে করাটা নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নের দাবিদার। তবে লুচ্চা শফিকের ব্যাপারটাই আলাদা। ক্লাস থ্রিতে থাকতে সে কেয়ার সঙ্গে যা করেছিলো, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করার মতো ঘটনা না। হাশেম চাচার দোকানে বসেই সে ঘটনা অবশ্য সে গর্বের সঙ্গে সবাইকে শুনিয়েছিলো।

কেয়ার বড় হয়ে যাওয়ার খবর দিয়ে লুচ্চা শফিককে বেশিক্ষণ প্রভাবিত করে রাখা গেল না। হাত বাড়িয়ে আবারও নড়াতে থাকলো সে, যেন অস্কার দোলানো হচ্ছে সামনে। বললো, “বিড়িটা জোস।”

চোখ কুঁচকে যায় সাদাতের। ঘটনা মনে হচ্ছে সিরিয়াস। লুচ্চা শফিক তার উক্তির প্যারোডি বানানোর মতো মানূষ না। এখন সেটাই ঘটছে। অর্থাৎ, প্রথমবারের মতো সে উদাসী হয়ে এসেছে। সাদাতকে জানতে চাইতেই হলো, “ঘটনা কি ভাই?”

সিগারেটটা একরকম কেড়েই নিলো শফিক, তারপর বললো, “কেয়ার বয়ফ্রেন্ডকে তুমিও চিনবা। হানিফ। বর্ষার ছোটভাই হানিফ। পাছাটা জোস।”

লুচ্চা শফিকের এই আরেক বিরল বৈশিষ্ট্য। যে কোন মানুষের পরিচয় তার কাছে এভাবেই জমানো থাকে। অনেকটা মোবাইলের সেভড কন্ট্যাক্টের মতো।

হানিফ, বর্ষার ছোটভাই। পাছাটা জোস।

তারেক, কৃষ্ণার বড়ভাই। পাছাটা জোস।

জামশেদ, কুলসুমের কাজিন। পাছাটা জোস।

ইত্যাদি ইত্যাদি।

সাদাত অবশ্য অন্য একটা কারণে থমকে গেছে। হানিফকে সে চেনে। টিঙটিঙে এক ছেলে। কেয়ার মতো দামাল মেয়েকে সে কিভাবে সামলাবে তা একটা প্রশ্ন হতে পারে। এ তো আর ক্লাস সেভেনের ইংলিশ প্রাইভেট টিউটরের বাড়িতে গিয়ে সহপাঠিনীর সঙ্গে প্রেম নয়। কলেজ ফার্স্ট ইয়ারের উদ্দাম প্রেম। হানিফ ছিবড়ে যাবে একেবারে!

“বলেন কী ভাই!” সিগারেট হারানোর দুঃখেই হোক আর খবরের প্রচণ্ডতায়, সাদাতের মুখ থেকে এটুকুই বের হলো।

“তুমি চিঙড়ির মতো দাঁপাচ্ছো কেন?” প্রচণ্ড বিরক্ত হলো লুচ্চা শফিক, “আসল খবরটাই তো বলিনি তোমাকে!”

“কোন হাসপাতালে?” দ্রুত উপসংহারে চলে এলো সাদাত।

“কোন হাসপাতালে মানে!”

“না কিছু না।” দ্রুত কথা গিলে ফেললো ও, “বলেন ভাই।”

“হানিফ কি বলেছে জানো?” গরগর করে উঠলো শফিক।

“কি ভাই?”

“আমি নাকি সুযোগ পেলেই কেয়ার পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকি! ভাবা যায়?”

মাথা চুলকালো সাদাত। ঘটনা পুরোপুরি অবিশ্বাসের উপায় কী? লুচ্চা শফিকের রেপুটেশন তল্লাটের সবারই জানা আছে। সেদিন মেথরপট্টির মর্জিনাকে দেখেছিলো শফিকের সামনে পড়ে যেতে। দ্রুততার সাথে কোমর তোয়ালে দিয়ে ঢেকে নিয়েছিলো সেদিন মর্জিনা। আর কেয়ার মতো আকর্ষণীয়া মেয়ে লুচ্চা শফিকের নাগাল থেকে ফস্কে যাবে?

মুখে অবশ্য বললো, “শালার সাহস তো কম না!”

“বোঝ একবার!” লাই পেয়ে মাথায় উঠে গেল শফিক, “শালা আমার বোনের সাথে প্রেম করে, আর সামান্য কিছু ব্যাপার চেপে যেতে পারে না!”

হাশেম চাচার কাছে আরেকটা সিগারেট চাইবে কি না তা মনস্থির করার চেষ্টা করছে তখন সাদাত। লুচ্চা শফিকের সঙ্গে বেশিক্ষণ বসার আগেই কান ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করে ওর।

“ঠিক করছিলাম আজ বিকালে শালাকে ক্যাচকা ধোলাই লাগাবো। তোমারেও ডাকতাম।”

লুচ্চা শফিকের কথা শুনে প্রমাদ গুণলো সাদাত। এর মধ্য আবার ওকে টানা কেন? কিন্তু তখনও শফিকের কথা শেষ হয়নি। বলে ফেললো, “শপিং মলে গিয়া মাথাটা কিছু ঠাণ্ডা হইলো। তানিশারে দেখলাম বাপের লগে ঘুরতাছে। টাইট জিন্স পড়ছে, মামা! চোখ ফেরানোর মতো না শালী! পাছাটা জোস!”

পিচিক করে চায়ের দোকানের মাটিতে থুতু ফেললো সাদাত।

৩.

তানিশার সঙ্গে প্রথমবার কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেল কেমিস্ট্রি ল্যাবের বাইরে। মেয়েটা মিশুক আছে। প্রথম তিন দিনের ক্লাস শেষে জুটিয়ে ফেলেছে একগাদা বান্ধবী। আর মেয়েগুলোও বেহায়ার মতো মিশছে ওর সাথে। যেন মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোনকে খুঁজে পাওয়া গেছে।

ব্যতিক্রম লামিয়া। ক্লাসের কোণে গুম হয়ে বসে ছিলো সে। সাদাত এখনও তানিশার ব্যাপারে কিছু বলেনি তাকে। তবে আড়চোখে প্রেমিকের দৃষ্টি ফেলা কোন ছেলেকে ধরে ফেলা কঠিন কিছু নয়। আজকে সাদাতের চোখের প্রেম লামিয়ার জন্য নয়।

“শালার মাল একটা। পুরাই মাল।” নিঃসঙ্কোচে ঘোষণা দিলো পলাশ। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে সে এখন।

“সরাসরি তাকাসনে। ধরা পড়ে যাবি।” সাবধান করে দিয়েছিলো সাদাত।

“ধরা পড়লেই বা! ওটাই তো ভাল হবে আরও। মাইয়া জানতে পারবে আমার চোখে সে আগেই পড়সিলো।”

“একই কারণে তোরে ছ্যাচড়া এক পোলা ছাড়া আর কোন কিছু ভাববে না সে।”

“আমাকে প্রেম শেখাতে আসবি না।” লাল চোখে বললো ছুপা পলাশ।

পলাশকে সেদিন প্রেম শেখাতে যায়নি সাদাত। তবে কেমিস্ট্রি ল্যাবের পর কলেজ গেটের দিকে এগুতে গিয়ে বাঁধাগ্রস্থ হয়েছিলো সে। দেখতে পাচ্ছিলো লুচ্চা শফিক দূরে একটা কিছু করছে। কাছাকাছি তানিশাকেও দেখা যায়। মসুরের ডাল তো কিছু কাল হয়েছেই। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতে হলো সাদাতকে।

কাছে পৌঁছতে লুচ্চা শফিকের গলা পরিষ্কারভাবে কানে এলো ওর। নিজের নাম্বার অত্যন্ত উৎসাহের সাথে দিচ্ছে সে। ততোধিক উৎসাহের সাথে চেয়ে বসেছে মেয়েটির নাম্বার। সেই সাথে কলেজে তার প্রভাব প্রতপত্তি কেমন তা খুব ভাল করে বুঝিয়ে বর্ণনা দিয়ে ছাড়ছে সে। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রতিপক্ষের বড় ভাইকেও হাসপাতালে পাঠায়নি কী সে? নিজে যে তিন বছরের সিনিয়র হয়েও একই ক্লাসে পড়ছে আজ, সে খবরটা তানিশার কাছে বেমালুম চেপে গেল মানুষটা। মনে মনে বেদম হাসলো সাদাত।

তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, “শফিক ভাই, টুর্নামেন্ট নিয়ে একটা কথা ছিলো।”

অচিরেই হতে যাচ্ছে আন্তঃকলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। তাতে কোন দায়িত্বই লুচ্চা শফিককে দেওয়া হয়নি। সে দলের একজন ডানহাতি স্পিনার। আর কিছু নয়। অথচ এই মুহূর্তে তাকে দেখে সে কথা কে বলবে?

সবগুলো দাঁত বের করে তানিশার দিকে তাকালো সে, “আরে আমরা পরে কথা বলবো, ঠিক আছে? জরুরী একটা আলাপ সাইরা লই। বোঝই তো, আমাকে ছাড়া একদম চলতে পারে না পোলাপাইন, হেহে।”

ব্যস্ততার ভঙ্গিতে করে সাদাতের দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই তাকে একটু আড়ালে নিয়ে গেল সে। তারপর , বললো, “মাহতাব স্যার তো বললো আপনাকে ইমিডিয়েটলি ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। স্পিনার নিয়ে কি একটা ঝামেলা যেন হয়েছে। স্কোয়াড চেঞ্জ হবে খুব সম্ভব।”

দলে স্পিনার রাখার সিদ্ধান্তই হয়েছে একজন। তার ওপর স্কোয়াড স্পিনারের জন্য চেঞ্জ হলে লুচ্চা শফিক দল থেকে বিতারিত হবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই বলা চলে। নিমেষেই তার মাথা থেকে তানিশার কথা চলে গেল। হন্তদন্ত হয়ে বিল্ডিংয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সাদাত গেটের দিকে হাঁটা দিলো আনমনে।

রাস্তাতেই ওভারটেক করা হলো তানিশাকে, তবে ব্যাপারটা যে ইচ্ছাকৃত তা তো আর মেয়েটির জানার কথা নয়। লুচ্চা শফিক কানের যথেষ্ট দূরে চলে গেছে। নরোম গলায় ডাকলো তানিশা, “হ্যালো?”

ফিরে তাকালো সাদাত, “আমাকে কিছু বললে?”

“থ্যাংকস।” ছোট করে বললো সে।

“আরে ও কিছু না। ওইটা শফিক ভাই। ফাঁপড়ে বস। মেয়েদের সাথে উনার এই রেপুটেশন আছে…”

“রেপুটেশন?”

সাদাত আবিষ্কার করলো, চমকে গেলে এই মেয়েকে সুন্দর লাগে। বিস্ময়ে সামান্য হা হয়ে যাওয়া সাধারণ কিশোরীর সৌন্দর্য্য নয়, এখানে আরও কিছু আছে। অপার্থিব কিছু। তানিশার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন একসাথে চমকে উঠেছে। এমনকী চুলও। যেন পুকুরের ঠিক মাঝখানে আছড়ে পড়েছে উল্কাপিণ্ড। নারীর এমন রূপ সাদাত আগে কখনও দেখেনি। লামিয়ার কথা উল্কার বেগেই মাথা থেকে বেরিয়ে গেল তার।

চমকে ওঠার উপযুক্ত কারণও অবশ্য তানিশার ছিলো। রেপুটেশনের মানে সবাই জানে। জাহাঙ্গীরনগরের এক পরাক্রমশালী ছাত্রনেতার ১০০ মেয়ে ধর্ষণের পর কেক কাটার খবর সবাই পড়েছে।

সচকিত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অভয়ের হাসি হাসলো সাদাত, “যা ভাবছো তেমনটা না। তিনি কাণ্ড ঘটান না কোন।”

“তাহলে তো ভালই।” হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো তানিশা, “রেপুটেশনের প্রসঙ্গ এলো কেন তাহলে?”

“ওহ… ওটা…” বলবে কি না তা নিয়ে দ্বিধায় ভুগলো সাদাত, তারপর বলেই ফেললো, “আসলে, উনি মেয়েদের পাছা দেখে বেড়ান।”

এবার তানিশা হা হয়ে গেছে। বিস্মাভূত তরুণীর অপরূপ রূপ। ঠিক যতটুকু রূপ ঠিকরে বের হলে এক গোবেচারা ছেলেও তার চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য হাত তুলতে পারে, ততটাই। সাদাত হাত তুলেও ফেলেছিলো, তানিশার পরের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার নামিয়ে ফেলে অবশ্য।

“কী!”

“মানে, উনি মেয়েদের…”

“হয়েছে, থাক!” দ্রুত বললো তানিশা, “আমি বুঝেছি।”

“সরি।”

এখনও হাঁটছে ওরা, তার মধ্যেই কয়েকবার সাদাতের দিকে তাকালো তানিশা। তবে ঘুরে তাকায় না সাদাত, ক্ষমাপ্রার্থনা ব্যাখ্যার কোন ইচ্ছে তার মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে না। দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে মনোযোগের সাথে হাঁটছে গেটের দিকে। বের হবে ওরা।

“সরি কেন?” অবশেষে মুখ ফুটে জানতে চাইলো ও।

“আরে, সব কথা শুনতে নেই।” মাথা নেড়ে বললো সাদাত। “বাদ দাও।”

সবুজ পাজেরো চলে এসেছে। সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিলো সাদাত।

মেয়েটার মাথায় যথেষ্ট মশলা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। লুচ্চা শফিকের কপালে এবার খারাপী আছে।

৪.

তানিশার সঙ্গে বিকেলে বের হওয়ার ফন্দীটা কাজে লাগাতে সাদাতের অপেক্ষা করতে হলো দুই সপ্তাহ। ঝাড়া দুই সপ্তাহ অপেক্ষার ইচ্ছে ওর ছিলো না। তবে তানিশা মেয়েটা পিচ্ছিল আছে। প্রতিদিন বিকেলে বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ক্রিকেট খেলা দেখবে, ওপর থেকে হাতও নাড়াবে সাদাতের দিকে লক্ষ্য করে, কিন্তু নিচে নামবে না। ভেতরে ডাকার তো প্রশ্নই আসে না।

এমনটা ঘটবে তা অবশ্য আগেই অনুমেয় ছিলো। শেষ যে ছেলেটা তানিশাদের বাড়িতে ডুকেছিলো, তার নাম ছুপা সালমান। একদম গুড়ুম করে দেওয়া হয়েছে তাকে। খুপড়ি উড়ে গেছে। সাদাতের খুপড়ি সংখ্যা এক। এক খুপড়ি নিয়ে তানিশাদের বাড়িতে ঢোকা চলে না।

সাদাত সময়টা কাজে লাগিয়েছে বেশ। কয়েকবারই কথা হয়েছে তার সাথে তানিশার। প্রতিবারই বোমা ফাটিয়ে দিয়েছে। স্ট্রেটকাট কথা বলা ছাড়া মেয়ে পটানোর আর কোন অস্ত্র সাদাতের ছিলো না কখনও। লামিয়া ওর প্রেমেও পড়েছিলো স্ট্রেটকাট কথার ধাক্কায়। ও জানে, তানিশাও পড়বে। এই মুহূর্তে লামিয়া নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা তার নেই। জগত জুড়ে আছে তানিশা। শেষ তিনদিন লামিয়ার সাথে ঘুরতেও যায়নি। ফোনে বাজে ব্যবহার করেছে। তারপর লামিয়ার কান্না শুনে শুধু বলেছে, “মেয়েমানুষের মত ফোঁত ফোঁত করবা না।”

তানিশা মাঝে মাঝে বিকেলে সাইকেল নিয়ে বের হয়। সপ্তাহে দুইদিনের বেশি না। ক্যাচ মিস করে সাদাত তানিশার পা দেখে। লুচ্চা শফিক বলে, “শালা গাণ্ডু! এমন ক্যাচ মিস করে কেউ?”

তবে ব্যাপারগুলো লুচ্চা শফিক বোঝে না তেমন নয়। নিতম্ব দর্শনের জন্য নতুন মেয়ে সে খুঁজে নিয়েছে। শুধু বোঝেনি ছুপা পলাশ। পলাশের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার মতো সাহস সাদাতের ছিলো না। একে তো লামিয়ার ভাই, তার ওপর লামিয়া-তানিশা দুটোর ওপরেই ক্রাশ খেয়ে বসে থাকা আরেক মানুষ ওই পলাশ। তাকে সব খুলে বললে পানি যে কোথা থেকে কোথায় গড়াবে তা কে জানে?

কাজেই অগ্রগতি চালাতে হচ্ছে সাদাতকে, তবে পলাশ থাকছে অন্ধকারে। রাতের বেলায় ওরা মাঝে মাঝে টঙে এসে দেখা করে। টাকা পয়সার কমতি যাচ্ছে দুইজনেরই। একটা সিগারেট ভাগ করে খাওয়ার সময় পলাশ সাদাতকে প্রায় কিছুই দেয় না। ফোঁস ফাঁস দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুই অবিবাহিত তরুণ।

তানিশার সঙ্গে প্রথম ব্রেকথ্রুটা ঘটে গেল এক সোমবারে। যথারীতি কলেজে এসেছে সাদাত। দূর থেকেই দেখা গেল লুচ্চা শফিক পেছনের বেঞ্চ থেকে তাকিয়ে আছে আড্ডারত তিন মেয়ের দিকে। ধ্যানের ভঙ্গিতে দুলছে মাথা। সাদাত পরিষ্কার বুঝতে পারলো, বন্যার নিতম্ব লক-ডাউনে এনেছে শফিক। সাদাতের দিকে তাকিয়ে একবার তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে গোল করে বোঝালো, “জোস!”

তেতো মুখ নিয়ে শফিকের দুই বেঞ্চ সামনে গিয়ে বসে পড়লো সাদাত। মোবাইল কিছুক্ষণ গুঁতোগুতি করলো। মন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। সামনে থেকে লামিয়া বার বার রিপ্লাই দিচ্ছে। তাকে হুঁ-হাঁ করে পাশ কাটানো যাচ্ছে না। তোমার কি হয়েছে? তুমি আমাকে ইগনোর করছো কেন? ভালবাসো না আর আমাকে? ইত্যাদি ইত্যাদি রাজ্যের বালছাল। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গেল সাদাতের।

পেছন থেকে কেউ মাথায় টোকা দিতেই দ্রুত ঘুরে তাকালো ও, মুখের আগায় চ-বর্গীয় এক গালি এসে গেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তবে গালিটা ঝাড়া গেল না।

পেছনে উজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছে তানিশা। পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছে ক্লাসে। বললো, “প্রেম হচ্ছে? আজকে ক্লাসে পর থাকিস তো একটু।”

প্রেম যে হচ্ছে না, সেটা বোঝানোর জন্য বিস্তৃত এক হাসি উপহার দিলো সাদাত। সামনের বেঞ্চ থেকে কটমট করে তাকিয়ে আছে লামিয়া। তার দিকে তাকিয়ে পিত্তি জ্বালানো হাসি দিলো তানিশা। লামিয়া-সাদাতের প্রেমের কথা সে জানে। তবে থোরাই পরোয়া করে। সাদাতের সঙ্গে তার কোন বিশেষ সম্পর্ক নেই। পরোয়া করার মানে হয় না। লামিয়া অবশ্য ডালের রঙ যে কালো হয়েছে তা বুঝতে পেরে গেছে।

তানিশা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, রীতিমতো আঁতকে উঠলো লুচ্চা শফিক।

তার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জানতে চাইলো সাদাত, “কি হলো, ব্রাদার?”

শফিক এবার কিছু বললো না। কটমট করে সে-ও তাকালো সাদাতের দিকে।

একটা উলের জ্যাকেট উল্টো করে কোমরে বেঁধে রেখেছে তানিশা। দেখাচ্ছে একদম টম বয়ের মতো। লুচ্চা শফিক বিড়বিড় করে কিছু একটা বললো। পাত্তাই দিলো না সাদাত।

নিজের মন্তব্য জানিয়ে শুধু বললো, “জ্যাকেটটা জোস!”

**

কলেজ ছুটির পর নিজে থেকেই এগিয়ে আসলো তানিশা। বিল্ডিং থেকে মেইনগেটের দূরত্বটুকু পার হতে হতেই কথা যা হওয়ার হয় ওদের মধ্যে। আজকে তানিশাকে স্বপ্রতিভ দেখাচ্ছে। সাদাতের ডানহাতের কনুইয়ের কাছে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে সে। কলেজের ছেলেরা ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকাচ্ছে। মেয়েরা বিরক্তিতে কুঁচকাচ্ছে নাক। ভাগ্যিস আশেপাশে লামিয়া ছিলো না। শেষ ক্লাসটা না করেই মন খারাপ করে বের হয়ে গেছে সে। সাদাতের সাথে ছুটির পর ঘুরতে যেতে চেয়েছিলো। সাদাত বলেছিলো, “মেয়েমানুষের মতো খালি ‘ঘুরতে যাবো-ঘুরতে যাবো’ করবা না।”

গেটের কাছে এসে তানিশা ওর কনুই ছেড়ে দিলো। মেয়েটার মনে কি চলছে বোঝা দায়। এগিয়ে যাওয়ার কোন ইঙ্গিত সে দেয়নি। সম্ভবতঃ “ঝুলিয়ে রাখা” হয়েছে সাদাতকে। ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট। সাদাত কিছু মনে করছে না। তানিশার কাছাকাছি থাকতে পারলেই সে খুশি। কোকড়া-রেশমি ওই চুলের পরশ মাঝে মাঝে গালে পেলেই তার চলে যাবে। লামিয়া নরকের অনন্ত আগুনে জ্বলে মরুক। কোন আক্কেলে যে ওই মেয়ের সাথে প্রেম করতে গেছিলো সে!

তানিশার সঙ্গে কথা বলার নমুনা মোটামুটি এরকম।

“দ্যাখ দ্যাখ, আম গাছে মুকূল ধরেছে।”

সাদাত জবাব দেবে, “আমের সিজনে আম ধরবে না তো কি লিচু ধরবে রে?”

“তাও ঠিক। এই আমগুলো কি কলেজ অথরিটি মেরে খেয়ে ফেলে?”

“সম্ভবতঃ। পেটুক শালারা।”

“ওই দ্যাখ, তরুর সাথে নতুন একটা ছেলে। খিক খিক খিক।”

“তাই তো দেখছি। শালী ভালোই ছেলে পটাচ্ছে।”

“আমাকে পটাবি তুই?”

“মানে কি?”

“কিছু না।”

সাদাত জানে এসবই তানিশার কাছে খেলা। সাদাতের ভেতরে তার জন্য দুর্বল কোন কোণ আছে, এটা সে জানে। সুবিধাটা পুরোদমে ব্যবহার করছে মেয়েটা। সাদাত জানে এই মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া চলবে না। সোজা খুপড়ি উড়ে যাবে। মেয়ে নিজেও ওড়াতে পারে সেটা।

সামনে তাকাতেই জমে যেতে হলো সাদাতকে।

সবুজ পাজেরোর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রিটায়ার্ড কর্ণেল। সরাসরি তাকিয়ে আছেন সাদাতের চোখের দিকে।

অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সাদাতের হাত ছেড়ে দিলো তানিশা। কর্ণেলের দৃষ্টি সেজন্য বিন্দুমাত্র নরোম হলো না।

মেঘগর্জনের সুরে বললেন, “ছেলে, গাড়িতে ওঠো!”

ছেলের হাঁটুতে তখন জোর নেই!

৫.

কখনও কখনও মনের গহীন থেকে সতর্কবার্তা শোনা যায়। “করো না, এই কাজ ভুলেও করো না!” তারপরও শুধুমাত্র এড়িয়ে যাওয়ার সৎসাহসের অভাবে ঠিক সে কাজটাই করা হয়ে যায়। যেমন এই মুহূর্তে কর্ণেলের ডাককে উপেক্ষা করতে সাদাত পারলো না। টুক করে গাড়ির ভেতরে বসে পড়লো। প্যাসেঞ্জারস সিটে। ড্রাইভ করছেন কর্ণেল স্বয়ং।

ভয়ে ভয়ে ভেতরটা একবার দেখে নিলো সাদাত। আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপস্থিতি স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিলো তার মনে। খুপড়ি নিয়ে আপাতত চিন্তার কিছু নেই দেখা যাচ্ছে। তবে ভদ্রলোকের মেজাজ খুব একটা প্রসন্ন বলেও মনে হচ্ছে না। বিষয়টা চিন্তাতে ফেলার মতো। তানিশা বসেছে পেছনের সিটে। রিয়ার ভিউ মিররে তার চেহারা ঠিক অ্যাঙ্গেলে আসছে না। আবার কর্ণেলের সামনেই তার মেয়ের দিকে ঘাড় ঘুররিয়ে তাকানো ঠিক হবে কি না সাদাত বুঝতে পারলো না।

“তানিশার ক্লাসেই পড়ো তুমি?” মেঘগর্জন শোনা গেল আবার।

“জ্বি।”

“বাবা কি করে?”

“শিপ… মানে শিপিং বিজনেস।” গলা খাকাড়ি দিয়ে বললো সাদাত।

তারপর আরও কিছুক্ষণ নীরবতা। গাড়ির ভেতরে কোন শব্দ নেই। সাদাতের আজ লুচ্চা শফিকের কথা বার বার মনে পড়ে। ও ব্যাটাকে তানিশার সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া গেলেই বোধহয় ভাল হতো। এখন জাঁদরেল এক কর্ণেলের সঙ্গে বসে থাকতে হতো লুচ্চা শফিককে। তার জায়গাতে বসে আছে সাদাত। সব বিপদ কেন যেন ভাল মানুষগুলোর সঙ্গেই ঘটে থাকে। খারাপ লোকেরা বেঁচে যায় দিব্যি।

“তানিশাকে ভালবাসো?”

এবার সাদাত ঢোক গিললো। বুড়ো বলে কি এসব? ছুপা সালমানকে কোনদিনও দেখেনি সাদাত, তবে আজ বেচারার জন্য বড় মায়া হলো তার।

“একটা প্রশ্ন করেছি তোমাকে। উত্তর দাও।”

“অ্যাঁ?”

“বাসো তাহলে! তা আমি তোমার চোখ দেখেই বুঝেছিলাম। দেখা হি পেহলি বার, ছোকড়া তোর আখে উয়ো পেয়ার।”

“জ্বি, জ্বি।” বিনয়ের অবতার ঘোষণা করলো।

“তানিশা, ওকে কি এখনও সত্যটা জানিয়েছো?” গরগর করে উঠলেন রিটায়ার্ড কর্ণেল।

বুকটা ধ্বক করে উঠলো সাদাতের। সত্যটা! এহেন সত্য কোনদিনই ভাল কিছু হয় না।

কি সত্য?

তানিশার সঙ্গে কর্ণেলের সম্পর্ক কি ভুল জানানো হয়েছে সবখানে? কর্ণেল আর তানিশা স্বামী-স্ত্রী নয় তো? এমনটা কিন্তু ঘটেছিলো শার্লকের সাথে। ওরা জানতো “বাস্কারভিলের” মিস্টার স্টেপলটন আর মিস স্টেপলটন ভাই-বোন। এলাকার সবাই তাই জানতো। তারপর তলা দিয়ে বের হলো কি? তারা আসলে জামাই-বউ। ঠ্যালাটা বোঝ!

“না, বাবা।” পেছনের সিট থেকে বললো তানিশা।

গলায় আর্দ্রতা।

তাও ভাল, সম্পর্কটা এখনও বাবা-মেয়ের আছে! হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সাদাত।

“কি সত্য?” সাহস করে জানতে চাইলো ও।

“হ্যাঁ, তানিশা, বলো বলো!” আবারও উৎসাহ দিলেন কর্ণেল।

“কি বলো, বাবা! প্লিজ!” তানিশার গলা আরও ভারী হয়ে এসেছে এখন।

বিব্রত বোধ করলো সাদাত। বিড়বিড় করে বললো, “থাক নাহয়।”

“থাকবে কেন? আরে থাকবে কেন! তানিশা, তুমি বলবে না আমি বলবো?” রিয়ার ভিউ দিয়ে মেয়ের দিকে কড়া করে নজর দিলেন তিনি।

“প্লিজ…”

তানিশা এবার সত্যি কেঁদে ফেললো। দুই গাল রাঙা হয়েছে। লজ্জা আর অপমান।

“আমি শুনতে চাইছি না, আংকেল। থ্যাংকস।” বললো সাদাত।

“শুনবে না মানে? অবশ্যই শুনবে।” গরগর করে উঠলেন তিনি, “তানিশার প্রিম্যাচিউর মেনোপজ ঘটেছে। এর অর্থ তুমি জানো, ছেলে?”

“জ্-জ্বী!” মেয়ের সম্পর্কে এমন অবলীলায় কথাটা বলে ফেলতে দেখে অবাক হয়ে গেল সাদাত।

তানিশা কোনদিনও মা হতে পারবে না!

সবজান্তার ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন রিটায়ার্ড কর্ণেল, “ইঁচরে পাকা ছেলেপেলে সব। এরপর আর কোনদিন তানিশার আশেপাশে তোমাকে দেখলে পাছার চামড়া তুলে ফেলবো। বোঝা গেলো?”

“জ্বি?”

“এরপর আর কোনদিন তানিশার আশেপাশে তোমাকে দেখলে পা-”

“জ্বি জ্বি।” দ্রুত বললো সাদাত। কার? এটা জানতে চাওয়ার সাহস তার আর নেই এখন।

তানিশাদের বাড়ির সামনে এসে থেমেছে সবুজ পাজেরো। আশা নিয়ে কর্ণেলের দিকে তাকালো সাদাত।

ভদ্রলোক শুধু বললেন, “গেট লস্ট।”

 ৬.

বাড়ি ফেরার পথে বাগানের দিকে চোখ পড়লো সাদাতের। পার্কটা ছোট। তার মধ্যে আছে সিমেন্টের চেয়ার। তার একটায় বসে আছে মেয়েটা। হলুদ রঙের জামা পরেছে। এদিকে পিঠ ফিরিয়ে রাখলেও মেয়েটিকে চিনতে ভুল হয়নি সাদাতের।

বাড়ির দিকে না এগিয়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল সে।

বড় বড় চোখ মেলে তার দিকে তাকায় সে, “তাই, না?”

“লামিয়া।” বিড়বিড় করে বললো সাদাত, আজকের দিনটায় কুফা লেগেছে, “এখানে কি করছো তুমি?”

জবাবটা এলো না। লামিয়ার চোখ ফুলে গেছে। মনে হচ্ছে কান্নাকাটি হয়েছে একটু আগে। এখন সেকেন্ড স্টেজ চলছে।

“তানিশার শরীর আমার চেয়ে ভাল।” মন্তব্য করার ভঙ্গিতে বললো লামিয়া।

প্রমাদ গুণলো সাদাত, “এসব কি হচ্ছে, লামিয়া?”

“চেহারাও।”

“আজব কথাবার্তা বলছো তুমি!”

“দুনিয়ার যে কেউ তোমাকে দেখলেই বলতে পারবে, শালীর প্রেমে পড়েছো তুমি। সেখানে আমি তোমাকে আর যে কারও থেকে ভাল চিনি।”

“এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে!” সাদাত নিজেই গলাতে জোর পেলো না।

“শাট আপ!”

লামিয়া কাঁদছে। লামিয়ার কান্না দেখতে সাদাতের বরাবরই সুন্দর লাগতো। ঠোঁট দুটো কিভাবে ফুলে যেত, তারপর পানি পড়তো চোখ থেকে মুক্তোর মতো। শুধু এই দৃশ্যটা দেখার জন্যই কতোবার মেয়েটিকে কাঁদিয়েছে সাদাত। তবে আজকে লামিয়ার কান্না দেখে তার কাছে সুন্দর কিছু মনে হলো না।

কুৎসিত!

অত্যন্ত কুৎসিত দেখায় মেয়েটি কাঁদলে।

অঝোরে কাঁদছে লামিয়া। এখনও। কাঁদতে কাঁদতেই কিছু একটা বললো সে। সাদাত ঠিক বুঝতে পারলো না।

“কী!”

“তুমি নাকি … তুমি নাকি প্রথমদিন ক্লাস শেষেই তানিশাকে বলেছো…”

“কি বলেছি?” অবাক হয়ে গেল সাদাত।

লামিয়ার কান্নার দমক বেড়ে গেল আরও, নিজের কথাটা শেষ করতে পারলো কোনমতে, “…ওর পাছাটা জোস!”

ধপ করে ওর পাশে বসে পড়লো সাদাত। তালগোল পাকিয়েছে সব। ভালোই পাকিয়েছে!

খবর রিলে করার মানুষটা কে হতে পারে? লুচ্চা শফিক ছাড়া আর কে হবে!

লামিয়াকে দেখে হঠাৎ মায়া হলো সাদাতের। মেয়েটা ভুল তথ্য পেয়ে মন খারাপ করেছে।

হাত বাড়িয়ে ওর চোখের পানি মুছে দিলো সাদাত।

মেয়েটার কান্না থেমে গেছে। দূরে কোথাও একটা কোকিল ডাকলো বলে মনে হলো সাদাতের।

ওর ডান হাতটা নিয়ে নিজের গাল ঠেকালো লামিয়া। নরোম একটা হাত।

পরমুহূর্তে বত্রিশটা দাঁত ঢুকে যাওয়ার তীক্ষ্ণ ব্যথা টের পেল সাদাত।

হাতের তালুতে খুব জোরে কামড়ে ধরেছে লামিয়া!

৭.

দুর্দিনেও সাদাতের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের হতে দেখে খুশিতে আজ ছুপা পলাশের মুখ উজ্জ্বল হলো না। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো, “আরেক মেয়ের মানে?”

ফস করে আগুন জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালো সাদাত, “তানিশা।”

চোখ কুঁচকে গেছে পলাশের, “ওই মাগির ঘরের মাগি?”

“হোয়াট? মুখ সামলে কথা বলবি, পলাশ!” ঝাঁ করে মাথাতে রক্ত উঠে গেল সাদাতের।

“তাতে করে কি ওর পরিচয়টা মিথ্যা হয়ে যাবে?” খুব অশ্লীলভাবে হাসলো পলাশ, “ওই ব্যাটা কর্ণেলের চরিত্র সুবিধার না।  তানিশার মাকে ফাটিয়ে দিয়েছিলো। মেয়েটা সিলেটের কোয়ার্টারে দুধ বিক্রি করতো। সু্যোগের সদ্ব্যবহার। তেজ তো দেখছিস লোকের। একদম ছিবড়ে বানিয়ে দিয়েছে ওই মাইয়াকে। এরপর দুধওয়ালী নাকি তিন মাস পা ফাঁক করে করে হেঁটেছে। নয় মাসের মাথায় বাচ্চা পয়দা সারা।”

সাদাতের পৃথিবীটা দুলে উঠলো হঠাৎ। পলাশ তার সাথে ট্রিকস খাটাচ্ছে? তানিশার দিকে তারও চোখে পড়েছে নাকি!

পলাশ কেন মিথ্যা বলতে যাবে!

“ছুপা সালমানের কাহিনী লুচ্চা শফিক বানায় কয় নাই।” বিষণ্ন কণ্ঠে বললো পলাশ, “সালমান নামে একজন ছিলো ঠিকই। তানিশাদের বাড়ি গিয়ে তার জন্ম পরিচয় সম্পর্কে যা-তা বলার পর কর্ণেল তার মাথায় গুলি করে।”

সাদাতের কান ভোঁ ভোঁ করছে। সিগারেটের ধোঁয়াগুলোকে আজ বড় বিষাক্ত মনে হচ্ছে তার।

“আমি ভাবছিলাম, সব লুচ্চা শফিকের বানোয়াট গল্প। সেজন্য সিলেটে খোঁজ লাগায়া দেখি কাহিনী সেই লেভেলের হিন্দী সিরিয়াল।”

“খুনের মামলায় ফাঁসলেন না যে কর্ণেল?” জানতে চাইলো সাদাত।

“হোম ডিফেন্স বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে ওটাকে। প্রোপার্টি তো কর্ণেলের। তাছাড়া সালমানের রেপুটেশন ভাল ছিলো না। অ্যাটেম্পট টু রেইপ বলতেই সব ঠাণ্ডা।”

“তানিশার মা…”

হাহা করে হাসলো আবারও পলাশ, “বললাম না, কর্ণেলের তেজ ছিলো। একদম ফাটিয়ে দিয়েছিলো মাগিকে। মেয়ে জন্মাইছিলো, সেই সাথে মারা গেছিলো মা। পিউর চোদন! জাউরা-চোদা…”

পলাশের হা হা করে হাসতে থাকা দেখে সাদাতের আজ যোগ দিতে ইচ্ছে হয় না তার সাথে। বরং ঘৃণায় তার শরীর রি রি করে ওঠে।

মুষ্ঠিবদ্ধ হাতটা পলাশের নাকে এসে আছড়ে পড়তেই হাড় ভাঙ্গার ভোঁতা শব্দটা শোনা যায়।

_ পরিশিষ্ট _

সবুজ পাজেরোর ড্রাইভিং সীটের দরজা সশব্দে লাগানো হলো। কর্ণেল আর তানিশা চলে যাচ্ছে।

কোথায়, তা কেউ জানে না। কর্ণেল জানাননি।

কর্ণেল চাননি তাঁদের গন্তব্য আর কেউ জানুক।

পেছনের সিটে বসে আছে তানিশা। তাকে দেখাচ্ছে ফুটফুটে এক পরীর মতো। মন-খারাপ-করা পরী।

সামান্য মাথা নিচু করে বসে আছে মেয়েটা। এখান থেকে পরিষ্কার দেখতে পায় সাদাত।

মেয়েটার মাথা ছুপা পলাশ নিচু করে দিয়েছে। এলাকার সবাই এখন জানে, তানিশার মা ছিলেন একজন দুধওয়ালী। যার সাথে কর্ণেলের অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক ছিলো। পথে, কলেজে, মার্কেটে, সবখানেই এখন তানিশার জন্মকাহিনী লেটেস্ট মুখরোচক ঘটনা। বিষয়টা মাটিতে পড়তে না দিয়ে সবাই এ নিয়ে আলাপে মগ্ন। তানিশাকে দেখলে এদের অনেকেই টিটকিরির হাসি হাসে।

তানিশার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু হয়ে গেছে সাদাতের। বিয়ে ছাড়াই মহিলার সঙ্গে কর্ণেলের প্রেমকে কেউ মেনে নিতে পারছে না দেখে সে বাকরুদ্ধ। সমাজের নিজস্ব নিয়ম এড়িয়ে গেলে সমাজ ভাল কিছুকেও প্রাপ্য সম্মান দেয় না। অমর্যাদার সঙ্গে ছুঁড়ে দেয় মাটিতে।

সমাজ মনে রাখেনি কর্ণেল ভদ্রলোকের নিষ্কলুস প্রেমকাহিনী। মনে রাখেনি প্রেমের টানে প্রেয়সীর মৃত্যুর পরও সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে না যাওয়া একজন সংগ্রামী মানুষকে। সমাজ বিয়েহীন এক যৌনসংস্রবকে মনে রেখেছে শুধু।

জানালা দিয়ে বাইরে থুতু ফেললো সাদাত। ঘৃণার ঘ্রাণ লেগে আছে সে থুতুতে।

তানিশার জন্মটা হয়তো পাপের সমীকরণের একপ্রান্তে।

হয়তো, জন্মের পরও সমীকরণ মেলেনি মেয়েটির, সৃষ্টিকর্তা কেড়ে নিয়েছেন তার সন্তান জন্মদান ক্ষমতা।

হয়তো লামিয়া এখনও তাকে প্রচণ্ড ভালবাসে!

সেজন্য তানিশাকে জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দিতে পারে না সাদাত।

লুচ্চা শফিকের গাড়িটা একদিনের জন্য ধার করে নিয়েছে ও।

আস্তে করে ইগনিশন কী ঘোরালো সাদাত। পিছু নিলো সবুজ পাজেরোর।

— ০ —-

** কিছু বাস্তব চরিত্র অবলম্বনে [শফিক, তানিশা, পলাশ, সাদাত। ছদ্মনাম।]

কিশোর পাশা ইমন

Website: http://kpwrites.link

১২টি ক্রাইম থৃলারের লেখক কিশোর পাশা ইমন রুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ছিলেন, এখন টেক্সাস ষ্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছেন মেকানিক্যাল অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বর্তমানে টেক্সাসের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ইউটি ডালাসে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডির ছাত্র। ছোটগল্প, চিত্রনাট্য, ও উপন্যাস লিখে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন। তার লেখা প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে। তার বইগুলো নিয়ে জানতে "প্রকাশিত বইসমূহ" মেনু ভিজিট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *