KP Imon

Words Crafted

খারাপ মেয়ে

মেয়েটার কাটা গলা থেকে এখনও দমকে দমকে রক্ত বের হচ্ছে।
ফর্সা গলাটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার পর ক্যানভাসে আঁকা অদ্ভুত এক ছবিটার মত মনে হতে থাকে দৃশ্যটাকে। একটু আগে বের হতে থাকা রক্তগুলো হাল্কা জমাট বেঁধে থকথকে একধরণের ঘন তরলে পরিণত হয়েছে, রঙ পাল্টে হয়ে গেছে কালচে লাল। নতুন রক্তগুলো টকটকে লাল রঙের তবে আগের মত জোর এখন আর নেই। হৃৎপিণ্ড আর পাম্প করছে না তরল জীবনীশক্তিগুলোকে।
মরার আগে দুর্বলভাবে বার কয়েক পা ছোঁড়ে মেয়েটা। গলা থেকে অদ্ভুত রকম একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
শেষ লাথিটা চেয়ারের ওপর পড়ল। আস্তে করে কাত হয়ে যায় ওটা প্রথমে। তারপর দড়াম করে মাটিতে পড়ে যায়।

সে শব্দ কানে ঢোকে না হতভাগা মেয়েটির। তার আগেই চোখ থেকে সরে গেছে প্রাণের সব লক্ষণ।

১.

‘কোন মতিনের কথা বলতেছ? গালকাটা মতিন?’ হতাশ একটা ভঙ্গীতে মাথা দোলাতে দোলাতে বলল রহমত মিয়া, ‘লোক খারাপ।’

চোরাই মালের কারবার যে লোক করে তার কাছ থেকে আরেকজনের ব্যাপারে ‘লোক খারাপ’ জাতীয় মন্তব্য শোনার পর সেটা হজম করতে সমস্যা হওয়ার কথা। তন্ময়েরও হজম হয় না। নাকের গোড়াটা হাল্কা কুঁচকে ওঠে বিরক্তিতে।
বিরক্তি প্রকাশ না করে হাল্কা মাথা দোলায় ও। চেহারা দুই সেকেন্ডের মাঝে স্বাভাবিক করে ফেলেছে।

‘মতিন ভাইকে পাওয়া যাবে কোথায় সেটা তাহলে বলতে পারছেন না, তাই তো?’ উঠে দাঁড়ায় তন্ময়, এই মানুষটাও লোক খারাপ। অযথা এখানে ঘুর ঘুর করার কোন মানে হতে পারে না।
পেছন থেকে রহমত মিয়ার কণ্ঠটা শুনে আবার থমকে দাঁড়াতে হয় ওকে, ‘চলে যাইতেছেন ভাই? সাবধানে থাইকেন।’
শুকনো গলাতে জানতে চায়, ‘কেন? সাবধানে কেন থাকতে হবে?’
‘নষ্টা মাইয়া নিয়ে মতিনের কারবার। হের লগে গ্যাঞ্জামে জড়াইয়েন না।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে রহমত মিয়ার ডেরা থেকে বের হয়ে আসে ও।
মতিনের কারবার যে দৃষ্টিতেই দেখুক সমাজের মানুষ, তার সাথে গ্যাঞ্জামে জড়ানোর কোন ইচ্ছে তন্ময়ের নেই। বরং অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে ওই লোকই গ্যাঞ্জামে জড়িয়ে পড়েছে। অস্বাভাবিক কিছু তো নয়।
লোক খারাপ।

বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশী বৃষ্টি এটা না। পুরো মেঘে মনে হয় মোটে এক চামচ পানি ছিলো। ওটাই গুঁড়ি গুঁড়ি করে ফেলা হচ্ছে এখন। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকলেও কান পর্যন্ত ভিজবে না।
মোবাইল ফোন বের করে অযথাই আরেকবার মতিন ভাইকে খোঁজার চেষ্টা করে ও। নাম্বার সেই আগের মতই বন্ধ।
রাস্তার পানি হাল্কা ছিটাতে ছিটাতে আসতে থাকা কালো গাড়িটা দেখে গত আধঘণ্টার মাঝে দ্বিতীয়বারের মত কুঁচকে যায় ওর ভ্রু। এখানে এই গাড়ি কেন?
আস্তে করে ওর পাশে থেমে যাওয়ার পর সাইড উইন্ডো ধীরে ধীরে নেমে যেতে থাকে। ইলোরার দিকে তাকিয়ে বোকার মত একটা হাসি দেওয়া ছাড়া ওর আর কিছুই করার থাকে না।

‘গাড়িতে উঠে পড়।’ পাল্টা হাসে না মেয়েটা, ‘কুইক।’

ভেজা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে গাড়িতে ওকে ওঠাই লাগে। ইলোরা অন্যপাশের জানালার দিকে পিছলে সরে যায়। এর মাঝেই একটা লিপসের প্যাকেট বের করে ফেলেছে। ফস করে আগুন ধরিয়ে ফেলে ও সিগারেটটাতে।
প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকে তন্ময় তাকিয়ে থাকলেও টু শব্দ বেরুলো না মেয়েটার মুখ থেকে। মনোযোগ দিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। সামনের ড্রাইভিং সীটে বসে থাকা মারুফ ভাইকেও রীতিমত শান্ত মনে হচ্ছে।

‘কিছু তো বলবি? কিছু তো হয়েছে বটেই। গাড়ি নিয়ে চলে আসতি না কিছু না হলে।’ নীরবতা অসহ্যকর মাত্রাতে চলে যাওয়ার আগেই সেটা ভেঙ্গে ফেলে তন্ময়।
‘তোর লিংক ধরে কিছু খুঁজে পাই নি।’ সোজাসাপ্টা বলে দেয় ইলোরা।
‘বিন্দু নামের একটা মেয়েকে পাওয়ার কথা ছিলো তোর। ভদ্রমহিলা কি ছিলেন না ওখানে?’
কটমট করে তাকায় ইলোরা, ‘ভদ্রমহিলা? প্রস্টিটিউটদের এখন থেকে এভাবেই ডাকা হবে নাকি?’
শক্ত মুখে সামনের দিকে তাকায় ও, ‘মারুফ ভাই, গাড়ি থামান। নেমে যাবো।’
হতচকিত মারুফ ভাই পেছনের দিকে তাকান সাথে সাথেই, ‘ম্যাম?’

‘ম্যাম’ খপ করে তন্ময়ের হাত চেপে ধরেছে ততক্ষণে। টানাটানি না করে আস্তে করে বলে ও, ‘হাত ছেড়ে দে। সব জেনেও যেভাবে কথা বলছিস – তাতে তোর সাথে কাজ করার রুচি হচ্ছে না আমার। জয়িতাকে আমি একাই খুঁজে বের করতে পারবো।’
‘মাথা গরম করিস না। ঘটনা প্যাঁচ খেয়ে গেছে অলরেডি। তোর কি মনে হয় মনের সুখে তোর এদিকে গাড়ি নিয়ে চলে এসেছি?’

মারুফ ভাই এখনও রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে পেছনের সীটের দিকে তাকিয়ে আছেন। থামবেন কি চালিয়ে যাবেন সেটা বুঝতে পারছেন না।
ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে তন্ময়। ইলোরার মুখের দিকে তাকায়, ‘কি ধরণের প্যাঁচ?’
‘তোর ঠিকানা অনুযায়ী ঠিকমতই গেছিলাম – হোটেলটায়– কিন্তু -’ কিছু একটা বলতে ইতস্ততঃ করে মেয়েটা।
অধৈর্যের মত চাপ দেয় ওকে তন্ময়, ‘রুম নম্বর ৩১৫। বিন্দুর একার থাকার কথা ছিল ওখানে। পাসনি তাকে?’
‘ইয়ে– মেয়েটা মারা গেছে রে।’

স্থির হয়ে যায় তন্ময় সাথে সাথে, ‘গতকালই ফোনে কথা বলেছি আমি ওর সাথে। দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক মনে হয়েছে -’
‘আজকে সকালে কেউ হোটেলের রুমেই জবাই করে ফেলে রেখে গেছে ওকে।’ ফিস ফিস করে বলে ইলোরা, ‘আমরা গিয়ে গলাকাটা লাশটা ছাড়া আর কিছুই পাই নি।’
‘হোয়াট?’
‘তুই মতিন ভাইকে খুঁজে পাচ্ছিস না গতকাল থেকে। আর আজকে জয়িতাকে চেনে এমন একমাত্র মানুষটা খুন হয়ে গেল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছিস?’

বাইরে বৃষ্টির বেগ আগের থেকে সামান্য বেড়েছে। সেদিকে তাকায় ছেলেটা।
চোখের শূন্য দৃষ্টি দেখতে দিতে চায় না ইলোরাকে।
ওভাবেই উত্তর দেয় মেয়েটার শেষ প্রশ্নের, ‘কেউ একজন চাচ্ছে না জয়িতাকে উদ্ধার করি আমি।’

জানালার কাঁচে জোরে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে বৃষ্টি – সাত মাসের আগের একটা দিনে ফিরে যায় তন্ময়।

২.
চারপাশে হাসির শব্দ। ছোট দোকানটাতে আজকে একটু বেশি মানুষই ভিড় জমিয়েছে।

বাইরে ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়তে থাকলে এমনটা হয়। নিঃসঙ্গ দোকানগুলোর ওপর চাপটা পরে বেশি। দরজা শক্ত করে লাগানো ছিলো, দড়াম করে ওটা খুলে যেতে নিজের সীট থেকে ঘুম ঘুম চোখে সেদিকে তাকায় তন্ময়।

ময়মনসিংহের এই পোড়া শহরে পড়ে আছে। একদিন ধরে নয়। আজকের দিনটা পার হয়ে গেলে আটদিন হয়ে যাবে।
সামান্য একটা কাজ করতে রাসেল ভাই পাঠিয়েছেন – সেটা করতে অতিরিক্ত সময় লাগিয়ে দিচ্ছে বলে মনে হয় ওর নিজের কাছেই। রাসেল ভাই সন্তুষ্ট হবেন না।

দরজা খুলে ঢুকেছে যে মানুষটা – তাকে দেখে আবার পেশীতে ঢিল দিচ্ছিলো ও, এক মুহূর্তের মাঝেই ঘুম ঘুম ভাবটা সম্পূর্ণ কেটে যায় ওর। ভিজে একেবারে দাঁড়কাক হয়ে আছে বটে, সেজন্য দলের ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি তারেক আদনানকে চিনতে মোটেও ভুল হয়নি এবার। বাম হাতে একটা মেয়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
শক্ত শরীরে কোমরের কাছে রাখা পিস্তলটার ওপর একবার আঙুল ছোঁয়ায় তন্ময়। মুখে ঘুম ঘুম ভাবটা ধরে রেখেছে এখনও। এখানে আটদিন পচা বৃষ্টির মাঝে অপেক্ষা করার ঝামেলাটা শেষ হতে যাচ্ছে।

নির্দিষ্ট একটা বয়েসের পর টাকা পয়সার জন্য বাবা-মার দিকে তাকিয়ে থাকা খুবই অস্বস্তিকর একটা ব্যাপার। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই বয়েসটা আঠারো থেকে তেইশের মাঝে থাকে। এর পর টাকার কথা পরিবারকে আর মুখ ফুটে বলা যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে বগুড়ার গ্রামে পড়ে থাকা বাবা-মার কাছে টাকা চাওয়াটা তন্ময়ের কাছেও অসহ্যকর একটা ব্যাপার বলে মনে হত। বন্ধুরা টিউশনি করে পরিবারের ওপর থেকে চাপ কমায়। দেখাদেখি তন্ময়ও ধরেছিলো একটা।

ক্লাস নাইনের যে মেয়েটাকে পড়াতে যেত ও, তার নাম ছিল সুস্মিতা।

গোড়া থেকেই মেয়েটির চরিত্র খুব একটা সুবিধের মনে হয়নি তন্ময়ের। ঘর থেকে তার মা বের হয়ে যাওয়ার পর থেকেই যতসব অদ্ভুত রকমের ইঙ্গিত দিয়ে যেত সে প্রতিদিন।
তবে মাসে সাত হাজার টাকার মায়া বড় মায়া, সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর দশটা ছাত্রের মত তন্ময়ের পক্ষেও এই পরিমাণ টাকা সামান্য ঝুঁকির ভয়ে ফেলে দিতে মন চায় নি। এক লোডশেডিংয়ের রাতের আগ পর্যন্ত সবকিছু এভাবেই চলছিলো বটে।

সুস্মিতার মত বোকা মেয়ে সে দেখেনি। ঘরভর্তি মানুষ লোডশেডিংয়ের সাথে সাথে প্রথমেই ছুটে যাবে যে ঘরে ছোট মেয়েকে তার টিউটর পড়াচ্ছে সেখানে – এই সহজ যুক্তিটির কথা সে চিন্তাই করে নি।
টর্চ জ্বালিয়ে সুস্মিতার বাবা যখন দেখলেন, মেঝেতে শুয়ে আছে তন্ময়, অন্ধকারে তাকে পাকড়ে ফেলতে মেয়েটির তেমন কষ্ট করতে হয়নি – এটা অবশ্য তাঁর বোঝার কথা নয়। আর গুণধর টিউটরের বুকের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে তাঁর নিষ্পাপ মেয়ে।
তন্ময়কে তুলে ধরে টর্চ দিয়েই একের পর এক আঘাত করেছিলেন তিনি। সব দোষ এখানে নন্দঘোষের ঘাড়ে পড়েছিল। তবে লোহার শক্ত টর্চের আঘাত তন্ময় চুপচাপ গ্রহণ করতে পারে নি। ভদ্রলোককে জোরে একটা ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথে কারেন্ট চলে আসে।

রক্তাক্ত ভদ্রলোকের নিথর দেহ প্রথমবারের মত চোখে পড়ে ওদের। ওয়ার্ডরোবের কিনারে মাথা লেগে একপাশ একেবারে গুঁড়িয়ে গেছে। সম্ভবতঃ বুড়ো হাড়ে এই আঘাত সহ্য হয়নি তার। বাড়ি খেয়েই একেবারে শুয়ে পড়েছেন। হাত বাড়িয়ে নাড়ি দেখে চমকে উঠেছিলো তন্ময় – নেই।

দরজা খুলে উদভ্রান্তের মত ছুটে বেড়িয়ে গেছিলো ও। পরের রাতটা ছিল লুকিয়ে; এরপর দিন জাতীয় দৈনিকের শেষ পৃষ্ঠাতে নিজের ব্যাপারে ছোট একটা খবর দেখে আতংক কয়েক গুণে বেড়ে যায় ওর।

“ঢাবির ছাত্র : টিউটর, ধর্ষক নাকি খুনী?”

তাকে খবরটিতে ‘জনৈক সুস্মিতা শারমিন(১৪)’-কে ধর্ষণের প্রচেষ্টা চালানো এক উদ্ধত যুবক হিসেবে দেখানো হয়েছে খবরে। স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে টিউশনি করানোর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের ঘরে ডেকে আনাটা মোটেও নিরাপদ কিছু নয় বরং এরা গৃহকর্তাকে অনায়াসে খুন করে ফেলতে পারে কন্যা সন্তানটিকে ধর্ষণের সময় বাঁধা দিতে এলে।

তখনই বন্ধু রাফসানের মাধ্যমে রাসেল ভাইয়ের সাথে ওর পরিচয়, ভাই হেসে বলেছিলেন, ‘ক্যাম্পাসের ছোট ভাই তুমি। আমাকে আগে বলবা না? এসব কোন সমস্যা হইল?’

তন্ময় ধীরে ধীরে বোঝে এসব অভিযোগ সরিয়ে দেওয়া রাসেল ভাইয়ের কাছে কোন ব্যাপারই না। ক্ষমতায় আছে – এমন একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর বেশ উঁচু অবস্থান তাঁর, দলের ভেতরে। শুধু তন্ময়কে ছোট একটা কাজ করতে হবে। একটা ফর্ম পূরণ করতে হবে।

রাসেল ভাই মুচকি হেসে বললেন, ‘আরে তোমাদের মত ভালো ছেলেরা রাজনীতিতে নাই, আমি জানি। এটা শুধু একটা লিস্ট দেখানো দলের ভেতরে। এতজন আমাদের সাপোর্টে আছে – হ্যান তেন। তোমাকে কিছুই করতে হবে না, বুঝলা না? ফর্মালিটি জাস্ট। যখন ওদের জানাবো – তোমাকে হেল্প করতেছি, তখন দলের তোমার এন্ট্রির ব্যাপারে বলা লাগবে তো। তোমার কাজ হওয়া নিয়ে কথা। কি কও?’

মাথা দুলিয়েছিল তন্ময়। তবে বুঝতে পেরেছিল, এমনি এমনি তার ওপর থেকে খুনের অভিযোগ সরানো হচ্ছে না। পরবর্তীতে তাকে কিছু একটা করে এর প্রতিদান দিতে হবে দলের কাছে।
দশ মিনিট চিন্তা করে হাতে থাকা দুটো অপশনের মাঝে এই রাজনৈতিক দলের পুতুলে পরিণত হওয়াটাকেই ভালো মনে হতে থাকে ওর। অন্য অপশনটা সহজ – জেলখানাতে সুড়ুৎ করে সেঁধিয়ে যাওয়া– বগুড়ার কোণে পড়ে থাকা মা-বাবার মুখটা ভেসে উঠেছিল ওর মানসপটে।

ঠিকমত এই ঝামেলা থেকে বের হতে পারলে বাবা-মার চাপ ও কমাবেই একদিন। সেজন্য এই রাজনৈতিক দলের পুতুল হওয়া অনেক ভালো। জেলখানায় আছে ছেলে – এই খবর সহ্য করতে পারবে হার্টের রোগী বাবা?

মাস চারেকের মাঝেই মাঝারি সাতটা অপারেশনে পাঠানো হয় ওকে। এর মাঝে ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলা হয়েছে ক্রিমিনাল রেকর্ড। পুলিশ সুস্মিতার বাবার মৃত্যুর কেসটা একেবারে দশমণি ফাইলের তলে চাপা দিয়ে রেখেছে। আগামী শতাব্দীতে ওটা আলোর মুখ দেখলেও দেখতে পারে। তবে সে সম্ভাবনা কম।

অষ্টম অপারেশনটা ছিলো রিজভী তরুণ নামে বিরোধীদলের এক পাতিনেতার কাছ থেকে তথ্য আদায় করা।
এতদিনে তন্ময়ের ভেতরের কোমল দিকগুলো সব সরে গেছে – ধাপে ধাপে নিষ্ঠুর কাজ করানো হয়েছে ওকে – সতর্কতার সাথে একটা অ্যাসেটে পরিণত করেছে ওকে দলটি। একবার খুনের অভিজ্ঞতা আছে – এমন কাওকে দিয়ে যে নোংরা কাজগুলো করিয়ে নেওয়া যায় – তা আর কাওকে দিয়ে করানো যায় না। বিবেকের দংশন তাদের এক ঘণ্টা দংশন করলে বাকি তেইশ ঘণ্টা করে রাখে বেপরোয়া। খুনের চেয়ে ছোট অপরাধগুলো তাকে আর স্পর্শ করে না। দলটি তন্ময়ের দিকে এজন্যই মনোযোগ দিয়েছিলো।
ব্যাপারটা অবশ্য ও টের পায় অনেক অনেক দেরিতে।

বিরোধীদলের পাতিনেতার শরীরের বারোটা হাড় ভাঙ্গার পরও যখন মুখ খোলানো যায় না – ছুরি দিয়ে গলা কেটে মানুষটার মাথা আলাদা করে ফেলেছিল তন্ময়।
অদ্ভুত ব্যাপার – এ ব্যাপারে বিবেকের দংশন সে আর অনুভব করেনি। নিজের দলের ক্ষতির কারণ হচ্ছে – এমন একজন শত্রুকে কমিয়ে দেওয়াতে অনুশোচনার কি আছে? দলের সক্রিয় কিলারে পরিণত হতে তার লেগেছে মাত্র চৌদ্দ মাস।

ভাবনাটাকে চাপা দিয়ে উঠে দাঁড়ায় ও – দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে দোকানটা থেকে – শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ায়।
কোনরকম দ্বিধা না করেই ঘরভর্তি লোকের সামনে পিস্তলটা বের করে ফেলেছে। প্রতিক্রিয়া দেখানো সময় এসময় স্বাভাবিক মানুষেরা পায় না – বদ্ধ ঘর কাঁপিয়ে দিয়ে পর পর দুইবার গুলি করে ও।

তারেক আদনান বুকে আর গলাতে বুলেটের ক্ষত নিয়ে পড়ে যাচ্ছেন – তার মাঝেই দরজা পেরিয়ে গেছে তন্ময়। বাইরে থেকে হুড়কো তুলে ভেতরের প্রতিটা মানুষকে আটকে ফেলেছে ভেতরে।

৩.
মোটরসাইকেলটা যখন চতুর্থবারের চেষ্টাতেও স্টার্ট নিলো না – গলা শুকিয়ে এল তন্ময়ের।
দরজাটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না ভেতরের ওদের। আর ক্ষিপ্ত জনতা বের হলে খবর আছে। হাড়মাংস আর থাকবে না একটাও জায়গায়।

মোটরসাইকেল থেকে দ্রুত নেমে এসে দৌড় দেয় ও রাস্তার অন্যপাশের গলিটা ধরে। বৃষ্টির জন্য মনের ভুল হতে পারে – তবে বেশ পেছনে কিছু একটা ভেঙ্গে পড়ার শব্দ শুনতে পেল কি ও? দরজাটা ভেঙ্গে ফেলেছে লোকজন?

তারেক আদনান তার নিজের দলের লোক, বিরোধি দলের নয়। ঢাকা মহানগরের সেক্রেটারি। মানুষটাকে খুন করা ছাড়া উপায় ছিলো না।
দলের স্বার্থে কাজটা করতে হল ওকে। সামান্য খারাপ যে লাগছে না তার – এমনটা না। কিন্তু এই ঘটনার পর সারা দেশ আঙুল তুলবে বিরোধী দলের দিকে। সামনের নির্বাচনে ভালো একটা প্রভাব ফেলবে ঘটনাটা।
তারেক আদনান নিজেও কিছু ভুল করে ফেলেছিল। বাল্যবন্ধুকে অতিমাত্রায় বিশ্বাস করে নির্বাচনী এজেন্ডার অনেককিছু শেয়ার সে করেছে। কাজটা ঠিক করেনি। জেনে শুনে শত্রুপক্ষকে তথ্য তুলে দেওয়ার কারণে বড় ধরণের পিছিয়ে গেছে দল।
তার মৃত্যুর মাঝ দিয়ে আবার আগের জায়গাতে ফিরিয়ে আনা হয়ত সম্ভব হতে পারে। তার কাজটা ঠিকমত করেছে তন্ময়।

বেশ পেছনে দুইজন পুলিশকে দেখতে পায় ও এই সময় আড়াল থেকে। অনুসরণ করছে কি না নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই।
পর পর তিনবার মোড় নেয় ও বোঝার জন্য। ঠাঁয় লেগে আছে পুলিশ।
রেস্টুরেন্টটা থেকে যদি এর মাঝে লোকজন বের হয়ে গিয়ে থাকে – তবে অর্ধেক শহর জেনে গেছে খুনের ব্যাপারটা। সেই সাথে পেয়েছে খুনির দৈহিক বর্ণনা। পুলিশ এই সময় পেছনে ঘুর ঘুর করার একটাই অর্থ হতে পারে। ঝুম ঝুমে বৃষ্টির মাঝে খুব বেশি মানুষ রাস্তাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে না – খুনের আসামী ধরার জন্য এর চেয়ে সহজ সিনারিও হতে পারে না। বৃষ্টি না থাকলে জনতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা করা যেত। এখন সেটি সম্ভব নয়।

মোটরসাইকেলটা ঠিক থাকলে শহরের অন্যপাশে থাকত ও এতক্ষণে। তার বদলে ধরা খাওয়া থেকে মাত্র দশ মিনিট দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠাণ্ডা শরীরটা আরও ঠাণ্ডা হয়ে যেতে থাকে ওর। ঘামতে পারলে ভালো হত – মনে মনে ভাবে একবার। পিস্তলটা ডাম্প করার সময়ও পায়নি ও। ওটা কোমরে এখনও। পুলিশ শুধু সার্চ করে দেখতে চাইলেই কাজ হয়ে যাবে।

পেছনের পুলিশ দুইজন দূরত্ব কেন রাখছে সেটা ও বুঝতে পারে। গুলির ব্যাপারটা এতক্ষণে চাউর হয়ে যাওয়ার কথা। পুলিশগুলো এক্ষেত্রে গুড ফর নাথিং। খালি হাতে আছে। একটা করে ব্যাটন সম্বল এদের। এই অবস্থাতে সশস্ত্র লোকের সাথে লাগতে চাইছে না।

আর দুটো মোড় নেওয়ার পর একটা ল্যাম্পপোস্টের সামনে থেমে যায় ও। কানাগলি এটা। সামনে এগিয়ে আরেক গলিতে পড়বে সে উপায় নেই। না বুঝেই এখানে ঢুকে পড়াটা একেবারেই অনুচিত হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ায় ও। ভাবনা খানা – কারও জন্য অপেক্ষা করছে।
প্রতিটা পেশিকে সচকিত করে রেখেছে একটা ঝামেলা দেখার জন্য। বিদ্যুৎচমকের মত রিঅ্যাক্ট করতে হবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওদের দুইজনকে দুটো বুলেট ঢুকিয়ে দিয়ে হাওয়া হয়ে যেতে হবে।
পুলিশদুটো ঘাঘু আছে। তারাও সম্ভবতঃ তন্ময়ের মনোভাব বুঝতে পারে স্পষ্ট। গলির মোড়ে এসে ইতস্তত করতে শুরু করেছে দুইজনেই। ঢুকছে না।

মিনিট তিনেক লাগে তাদের একটা মতৈক্যে পৌঁছতে – পুরো সময়টা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে তন্ময়। উদাস ভঙ্গীতে অন্যপাশের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে দুই আপদ এতক্ষণে এগিয়ে আসতে থাকে ওর দিকে।

‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই জানতে চাইলো ওদের একজন।
কিছুক্ষণ স্মৃতি হাতড়ায় তন্ময় – কোনকালে কোন পুলিশকে কি হাই-হ্যালো দিয়ে শুরু করতে দেখেছে একটা কথোপকথন? বাংলাদেশে? না।
পাল্টা প্রশ্ন করে তন্ময়, ‘তা জেনে আপনার কি কাজ?’

সাথে সাথে পুলিশের মুখের চেহারাই পাল্টে যায়, রীতিমত ভয়ংকর হয়ে উঠেছে লোকটা। এভাবে পাল্টা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের কাছে শুনে অভ্যস্ত নয়।
‘এক থাবড়ে কানপট্টি ছুটায়া দিমু শালা – প্রশ্ন করছি – উত্তর দে!’
শক্ত শরীরে দাঁড়ায় তন্ময়, ‘ভদ্র ভাষাতে কথা বলেন। আপনি একজন ভদ্রলোকের সাথে কথা বলছেন।’
‘ওরে আমার ভদ্রলোক রে!’ দ্বিতীয় পুলিশ খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দ করে, ‘কে ভাই আপনি? বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট?’
মাথা নাড়ে তন্ময়, ‘সাধারণ একজন ছাত্র।’
‘কোথায় পড়াশোনা করেন?’
‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি।’

পুলিশ দুইজন এ ওর মুখের দিকে তাকায়। ভার্সিটির নাম শুনে এমন করার কারণ কি? খুনী একজন মানুষ ঢাকা ভার্সিটিতে পড়তেই পারে না – এমন একটা ধারণা নিয়ে আছে? নাকি আগে থেকেই পুলিশকে কেউ সতর্ক করে দিয়েছিল – ঢাবি থেকে কেউ আসতে পারে এখানে?
সেক্ষেত্রে আর কোন আশা নেই। হাত নামাতে থাকে ও পিস্তলের দিকে ।

তবে আচমকা কোমল হয়ে যায় পুলিশ দুটোর গলা, ‘এখানে কেন এসেছেন?’
‘বাঁধা কোথায়? উইকএন্ড চলে।’
‘না, মানে -’
‘বড্ড প্রশ্ন করেন আপনারা।’ কাঁধ ঝাঁকায় তন্ময়, ‘আমার প্রেমিকা ময়মনসিংহে থাকে। সকালের বাসে এসেছি– বিকেলের বাসে ঢাকা চলে যেতে হবে। এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেন – সেটা স্পষ্ট হয়েছে এবার?’

রিকশাটা ওদের খুব কাছে থেমে যায় তখনই। চোখ ধাঁধানো সুন্দরী মেয়েটি ফিরে তাকিয়েই বিস্ময়ে হা হয়ে যায়। পুলিশ দুইজনের চোখ এখন তার দিকে চলে গেছে।
এর মাঝেই তন্ময় ওকে একটা চমৎকার হাসি উপহার দেয়।

দ্রুত এগিয়ে আসে মেয়েটি, ‘তুমি কতক্ষণ হয়েছে এখানে? ইশ, ভিজে গেছ যে একেবারে!’
কাঁধ ঝাঁকায় তন্ময়, ‘ফোন তো ধর না। কি করব? বৃষ্টিতে মোবাইল এতবার বের করতেও পারছিলাম না -’

আর কিছু বলার আগেই মেয়েটা ওকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে, রাস্তার মাঝেই ওর ঠোঁটদুটো কামড়ে ধরে, তারপর মুখের ভেতর নিয়ে যায়। তন্ময়ের মনে হয় এই ভৌতিক চুম্বন কোনদিনও শেষ হবে না। মেয়েটির শরীর খুব কাছে চলে এসেছে ওর – মাতাল করা একটা বুনো গন্ধ পাচ্ছে ওখান থেকে। আস্তে করে মেয়েটাকে সরায় ও মিনিট তিনেক পর।

পুলিশ দুইজন হা করে তাকিয়ে আছে এখনও। মেয়েটি যেন এতক্ষণে সচকিত হয়, ‘ভাই, ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছেন কেন?’
তন্ময় অবশ্য অন্য কথা বলে, ‘ডিসট্যান্সড রিলেশন তো – দেড় মাস পর দেখা হল – সামলাতে পারিনি আমরা নিজেদের। কিছু মনে করবেন না। কি জানি জানতে চাইছিলেন?’

মাথা নাড়ে দুইজনই, ‘না না – ঠিক আছে। আপনারা যেতে পারেন।’

মেয়েটা একপাশ থেকে ওর হাত জড়িয়ে ধরেছে, পুলিশ দুটো ফিরে যেতে থাকে। একজনকে বলতে শোনে তন্ময়, ‘এই ছেলে দিয়ে রেস্টুরেন্ট ডাকাতি? হাহ!’

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও। মাত্র খুনটা হয়েছে – পুলিশ এখনও বুঝতেই পারেনি ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি মারা গেছে এই মাত্র। তারা ভেবেছে সাধারণ কোন ডাকাতির কেস এটা হবে। নিশ্চয় যথেষ্ট তথ্য কালেক্ট করার আগেই বোকার মত তারা পিছু নিয়েছে সন্দেহজনক তন্ময়ের?

‘কেন করলে এটা? আমাকে বাঁচালে কেন?’ এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে গোলাপফুলের মত ফুটফুটে চেহারার মেয়েটাকে প্রশ্ন করে ও, গলা নামিয়ে রেখেছে।
‘জানোয়ারটা একমাসের জন্য আমাকে ভাড়া নিয়েছিলো।’ বিড় বিড় করে বলে অদ্ভুত মেয়েটা।
চিনে ফেলে তন্ময়, ‘তারেক আদনানের সাথে ছিলে তুমি রেস্টুরেন্টে।’
‘ভাগ্য ভালো একেবারে আমার ফ্ল্যাটের সামনে এসে থেমেছিলে। অবশ্য – ফ্ল্যাটটা আমার না। জানোয়ার তারেকের। আমাকে নিয়ে নিরিবিলিতে থাকা দরকার ছিলো তার।’
‘ফিরে এলে কেন?’
‘আমার জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে হবে যত তাড়াতাড়ি পারি – পুলিশ এসব পেলে আমার পেছনেও লাগতে পারে।’

বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ছে, দারোয়ান মুচকি একটা হাসি উপহার দেয় ওদের দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা কয়েকদিন ধরে এখানে আছে। অজানা নয় এখন চেহারাটা।

‘তুমি আসছ কোথায়?’ ফিস ফিস করে প্রশ্ন করে তারেকের রক্ষিতা।
‘ঘরের ভেতর থেকে তোমার ট্রেস সরিয়ে ফেলতে আমাকে পাশে চাবে তুমি – বিশ্বাস কর। ওই কাজে আমার মত দক্ষ লোক এ তল্লাটে পাবে না।’
এক মুহূর্ত ভাবে মেয়েটা, তারপর রাজি হয়ে যায়, ‘এসো তবে।’ লিফটের সুইচে চাপ দিয়ে তাকার একবার ওর দিকে, ‘আমার নাম জয়িতা।’

‘ঠোঁটের মতই মিষ্টি একটা নাম।’ মুচকি হাসে তন্ময়, ‘আমি তন্ময়।’

৪.
রাতটা অন্য একটা হোটেলে কাটাতে হয় ওদের। আঁচরে তারেক আদনানের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সবকিছু বের করে এনেছিলো ওরা।
স্বয়ং তারেক আদনান মরা থেকে জ্যান্ত হয়ে যদি উঠে আসে – তবুও সে দাবী করতে পারবে না এখানে কোনদিন জয়িতা বলে কোন মেয়ে ছিলো। একটা চুলও ফেলে আসেনি ওরা ওখানে।

হোটেলের ছোট্ট ঘরটাতে টিভি চলছে – ক্লান্ত তন্ময়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকে জয়িতা। অজান্তেই ওর কপালে হাত বুলিয়ে দেয় তন্ময়।
বড় বড় চোখ মেলে ওর দিকে তাকায় মেয়েটা, ‘তন্ময়?’
‘হুঁ।’
‘কাল চলে যাবে?’ মেয়েটার গলা এবার বিষণ্ণ শোনায়।
মাথা দোলায় ও, ‘যেতে হবে। ছোট একটা কাজ বাকি আছে। সেটা শেষ করেই চলে যাবো।’
গুটিসুটি মেরে তন্ময়ের আরও কাছে আসে জয়িতা, ‘কি কাজ?’
শক্ত হয়ে যায় তন্ময়ের মুখটা, ‘জানতে চেও না।’

ধমক খেয়ে হাসিখুশি ভাবটা মুখ যায় না জয়িতার, বরং উঠে বসে বিছানাতে। চেপে ধরে শুইয়ে দেয় তন্ময়কে। জোর করে নিজের কোলে তুলে নিয়েছে ওর মাথাটা।
‘আচ্ছা, জানতে চাইবো না। চুপচাপ শুয়ে থাকো তো – তোমার মাথায় বিলি কেটে দেই। ঘুমাও একটু।’

জয়িতাকে এই মুহূর্তে তন্ময়ের ঠিক ইলোরার মত লাগে।
এক ছাদের নিচে ওরা ছিলো তিন মাস। মেয়েটা এভাবে কোলে তুলে নিত ওর মাথাটা। তারপর এভাবেই বলত, ‘বিলি কেটে দেই, হুঁ?’
মেয়েটা হুট করে ওর জীবন থেকে সরে গেল কেন? ড্যাশিং একটা ছেলেই কি সব নাকি? বেটার চয়েজ দেখতে পেয়ে অপেক্ষা করার মত বোকা ইলোরা ছিলো না।
তন্ময়ের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।

কাচ ভাঙ্গার মত শব্দ করে হাসে জয়িতা, ‘এক্স গার্লফ্রেন্ডের কথা মনে করতে হবে না। ঘুমাও।’
চোখ খুলে যায় তন্ময়ের, চোখে বিস্ময়ের ছাপ। মেয়েটা জানে কিভাবে?
ওর বুকে হাত বোলায় জয়িতা, ‘আমার পেশাটাই এমন গো, পুরুষ চিনতে হয়। নিঃশ্বাসে পুরুষ চিনতে হয়, দীর্ঘশ্বাসেও চিনতে হয়। নইলে ধ্বংস হয়ে যেতাম।’
জয়িতার হাত সরিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসে তন্ময় ওর পাশে, মেয়েটার জন্য হঠাৎই খুব মায়া হতে থাকে ওর।

‘কাল থেকে তো আর আমাদের দেখা হবে না, তাই না?’ বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চায় মেয়েটা। তন্ময় জোর করে চোখ সরিয়ে নেয়।
‘হবেই না – কে বলতে পারে?’ প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করে তন্ময়, ‘বাদ দাও তো – তোমার ব্যাপারে বল। তারেকের সাথে জুটলে কিভাবে?’
মাথা নাড়ে জয়িতা, ‘শুনতে তো তোমার ভালো লাগবে না।’
মুচকি হাসে তন্ময়, ‘ঘুম আসছে না। আপত্তি না থাকলে বল।’
‘ময়মনসিংহের সবচেয়ে বড় ব্রথেল থেকে এসেছি আমি – শাইনিং।’ ধীরে ধীরে বলে মেয়েটা, ‘নাম শুনবে না। এসব কাজ প্রকাশ্যে চলে না। শাইনিংয়ের সাথে সারাটা জীবন ধরে আছি আমি। কারণ, ওখানেই আমার জন্ম। আমার মা ছিলেন এলাকার টপ খানকি।’

স্তব্ধ হয়ে শোনে তন্ময়, বলে যাচ্ছে দুঃখী মেয়েটা, ‘আমাকে সারাজীবন একজন বেশ্যা হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ছোট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত – নিখুঁত একজন বেশ্যা বানানো হয়েছে আমাকে ধাপে ধাপে। শাইনিংয়ে কোন মেয়ে প্রেগনেন্ট হয়ে গেলে ছেলে সন্তান না মেয়ে সন্তান পেতে যাচ্ছে – সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করে ওরা। মেয়ে হলে আমার মতই শিখিয়ে পড়িয়ে উন্নত মানের বেশ্যা তারা বানিয়ে ফেলে। জীবনটা ওখানে এরকমটাই স্বাভাবিক।’
টপ করে এক ফোঁটা পানি পড়ে মেয়েটার হাতের ওপর, ‘আমার কুমারী জীবন ছিলো এগারো বছরের। যখন মা আমাকে বলল আজ রাতে আমি আরেকজনের সাথে ঘুমাবো – তখন আমার বয়েস ছিলো মাত্র এগারো। বয়েস চৌদ্দ পেরুনোর আগেই পুরোদস্তুর বেশ্যা হয়ে গেলাম। পড়াশোনা যথেষ্ট শেখায় তারা ওখানে। ভদ্রোচিত একটা উপস্থাপনা করতে পারলে অনেক বেড়ে যায় খানকিদের দাম।’

সান্ত্বনা দেয় না তন্ময়, তবে মেয়েটার কষ্ট ওকে স্পর্শ করে। এক হাত বাড়িয়ে ওকে ছোঁয় সে, ‘আর এখান থেকেই তোমাকে ভাড়া করে নিয়ে গেছিলো তারেক আদনান?’
‘সাতদিন আগে।’ চোখ মোছে জয়িতা, ‘নতুন কিছু তো আর না। এরকম স্পেশাল অর্ডার আমরা মাঝে মাঝেই পাই। টাকাটা একটু বেশিই আসে। তবে কাজকর্মের কোন পার্থক্য নেই। পুরুষ মাত্রই জানোয়ার।’
ইতস্তত করে প্রশ্নটা করেই ফেলে তন্ময়, ‘আমাকে সাহায্য করলে কেন? আমিও একজন পুরুষ।’

জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়ায় মেয়েটা। ঘরের ঠিক মধ্যখানে হেঁটে যায়। তারপর আস্তে করে জামার চেইন খুলে ফেলে।
কোমর পর্যন্ত খুলে গেছে মেয়েটার পোশাক। কালো রঙের বক্ষাবরণী ছাড়া ওপরে আর কিছুই নেই। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় ও তন্ময়ের দিকে পিঠ ফিরিয়ে।
শিউরে ওঠে তন্ময়, এত সুন্দর মেয়েটার পিঠ ওটা? বীভৎস ভাবে কুঁচকে গেছে চামড়া। সম্ভবতঃ কাগজ কাটার ছুরির অবদান। ফালা ফালা করে ফেলা হয়েছে পিঠে মেরে মেরে। পরক্ষণেই কোমর পর্যন্ত চলে যাওয়া একটা সাপের মত দাগ দেখে ভুল ভাঙ্গে ওর।
কাগজ কাটার ছুরি নয়, পুরুষালী বেল্টের দাগ! রক্ত শুকিয়ে আছে ওখানে। বেশিদিনের পুরোনো ক্ষত নয়।

খাট থেকে উঠে দাঁড়ায় হতভম্ব তন্ময়, বিষণ্ণ গলাতে বলে যাচ্ছে জয়িতা, ‘এগুলো, তারেক আদনান নামক একজন পুরুষের অবদান। তাকে গুলি করার মুহূর্ত থেকে পুরুষ জাতির সেই শ্রেণি থেকে সরে গেছ তুমি।’
ওর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে তন্ময়, আলতো করে ছোঁয় ক্ষতগুলো। এই প্রথম তারেক আদনানকে গুলি করার জন্য মনের কোথাও কোন খারাপ লাগা অনুভূতি নেই ওর। বিবেক আগে থেকেই ওর হেডঅফিসের অনেক নিচু একটা পদে কাজ করে, এখন একেবারে চুপ হয়ে গেছে।

‘কিভাবে বুঝলে না মেয়েদের ক্ষেত্রে তারেক আদনানের সাথে আমার কোন পার্থক্য আছে কি নেই? ব্যবসায়িক কারণে মারা গেছে তারেক। তোমাকে নির্যাতন করার জন্য তাকে গুলি করিনি আমি।’

মুচকি হেসে ঘুরে দাঁড়ায় জয়িতা, সামান্য পোশাকে ওর সুন্দর মুখ আর সুগঠিত বুকের দিকে চোখ পড়তে তন্ময় নিজের অজান্তেই ঢোক গেলে। গলা শুকিয়ে আসছে ওর। মেয়েটা কি সুন্দর! অথচ, কি ভাগ্য নিয়েই না জন্মেছে!
‘ওই যে বলেছিলাম -’
গলা খাঁকারি দিয়ে কথাটা শেষ করে দেয় তন্ময়, ‘রাইট। রাইট – আমাদের নিঃশ্বাসে চিনে ফেল কে কেমন হতে পারে।’

আলতো করে মেয়েটার জামা আবার পরিয়ে দেয় তন্ময়, যত্ন করে চেইন লাগিয়ে দুই কাঁধ ধরে সামনে দাঁড় করায় ওকে, ‘এই জীবনে কেন আছো? আমার সাথে কাল তুমিও চলো ঢাকায়।’
অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে জয়িতা, ‘মানে?’
‘আমার অনেক কানেকশন, অনেক লিংক এখন। আজকের পর থেকে আরও স্ট্রং একটা পজিশনে চলে যাবো। তোমাকে ভালো একটা কাজ জুটিয়ে দেওয়াটা এখন আমার পক্ষে খুব একটা কঠিন কিছু না।’
‘কেন করবে সেটা জানতে পারি?’ আচমকা শক্ত হয়ে যায় জয়িতার কণ্ঠ।

অবাক হয়ে দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তার দিকে তন্ময়, তারপরই বুঝতে পারে তার ভয়। উচ্চস্বরে হেসে ওঠে ও, ‘বোকা মেয়ে, তোমাকে নিজের জন্য নিয়ে যাচ্ছি না। নিয়ে যেতে চাইছি বন্ধুত্বের দাবীতে। এখানে পচে মরার তো কোন কারণ দেখি না তোমার।’
কৃতজ্ঞ একটা দৃষ্টি ফোটে জয়িতার মুখে আর কয়েক সেকেন্ড পর, তন্ময়ের শিশুর মত মুখটাতে কোন রকম শঠতার চিহ্ন সে দেখে নি।
তবুও গলাটা বিষণ্ণ থাকে মেয়েটার, ‘আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব কিসের? আমার পরিচয় তোমার অজানা নয়। এমনও নয় যে আমাকে অনেকদিন ধরে চেন। কেবলই না পরিচয়!’
হাসিমুখটা ম্লান হয় না তন্ময়ের, থুতনি ধরে জয়িতাকে বাধ্য করে ওর দিকে তাকাতে, ‘তুমি না থাকলে এতক্ষণে আমি শক্ত রুটি খেতাম হাজতে বসে, সেটা অজানা না তোমার। আর বন্ধুত্বে কোন ছোট বড় নেই। বোঝা গেছে?’

জয়িতার চোখে আচমকা পানি চলে আসে। জীবনে তার দিকে একটা মানুষও তাকায়নি স্বাভাবিক কোন দৃষ্টিতে।
প্রত্যেকের চোখে শুধু ছিলো ভোগ, লালসা, কাম, ওকে দেখা হয়েছে স্রেফ একটা উপাদেয় খাবার হিসেবে। তন্ময় ছেলেটা একটু আগেই একটা মানুষকে ঠাণ্ডা মাথাতে দুই বার গুলি করেছে – কিন্তু ছেলেটার ওই একটা দিকই নেই।
অন্যদিকটার পরিচয় পেয়ে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে নি। চোখের পানিটা তাড়াতাড়ি মুখে ঘরের অন্য পাশে চলে যায় ও তাড়াতাড়ি।
তন্ময়কে জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছে করছিলো হঠাৎ করেই। কাজটা করা যাবে না। ছেলেটা মেয়েদের ব্যাপারে ঠিক যেভাবে ভাবে বলে ধারণা করে ছিল, সে ওরকমই। এদের ছুঁয়ে দিতে হয় না, একটু দূরত্ব রেখে দেখতে হয়।
হঠাৎ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়েটি বলে মনে হয় ওর।

ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ – তন্ময়ের নিঃশ্বাস নিজের ঘাড়ে অনুভব করে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না ও। ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর বুকে। একে অন্যের ঠোঁট খেয়ে ফেলার যে অসম প্রতিযোগিতা তারা লাগিয়ে দেয় পরমুহূর্তে – দাঁতগুলো ছাড়া আর কেউ তার সাক্ষী থাকে না।
অথবা তারা ওটাই ভেবেছিলো।

কোন রকম আগাম সংকেত না দিয়েই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে হোটেল রুমের দরজাটা।
উজ্জ্বল টর্চের আলো ফেলে ঘরে ঢুকে পড়ল চার-পাঁচজন মানুষ। প্রতিটা আলো ফেলা হয় ওদের চেহারাতে।

‘মাগীর হুক দেখো!’ গর্জন করে ওঠে ওদের একজন, ‘কাস্টোমার ছুইটা গেছে – সেই ফাঁকে ফ্রিতে ক্ষ্যাপ মারতাছে।’

খপ করে জয়িতার হাত ধরে মেয়েটিকে সরিয়ে নেয় আরেকজন, ‘ফিইরা চল। যাইতে হবে আমাদের এখন।’

তন্ময়ের মাথাতে রক্ত উঠে যায় – এক পা এগিয়ে এসেছে বিদঘুটে লোকটার দিকে – একই সাথে নড়ে ওঠে দুই বিশালদেহী। প্রচণ্ড একটা ধাক্কা শুধু অনুভব করার সময় পেল তন্ময়। তারপর পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে খেয়াল করলো হোটেলের পুরোনো জানালা তার ওজন নিতে পারেনি, ভেঙ্গে গেছে।

দুই তলা থেকে খসে পড়ছে ও নিচে!

৫.
বাইরের বৃষ্টি থেমে গেছে। কালো গাড়িটা থেকে হাল্কা পায়ে নেমে আসে তন্ময়। ইলোরার ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকিয়ে হাল্কা হাসে।
‘ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেন? যাবো আর আসবো।’
ড্রাইভিং সীট থেকে নেমে এসেছেন ইলোরার ড্রাইভার-কাম-বডিগার্ড মারুফ ভাই, ‘আমিও যাবো।’
কাঁধ ঝাঁকায় তন্ময়, ‘অযথা কষ্ট করছেন। মতিন ভাই আমাকে চেনেন। এখানে কোন ঝামেলাই হবে না।’
জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেয় ইলোরা, ‘অদ্ভুত কথা বলবি না তো। মতিন ভাই নিজেই ঝামেলায় আছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’

চোখ মটকালেন মারুফ ভাই। এরপর আর আপত্তি করা যায় না।
ছোট কিন্তু ছিমছাম বাড়িটার ভেতর ঢুকে পড়ে ওরা। দোতলা একটা বাড়ি। সাদা রঙের দেওয়ালগুলো আর ওপরের খয়েরী রঙের চালমত ছাদ দেখে মনে হতে পারে এটাকে স্রেফ ছবি থেকে তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এখানে।

এত টাকা মতিন ভাই কিভাবে পেয়েছেন তা এলাকাবাসী পর্যন্ত জানে। বেশ্যা-ব্যবসা থেকে।

ময়মনসিংহ থেকে পরদিনই ঢাকাতে চলে আসতে হয়েছিলো তন্ময়কে। একে তো এর পরের কয়েকদিন দেশ গরম রাখার মত একটা খুন করে এসেছে। আবার ‘শাইনিং’-এ এসে ঝামেলা করলে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। ঢাকায় ফেরার পর ও জেনেছে জয়িতার সাথে সেদিন কী ঘটেছিল।

মেয়েটির কন্ট্যাক্ট যে গুলি খেয়ে মারা গেছে – সেটা ‘ব্রথেল শাইনিং’ জানতে পেরেছিল তিন ঘণ্টার ভেতরই। তখনই তাদের মাথাব্যথার শুরু, তাদের টপ খানকি কি এই সুযোগে পালিয়ে গেল? নাকি ফ্রি-তে ‘ক্ষ্যাপ মারতে’ বের হয়েছে সে?
দুটোই শাইনিংয়ের জন্য ক্ষতির কারণ, খোঁজ খবর নিয়ে তন্ময়দের হোটেলে থাকার ব্যাপারে জানতে তাদের তেমন কষ্ট হয় না। হোটেলগুলোর সাথে সব সময়ই মাগিপাড়ার দহরম মহরম। দুটো ফোন দিয়েই বের করে ফেলা গেছে।

তারপর হোটেলে ঢুকে ওদের যে অবস্থায় তারা পেয়েছিল, লোকগুলো ধরেই নেয় জয়িতা ‘শাইনিং’কে বাটোয়ারা না দিয়ে শুধু নিজের জন্য দুই এক রাত রোজগার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কাজেই তাকে ধরে আবার শাইনিংয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে রেগুলার কাস্টোমারদের কাছে তার ডিমান্ড আছে। এক রাত তার বাইরে থাকা মানে বড় অঙ্কের ক্ষতি।

তন্ময় শাইনিংয়ে ফিরে এসেছিলো ঠিক দেড় মাস পর।
তবে জয়িতাকে ওখানে পায় নি। বড় অংকের টাকার টোপ ফেলার পর ম্যানেজার শুধু জানায় ঢাকাতে চালান করে দেওয়া হয়েছে তাকে। প্রস্টিটিউট-ট্রেডিং হয়েছিলো ‘রজনী ব্রথেলে’র সাথে। জয়িতার ডিমান্ড ময়মনসিংহে পড়ে আসছিল, কাজেই তার সাথে ‘লিয়া’ নামক আরেকজনে অদলবদল করেছিল ব্রথেল দুটো। আরেক বেশ্যা বিন্দুকেও ট্রেড করা হয়েছে লতিকার সাথে।

রজনী ব্রথেলে জয়িতাকে খুঁজেছে তন্ময়, পায়নি সেখানে। কাস্টোমারের বেশে এসে অন্য কোন এক ব্রথেল খুব ভালো প্রস্তাব দিয়েছিলো রজনীর চারজনকে। এক রাতে চারজনই পালিয়ে গেছে। কোথায় গেছে সেটা রজনীর ম্যানেজার জানে না।

সবচেয়ে লম্বা হাত যে মতিন ভাইয়ের – সে গালকাটা মতিন ভাইও গত কয়েকদিন ধরে লুকিয়ে আছেন। শাইনিংয়ের বিন্দু অবশ্য রজনীতেই ছিলো। ফোনে আলাপ করেছিলো তন্ময় তার সাথে। তবে ওটা যথেষ্ট হয়নি, কাজেই পাঠিয়েছিলো ইলোরাকে। এখন ইলোরা বলছে, ওখানে গিয়ে বিন্দুকে মৃত পেয়েছে সে!

এই মুহূর্তে মারুফ ভাইয়ের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পিঠের কাছে শির শির করে ওঠে ওর। কেউ একজন অদৃশ্য থেকে যেন চাইছে না ও জয়িতাকে খুঁজে পাক। মেয়েটার প্রতি অদ্ভুত ধরণের একটা টান অনুভব করেছে ও, সেই প্রথম চুমুর সময় থেকে। ইলোরা প্রথমে শুনে তো রীতিমত অপমান করেছিলো ওকে। এত থাকতে তন্ময়ের মত দারুণ একটা ছেলে কিভাবে একজন প্রস্টিটিউটের সাথে মাথা কুটে?

মেয়েটির সাথে আজকের বন্ধুত্ব নয় ওর। মাঝে লিভ টুগেদার করেছে বলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয় নি, বরং আরও হয়েছে গাঢ়। তন্ময়ের জীবনে এই জয়িতা মেয়েটার গুরুত্ব আছে, সেটা বুঝতে অবশ্য ইলোরার বেশি সময় লাগেনি। এসব ব্যাপারে ওদের হয়তো ষষ্ঠইন্দ্রীয় প্রখর হয়।

এদিকে ইলোরা বেশ্যাবৃত্তি একেবারেই দেখতে পারে না। জয়িতাকে তন্ময়ের জন্য বিশেষ ছাড় দিলেও জগতের আর বেশ্যাদের নাম শুনতে সে নারাজ। বিন্দুর সাথে কথা বলতে রাজি হওয়ায় তন্ময় খুশি হয়েছিল – ইলোরাকে পাঠাবার কারণ, বেশ্যাপাড়ার মেয়েদের পুরুষের প্রতি ঘৃণা। ইলোরাকে বিন্দু যত সহজে তথ্য দেবে, তন্ময়কে দেবে না। পুরুষ ঘৃণা করার যথেষ্ট কারণ তাদের আছে।

‘কলিং বেল তো নষ্ট দেখি।’ বিরক্ত হয়ে বললেন মারুফ ভাই।
বার দুই বেল চেপে দেখে তন্ময়ও, ‘তাই তো। আরেকটা রাস্তা বের করতে হবে।’
চারপাশে তাকায় ও বাড়িটার। একেবারে রাস্তার সাথে বানিয়েছে। দরজা ভাঙ্গতে গেলে নির্ঘাত লোকজন জড় হয়ে যাবে। আর বাই অ্যানি চান্স, মতিন ভাইয়ের অবস্থা বিন্দুর মত হলে পরিস্থিতি ওদের হাতে আর থাকবে না।

‘পেছনের দিকটা দেখে আসি, চলো।’ প্রস্তাব রাখেন মারুফ ভাই।
না মেনে উপায় কি? দরজা তো “চিচিং ফাঁক” বললেই খুলে যাচ্ছে না। দুইজন ঘুরে পেছনের দিকে চলে আসে।
রান্নাঘরের পাশের ছোট দরজাটা চোখে পড়তেই একে অন্যের দিকে তাকায় ওরা। চোখে সন্দেহের দৃষ্টি।

‘পিস্তল এনেছ?’ জানতে চান মারুফ ভাই।
মাথা নাড়ে তন্ময়, ‘না। সকালে বের হয়েছি যখন, ভাবিনি দরকার পড়বে।’
‘আমার পেছনে থাকো। একটাতেই চলবে।’ কোমর থেকে একটা টানে অস্ত্রটা বের করেন মারুফ ভাই।

আস্তে করে একটা ঠেলা দিতেই দরজাটা হা করে খুলে যায়। কাওকে দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে।
জুতোর কোন শব্দ না করে সাবধানে আরও ভেতরে ঢুকে যায় ওরা। পুরো বাড়িটা একেবারে শান্ত হয়ে আছে। বাইরে থেকে কিছু পাখির ডাক শোনা যায় – এছাড়া আর কোন শব্দ নেই কোথাও।
দোতলায় ভূতের মত নিঃশব্দে উঠে আসে ওরা। একেবারে উত্তর দিকের ঘরটাতে চোখ পড়তেই পা থমকে যায় তন্ময়ের। টকটকে লাল রঙের বের হয়ে এসেছে ঘরটা থেকে। খুবই সামান্য পরিমাণে। ভেতরে কি চলছে বোঝার জন্য জ্যোতিষী হবার কোন প্রয়োজন নেই – এক হাত বাড়িয়ে পিতলের ভাস্কর্যটা তুলে নেয় তন্ময়। একেবারে খালি হাতে যাওয়ার থেকে এ বরং–

দরজাটা পেরিয়ে প্রথম চোখে পড়ল মতিন ভাইয়ের দিকে। লোকটার নাম কবে তেকে ‘গালকাটা মতিন’ হয়েছে তা ওর জানা নেই। তবে এই অবস্থাতে কেউ দেখলে তাকে ‘গলাকাটা মতিন’ নামে অনায়াসে ডাকা শুরু করতে পারে।

দ্বিতীয় শরীরটার দিকে নজর পড়তে ওর হাত থেকে লম্বা পিতলের লাঠিটা পড়ে যায়।

একটা চেয়ার উল্টে পড়ে আছে।
হতভাগ্য মেয়েটা মৃত্যুর আগে ছটফট করার সময় চেয়ারে পা বাঁধিয়েছিল নিশ্চয় – তাতেই উল্টে গেছে ওটা।
ফর্সা গলাটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার পর ক্যানভাসে আঁকা অদ্ভুত এক ছবিটার মত মনে হচ্ছে দৃশ্যটাকে। কয়েক ঘণ্টা আগে বের হয়ে যাওয়া রক্তগুলো হাল্কা জমাট বেঁধে থকথকে একধরণের ঘন তরলে পরিণত হয়েছে, রঙ পাল্টে হয়ে গেছে কালচে লাল।

জয়িতা!

বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে ওর – কাঁদতে চাইছে, ফোঁপাতে চাইছে, চিৎকার করতে চাইছে, সব কিছু ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে – কিন্তু কিছুই করতে পারে না ও।
পেছন থেকে মারুফ ভাইয়ের গুরুগম্ভীর গলাটা শোনা যায়, ‘বেডটাইম, শুয়োরের বাচ্চা।’

পিস্তলটা তুলে একবার আঘাত করেন তিনি তন্ময়ের ঘাড়ে।
কাটা কলাগাছের মত জয়িতার রক্তের ওপর শুয়ে পড়ে ও।

৬.
‘তোমার প্রেম দেখে তো আমারই চেতনাদণ্ড দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো।’ ঘোলা ঘোলা চোখে তাকানোর সাথে সাথে প্রথম এই কথাটাই শোনে তন্ময়।
দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে দেরী হয় না ওর, ‘অ্যান্টি পার্টি।’
ঘর কাঁপিয়ে হাসেন মারুফ ভাই, ‘আর কে? তোমার দুলাভাইকে আশা করনি নিশ্চয়?’
‘ধরেছেন কেন আমাকে?’

শান্ত গলাতে প্রশ্ন করে এখন তন্ময়। জয়িতাকে নিয়ে হা-হুতাশের সময় এটা নয়, স্পষ্ট বুঝতে পারছে কেন তাকে আটকে ফেলা হয়েছে। বিরোধী দলের লোক এই মারুফ ভাই, এটা এখন স্পষ্ট। আর তার প্রতি আক্রোশ থাকার কারণ একটাই হতে পারে। তন্ময়দের দলের সেক্রেটারির মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো বিরোধীদল।

তাদের ওপর এমন একটি দায় চাপিয়ে দিয়েছিল তন্ময়, যে অপরাধটি তারা করেনি। আঙুল তোলা হয়েছিলো, মামলা করা হয়েছিলো, বিরোধীপক্ষের ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে জেলখানায় ভরে দেয়া হয়েছে, ইমেজের বাজানো হয়েছিল বারোটা। এদের মধ্যে অন্তত ৫ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে, সবাই জানে।

সব মিলিয়ে মাজা ভেঙে দেয়ার সব কাজই সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলাফল হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে এবার তাদের হয়তো হারতে হবে। কোন অন্যায় না করেও মাথা পেতে নিতে হবে শাস্তি। কাজেই পালটা আঘাত হানতে চাওয়া দোষের কিছু নয়।

এখন মারুফ ভাই তাকে কেন চেয়ারের সাথে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে রেখেছেন সেটা বেশ ভালোই বোঝে ও। এভাবেই অষ্টম অপারেশনের সময় রিজভী নামক এক পাতিনেতাকে ধরেছিলো ওরা। নিজের দলের ওপর থেকে মিথ্যে অভিযোগ সরাতে স্বীকারোক্তি দরকার ছিলো।

মারুফ ভাইয়ের হাতের হাতুড়িটা দেখে বোঝা যায়, খুন তিনি করবেন না, তবে স্বীকারোক্তি আদায় করে ছাড়বেন।

প্রশ্নটাও তন্ময় জানে : “তারেক আদনানকে কে খুন করেছিলো?”

মারুফ ভাই মুচকি হাসছেন, ‘কেন তোমাকে ধরে এনেছি তা বুঝতে তো কষ্ট হওয়ার কথা না। জয়িতা নিয়ে তোমার অবসেশন আমাদের নজরে পড়েছে। মনে করছ, তোমাদের মাথামোটা তারেক আদনান যে এক বেশ্যার সাথে থাকতো ময়মনসিংহে – সেটা আমাদের জানা ছিলো না? ঠিক সেই বেশ্যার ব্যাপারেই কেন এত আগ্রহ দেখাবে আরেকজন একই দলের লোক?’
‘নাটকীয় পরিচয় ছিলো আমার আর জয়িতার।’ শুধু এতটুকুই বলল তন্ময়, পুরো ঘটনা শুধু ইলোরা জানে, এই লোকের কাছে ইলোরা ওকে বিক্রি করে দিয়েছে কি না তা ওর জানা নেই। তবে ধরে নেয়, দেয় নি। সুযোগ কাজে লাগিয়েছে মারুফ সম্ভবতঃ।
‘নিশ্চয়, অপারেশন – কিলিং তারেক আদনানের সময় সেই নাটকীয় পরিচয়? ডেট আমাদের কাছে কালেক্ট করা আছে। ওই সময় তুমি তার সাথেই ছিলে।’
কাঁধ ঝাঁকায় তন্ময়, ‘তারেক আদনান ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিলো। বিশেষ একটা মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে তখন দুইজনই ময়মনসিংহে ছিলাম।’
‘তাই?’ সরু চোখে তাকান মারুফ ভাই, ‘শেষ দিন তাহলে তারেকের মাগী তোমার বিছানাতে আসলো কী করে?’

চুপ হয়ে যায় তন্ময়।
এত কিছু জানার কথা নয় মারুফের। নিঃসন্দেহে ইলোরা সব বলে দিয়েছে। মেয়েটাও পার্টিতে ঢুকেছে নাকি?
তন্ময়ের জানা ছিলো না।
মারুফ ভাই হাতুড়ি নিয়ে এগিয়ে আসছেন। নির্যাতনটুকু হবে অবর্ণনীয়, জানে তন্ময়। ঠিক এভাবেই নির্যাতন করেছিলো ওরা পাতিনেতা রিজভীকে।

পিটিয়ে একটা একটা আঙুল ভেঙ্গে ফেলেছিলো ওরা। তারপর ইঞ্চি ইঞ্চি করে দুই হাতের চামড়া ছিলে ফেলেছিলো লোকটার। তারপরও কথা বলেনি হারামজাদা। তলপেটে দুইবার চাকু মেরেছিলো তন্ময় নিজ হাতে।
তার আধঘণ্টা পরও যখন অসহ্য গোঙ্গানী ছাড়া আর কিছু বের হয়নি লোকটার মুখ থেকে – রাগ সামলাতে না পেরে গলাতে চাকু লাথি মেরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ও।
আজ কি তার সাথে একই কাজ হতে যাচ্ছে? ওই পার্টির রিজভী সহ্য করেছিলো, তবুও স্বীকার করেনি।
আজ তন্ময় পারবে তো?

গলায় ছুরি নিয়ে ফোঁপানোর মত শব্দ করতে করতে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে মারুফ ভাই, তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে তন্ময়। তিক্ত সত্যটা মাত্র উপলব্ধি করতে পেরেছে।

পেছনে থর থর করে কাঁপছে ইলোরা।
কখন যেন গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে, ঢুকে পড়েছে এই বাড়ির ভেতর। তার কাঁপাকাঁপির রহস্যও স্পষ্ট; এই মাত্র মারুফ ভাইয়ের গলায় আস্ত একটা চাকু গাঁথিয়ে দেওয়ার মানসিক ধাক্কাটা সামলাতে পারেনি বোধহয়।

‘হাত খুলে দে। কুইক!’ চাপা কণ্ঠে হুংকার দেয় তন্ময়।

পরিশিষ্ট
জন্তুর মত চিৎকার করছে ইলোরা, কান পর্যন্ত হাসি ছড়িয়ে পড়লো তন্ময়ের। সুইয়ের মত চিকন শিকটা ওপর থেকে ঢুকিয়ে স্তনের নিচ দিয়ে বের করে আনল আবারও।
তড়পে উঠছে মেয়েটার পা দুটো, দেখে সামান্যতম অনুকম্পা হয় না তন্ময়ের মনে।

‘আমার স্বীকারোক্তি বের করতে সব নাটক সাজানো হয়েছে – এটা খুবই ভালো একটা গল্প। কিন্তু তার জন্য বিন্দু আর জয়িতাকে কেন খুন হতে হবে? গল্পের অসমাপ্ত প্রশ্ন যে থেকে যাচ্ছে, ডিয়ার ইলোরা।’
‘আমি জানি না – ওহ গড – আমি জানি না -’ হাঁফাতে হাঁফাতে বলে ইলোরা, মেয়েটাকে এখন আরও সুন্দর লাগছে – মনে মনে স্বীকার করতেই হয় তন্ময়কে।

আচ্ছা, যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় কি মেয়েদের রূপ বেড়ে যায়?

‘মারুফ বেচারাকে পর্যন্ত টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছ তুমি, ইলোরা। জানতে তার মত সে এগিয়ে যাবে – পার্টির স্বার্থে দুটো বেশ্যা খুঁজে বের করা অথবা খুন করা তার জন্য ব্যাপারই না। তাছাড়া, মৃত্যুর আগে জয়িতার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিও নিতে পারছে সে। কিন্তু, জয়িতার গলাতে ছুরি চালানোর দরকার ছিল না। জ্যান্ত জয়িতা আদালতে ভালো সাক্ষী হতে পারতো। কার হাত ছিলো ওই ছুরিটার হাতলে?’
‘আমি জানি না, প্লিজ, তন্ময়। পাগল হয়ে গেছ তুমি – একটা প্রস্টিটিউটের মৃত্যুতে -’

বিদ্যুতবেগে বাম হাতে হাতুড়িটা তুলে এনে দড়াম করে আছড়ে ফেলে ও মেয়েটার বাম পায়ের আঙুল গুলোর ওপর।
বিশ্রী একটা কড়মড় শব্দে ভরে যায় মাটির নীচের ঘরটা। আজ বিকেলে এখানেই নিয়ে এসেছে ও ইলোরাকে।

মেয়েটার গলা ভেঙ্গে গেছে চেঁচাতে চেঁচাতে। কুমীরের নিঃশ্বাস নেওয়ার মত শব্দ বের হচ্ছে এখন তার মুখ দিয়ে। হাত তুলে অন্য পায়ের ওপর হাতুড়ি নিয়ে আসে তন্ময়, ‘কে ছুরি মেরেছিলো? সত্য স্বীকার করে নাও – মুক্তি দেবো তোমাকে। নাহলে প্রতিটা হাড় ভাঙ্গব আজ তোমার।’
ঠাণ্ডা কণ্ঠটা তেমন ছোঁয় না ইলোরাকে বরং ছুঁয়ে যায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা – বাম পায়ের নিচের দিকটা গরম হয়ে গেছে, ফুলছে। হাড়গুলো ভেঙ্গেই ক্ষান্ত দেয়নি – থেঁতলে গেছে মাংস।

হাতুড়িটা শক্তি দিয়ে ডান পায়ের ওপরও নামিয়ে আনে তন্ময়, চোখ থেকে ঝর্ণার মত পানি বের হয়ে আসে ইলোরার। সত্যটা বললে ওকে মেরেই ফেলবে তন্ময়, কিন্তু আর যে পারছে না যন্ত্রণা সহ্য করতে!

‘আমি। ওহ প্লিজ, তন্ময়, আমি মেরেছি মাগীকে। তোমার সাথে আর কাওকে সহ্য হয় না আমার – যা করেছি তোমাকে ভালোবেসে – মরে যাচ্ছি তন্ময়, খুব ব্যথা, আমাকে খুলে দাও?’ হাঁফায় মেয়েটা, তন্ময় কিছু বলে না।
‘মারুফের ব্যাপারটা কন্ট্রোলে রেখেছিলাম, তন্ময়, তোমার কোন ক্ষতি হতে দিতাম না আমি – কিন্তু ওই বেশ্যাকে তোমার হতে দিতে পারতাম না আমি – প্লিজ বোঝ একটু- ‘ চোখ দিয়ে পানি পড়ার যেন কোন বিরাম নেই – তার মাঝেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলাতে বলে ইলোরা, ‘আমাকে খুলে নামাও? অনেক ব্যথা যে! পিপাসা খুব – একটু পানি খেতাম -’

খুব কাছে চলে আসে তন্ময়, বার দুই গাঁথিয়ে দেয় হাতের চাকুটা ইলোরার তলপেটে।
হেঁচকি ওঠানোর মত শব্দ হচ্ছে এখন মেয়েটার মুখ দিয়ে।
মরবে ও, তবে অনেক সময় নিয়ে।

ওর সামনে থেকে ঘুরে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য এগোয় তন্ময়। পেছনে কাতরাচ্ছে ইলোরা – দড়াম করে দরজা লাগিয়ে দেয় ও।
খারাপ একটা মেয়ের রক্ত লেগে আছে শরীরে, গোসল করতে হবে।

— ০ —
রচনাকাল – সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৪

সন্তান

১.

‘আমার পেটে শাহেদের বাচ্চা।’

লিনিতার মেসেজটা দেখে পাছার ধাক্কায় চেয়ার উল্টে ফেললাম।
ছুটির দিন বাসায় বসে আয়েস করে ফেসবুকে চক্কর দেওয়ার মাঝে যে আনন্দ সেটা ব্যাচেলর ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। মাথার ওপর বন বন করে ঘুরতে থাকা ফ্যানের বাতাস আর কানের মাঝে ঝনঝন করে বাজতে থাকা লিংকিন পার্কের ‘ক্রলিং’; ব্যাচেলর হৃদয় এসময়গুলোয় থাকে দুশ্চিন্তা মুক্ত। ‘কেয়ামত নামিয়া আসিতেছে’ জাতীয় সমস্যাগুলো ছাড়া এর ব্যত্যয় ঘটে না।
ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর পেটে বন্ধুবরের বাচ্চা – এটা একটা কেয়ামত নেমে আসার মতো সমস্যা। চেয়ার উল্টে ফেলার জন্য মনের ভেতর কোনরকম পাপবোধ অনুভব করলাম না।
থাবড়ে থুবড়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি অফ হয়ে আছে। চার্জ শেষ হয়ে গেছে কখন জানি। পাঁচ বর্ণের একটা ছোট অথচ উপর্যুপরি নোংরা গালি দিয়ে ওটাকে চার্জারের সাথে লাগালাম। দ্রুত হাতে অন করছি ডিভাইসখানা।

লিনিতা এরকম কঠিন সমস্যায় পড়ে মোবাইলে ফোন না দিয়ে কেন ফেসবুকে মেসেজ দিয়েছে – ব্যাপারটা আমার কাছে এখন পানির মতই পরিষ্কার। মোবাইলের চার্জ ইত্যাদি নিয়ে গতকাল রাত থেকে খোঁজ খবর কিছু নেয়া হয়নি। শুধু গতকাল রাত বলে নয় – মোবাইল পাগলা বলে এককালে পরিচিত আমি গত একটি বছর ওই যন্ত্রটার ব্যবহার প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম।
ওপাশে রিং হচ্ছে। প্রথমবারের পর দ্বিতীয় রিংটুকুর শব্দ আর হতে শোনা যায় না। লিনিতা রিসিভ করে ফেলেছে।

‘তুই কই?’ ফোন ধরতেই জানতে চাইলাম।
‘কাজী অফিসে রে। রাজাবাড়ীর কাজি অফিসে। তুই একটু দেখবি প্লিজ -’
‘শাহেদ কোথায়?’ পাল্টা জানতে চাইলাম আমি।
‘ও তো এখানে নাই – তুই একটু দেখবি ও কই? একা একা দাঁড়িয়ে আছি।’
‘ওখানে কি করছিস?’
‘আজকে আমাদের বিয়ে করার কথা ছিলো।’ ওপাশে ফোঁপানোর শব্দ শুনলাম। মেয়েটা কাঁদছে?
‘দাঁড়ায়ে থাক। আমি আসছি। পনের মিনিট দাঁড়া, ওকে? আর দেখছি শাহেদ্যা কোথায়। এসে শুনবো পুরো ঘটনা।’

লিনিতা কিছু বলতে চাইছিল হয়ত – ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম। ঘটনা নিদারুণ প্যাঁচ খেয়েছে।
লিনিতার বাবার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির কথা আমার অজানা নয় – এর সাথে বিয়ের দিন ঠিক করে রেখে শাহেদের অন্তর্ধানটার ব্যাপারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সাবধানে আগানো দরকার। সব রিলেশনে ‘কাইজ্যা’ বাঁধে।
এবার লিনিতাদের রিলেশনে বেঁধেছে। ‘কাইজ্যা’র আকার নেহায়েত ছোট নয়। এটা ঠিকমত সামলাতে না পারলে মগডালে উঠে যাবে দুটোই। সাহায্যকারী হিসেবে আমি সেই গাছের তলে চাপা পড়বো।

শাহেদের প্রাণের বন্ধু মোস্তফাকে ফোন লাগালাম। সেই সাথে স্যান্ডোগেঞ্জির ভেতরে নিজেকে একটা সুইয়ের মত গলিয়ে দিচ্ছি। হাতে একেবারেই সময় নেই।
লিনিতা ওখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছে – বিষয়টা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। ওর পেটে কি আসলেই শাহেদের বাচ্চা? মাথা ঘুরেটুরে পড়ে যায় যদি?

মোস্তফা ফোন ধরছে না।
শালার পরবর্তী চৌদ্দগুষ্টির উদ্দেশ্য গুণে গুণে সতেরটা গালি দিয়ে ইমার্জেন্সী ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে এক লাফে বাসা থেকে বের হয়ে যাই।
গন্তব্য – রাজাবাড়ির কাজী অফিস।
অথবা, গন্তব্য – লিনিতা।

২.
লিনিতা আমাকে দেখে ক্লান্ত ভঙ্গীতে একটু হাসলো। তারপর টলে উঠে একবার।
রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকলে মাঝে মাঝে টলবেই। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে একহাতে ধরে ফেললাম।

‘শাহেদ কোথায়?’ দুর্বল গলাতে জানতে চায় লিনিতা।
আমি হাল্কা করে মাথা নাড়লাম, ‘শাহেদকে খুঁজে পাচ্ছি না। শালার মোবাইল বন্ধ, শালার ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই মনে হয় বিজি। তুই এখানে শাহেদের জন্য অপেক্ষা করবি?’

নিষ্পাপ শিশুর মত মাথা দোলায় লিনিতা। এক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলাম।
এক বছরে আরও সুন্দর হয়েছে মেয়েটা। পারফিউম দিয়ে এসেছে কি না বুঝতে পারছি না। তবে মিষ্টি একটা গন্ধ নাকে আসছে। এটা স্মেল-গ্ল্যান্ড থেকেও আসতে পারে। নারীর বিশেষ গন্ধ শুধু ছেলেরাই পায়। তেমনটা হয়ত পাচ্ছি এখন আমি। কতদিন ওর সাথে এত কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলা হয় না!

‘শাহেদ এদিকে আসলে নিশ্চয় ফোন দেবে? তুই আমার সাথে চল তো। ছায়ায় বসা যাক।’
চারপাশে ইতিউঁতি তাকাই। দূরে নতুন রেস্টুরেন্টটা দেখা যাচ্ছে। লিনিতার হাত ধরে টান দিলাম, ‘চল, ওখানে ঢুকি।’
‘কিছু খাবো না তো।’ বিড় বিড় করে মেয়েটা।
‘লাচ্ছি খাওয়া যেতে পারে। রোদের মাঝে খুব বীরত্ব দেখাচ্ছিস। পিপাসা তো লাগার কথা।’

লিনিতা এবার আর আপত্তি করে না। দুইজন ওদিকে আগাচ্ছি, আড়চোখে লিনিতাকে একবার দেখে ‘কাইজ্যা’র গভীরতা মাপার চেষ্টা করলাম।
একহাতে একটা ডাফল ব্যাগ। ভ্যানিটি ব্যাগের সাইজও মাশাআল্লাহ – চায়ের আস্ত দুটো ফ্লাস্ক রাখা যাবে। সেই সাথে চোখ মুখের ক্লান্তি – একটা দিকই ইঙ্গিত করে।

বাসা থেকে এই মেয়ে ভেগে গেছে।
লিনিতার চোখে আড়চোখেই চোখ পড়ল। ওকেও দেখলাম আমাকে মাপছে। মুচকি একটা হাসি দেয় ও এবার।

‘কাঁধে ব্যাগ চড়িয়ে দৌড়াচ্ছিস কোথায়? যাচ্ছিলি নাকি কোথাও?’
‘যাচ্ছিলাম তো বটেই।’ সায় দেই আমি, ‘ভেগে যাচ্ছিলাম।’
‘আমার মেসেজ দেখেই বুঝে ফেলেছিস – বাসা থেকে পালাচ্ছি। তাই না?’
‘অতটুকুই। আর কিছু বোঝার সৌভাগ্য হয়নি আমার এখনও। তুই বোঝাবি – এই আশায় আছি।’

লিনিতার চলাফেরায় আগের মত উচ্ছ্বল ভাবটা লক্ষ্য করলাম না। ঢিলেঢালা পোশাক পরে আছে। বোঝার উপায় নেই তলপেটে আস্ত একটা বাচ্চা নিয়ে ঘোরাফেরা করছে কি না। তবুও অসভ্যের মত কয়েকবার তাকালাম।
লিনিতা মজা করেনি তো বাচ্চা প্রসঙ্গে? লেট ম্যান হিসেবে আমার সুখ্যাতি আছে। সেটা এড়াতেই কি একটা মিথ্যা বলে আমাকে ঘর থেকে বের করেছে ও?

ঠান্ডা এক কোণের টেবিল দখল করতে করতে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, লিনিতার বাবুর ব্যাপারে আমার মাথা ব্যাথা কিসের? শাহেদের সাথে চুটিয়ে প্রেম করেছে একটা বছর ধরে – একটা উইকএন্ডেও রাতগুলো শাহেদের বাসার বাইরে কাটায়নি লিনিতা। ওর পেটে বাচ্চা আসবে না তো কি আমার পেটে আসবে?

বোকা মেয়েটা সতর্ক হতেও শেখেনি। এখন লেগেছে ‘কাইজ্যা’।
বোঝ এখন!

আমার দিকে ক্লান্ত ভঙ্গীতে তাকালো মেয়েটা। তারপর কী বিষণ্ণ একটা মুখ নিয়েই না হেলান দিল চেয়ারে।
‘দোষ আমার। পিল নিতে ভুলে গেছিলাম।’ আস্তে করে স্বীকার করে লিনিতা।
‘নিজেকে দোষ দিস নে।’ আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম ওকে, ‘শুধু বল শাহেদের প্রতিক্রিয়া কি?’

উত্তরটা জানার জন্য আমার বুকের ভেতরটা ধ্বক ধ্বক করতে থাকে। এরকম সময় ছেলেরা পল্টি মারে বলে শুনেছি। শাহেদ আমার বন্ধু, তবে খুব ঘনিষ্ঠ কেউ নয়।
তাছাড়া লিনিতার বয়ফ্রেন্ডের সাথে লুঙি শেয়ার করার মত বন্ধুত্ব হবে আমার – সেটাও আমি চাবো না কখনও।
সব মিলিয়ে শাহেদের মনের অবস্থা আমার বোঝার কথা নয়।

‘শাহেদ অনেক ভালো রে। মেনে নিয়েছে ও। তাছাড়া আগে থেকেই জানতাম কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না। টেস্ট করে আমার প্রেগনেন্সির ব্যাপারে আগেই জানতাম। মাসখানেক হয়ে গেল। কিন্তু তখন আমরা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম সবকিছু। এর মাঝেই বিয়েটা করে ফেললেই ঝামেলার একাংশ মিটে যেত।’
বিরক্তি আর চেপে রাখতে পারলাম না, ‘তাহলে একমাস পর কেন বিয়ের জন্য ঘুরছিস? এতদিনে তো তোর শ্বশুর বাড়িতে চলে যাওয়ার কথা।’
‘বাবা মেরে ফেলত শাহেদকে।’ শান্ত গলাতে বলে লিনিতা। আর আমি হয়ে যাই চুপ।

হাল্কা নাক টানে মেয়েটা। চমকে ওর মুখের দিকে তাকাতেই দেখি কাঁদছে ও।
আস্তে করে ওর হাত নিজের হাতে তুলে নিলাম।
একটুও শান্ত হল না এতে ও, ‘আপুর একবার হয়েছিল – জানিস – রাজন ভাইয়ের সাথে রিলেশন ছিল আপুর – বাবা ভাইয়াকে … ’
‘আচ্ছা,’ তিক্ত গলাতে বললাম আমি, ‘রাজন ভাই গত তিন বছর ধরে এজন্যই নিখোঁজ, অ্যাঁ? গুলি করে ফেলে রেখেছে কোথাও, তাই তো?’

ক্যাম্পাস আলোড়ন উঠিয়ে উধাও হয়ে গেছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্ট সিনিয়র রাজন ভাই। পলিটিকস করতেন না। তবে জার্নালিজমের ক্ষেত্রে কাওকে ছাড় দিতেন না। আমরা তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।
নির্দিষ্ট একটি দলের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা জ্বালাময়ী কলামই উনার মৃত্যুর পেছনের একমাত্র কারণ – সে ব্যাপারে আমাদের মনে কোনই সন্দেহ ছিলো না। মানববন্ধন, আমরণ অনশন – সবই করা হয়েছিলো।
কাজে দেয়নি।

এখন দেখছি ঘটনা ভিন্ন!

রাজন ভাইকে নিয়ে লিনিতার মাথাব্যাথা তেমন দেখলাম না। আমার হাত আঁকড়ে ধরেছে ও এই মুহূর্তে।
‘আপুর অ্যাবোরশন করিয়েছিলো বাবা। আমি আমার বাবুটাকে ওদের হাতে খুন হতে দেবো না, নীরব। প্লিজ, আমাকে একটু সাহায্য করবি? বাবুটাকে নিয়ে পালিয়ে থাকতে হবে আমাকে কয়টা দিন।’

একজন মা তার অনাগত সন্তানের জন্য কতখানি মায়া অনুভব করে সেটা আমি আগে বুঝতে পারিনি কখনও। এখন সেটা লক্ষ্য করে খেয়াল করলাম বুকের কাছে কোথাও দলা পাকিয়ে উঠছে। চার বছর ধরে মেয়েটাকে ভালোবাসি – তবে আজকের মত অসীম মায়া কোনদিন অনুভব তো করিনি ওর জন্য!

শক্ত করে ওর হাত ধরে বললাম, ‘লিনি, আমি আছি। তোমার বাবুকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। কেউ না!’

পকেটের মাঝে মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। হাত বাড়িয়ে ওটা বের করে আনলাম।
মোস্তফার ফোনকল দেখে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শান্তি অনুভব করলাম। এই ব্যাটার নাগাল পাওয়া গেলে শাহেদকেও পাওয়া যাবে। গার্লফ্রেন্ডের পেট বাঁধিয়ে ভেগে গেছে নাকি শালা?

ছেলেজাতিকে কোন বিশ্বাস নেই।

রিসিভ করতেই ওপাশে মোস্তফার মেয়েলী গলাটা শুনতে পেলাম, ‘কি রে, ফোন দিয়েছিলি নাকি? গডজিলা দেখতেছিলাম। বালের মুভি। সময়টাই নষ্ট করে-’
‘তোমার মুভির আলাপ শোনার জন্য ফোন দেই নাই আমি।’ ক্যাট ক্যাট করে উঠলাম।

লিনিতা চমকে উঠে আমার দিকে তাকায়। বেশি জোরে তো বলিনি – তবুও চমকে গেছে।
নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে থাকি এবার। এত করেও মোস্তফার পরের কথা শুনে আমার মুখ থেকে বের হওয়া বাক্যটা বেশ জোরেই উচ্চারিত হল।

‘আর তুমি হাওয়ার নাতি আরাম করে মুভি দেখতেছ? শাওয়া!’ টেবিলে মোবাইল আছড়ে ফেললাম আমি।
‘কি হয়েছে?’ শিশুদের মত মুখ করে আমাকে প্রশ্নটা করে লিনিতা।

ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছে হয় আমার।
ইচ্ছে হয় ওর ঘন রেশমী চুলে হাত ডুবাই।
শক্ত করে বুকে আটকে রেখে বলি, ‘কিছু হয় নি, লিনি সোনা। কিছু হয় নি, সব ঠিক আছে, তোমার বাবুটাকে আমি জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করব।’

কিন্তু এগুলোর কোনটাই করতে পারলাম না। শুধু শুকনো গলাতে বললাম, ‘গতকাল রাতে শাহেদকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। সম্ভবতঃ তোমার বাবার হাত আছে এর পেছনে।’

৩.
প্যাঁ-প্যুঁ করে লঞ্চটা ছেড়ে দিলো।
পারাবত – ১১।
গন্তব্য – বরিশাল।

বাইরে থেকে লিনিতার কেবিনে বার দুয়েক টোকা দিলাম। দরজা সাথে সাথে খুলে যাওয়ার কারণ নেই – রেইলিংয়ে এসে দাঁড়ালাম।
মিষ্টি বাতাস আমার মুখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। বুড়িগঙ্গার করুণ হাল হতে পারে – লঞ্চগুলোকে বমি করে খোলা বড় নদীতে এই ছোট নদীটাই পাঠাচ্ছে। চারপাশে এর মাঝে আঁধার নেমে এসেছে। আগামীকাল সকাল নাগাদ পৌঁছে যাবো আমরা বরিশাল।

এই মুহূর্তে আর কোন ভালো সমাধান পেলাম না। বরিশালে আমার খালাতো ভাইটি আছে অনেকদিন ধরেই। কাশীপুরে থাকে, ব্রজমোহন কলেজের একজন নবাগত লেকচারার।
ভাইটির সাথে আমার বয়েসের পার্থক্য খুব বেশি না। বোঝালে পরিস্থিতি তিনি বুঝবেন বলেই মনে করেছি। আমার এখন আর আমাকে বা লিনিতাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে না। চিন্তা হচ্ছে শাহেদকে নিয়ে।
পুলিশের লোকেরা শাহেদকে নিয়ে সোজা লিনিতার প্রভাবশালী বাবার সামনে এনে ফেলবে সন্দেহ নেই।
তারপর কি হবে?

রাজন ভাইয়ের মত এই ছেলেও কি নিখোঁজ হয়ে যাবে না?
আমার মনের একটা অংশ গোটা ব্যাপারটায় পৈশাচিক একটা আনন্দ অনুভব করছে – বুঝে রীতিমত লজ্জায় ভরে গেল মনটা।
ছি ছি – এটা আমার ভাবা তো উচিত না। লিনিতার সন্তানটি এই শাহেদেরই – আর শাহেদেরই অধিকার সবচেয়ে বেশি লিনিতার ওপর। আড়াল থেকে মেয়েটিকে ভালোবাসতে পেরেছি এই তো যথেষ্ট।
দৃশ্যপট থেকে প্রেমিকার প্রেমিক সরে গেলে আনন্দে বগল বাজানোটা তো ছোটলোকি হয়ে যায়। আমি ওরকমটা কিভাবে করতে পারি?

তবে শাহেদ না আসলে আমার করণীয় কি সেটাও আমি জানি। আর একবছর পর জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাদের ব্যাচটাও বের হয়ে যাবে। নিজের একটা ভবিষ্যত আমি গড়ে তুলতে পারবো। আর তাতে থাকবে লিনিতা আর তার বাবুটা।

পেছন থেকে খুট করে দরজাটা খুলে যায়। চওড়া একটা হাসি উপহার দিলাম লিনিতার দিকে। তারপর সাবধানে ভেতরে ঢুকে যাই। কেবিনের ভেতরটা বেশি বড় নয়। তবে বেশ একটা ‘পানিতে আছি’ ‘পানিতে আছি’ ভাব টের পাওয়া যায় এখানে।

‘ভাবিস না। আর কয়েক ঘন্টার পর একেবারে রাডারের নিচে চলে যাবি। তোর বাবা তোকে জোনাকি পোকা জ্বালিয়েও খুঁজে পাবেন না।’ আশ্বস্ত করি ওকে, ‘কেমন লাগছে এখানে?’
আস্তে করে বাংকে পা দুলিয়ে বসে পড়ে মেয়েটা, ‘খারাপ লাগছে না। তুই আমার পাশে একটু বসবি?’

কোন কথা না বলে ওর পাশে বসে পড়ি। আস্তে করে আমার কাঁধে মুখ ঠেকায় মেয়েটা। তারপর একটু ঘুরে গাল ছুঁইয়ে রাখে।এক হাতে ওকে আমার সাথে জড়িয়ে রাখি আমিও। একটু কেঁপে কেঁপে ওঠে লিনিতার শরীর।

আমার দিকে বড় বড় চোখ দুটো মেলে দেয় তারপর, ‘গতকাল আমাকে আর শাহেদকে দেখে ফেলেছিল বাবার লোক।’
‘এজন্যই এতদিন পর তোরা ফাইনালি পালানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলি?’ বোঝার ভঙ্গী করলাম।
‘জানতাম তখনই। জানতাম, হাতে বেশি সময় নেই আর। কাল রাতেই যে বাবা ওকে ধরে ফেলবে সত্যি ভাবিনি।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ‘ভাবিস না। আমি ওকে মুক্ত করে আনবো।’
কিছু না বলে চুপচাপ আমাকে ধরে বসে থাকে মেয়েটা। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ও নিজেও ফেলে।
একটু করে চুলে হাত বুলিয়ে দিলাম ওর। এই বড় পৃথিবীটায় বেচারির কেউ নেই এখন, আক্ষরিক অর্থেই।

‘তোকে ধরে আছি বলে আমাকে খারাপ ভাবলি?’ আস্তে করে জানতে চায় লিনিতা।
মাথা নাড়ি আমি, ‘তা কেন? তোর ওপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে। এখন কিছু না ভেবে চুপচাপ বসে থাক তো।’
‘আমার খুব একা একা লাগছে।’ শোনা যায় না প্রায় – এভাবে বলে মেয়েটা।
ওর থুতনীতে হাত রেখে তুলে ধরলাম আমার দিকে, ‘ভয় করছে?’

পাখির বাবুর মত মাথা দোলায় লিনিতা।
ওর ছোট একটা নাক, লালচে দুটো গাল, হাল্কা ঘাম ঘাম কপাল আর কপালে জমে থাকা চুলগুলো আমাকে স্থির থাকতে দেয় না। ওকে জড়িয়ে রাখি নিজের আরও কাছে। তলপেটটা একটু ফুলে আছে ওর, বাবুটা ওখানেই বেঁচে আছে নিশ্চয় – কি অদ্ভুত!
গলা নামিয়ে বললাম আমিও, ‘আমি তোর সাথে আছি। একটুও ভয় পাবি না তুই, হুঁ?’

সাথে সাথে চারপাশের আলো নিভে গেল দপ করে। চমকে উঠে আমাকে শক্ত করে খামচে ধরে লিনিতা।
ওর কপালে একটা চুমু খেলাম, ‘তুই চুপটি করে শুয়ে থাক। আমি দেখে আসছি।’

লিনিতা অনিচ্ছাস্বত্বেও আমাকে ছেড়ে দেয় আলিঙ্গন থেকে। ঠিক এই সময় দরজার ওপর জোরে আঘাত করে কেউ।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।

এরপর ভেসে আসে ভারী গলাটা।
‘দরজা খুলুন, পুলিশ!’

চট করে একে অন্যের দিকে তাকাই আমরা। বাসা থেকে লিনিতার পালানোর পর প্রায় আঠারো ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে – কেউ কি দেখে ফেলেছে আমাদের এদিকে আসতে? লঞ্চে উঠতে খেয়াল করেছে লিনির বাবার কোন পোষা কর্মচারী?
এখন কি ওরা লিনিতাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে?

‘আমার বাবুটাকে ওরা মেরে ফেলবে!’ ফিস ফিস করে বলে লিনিতা।
অসহায়ের মত ওর দিকে তাকিয়ে থাকি আমি।

৪.
কেবিনের ঠিক বাইরে বের করে এনে আমাকে লঞ্চের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে রাখা হয়েছে। পকেট থেকে একে একে বের হয়ে আসে আমার চকচকে স্মার্টফোন, একটা মানিব্যাগ, আর বাসার চাবিটা।

‘চাবি নিয়ে ঘোরেন কেন?’ ছোট খাটো একটা হাতির সাথে যায় – এমন আকারের পুলিশটি প্রশ্ন করল আমাকে।
পেছনের বডি বিল্ডার পুলিশটির চাপে আমার দাঁত খুলে যেতে থাকে, তার মাঝেই কোনমতে উত্তর দেই, ‘তালা খোলার জন্য।’
‘চেহারা দেখে তো পাক্কা চোর লাগতেছে, স্যার। এরে দিয়া এর চেয়ে বড় কাজকাম কিছুই হইবো না।’

এই পুলিশটার দিকে ঘাড় বাঁকা করে তাকালাম। রেইলিংয়ে পশ্চাদ্দেশ ঠেকিয়ে ডান হাতের কানি আঙুল দিয়ে ঘষঘষ করে কান চুলকাচ্ছে। ইচ্ছে করছিল এক ধাক্কা দিয়ে ব্যাটাকে রেইলিংটা পার করে পানিতে ফেলে দিতে।
কিন্তু পারলাম না।

‘এই শালার চেহারা সুবিধার লাগছে না।’ তিনজনের মাঝে নেতাগোছের পুলিশটি এবার বলে, ‘খিঁচে সার্চ কর তো, সোহরাব।’

সোহরাব আমাকে ‘জাতা’ মেরে দেওয়ালে এতক্ষণ চেপে রেখেছিলো নিশ্চয়। এবার তার হাত দুটো অসভ্যের মত আমার শরীরের ওপর ঘোরাফেরা করতে থাকে। ‘খিঁচে’ সার্চ করছে।
সমকামী নাকি?

কান চুলকানোর কাজ শেষ করে তৃতীয় পুলিশ আমার ব্যাগ নিয়ে পড়ল, ‘বিশ হাজার টাকা। নগদ। স্যার, এর মানে কি?’
‘স্যার’ দুই লাফে ব্যাগের কাছে চলে গেছেন ততক্ষণে, ‘আরে এই-ই তাহলে আমাদের সেই লোক।’
আমি ইঁদুরের মত শব্দ করে বললাম, ‘কোন লোক?’
‘শাট আপ!’ তড়পে উঠলেন পুলিশ ভদ্রলোক, ‘নগদ এত টাকা কেন? আর মাইয়া নিয়া চলতেছ – কিছুই বুঝি না?’

আমার বুকটা ধ্বক করে ওঠে। লিনিতার পালানোর খবর এরা জেনে গেছে নির্ঘাত! আর এজন্যই একেবারে দলবল নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। মেয়েকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েই বাচ্চার বারোটা বাজিয়ে দেবে নিশ্চয় বাবা-মহাশয়। আর আমাকে ‘নাগর-প্রবর’ মনে করলে স্রেফ নাগরদোলায় চড়ানো হবে – এতেও সন্দেহের কিছু দেখলাম না।

আমাকে সার্চ করতে থাকা লোকটাকে বিরক্ত হয়ে বলেই ফেললাম, ‘আর কত সার্চ করবেন? নগ্ন করে ফেলবেন নাকি?’
মুখ ঘষে নোংরা পুলিশটা, ‘হলে তো ভালোই হয়। অন্ধকারে সার্চ করা যায় না ঠিক মত।’
নেতা পুলিশটা আমার মাথার পেছনে রোলার দিয়ে একটা উপর্যুপরি গুঁতো দেয় এসময়, ‘ন্যাকামি হচ্ছে! বাচ্চাটা কই? অ্যাঁ? বাচ্চা কোথায়?’

মাথাতে এত জোরে আগে কেউ মারেনি আমাকে। গোঁ গোঁ করতে করতে পড়ে গেলাম।
লিনিতাকে দেখলাম শিউড়ে উঠেছে একেবারে। আমি মাটিতে শুয়ে পড়েছি ততক্ষণে। খুব বলতে চেষ্টা করলাম, ‘আমাকে মাফ করে দিস, লিনি!’
কিন্তু পারলাম না।

কান চুলকানি পুলিশ উঠে দাঁড়ায় আমার ব্যাগের ওপর থেকে। বলে, ‘বাচ্চা দেখলাম না, স্যার।’
স্যার মাথা দোলালেন, ‘টাকাটা রেখে দাও। শিওর তো?’
দাঁত কেলায় সোহরাব, ‘ওই কাজে আমরা কোনকালে শিওর ছিলাম না, স্যার?’
নেতা-পুলিশের অহংয়ে বাঁধল এবার, ভারী গলাতে বললেন, ‘আমি বাচ্চার কথা বলেছি।’
‘নাই, স্যর।’

মনে মনে আমি বললাম, ‘বাচ্চা তো লিনিতার পেটের ভেতর। ব্যাগের চিপাতে খুঁজে কে কবে পেয়েছে ওই জিনিস?’
মুখে কিছু বললাম না।
চিৎ হয়ে শুয়ে আছি – এই সময় কানে খাটো পুলিশটি স্যারের দিকে এগিয়ে যায়, ‘মোবাইলখান ভালো মাল স্যার।’
‘বেশি টেনো না, ইদরিস।’ সতর্ক করে লিডার-পুলিশ, ‘পরে ঝামেলায় পড়বে। টাকা নিয়েই আপাতত সন্তুষ্ট থাকো।’

আমার মোবাইল সম্ভবতঃ ওদের সাথে যেতে চাইছিল। হাহাকার করে রিংটোন বাজিয়ে ডেকে উঠলো ওটা।
আমি ধড়মড় করে উঠে বসছিলাম, তার আগেই নাফরমান পুলিশটা রিসিভ করে ফেলেছে। তাও আবার লাউডস্পীকারে।
আমি এখান থেকে রেজা ভাইয়ের গলাটা স্পষ্ট শুনতে পেলাম। ক্যাম্পাস সিনিয়র।

‘আরে মিয়া তুমি সারারাত ফোন অফ কইরা রাখছো! এখন আবার ফোন ধর না। কয়বার ফোন দিছি তোমারে?’

আমি মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছি রোলারের বাড়ি খেয়ে। কিভাবে রেজা ভাইকে বোঝাবো তখন আমি আমার স্বপ্নবালিকার হাত ধরে ছুটে পালাচ্ছিলাম। বালিকা পালাচ্ছিল তার বয়ফ্রেন্ডের বাচ্চা পেটে নিয়ে। মানে, বয়ফ্রেন্ডের অদৃশ্য হাত ধরে!
অভূতপূর্ব রোমান্টিক মুহূর্তগুলোয় রেজা ভাইয়ের ফোনকল কেটে দেওয়া ছাড়া আমার গতি ছিলো না। শালার পুলিশ – ধরেই ফেলল ফোনকলটা।

নেতাটি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘কথা বলেন।’
আমি খামচি দিয়ে ফোনটা ধরলাম, পুলিশ ইঙ্গিতে বলল ‘লাউডস্পীকার অন থাকুক’। চিংড়ির মত মুখ করে ফোনের সামনে মুখ নিতেই হল।

‘কি ব্যাপার, নীরব। কথা বলছ না কেন? মিউজিয়মে আমি প্রায় চার ঘণ্টা ধরে। তোমাকে সাথে করে আসতাম – তোমার খবর নেই কেন?’
আমি ফোন হাতে এবার বাঘ হয়ে গেলাম, ‘আমার গার্লফ্রেন্ড প্রেগনেন্ট। ওকে নিয়ে বরিশাল যাচ্ছি।’

পুলিশ তিনজন স্রেফ ‘দোচনা’ হয়ে গেছে। একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে ওরা। আমি নিশ্চিত, ফোনের ওপাশে রেজা ভাইয়ের প্রেশারও কয়েক ডিগ্রী বেড়ে গেছে। আর সব সময় চমকালে তিনি যা করেন –চোখ স্রেফ কপালে তুলে ফেলেছেন।

‘লে হালুয়া।’ বিড় বিড় করে বললেন তিনি।
‘ভাই মহা ঝামেলাতে পড়ে গেছি। কথা তো শোনেনা শিরিন। পিল নিতে মনে না থাকলে আমার দোষ?’
‘না না , তোমার আর কি … আচ্ছা, সরি, ঝামেলা সামলাও। আমি এদিকটা দেখছি।’

ফোন রেখে দিতেই পুলিশ তিনজন আমাকে ধরে বসালো, লিডার হাতের কাছে রোলার রাখলেও এখন বেশ কোমল তাঁর চেহারা, ‘ইয়ে, ইনি কে ছিলেন?’
দেওয়ালেই হেলান দিলাম আমি, ‘ক্যাম্পাসের সিনিয়র। আমাদের ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই। একটা কেস স্টাডির জন্য ডেকেছিলেন। আমার যাওয়া হয় নি।’
‘কেস স্টাডি?’
‘আমরা জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের।’

পুলিশ তিনজনের চেহারা হয়েছে দেখার মত।
নিমেষে হুংকার ছাড়লেন নেতা-পুলিশ, ‘ভাইয়ের জিনিস ফেরত দে। দেখ, সবকিছু ঠিকমত দিয়েছিস কি না। ভাইরে দেখা সব ঠিক আছে কি না!’
সোহরাব হারামজাদাকে দেখলাম পাছার ভাঁজ থেকে আমার বিশ হাজার বের করে আবার ব্যাগে রাখছে। মনটা চাইলো কানের ওপরে আর নিচে একটা করে বসিয়ে দিতে। কিন্তু লিনিতার কম্পমান শরীর দেখে কিছু বললাম না।
মেয়েটাকে ওরা সার্চ করেনি ঠিকই – কিন্তু দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

পুলিশগুলো আমার জিনিস গুছিয়ে সাজিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দেয়। তারপর একবার ক্ষমাপ্রার্থনা করতে তারা ভোলে না। নেতাটিকে দেখলাম দাঁত বের করে একটা নোংরা জোকস শুনিয়ে দিলো।
আমিও শুকনো হাসার ভান করলাম। একটু আগে যে মাথার পেছনে গর্ত করে দিয়েছে রোলার মেরে – তার কৌতুক শুনে প্রাণ খুলে হাসা যায় না।

ওদের সামনেই লিনিতাকে জড়িয়ে ধরি। কাঁপছে মেয়েটা।
কানে কানে বললাম, ‘ভয় নেই, লিনি। শান্ত হও।’
মেয়েটা আমাকে চুপচাপ জড়িয়ে থাকে। কাঁপুনি আগের চেয়ে কমে গেছে।

শুনতে পেলাম, কান চুলকানো পুলিশ গলা নামিয়ে বলছে, ‘আগেই কইছিলাম না, মাইয়া পোয়াতী?’
আমি গলা চড়িয়ে জানতে চাইলাম, ‘শুনুন?’

নেতা পুলিশ চমকে ফিরে তাকায়।
হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে যাই, ‘কারেন্ট চলে গেল কেন?’
হতভম্ব দেখায় এবার পুলিশকে, ‘আমি তো ঠিক জানি না। সম্ভবতঃ পাওয়ারে কোন সমস্যা হচ্ছে। দেখছি আমি।’

মাথা দুলিয়ে লিনিতার দিকে ফিরে আসছি – নীচে কোথাও প্রচণ্ড শব্দ হল। তারপরই চিমনি বেয়ে লক লক করে আকাশের দিকে ছুটে যায় আগুনের শিখা।
নিচে কিসের শব্দ হয়েছে তা আমি বুঝতে পেরেছি। মেরুদণ্ড শীতল হয়ে যায় আমার ওতেই।

শব্দটা বিস্ফোরণের!

৫.
লঞ্চ ডুবছে।
লিনিতার হাত ধরে ছুটছি প্রানপণে। একেবারে মাঝ নদীতে ডুবতে থাকা লঞ্চের ভেতর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়।
সবাই ছুটছে – যার যেদিকে মন চায়।
এদের অধিকাংশই সাঁতার পারে না।

সাঁতার পারলেও খুব একটা কিছু আসে যায় না। লঞ্চ ডোবার সময় ডুবন্ত একটি মগ যেভাবে বালতির পানি টেনে নেয় – সেভাবে সবাইকে টেনে নিবে নিজের ভেতরে। তারপর ডুববে।
এটার চেয়ে বড় সমস্যা হল আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলছে। ছড়িয়ে আসছে এদিকে।
লিনিতার হাত শক্ত করে ধরে আছি। ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যেতে ওকে আমি দেব না। অনেক দিন অপেক্ষার পরে এই মেয়েটিকে পেয়েছি। আর হারাতে চাই না ওকে আমি।

শাহেদের ওপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে। যেই ছেলে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না – তার কি কোন অধিকার আছে লিনিতার ভালোবাসা পাওয়ার?
মেয়েটার দিকে একবার আড়চোখে তাকাই – ভীত হরিণীর মত দেখাচ্ছে ওকে। আগুণের হলদে আভা তার চোখে মুখে পড়ছে। আরও বেশি সুন্দর লাগে ওকে আমার এই মুহূর্তে।

শাহেদ তো ওর জন্য কিছু করে নি। বিয়েটা পর্যন্ত করতে পারলো কোথায়? বরং সন্তানের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
সতর্কতা গ্রহণের জন্য তার কি কোন পদক্ষেপ নেওয়ার ছিলো না?
আগুনে ডুবন্ত একটা লঞ্চ থেকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে আমার লিনিতা – শাহেদ কোথায় এখন?

পাশের রেইলং টপকে এক মাঝ বয়েসী লোক পড়ে যেতে থাকে পানিতে – হয়ত কারও ধাক্কা লেগেছে, তাল সামলাতে পারেননি।
দৃশ্যটা আমাকে থমকে দেয়। লিনিতা পাশ থেকে তাড়া দেয়, ‘এগিয়ে চলো, নীরব। দাঁড়াবে না।’
ভয়ার্ত চোখে ওর দিকে তাকালাম, ‘যাবো কোথায়?’

কিছু বলল না ও, হাঁফাচ্ছে। একে অন্যের দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে থাকি আমরা।
লঞ্চ আগের চেয়েও ডুবে গেছে এখন। আর আধঘণ্টার মাঝেই পানির তলে চলে যাবে একেবারে – যা মনে হচ্ছে।
কেউ একজন ফ্লেয়ার গান দিয়ে আকাশে একটা ফ্লেয়ার মারে। রাতের আকাশ কিছুটা আলোকিত হয়ে উঠেছে ওটার আলোতে।
কান না পাতলেও লঞ্চের যাত্রীদের চিৎকার, কান্না আর হাহাকারে পরিবেশ ভারী হয়ে আসতে শুরু করেছে এরই মাঝে। লিনিতা ঝট করে চোখ সরিয়ে নেয় ঠিক তখনই। আচমকা দৌড় দেয় সিঁড়ির দিকে।

সবাই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে এখন। ওপরের অংশ পরে ডুববে – ধারণাটাকে পুঁজি করে বাঁচার চেষ্টা একটা। সেই ভীরের মধ্য দিয়ে লিনিতা নিচের দিকে নামতে থাকে। কাজটা সহজ না – সবার ধাক্কা খাচ্ছে মেয়েটা।
বাবুটার গায়ে ওই ধাক্কাগুলো প্রভাব ফেলবে না?
ঠিকভাবে কিছু ভাবার আগেই ওর পিছু নিলাম।

ওপরের দিক থেকে দোতলা নেমে আসতেই সিঁড়ির গোড়ায় পানি দেখতে পাই। এই ফ্লোরে এখন একজন মানুষও নেই!
দূরে কোথাও চর চর শব্দ শোনা যাচ্ছে। আগুনের ধ্বংসাত্মক শব্দ!
লিনিতা এরই মাঝে গোড়ালি ডোবানো নদীর পানিতে নেমে পড়েছে। এই ফ্লোর এখন নদীর সারফেস লেভেলেরও আট ইঞ্চি নিচে!

ছুটে গিয়ে ওকে ধরলাম আমি, ‘পাগল হয়ে গেছিস তুই? ওপরে চল, পাগলামি করিস না!’
লোহার বালতিটা এই সময় লিনিতার পায়ে বেঁধে যায়। পড়েই যাচ্ছিল – দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ধরে ফেললাম।
ভারসাম্য সামলে নিয়ে আমার দিকে ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকায় মেয়েটা। কেমন করুণ একটা অভিব্যক্তি ফুটে আছে ওর চোখে মুখে।
‘নীরব?’
‘ওপরে চল।’
‘আ’ম সরি…’

আচমকা পেছনের দিকে সরে গেছে লিনিতা – আমি নড়ে ওঠার আগেই বালতিটা তুলে এনে দড়াম করে আমার মাথাতে বসিয়ে দেয় ও। দুই পা পিছিয়ে গেছি – তারপর তৃতীয় পা পেছতে পারলাম না – সিঁড়িতে পা বেঁধে পড়ে গেলাম।
ঘোলা ঘোলা দেখতে পাচ্ছি – লিনিতা ওর ট্রাউজার খুলে ফেলছে। আমি নড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মস্তিষ্কের কথা শুনছে না শরীর একদম। নদীটা ধীরে ধীরে উঠে আসছে ওপরের দিকে। আমার থুতনীর কাছে পানি চলে এসেছে এখন। লিনিতার নাভী পর্যন্ত ডুবে আছে।
টান দিয়ে কিছু একটা বের করছে ও ওখান থেকে।

আমি আঁতকে উঠি।
বাচ্চাটা মরে যাবে তো?

তারপর – অদ্ভুত এক অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমি। পড়ে যাচ্ছি যেন অসীম শুন্যতায়!
তার মাঝেই দূরে একটা ছোট নৌকা দেখতে পাই আমি। জনকন্যাকে তুলে নিচ্ছে ওটা তার বিশাল বুকে।

পরিশিষ্ট
কে জানি বলছে, ‘শালা, ভেবেছিলাম নীরবই নিউজ হইয়া গেছে!’

ব্যাঙের মত বার কয়েক শব্দ করে চোখ মেললাম।
আছি কোথায়?
চারপাশে নোংরা পরিবেশ আর দরজাতে সাদা পর্দা দেখে বুঝলাম, জায়গাটা সরকারী কোন হাসপাতাল।

‘নবাবের জ্ঞান ফিরেছে।’ রেজা ভাইয়ের কণ্ঠটা চিনতে পারি এখন আমি।
ধড়মড় করে উঠে বসি আমি, ‘লিনিতা-’
‘হাওয়া। আমাকে যদি আরেকটু আগে জানাইতা তোমার সাথে তথাকথিত গার্লফ্রেন্ড লিনিতা – তাইলে এতক্ষণে ফাটকে পুড়ে ফেলা যেত ওকে।’
‘দোষটা কি ওর?’ কিছুটা আগ্রহী হই এবার আমাই। আধশোয়া হলাম বালিশ টেনে এনে।
‘মিউজিয়মে পরশু রাতে চুরি হল না? আরে সব ভুলে যাও তো – জার্নালিজমে কিভাবে উন্নতি করবা? ২০ ক্যারটের প্রাচীন ডায়মন্ড সাফা করে দিয়েছে খবর শোনো নাই?’

হাই আসছিলো, তবে সেটা চেপে ধরতে দরতে রেজা ভাইয়ের দিকে তাকালাম, ‘ওখানেই নিতে চাইছিলেন আমাকে গতকাল?’
‘হুঁ। নিজে তো ডায়মন্ড-চোরের সাথে ভাইগা গেছো মিয়া।’
‘বুঝলাম না।’
‘তোমার ওই লিনিতার বয়ফ্রেন্ড শাহেদের মাস্টার প্ল্যানিং পুরো চুরির ব্যাপারটা। সিসি ক্যামে সে নিজেকে বাঁচাইছে। কিন্তু মিউজিয়ম থেকে বের হয়ে রাস্তার অপোজিট ক্যামেরাতে এসে ধরা খাইছে। তখন পালাইলেও পুলিশ ওরে মার্ক করে ফেলছিলো। রাতের বেলাতেই শালাকে ধইরা ফেলছে ওরা।’
‘ওহ… কাহিনী তাহলে এটাই!’ চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে আমার।
‘আরে আরও আছে। শাহেদরে ধরলেও তো আর ডায়মন্ড পায় নাই। পুলিশ তো জানতো না শাহেদের অ্যাসিস্টেন্ট আছে একজন। বাইরে ছিলো কোথাও এই মাল, তারে মাল দিয়া শাহেদ ফুটছে আগেই।’
‘লিনিতা।’ বিড় বিড় করলাম।
‘পুলিশ শাহেদকে পিটায়া রুট বের করে ফেলছে। ডায়মন্ড ওখান থেকে সোজা যাবে বরিশাল। কিন্তু পুলিশ শুধু এটাই জানত না – কার হাত দিয়ে সেটা যাবে। ‘ চোখ বড় বড় করে বলেন রেজা ভাই।
‘এজন্য ঢালাউ সার্চের ব্যবস্থা তারা করেছিলো।’ মাথা দোলালাম।

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন রেজা ভাই, ‘এটা হল ফ্যাক্টস। তবে বাকি কাহিনী আমার হাইপোথিসিস অনুযায়ী কইতে পারি। হাসবা না কইলাম। আমি মাত্র বাইর হইতেছি জার্নালিজম থেকে।’
‘হাসবো না।’ বলেই মুচকি হেসে ফেলি।
‘লিনিতা একা ছিলো না। শালীর সাথে অন্তত একজন ছিলো আরও। ওই ব্যাটাই লঞ্চে উঠে এসেছিলো পাশে স্পীড বোট ঠেকিয়ে। বোমা মেরে তোমাদের লঞ্চের ইঞ্জিন রুম দিলো উড়াইয়া। লাভটা বুঝতেছ না?’
চিন্তিত মুখে বললাম, ‘ডুবন্ত লঞ্চের লোক উদ্ধারের জন্য পুলিশের দম বের হয়ে যাবে। ডায়মন্ড চোর খুঁজবে কে ওই রুটে?’
‘ঠিক তাই। নৌকাতে করে ভেগে গেল তোমার প্রেম – লিনিতা। ডায়মন্ড শুদ্ধ।’

হেসে ফেললাম এবার আসলেই, ‘লজ্জা দেবেন না তো। আমাকে পেলেন কোথায়?’
‘ডুইবা ডুইবা সেকেন্ড ডেকে পানি খাইতেছিলা – ওখান থেকে উদ্ধার করছে তোমাকে। পারাবত – ০৯ লঞ্চটা কাছেই ছিলো।’
মাথা দোলালাম আমি, ‘বাচ্চা খুঁজছিলো পুলিশ। আর লিনিতা ছদ্মবেশ নিয়েছিল গর্ভবতী মেয়ের। কো-ইন্সিডেন্স?’
ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন রেজা ভাই, ‘কি কও! লিনিতা প্রেগন্যান্ট মহিলার ছদ্মবেশ নিছিলো? স্রেফ রসিকতা – এই মাল পাচারের জন্য এর চেয়ে ভালা রসিকতা আর হয় না!’
‘কেন?’
’২০ ক্যারটের ডায়মন্ডটার নাম কি জানো? অফস্প্রিং। বাচ্চা এইটারে বলাই যায়।’

আস্তে করে বিছানাতে আবার শুয়ে পড়লাম।
অফস্প্রিং।
সন্তান।
বাচ্চা।

তাই তো – বলাই তো যায়।
পারাবত – ০৯ সময়মত চলে এসেছিলো দেখে নিজেকে ধন্যবাদ দিলাম মনে মনে। জার্নালিজমে উন্নতি করতে পারবো না – কথাটা হয়ত একেবারে মিথ্যা নয় – কারণ, সুযোগের সদ্যবহার করতে আমি পারি । লিনিতার উচিত ছিলো আমার মাথাতে বালতি দিয়ে আরেকবার বাড়ি মারা।
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যেন কয়েক ঘন্টা আগের দৃশ্যগুলো। মানিব্যাগে সব সময় রাখা ব্লেডটা খুব কাজে এসেছিলো। লিনিতার গলা ফাঁক করে দিতেই হারামজাদা বোট-ম্যানের চোখ কপালে উঠে গেছিল। আমার দিকে বোট থেকে নেমে এগিয়ে আসতে যাচ্ছিল অবশ্য, শালার মুখের ওপর আস্ত বালতিটা ছুঁড়ে মেরেছিলাম। তারপর সব ঠাণ্ডা। উজ্জ্বল সার্চ লাইটের আলোতে ব্যাটার গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার যোগাড়।

পারাবত -০৯ নদী কাঁপিয়ে আসছিলো – আমাকে ওখানে রেখে প্রাণটা নিয়ে পালানো ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না ওর।

আস্তে করে বেল্টের নিচে গোপন পকেটটার ওপর হাত বোলালাম।
আমার সন্তান নিরাপদেই আছে!

— ০ —

[ চ্যালেঞ্জ মিটিয়ে দিলাম। 🙂
এই গল্পটা লেখার কোন ইচ্ছে আজকে ছিলো না। দুটো লেখার শিডিউল আগে থেকেই ছিলো আজকের জন্য। এর মাঝে চ্যালেঞ্জের জন্য বাধ্য হয়েই লিখতে হল আমাকে।
যদি খারাপ লেগে থাকে – তাহলে পাঠকের কাছে আমি দুঃখিত। এক গল্প লিখতে লিখতে ওটা থামিয়ে রেখে বাধ্য হয়েই আরেক গল্প লিখতে হয়েছে আমাকে এখানে। একসাথে দুই গল্প লেখার প্যাড়া লেখক মাত্রই বুঝবেন। দুইটি প্লটকে আলাদা করে একটা ধরে লিখতে হয় তাঁকে। মানসিক টর্চার ছাড়া কিছু না।

তবে আমি সময়ের ভান্ডার আছে, অফুরন্ত সময় সেই ভান্ডারে– এমন একজন ‘লেখকে’র লেখা পড়ার অপেক্ষাতে আছি। দশটায় তাঁরও একটা গল্প দেওয়ার কথা কি না…

উল্লেখ্য, অপর গল্পটি লিখছিলাম ‘শুধুই গল্প – সংকলন বইমেলা ২০১৫’ উদ্দেশ্যে। 😉 ]

রচনাকাল – সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৪

ইরোনিয়াস

১.
দরজা খোলার সাথে সাথে মধ্যবয়েসি ভদ্রলোকের মুখে হতাশার ছাপ পড়ল।
এমনটা দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে – রায়হান স্বাভাবিকভাবেই তাকায় মানুষটার দিকে। চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি ঝুলিয়ে রাখতে ভোলেনি।

‘মি. রায়হানের কাছে এসেছি আমি। আবু মোহাম্মদ রায়হান।’ ভদ্রলোকের চোখগুলো ব্যস্ত হয়ে ঘরের এদিক থেকে ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।

আলতো করে মাথা দোলায় রায়হান, এই মানুষটি ক্লায়েন্ট সেটা ও দরজা খোলার সাথে সাথেই বুঝে ফেলেছিলো। হতাশার দৃষ্টি এই গোত্রটির চোখেই ফোটে – কারণ, এরা আসেন বড় কোন প্রত্যাশা নিয়ে।

‘আপনি ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। প্লিজ, ভেতরে বসুন।’ সাদরে আমন্ত্রণ জানায় রায়হান।

ইতস্তত পায়ে ভদ্রলোক ঢুকে পড়লেন। নোংরা সোফা সেটটার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেন তিনি। দামী পোশাকে ময়লা লেগে যাবে না কি – তাই ভাবছেন হয়ত। সেই সাথে হাল্কা কুঁচকে যাওয়া নাক দেখেই রায়হান বুঝতে পারে – এঁকে চা বা কফি সাধা চলে। কঠিন বা তরলেই এর সীমাবদ্ধতা। ধূমপান ইনি সহ্যই করতে পারেন না।

‘চা অথবা কফি?’ জানতে চায় রায়হান।
পাল্টা প্রশ্ন করেন ভদ্রলোক, ‘মি. রায়হান কি ঘরে নেই? আমার আসলে তাড়া ছিলো।’
স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়, ‘আগেই খোলাসা করা উচিত ছিলো। আমিই আবু মোহাম্মদ রায়হান।’
হতাশার চিহ্নগুলো আরও প্রকটভাবে ফুটে উঠল এবার ভদ্রলোকের চেহারায়। তবুও হাত মেলালেন ভদ্রতার খাতিরে।
‘আমার নাম মোস্তফা কামাল। আপনাকে আরও বয়স্ক কেউ হবেন ভেবেছিলাম।’

রায়হান সামান্য হাসলো। কথাটার পিঠে কোনরকম মন্তব্য না করে আবার জানতে চাইলো, ‘তাহলে কফি চলতে পারে? আপনি কি কফিতে দুধ নেন?’
কাঁধ ঝাঁকান মোস্তফা, ‘দুটোই চলে।’

রান্নাঘরে ঢুকে তাকের দিকে এগিয়ে যায় ও। তিনটি ফ্লাস্কে ভর্তি করাই আছে এখানে চা আর কফি। সারা দিনে প্রচুর চা পান করে রায়হান। মাঝে মাঝে স্বাদ পাল্টাতে কফির দিকে ঝুঁকে যায়, তবে সেটা সচরাচর সকালের দিকে। কফির ফ্লাস্কটা হাতে নিতে নিতে এপর্যন্ত ভদ্রলোক থেকে যা জানা গেছে তা একবার ভাবে ও।
এঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, টাকার খুব একটা অভাব তার নেই। তবুও বিশেষজ্ঞের কাছে না গিয়ে রায়হানের কাছে এসেছেন। অর্থাৎ এমন কিছু ঘটে গেছে যেটা তিনি গোপন রাখতে চান। সম্মানরক্ষার অদ্ভুত এক ধারণা এই উচ্চশ্রেণির মানুষগুলো ধারণ ও বহন করেন।

আরেকটি ঘটনা হতে পারে, বিশেষজ্ঞ দিয়ে ইনার কাজ হয়নি। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো হিসেবে রায়হানের কাছে এসে ধর্ণা দিয়েছেন।

বয়েস চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ – যে কোন একটা হতে পারে। কোন ধরনের সমস্যা সমাধান করতে এসেছেন বলাটা শক্ত। এই বয়েসের মানুষদের যে কোন মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। অল্পবয়েসীদের কেসগুলো ধরাবাঁধা ছকের মধ্যে পড়ে। এদেরগুলো নয়। তবে সম্মানরক্ষার ব্যাপারটি এলে, খুব সম্ভব নিজের জন্য নয় সেই নাটক।

দুটো কাপ ট্রে-তে সাজানোর ফাঁকে রায়হানের মনে হলো, সমস্যাটা এই ভদ্রলোকের ছেলে অথবা মেয়ের হতে পারে। এঁর বয়েস থেকে অনুমান করা চলে, ছেলেটি বা মেয়েটি হবে একজন টিন এজার।

ট্রে-টা সামনের টি-টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে জানতে চায় রায়হান, ‘আপনার কি একটাই সন্তান?’

মোস্তফা কামাল হাল্কা চমকেছেন। মুখের ভাবটা গোপন করার চেষ্টা না করে উত্তর দিলেন, ‘না। দুইজন।’
একটা কাপ তুলে নেয় রায়হান হাতে, ‘চমৎকার। আপনার সমস্যাটি নিয়ে তাহলে আলাপ করা যায় এখন।’

দেখাদেখি কফির কাপ হাতে নিলেন মোস্তফা কামালও, ‘তার আগে আপনার ব্যাপারে বলুন। আপনি কি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ?’
মাথা নাড়ে রায়হান, ‘উঁহু। নিজেকে আমি বলে থাকি সাইক-ইনভেস্টিগেটর। মনোরোগ নিয়ে আমার কোন একাডেমিক পড়াশোনাই নেই। ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলাম। অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি। দুই বছর পর ছেড়ে দিয়েছি – আগ্রহ পাচ্ছিলাম না।’

‘সে থেকেই এই শহরে চলে এসেছেন?’ সন্দিহান কণ্ঠে বলেন ভদ্রলোক, ‘আপনার গল্পটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।’

‘কাওকে খুন টুন করে ভার্সিটি থেকে বের হয়ে আসিনি আমি – যদি তাই জানতে চেয়ে থাকেন।’ মুচকি হেসে মানুষটার প্রশ্ন আন্দাজ করে নেয় রায়হান, ‘বাবার টাকা পয়সার অভাব ছিলো না – এই বাড়িটা দেখতেই পাচ্ছেন। ও ছাড়াও শেয়ারগুলো থেকে প্রচুর টাকা আসে। কাজেই আমার অপছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ার কোন মানে খুঁজে পাই নি।’
‘সাইকোলজি নিয়ে পড়লেই পারতেন। অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট যখন – সাবজেক্ট চয়েজে ওটা নেওয়া খুব কঠিন কিছু হওয়ার তো কথা না।’
‘নিতে পারি নি সে সময়। আমার মা চান নি ওটা আমি নেই। বয়েস কম ছিল, বাবা-মা যেদিকে চালিয়েছে সেদিকে ঘোড়া দাবড়েছি।’ কাটা কাটা ভাবে জবাব দেয় রায়হান।

এই লোককে নিজের ব্যাপারে বলতে হচ্ছে দেখে বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। একটা কেস একজনের হাতে তুলে দেওয়ার আগে তার ব্যাপারে জানতে চাইবে ক্লায়েন্ট এটা খুবই স্বাভাবিক।

‘এ বাসায় তাহলে আপনি মায়ের সাথেই থাকেন?’ মোস্তফা কামালের প্রশ্ন শেষ হয় না।
‘না। একাই থাকি।’ শান্তভাবেই বলে রায়হান, ‘বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই আমার।’
‘কিভাবে মারা গেলেন তাঁরা?’ হাল্কা চালে জানতে চাইলেন তিনি।

‘এ নিয়ে কথা বলি না আমি। কেসটা যদি আমাকে না দিতে চান – সেক্ষেত্রে কফিটা শেষ করে আসতে পারেন।’ উঠে দাঁড়ায় রায়হান। মেজাজ একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে ওর।

মোস্তফা কামাল একটু হাসলেন।
‘বসুন, প্লিজ। আপনার ওপর ভরসা করা ছাড়া আমার আসলে উপায়ও নেই। বিষয়টা খুবই স্পর্শকাতর।’

‘আপনার মেয়ের বয়েস কত?’ চট করে জানতে চায় রায়হান।
ফ্যাকাসে হয়ে গেল মোস্তফা কামালের মুখ, ‘কিভাবে জানলেন-’
‘বয়েস কত?’
‘এগারো।’
‘আপনার ছোট মেয়ে।’
ফ্যাকাসে মুখটা আরেকটু বাড়ে ভদ্রলোকের, তারপর হেসে ফেললেন, ‘মাহফুজ আমার ব্যাপারে বলেছে আপনাকে ফোনে? তাই না? আর সেসব তথ্য গড় গড় করে বলে চমকে দিতে চাইছেন আমাকে?’
অবাক হয় রায়হান, ‘ওয়েস্ট-ইস্ট ইউনিভার্সিটির লেকচারার মাহফুজ? তার সাথে গত কয়েক মাসে আমার যোগাযোগ হয়নি। আপনার ব্যাপারে যা বলেছি সেটা আপনিই আমাকে জানিয়েছেন। মুখে না জানালেও আপনাকে হাল্কা পর্যবেক্ষণ করলে এটা অনুমান করতে পারবে যে কেউ।’
থমথমে মুখে মাথা দোলালেন মোস্তফা, ‘অর্থাৎ আপনি নিজের কাজে আসলেই ভালো। আপনাকে আমার সমস্যা খুলে বলবো। তবে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, কাওকে এ বিষয়ে সামান্যও জানাতে পারবেন না। আপনার বন্ধু মাহফুজকেও না।’
‘আমার ক্লায়েন্টের ব্যাপারে আমি কাওকে কিছু জানাই না।’

বুঝতে পারছে, মাহফুজের সাথে কোনভাবে এই ভদ্রলোকের পরিচয় আছে। তিনি হয়ত ব্যতিক্রমী কোন সাইকিয়াট্রিস্ট খুঁজছিলেন – বেচারাকে সে রায়হানের ঠিকানা ধরিয়ে দিয়েছে। নিজের অজান্তেই মাথা দোলালো একবার ও।
পুলিশ বাদে এই প্রথম মালদার পার্টি এভাবেই ওর কাছে এসেছে একারণেই!

‘সফল কেসের ক্ষেত্রে আপনাকে কত দিতে হয়?’ আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানতে চাইলেন মোস্তফা কামাল।
‘ত্রিশ হাজার। কেস শেষে লিখে দেবেন । কেস ব্যর্থ হলে কোন টাকা-পয়সা আমি নেই না।’
‘ফাইন। আমার কোন আপত্তি দেখছি না।’ ঘাড় কাত করে বলেন তিনি, ‘তাহলে সরাসরি আমাদের সমস্যাতে চলে আসতে পারি?’
কিছু না বলে মাথা দুলিয়ে সায় দেয় রায়হান।

‘নতুন ডক তৈরী হয়েছে এদিকে একটা। জানেন বোধহয়, কৈলাকুটিরে। ওটা আমাদের।’ গলা খাঁকারি দেন তিনি, ‘মানে, মালিকানা আমাদের পাঁচজনের। ওখান থেকে ভালো লাভ আসতে যাচ্ছে – আর আমার পূর্বপুরুষের অঢেল জমি আছে এদিকে। কাজেই ঢাকা থেকে চাকরী ছেড়ে পরিবার নিয়ে আপনাদের শহরে চলে এসেছি আমি – মাস দুয়েক হল। উদ্দেশ্য – এখানে আরও কিছু বিজনেস সেক্টর বের করে নেওয়া।’

কফিতে চুমুক দিতে বিরতি নিলেন তিনি, তারপর আবার শুরু করলেন, ‘আমিও আপনার মত কিছুটা। পূর্বপুরুষের অঢেল সম্পত্তির বদৌলতে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু তাদের সম্পত্তির পরিমাণ আমি ভোগ করে ফুরিয়ে দিতে চাই না – বরং চাই আরও বেড়ে যাক ওটা। তাছাড়া শুয়ে বসে খাওয়ার অভ্যেস আমার নেই। তাই দশ বছর শুধু চাকরী করে গেছি এক কোম্পানিতে।’
কথা কেড়ে নেয় রায়হান, ‘অবশেষে ইচ্ছে হয়েছে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে আরও ভালো কিছু বের করা সম্ভব কি না – সেটা খতিয়ে দেখতে। এটুকু আমি বুঝতে পারছি, মি. কামাল। আপনি আসল কথাতে চলে আসুন।’

একটু বিভ্রান্ত মনে হয় এবার তাঁকে, ‘এ শহরে আমাদের পুরোনো বাড়িটিতেই উঠেছি আমরা। বাড়িটাকে নিয়ে অনেক গুজব আছে । গুজবটা মূলতঃ আমার প্র-পিতামহ মানে আমার দাদার বাবাকে নিয়ে।’
‘উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকের কথা তারমানে। বলে যান।’ তেমন আগ্রহ দেখা যায় না রায়হানের ভেতরে।
‘প্রচণ্ড নিষ্ঠুর ছিলেন তিনি। জমিদারী প্রথার প্রচলন তখন ছিলো। সমুদ্রের কিনারে এ এলাকাতে তেমন কেউ মনোযোগ দিতো না। এখানকার প্রজাদের হর্তাকর্তা ছিলেন আমার গ্রেট গ্রান্ডফাদার।’
সোফাতে হেলান দেয় রায়হান আরাম করে, ‘তাকে নিয়ে গুজবটা ঠিক কি ছিলো?’
‘গুজবটা তাকে নিয়ে নয়। ওটা আমাদের বাড়িটি নিয়ে। কয়েকবার ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমি ঢাকা থেকে। কিন্তু পারিনি। প্রতিটা পরিবার সরে গেছে। তাদের অভিযোগ – বাড়ির নারীসদস্যরা অস্বস্তি অনুভব করেছে সব সময়।’
‘নারী-প্রজাদের ওপর জমিদারবাবুর নিষ্ঠুরতার পরিমাণ কি পুরুষের চেয়েও বেশি ছিলো নাকি?’

মাথা নাড়লেন মোস্তফা কামাল, ‘পুরুষের ওপর অত্যাচারের কোন মাত্রা ছিলো না আমার গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের। খাজনা দিতে একদিন দেরী হলেই প্রজাদের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার অভিনব নজির তিনি রেখেছিলেন। তবে বাড়ির গুজব পুরুষাঙ্গ নিয়ে নয়।’
বুঝতে পারল রায়হান, তবে একমত হল না। বরং মাথা হাল্কা দুলিয়ে প্রশ্ন করল, ‘পুরুষাঙ্গবিহীন প্রজাদের স্ত্রীরা ঠিক কোথায় থাকতো তখন?’

গম্ভীর হয়ে যান কামাল, ‘গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার স্ত্রীদের দিকে চোখ দিতেন ঠিকই – তবে রতিক্রিয়াতে মেতে উঠতেন কন্যাদের সাথে। তাঁর পদ্ধতি ছিলো খুবই অভিনব। মা-মেয়েকে নিয়ে এসে মেয়ের ওপর চড়াও হতেন তিনি মাকে বেঁধে রেখে। ধর্ষণের ফাঁকে ফাঁকে নিজের যৌনসঙ্গীর মাকে ছুরি দিয়ে বার বার আঘাত করতেন। এটাই ছিলো উনার রুচি।’
“যে নারীর মেয়ে নেই?”
“তাদের মাকে ধরে আনা হতো, বয়েস যতই হোক।”
“যার মা এবং মেয়ে কোনটাই নেই?”
“স্বামীর পুরুষাঙ্গের সাথে যেত তাদের গর্দানখানাও।”
সামনের টেবিলে কাপ নামিয়ে রাখল রায়হান, ‘কাজেই – অসহায় সেসব নারী মারা পড়েছিলো আপনাদের ওই বাড়িতে। গুজবের শুরু ওখানে হওয়া মোটেও বিচিত্র নয়। কিন্তু ইতিহাস নিশ্চয় সমস্যা নয় আমাদের জন্য? আজ আমার বাড়িতে আপনি এসেছেন বাস্তব কিছু নিয়ে আলোচনা করতে। সে প্রসঙ্গে চলে আসতে পারেন।’

‘কিন্তু ইতিহাসের একটা ভূমিকা আছে। জমিদার-পূর্বপুরুষটি সব বয়েসী নারীদের সাথে বিছানাতে যেতেন না। শিশু আর কিশোরীদের সাথেই তিনি মিলিত হতেন।’ শান্ত কণ্ঠে আগের প্রসঙ্গেই ফিরে যান মোস্তফা কামাল, ‘আমার মেয়েটির বয়েস এখন ওই বয়েসসীমার ভেতরে।’
‘আপনি আপনার মেয়ের নাম এখনও বলেন নি।’ হঠাৎ বাঁধা দেয় রায়হান।
‘ঈপ্সিতা।’
‘কি ধরনের আচরণ করেছে আপনার মেয়ে?’

এক মুহূর্ত ইতস্তত করেন মোস্তফা কামাল। রায়হানকে বিশ্বাস করা যায় কতটুকু তা ভাবছেন।
তারপর গলা খাঁকারি দিলেন একবার।

‘কাজের ছেলে ছিলো একজন আমার বাসাতে। বয়েস বেশি না।’ চোখ পিট পিট করে তাকালেন ভদ্রলোক, ‘তিন রাত আগে ছেলেটির পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়েছে ঈপ্সিতা।’

২.
‘এই ঘরে থাকতেন আফনে।’

যোবাইদা নামের কাজের মেয়েটা দেখিয়ে দিতে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে রায়হান। শহরের একেবারে অন্যপাশে এই বাড়িটা। ছোট একটা টিলার ওপরে। এখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়।
নিঃশব্দে যোবাইদা বের হয়ে গেছে – রায়হান ধীরে সুস্থে নিজের কাপড়গুলো বের করে করে খালি আলনাতে তুলে রাখে। বাইরের ঘরের মত এই ঘরের দেওয়ালেও ঝুলছে ছবি। ছবিগুলোর ভেতরের নারীরা প্রত্যেকে নগ্ন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটে এসে বসে রায়হান। এই ছবিগুলো দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন কেন মোস্তফা কামাল আজও? দুইজন আন্ডারএজড ছেলে মেয়ে এখানে বাস করে!

প্রশ্নটা ভদ্রলোকের সাথে দেখা হলেই জেনে নেওয়া যাবে।
গতকাল তাঁর সাথে তেমন কথা হয়নি। শুধু ঈপ্সিতার সমস্যাগুলো শুনেই আগ্রহী হয়ে উঠেছে ও কেসটার ব্যাপারে। কাজের ছেলেটার মৃত্যুর কথা একেবারেই চেপে যাওয়া হয়েছে। সবাই জানে, ছেলেটি বিশ হাজার টাকা সাথে নিয়ে পালিয়ে গেছে। পুলিশ জমিদারের বাড়িতে ঢুকে তদন্ত করবে না। তাদের কাছে বড়লোকের মুখের কথাই কাফি।

মোস্তফা কামাল থানায় ওই গল্পটিই জানিয়েছেন। যে কোন মূল্যে যেন ছোকরাকে গ্রেফতার করা হয়। নিজের মেয়ের কীর্তি ঢাকতে এটুকু তাঁকে করতেই হত – এ বলে কৈফিয়ত দিয়েছেন তিনি রায়হানকে। ও অবশ্য তেমন একটা গায়ে মাখে নি বিষয়টা। মানসিক কোন রহস্য থাকলে সেটা সমাধানে রায়হান আগ্রহী। কে কোথায় খুন হলো না পুরুষাঙ্গ হারালো তা দিয়ে তার কিছু এসে যায় না। পুলিশ মাঝে মাঝে তার সাহায্য নিয়ে থাকে – তার মানে সে ওদের একজন নয়। কাজেই আইনের দিক থেকে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা নিয়ে চিন্তা করার প্রশ্নই আসে না।

ঘরের প্রতিটা আসবাবই জমিদারবাড়ির সমান বয়স্ক। অথবা ওরকম বলেই মনে হচ্ছে। এমনও হতে পারে মোস্তফা কামালের বাবার সময়কার এসব। আর ওটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে বড়। প্রাচীন যে কোন কিছুর মতই।

ভালো করে তদন্ত করে দেখার জন্য রায়হান তিনদিন এই বাড়িতে থাকতে চেয়েছে। ঈপ্সিতা তার কর্তন-কর্ম সেরেছে রাতের বেলাতে। কাজেই রাতে থাকাটা বিশেষ জরুরী। আর একটা কেস নিলে সাবজেক্টের মানসিক অবস্থা কী থেকে প্রভাবিত হতে পারে, তা জানা রায়হানের দরকার। সে জন্য সাবজেক্টের পরিবেশে দুই একদিন কাটানোটা দরকার। সতর্কতার জন্য একদিন বেশি নিয়েছে ও। তিন দিন তিনরাতের মাঝেই এই কেসটা সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।

একটা ভাঁজ করার মত টেবিল নিয়ে যোবাইদা ঢুকে পড়ল। তার দিকে মুখ তুলে তাকালো রায়হান। মেয়েটা একবারও এদিকে নজর দিল না, চুপচাপ টেবিলটা ঘরের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে বের হয়ে যায়।
ঘরটার বিশালত্ব প্রথমবারের মত চোখে পড়ে ওর এবার। খাট, কাপড় রাখার বিশাল আলমারি, আয়না সহ একটা বড় ড্রেসিং টেবিল, আলনা আর বুক সেলফ রাখার পরও অনায়াসে ইনডোর ক্রিকেট খেলা যাবে। কাজের মেয়েটা এরই মাঝে আবার ফিরে এসেছে। হাতে বড় একটা ট্রে, নাস্তাগুলো টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।

‘আমি নাস্তা করেই এসেছিলাম।’ মৃদু কণ্ঠে বলে রায়হান।
মুখ ফিরিয়ে তাকালো যোবাইদা, তবে সরাসরি ওর দিকে নয়, কেমন অস্বস্তিকর একটা ভঙ্গী যেন – রায়হান ঠিক ধরতে পারে না, ‘সাহেবে বলছেন আপনের লগে নাস্তা বইবেন।’
মাথা দোলায় ও , ‘ঠিক আছে।’

প্রায় সাথে সাথেই ঘরে ঢুকে পড়লেন মোস্তফা কামাল। চমৎকার চুলগুলো আজ ব্যাকব্রাশ করা, গাল হাল্কা নীলাভ হয়ে আছে। সম্ভবতঃ সদ্য শেভ করেছেন। চুল আর ত্বক দেখে মনে হচ্ছে মাত্রই গোসল করে এসেছেন। রায়হান বোঝে সাত সকালে এঁর গোসলের অভ্যাস আছে।
উঠে দাঁড়ায় ও, হাত বাড়িয়ে দেয় – নিঃসংকোচে হাত মেলালেন মোস্তফা।

‘আপনাকে খুব বেশি সময় বসিয়ে রাখিনি তো? গোসলে একটু দেরী হয়ে গেল।’ দুঃখপ্রকাশের ভঙ্গীতে নয়, যেন বলার জন্য বলছেন এভাবে বলেন তিনি।
‘না না, মাত্রই এলাম।’ আশ্বস্ত করে রায়হান।
চেয়ার এনেছে যোবাইদা একটা, ওটা টেনে নেন মোস্তফা, ‘হাত ধুয়ে বসে পড়ুন। আর বেলা করে কাজ নেই।’

কাজেই বসে পড়ে ও। ঢাকনা সরাতেই দেখা গেল মিহিভাবে বেলা রুটি আর নাম না জানা অসংখ্য পদের রান্না পরিবেশন করা হয়েছে।
‘চিনতে পারছেন না?’ রায়হানের বিভ্রান্ত দৃষ্টি লক্ষ্য করে হেসে ওঠেন মোস্তফা, ‘কচ্ছপের মাংস।’
চোখ কুঁচকে গেছে ওর, লক্ষ্য করে দ্রুত আবার বলেন তিনি, ‘স্যামন ফিশ। টিনে করে আনা। ডক কাছে হওয়াতে হয়েছে সুবিধে। সবকিছুই সামুদ্রিক। ওই মাছগুলো কেমন অদ্ভুত রকমের সুস্বাদু হয় খেয়াল করেছেন?’
একটু হাসে রায়হান, ‘কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে এদের। মিঠেপানির মাছ থেকে আলাদা লাগে খেতে। ভালোই।’

মোস্তফা কামাল চরিত্রটাকে ঠিক বুঝে উঠে না ও, গতকাল ছিলেন নিখুঁত ভদ্রলোক। ময়লা সোফাতে বসতে চাইছিলেন না। তারপর আজকে আতিথেয়তার চূড়ান্তে এসে মেহমানের ঘরে এসে একসাথে নাস্তা করতে চাইলেন এবং একেবারেই হঠাৎ খাবারের সময় বাজে রসিকতা – ঠিক শোভন নয় সেটা। স্বাভাবিক মোস্তফা কামালের সাথে যাচ্ছে না।
এক মানুষের ভিন্নরূপ দেখতে পেলে সেটা মাথার ভেতর নোট করে রাখতে হয় – অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটা জানে রায়হান।

মোস্তফা কামাল সম্ভবতঃ রায়হানের অস্বস্তির কারণটা বুঝলেন। চট করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেন তিনি।

‘আপনাকে কেন ডেকেছি তা আশা করি বুঝতে পারছেন?’
রুটির টুকরোটা গিলে ফেলার আগে রায়হান উত্তর দেয় না, ‘আপনি চাইছেন ঈপ্সিতার ব্যাপারটা একটা সমাপ্তিতে আসুক। নিজের মেয়েকে চিনতে পারছেন না আপনি। হঠাৎ করে তার অচেনা হয়ে যাওয়ার কারণটাও ঠিক বুঝতে পারছেন না। কাজেই এখানে আমাকে দরকার হয়েছে।’
মাথা নাড়লেন মোস্তফা, ‘সেটা বড় ব্যাপার না। বড় কথা হল ঈপ্সিতা একজন মানুষ খুন করেছে। সে আবারও আঘাত হানবে কি না আমি জানি না। আপনার কথা সত্য – আমার মেয়েকে আমি চিনতে পারছি না। কিন্তু আমার চোখ থেকে দেখুন – আমার মেয়ে একজন খুনী। এই অনুভূতিটা আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। তার বিচারের জন্য পুলিশের কাছে আমি যাবো না। তার কারণ এই না, ঈপ্সিতা আমার মেয়ে। তার কারণ এটাও না, ঈপ্সিতার বয়েস মাত্র এগারো। আমি পুলিশের কাছে বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই নি – কারণ আমার মনে হয়, বিষয়টা একেবারেই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে নি, মানে-’

শব্দের অভাব বোধ করছেন মোস্তফা কামাল, বোঝে রায়হান, তাঁর কথাটা সে নিজেই শেষ করে দেয়, ‘আপনি ভাবছেন এখানে অতিলৌকিক কিছু একটা আছে। নিজের জমিদার পূর্বপুরুষের বিদেহী আত্মা এই বাড়িতে আটকে গেছে এরকম কিছু একটা ভাবছেন আপনি।’
হাল্কা মাথা দোলান মোস্তফা কামাল, ‘বলতে পারেন। আসলে, আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছি না এমন কিছু। নিজেকে বাস্তববাদী মানুষ হিসেবেই চিনি। আবার উড়িয়েও দিতে পারছি না একেবারে।’
পানির গ্লাসটা টেনে নেয় রায়হান, ‘আপনার পূর্বপুরুষটি সম্পর্কে বলুন। আগে তেমন বিশদ জানা হয় নি।’

‘রুদ্রপ্রতাপ রায়। নামের প্রতি তিনি অবিচার করেন নি। জীবনটা কাটিয়েছেন প্রতাপের সাথে। রুদ্রমূর্তি ধারণে ইনার জুড়ি ছিলো না।’ মৃদু হাসলেন মোস্তফা কামাল, হাসিটা তিক্ততার, ‘হাল্কা ভাবে বলছি বটে, তবে নিজের পূর্বপুরুষের আচরণ নিয়ে আমি মোটেও গর্ব করার মত কিছু দেখি না। নিজের বংশ তো আর পাল্টানো যায় না। তাই না?’
‘তা বটে। জমিদারবাবুই কি এই বাড়ির পত্তন ঘটিয়েছেন?’
‘হুঁ। তার এই একটা কাজই লজ্জা পাবার মত নয়। আর সবই -’

এই বাড়ি তৈরি করতে যে পয়সা আর শ্রম নেয়া হয়েছে তা যে তার লজ্জাস্কর কর্মকাণ্ডের ফলাফল তা রায়হান মনে করিয়ে দিল না আর। যার বাড়িতে দাওয়াত, তাকে চটানো স্বাস্থ্যের জনয সব সময় উপকারী নয়।

‘স্বভাবের দিকে এঁর মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরতে পারবেন? খেয়ালী হন এঁরা। ইনার খেয়ালটা কোনদিকে ছিলো?’
একটু ভাবলেন মোস্তফা কামাল, ‘আলাদা করে এভাবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিন প্রজন্ম আগের কথা – বুঝতেই পারছেন। তবে পারিবারিক ডায়েরী থেকে যা জানতে পেরেছি – ইনার খেয়ালের অভাব ছিলো না। তীর ধনুক দিয়ে মানুষ শিকার করতেন ইনি। অযোগ্য বলে প্রমাণিত চাকর বাকর আর প্রজাদের হতে হত শিকার। ময়দানে তাদের পালানোর সুযোগ দেওয়া হত। ঘোড়া চড়ে একে একে সবাইকে শিকার করতেন। খাওয়ার ব্যাপারেও তাঁর খামখেয়ালীপনা ছিলো। মাসে একদিন রাজভোজ হত। সে ভোজে তিনি মেয়ে মানুষের বুকের মাংস খেতেন। অবশ্যই রান্না করা হত সেটা। কাঁচা মাংস আবার উনার পছন্দ ছিলো না।’
‘প্রজাদের ভোগের সামগ্রী ছাড়া আর কিছু ভাবেন নি দেখছি ইনি!’ তিক্ত কণ্ঠে বলল রায়হান, ‘আপনাদের পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো কবে?’
‘আমার দাদা করেছিলেন।’

চুপচাপ খাওয়াতে মন দেয় ওরা আবার।
রায়হানের মাথাতে নতুন তথ্যগুলো ঘুরছে। পারিবারিক ডায়েরীর কথা উল্লেখ করেছেন মোস্তফা কামাল। তবে সেটা রায়হানকে পড়তে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। অথচ ও জানে, সমস্যাটার গোড়া রুদ্রপ্রতাপ রায়ের ইতিহাসে থাকলে ওই ডায়েরী পড়া লাগবে ওকে। তবে এই মুহূর্তে ওটা না হলেও চলবে।

‘ঈপ্সিতাকে বলেছি আজ স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই।’ খেতে খেতে জানালেন মোস্তফা।
‘তা কেন?’ অবাক হয় রায়হান, ‘ওর স্বাভাবিক জীবনে বাঁধা দেওয়া যাবে না। ওকে অবশ্যই স্কুলে পাঠান।’
‘কিন্তু ভেবেছিলাম তার সাথে আপনি কথা বলতে চাবেন।’ অবাক হন মোস্তফা।
‘তা অবশ্যই বলবো।’ একমত হয় রায়হান, ‘তবে স্কুল থেকে ও ফিরে আসার পরও তা বলা যাবে। নয় কী?’
“অবশ্যই। সে কথাই রইলো তবে। তবে দয়া করে আপনি নিজের সত্যিকারের পরিচয় দেবেন না। আমি চাই না মেয়েটা জানুক আপনি তাদের পাগলামি সারাতে এসেছে। বিগড়ে যেতে পারে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন?”
মাথা দোলালো রায়হান, “অবশ্যই। চিন্তা করবেন না এ নিয়ে।”

আর কিছু বলল না ও। ঈপ্সিতা নামক সাবজেক্টটার রুমে একবার ঢুঁ মারতে হবে ওকে যখন সে তার ঘরে থাকবে না। স্কুলে গেলে সেই টাইম গ্যাপটা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। মূল লক্ষ্য ওটাই ছিল রায়হানের। মেয়ে স্কুলে গিয়ে বিদ্যাবাগীশ হবে এমন সদিচ্ছা থেকে স্কুলে পাঠাতে তোড়জোড় করেনি সে।

৩.
ছোট্ট মেয়েটা দুই হাত সামনে ছেড়ে দিয়েছে। ও অবস্থাতেই একে অপরের সাথে আটকে রেখেছে ওদের।
মুখটা একেবারেই নিষ্পাপ – এগারো বছরের শিশুদের মাঝে যেটা থাকে। চুলগুলো ছেড়ে রেখেছে – কাঁধের ওপর এলিয়ে আছে ওগুলো। চোখের মাঝে নিরীহ একটা দৃষ্টি। বাবা যখন বলেছিল তার বন্ধু কথা বলবে ওর সাথে, ভেবেছিল অনেক বয়স্ক কেউ হবে। রায়হানকে দেখে অবাক হয়েছে। এরপর এরকম একটা নিরীহ দৃষ্টিই ফুটে উঠেছে ঈপ্সিতার মুখে।
অস্বাভাবিক কোন আচরণ রায়হান এখন পর্যন্ত দেখেনি।

‘দাঁড়িয়ে কেন? বস তুমি।’ একটু হাসে রায়হান, ‘তোমার নাম তো ঈপ্সিতা, তাই না?’
মাথা দোলায় মেয়েটা। কথা বলে উত্তর দেয় না, অথবা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না।
‘আগে ঢাকার কোথায় থাকতে তোমরা?’ ঘরোয়া আলাপের ভঙ্গিতে জানতে চায় ও।
প্রথমবারের মত কথা বলে ঈপ্সিতা, ‘ধানমন্ডি। তুমি চেন?’
‘হুঁ। সুন্দর জায়গা। ওখান থেকে এখানে এসে তোমার মন খারাপ করে না?’
চুল দুলিয়ে মাথা নাড়ে বাচ্চা মেয়েটা, ‘না। এ জায়গাটা আরও ভালো।’
‘পুরোনো বাড়ি ভালো লাগার কথাই অবশ্য। তোমাদের এই বাড়িটা বিশাল। তাই না?’
চোখ সরু হয়ে যায় ঈপ্সিতার, এতটাই আচমকা রায়হানও প্রস্তুত ছিলো না, ‘আপনি আমাকে কেন প্রশ্ন করছেন? আমি কি কিছু করেছি?’

রায়হান চাইলে বলতে পারতো, ‘প্রশ্ন নয়, ঈপি, তোমার সাথে এমনি আলাপ করছি।’ তবে এসব ভুজুং ভাজুং দিয়ে এই মেয়েকে ভোলানো যাবে না। মোস্তফা কামালের ধারণা ছিলো কাজের ছেলের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার ঘটনাটা ঈপ্সিতার মনে নেই। শকে চলে গেছিলো তখন মেয়েটা।
তবে এই মুহূর্তে রায়হানের মনে হয়, পুরো বিষয়টা সে মনে রেখেছে। কাজেই, বিপদের সম্ভাবনা দেখা মাত্র আক্রমণে চলে গেছে। মেয়েটি বয়সে ছোট বলে ওকে হাল্কাভাবে নেওয়ার কোন কারণ নেই আর। একে মুখ খোলাতে ভালো বেগ পেতে হবে।

কাজটা করার সময় কি এই ভূতুড়ে মেয়েটা ব্যাপারটিকে উপভোগ করেছিলো? ভাবনাটা মাথাতে আসতেই রায়হানের মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে শীতল প্রবাহ টের পায় ও।

‘তোমাকে প্রশ্ন করছি, কারণ – তোমার সাহায্য আমার প্রয়োজন, ঈপ্সিতা।’ সোজাসাপ্টা কথা বলছে এভাবে জবাব দেয় রায়হান, ‘আমি একজন লেখক। আর এবারে যে উপন্যাসটা লিখতে চলেছি – সেটা একটা পুরোনো বাড়ি নিয়ে। তোমাদের বাড়িটার মতই। আরও মজার ব্যাপার কি জানো? ’
ঈপ্সিতাকে দেখে মনে হয়, এই ব্যাখ্যাতে সে সন্তুষ্ট হয়েছে, জানতে চায়, ‘কী?’
‘গল্পের নায়িকা তোমার মত ছোট্ট একটা মেয়ে। কাজেই – তোমার সাথে কথা বললে মেয়েটাকে চেনা আমার জন্য সহজ হবে।’

মাথা দোলায় ঈপ্সিতা, যেন বুঝেছে সবই। রায়হান প্রশ্ন চালিয়ে যায়, ‘কাজেই, আমার জানা দরকার – বড় একটা শহর থেকে আমার নায়িকাটি যখন প্রাচীন এই জায়গাতে আসল, তখন তার ঠিক কেমন লেগেছে। মন খারাপ কতটুকুই লেগেছে পুরোনো জায়গা ছেড়ে আসতে, কতটুকু ভালো লেগেছে নতুন জায়গাতে আসতে। অথবা -’
‘আমি এখানে আমার পরিবারকে ফীল করি।’ উদাস একটা ভঙ্গীতে বলে মেয়েটা।
একটু গভীরভাবে ভাবে রায়হান, ‘পরিবার মানে, তুমি তোমার পূর্বপুরুষের কথা বলছ?’
‘ভালোবাসে আমাকে ও। অন্যরকম ভালোবাসা। জায়গাটা আমার খুব পছন্দ।’ মুচকি হাসে ঈপ্সিতা।

হাসির ধরন দেখে ভেতরটা কেঁপে ওঠে রায়হানের।
চারপাশে একবার তাকায় দ্রুত। দিনের আলো স্পষ্ট। তারওপর কথা বলছে একজন বাচ্চা মেয়ের সাথে। আচমকা কেন নার্ভাস লাগছে ওর – সেটা বুঝতে পারে না সে।
তবে একটা ভালো দিক হল, হঠাৎ নিজেকে খুলে দিয়েছে সাবজেক্ট। একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে অল্প সময়েই ক্লু দিয়েছে। এটুকু পেতে কারও কারও পেছনে সপ্তাহখানেক ব্যায় করা লাগে।

ও তাকে ভালোবাসে। ওকে মেয়েটা ফীল করে! ও হল পরিবার।

“ও” টা কে?

‘জায়গাটা আমারও ভালো লেগেছে।’ একটু হাসে রায়হান, ‘ও তোমাকে অন্যরকম ভালোবাসে – ব্যাপারটা ভালো।’
চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঈপ্সিতার, যদিও কণ্ঠে রুক্ষতা এনে ফেলেছে, ‘আপনি কিছুই জানেন না।’
‘ওর নামটা বলবে আমাকে?’
‘তা দিয়ে আপনার দরকার কী?’ একেবারে হঠাৎ আক্রমণে চলে গেলো আবার ঈপ্সিতা।
‘তোমাকে বলতেই হবে, এমন কিছু না। ইচ্ছে না হলে থাকুক। তবে আমার গল্পের মেয়েটাও পরিবারের একজনের বিশেষ ভালোবাসা পায়। সেজন্য জানতে চেয়েছিলাম।’
সরু চোখে মেয়েটা তাকায় ওর দিকে, ‘আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না। ওর নাম বলতে পারি – তবে ভবিষ্যতে আমার সাথে কথা বলতে আসবেন না, এই কথা আপনাকে দিতে হবে।’
একটু ভেবে রাজি হয়ে যায় রায়হান, ‘কথা দিলাম।’
‘আমার বাবাকে বলে আমাকে কথা বলতে বাধ্য করাবেন না?’
‘করাবো না। তোমাকে আর ঘাঁটাবো না আমি।’ একটু হাসে রায়হান, ‘জোর করার মত মানুষ বলে ভাবছ হয়তো, আমি ওরকম নই।’

জ্বলন্ত চোখে চেয়ে থাকে মেয়েটি। ঠোঁটদুটো একে অন্যের সাথে চেপে বসেছে।
রায়হানের মনে হল এখনই চেয়ার থেকে উঠে বেড়িয়ে যাবে মেয়েটা, তাকে বিশেষ ভালোবাসতে থাকা মানুষটির নাম না বলেই।

ওর ধারণা সত্য প্রমাণ করার জন্যই উঠে দাঁড়ায় মেয়েটা। চেয়ারটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় একপাশে। ঢোকার সময় যে শান্ত মূর্তি নিয়ে ঢুকেছিলো ও – তার ছিঁটেফোঁটাও এখন অবশিষ্ট নেই। চরিত্র যেন আচমকাই পাল্টে গেছে ওর।

দরজা দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার আগে ফিরে তাকায় ঈপ্সিতা।
হিস হিস করে হিংস্র একটা কণ্ঠে উচ্চারণ করে, ‘ওর নাম রুদ্র।’

৪.
বাগানের এক কোণে বসে সবুজ রঙের পেয়ালা থেকে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন মোস্তফা কামাল। সেদিকে এগিয়ে যায় রায়হান।
মোস্তফার সঙ্গে অসামান্যা সুন্দরী এক মহিলা আছে এখন। আর আছে চৌদ্দ-পনের বছরের এক কিশোর।
কাছাকাছি গিয়ে মুখে হাসি ফোটায় রায়হান।

‘যাক, আসতে পারলেন তাহলে।’ বিশাল এক হাসি দিয়ে রায়হানের হাসির জবাব দেন মোস্তফা, ‘বসুন। বসে পড়ুন। নিজে না গিয়ে যোবাইদাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছি বলে কিছু মনে করেননি তো?’
হাসিটা মোছে না রায়হানের মুখ থেকে, ‘আমি বাঙালী অতিথেয়তার চেয়ে ইংরেজ আতিথেয়তাকে বেশি পছন্দ করি। এটাই ঠিক আছে। নিজের বিকেল বেলার জগিং বাদ দিয়ে যদি আমার ঘরে গিয়ে ডেকে আনতেন– তবেই বিরক্ত হতাম।’
সোজা হয়ে বসেন মোস্তফা, ‘দারুণ লাগলো আপনার এই চিন্তাটা। আমিও এভাবেই ভাবি, বুঝলেন। অথিথিপরায়ণতার নাম করে আমরা আসলে পর-অধিকারচর্চা করে থাকি। তবে বাংলাদেশি সবাই এরকম ভাবে না। মানে ভাবতে চায় না… পরিচয় করানো হয় নি – মাফ করবেন।’
মহিলার দিকে ফিরলেন তিনি, ‘দিস ইজ মাই বিউটিফুল ওয়াইফ, রাইসা।’
মাথা দোলায় রায়হান, ‘প্লেজার টু মীট ইউ, মিসেস কামাল। ’
‘আর এ হল আমার বড় ছেলে, জাহিদ। জাহিদ, উনি হলেন মি. আবু মোহাম্মদ রায়হান, এসেছেন ঈপ্সিতার চিকিৎসার জন্য।’

ছেলেটা ভদ্র আছে, নিজের সীট থেকে উঠে এসে হাত বাড়িয়ে দেয়, ‘আপনার ব্যাপারে শুনেছি, স্যার। মাহফুজ ভাইয়া বলেছে, নিজের কাজে আপনার মত দক্ষ আর কেউ নেই।’
হাত মেলায় রায়হান, মুখে হাসি, ‘বন্ধুর ব্যাপারে যখন কোন বন্ধু প্রশংসা করে – হয়তো চাপাবাজি সেটা নয়, তবে বেচারা বন্ধুর প্রতি তার উচ্চধারণা থাকতে পারে। কাজেই সবকিছু বিশ্বাস করতে নেই।’
‘আপনার বিনয়ের ব্যাপারেও বলেছেন তিনি।’
‘আমাকে স্যার বলে ডাকবে না আশা করি। নাম ধরেই ডাকতে পারো। ওই যে বলেছিলাম – বাংলাদেশি-’
‘বুঝেছি।’ হেসে ফেলে জাহিদ, ‘আ’ম ওকে উইথ রায়হান।’
‘ঈপ্সিতার ব্যাপারে কি দেখলেন, মি. রায়হান?’ জানতে চাইলেন মোস্তফা কামাল।

মিসেস কামাল এক কাপ চা বাড়িয়ে দিয়েছেন ওটা হাতে তুলে নেয় রায়হান, ‘মেয়েটির ব্যাপারে আমার পক্ষে এখনও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব না। তবে তার মুড ডিজঅর্ডার আছে। ঠিক কোনদিকে যাবে তা বের করতে সময় তো লাগবেই, এখনতক আমার বেট, ডিপ্রেশন।’
‘এগুলো কি খারাপ কিছু?’ শঙ্কিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন মিসেস কামাল।
‘খুব গুরুতর কিছু হতেই হবে এমন নয়। মেয়েদের পিএমএস থেকে শুরু করে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার সবই এর মধ্যে পড়তে পারে। আগেই ভয় পাবার কিছু নেই। তবে ঈপ্সিতার কয়েকদিন আগের ইতিহাস যেহেতু আমরা জানি, হাল্কা করে নেবার উপায়ও থাকছে না। তবে এই মুহূর্তে আমি জানি না, এই মুড ডিজঅর্ডার ঠিক কি মীন করছে।’

পাশ থেকে প্রশ্ন করে জাহিদ, ‘এতে কি হয়, মুড পাল্টে যায় বার বার সাবজেক্টের?’
‘মুড স্বাভাবিক মানুষেরও পাল্টে যায়। তবে মুড ডিজঅর্ডার বলতে আরও স্পেসিফিক কিছু বোঝানো হয়। এটা বেশ ধ্বংসাত্মকও হতে পারে। ধর এই যে তুমি শান্ত ভঙ্গীতে চা খাচ্ছো – হঠাৎ প্রচণ্ড রাগ উঠলো তোমার – আমার মাথাতে চায়ের কাপটা আছড়ে ভেঙ্গে ফেললে। এটাই হল-’
‘মুড ডিজঅর্ডার।’ মাথা দোলায় জাহিদ, বোনকে নিয়ে বেশ চিন্তিত – বোঝাই যাচ্ছে।
‘কপাল খুব ভালো হলে ঈপ্সিতার কেসটা হল সিজো-অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার। কিন্তু এভাবে হুট করে রোগ নির্ধারণ করাটা আমার নীতি বিরুদ্ধ – তবুও এটা জানিয়ে রাখছি, কারণ আপনারা যতটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন তা থেকে সরে আসতে হবে। নিজেরা সুস্থ না থাকলে অসুস্থ মেয়েকে কীভাবে সহায়তা করবেন?’

ভ্রু কুঁচকে গেছে মোস্তফা সাহেবের, ‘তারমানে ও সিজোফ্রেনিক?’
মাথা নাড়ে রায়হান, ‘না। সিজো-অ্যাফেকটিভ। অর্থাৎ সিভিয়ার বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং মাইল্ড সিজোফ্রেনিয়ার মিশেল। বাইপোলার ডিজঅর্ডার থাকলে সাবজেক্টের মুড ম্যানিয়া আর ডিপ্রেশনের মাঝে সুইচ করে বার বার। সেই সাথে সিজোফ্রেনিয়ার হাল্কা উপসর্গ – প্যারানয়া, মিডিয়া অবসেশন, নিজের সম্পর্কে শারীরিক ভুল ধারণা আর ভিজুয়াল এবং অডিটরি হ্যালুসিনেশন। সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ বলতে অনেকেই শুধু এই হ্যালুসিনেশনটুকুকেই ধরে নেয় – অজ্ঞতা। যাই হোক, এই ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে চাই একান্তে। যদি সম্ভব হয়।’

ইঙ্গিতটা সাথে সাথে বুঝে যায় জাহিদ, ক্লাস এইটে পড়ে ও, একেবারে শিশু নেই এখন। বড়রা একা একা কথা বলতে চাইতে পারে। তখন ওদের থেকে দূরে চলে যাওয়া নিয়ম।

আস্তে করে উঠে দাঁড়ায় ও, হেসে জানালো, ‘আমার একটু ঘরে যেতে হচ্ছে। ডাউনলোড করতে দিয়েছিলাম একটা ফাইল – হয়ে গেছে বোধহয়। আপনারা কথা বলুন।’
রায়হান মাথা কাত করে সায় দিলো। ছেলেটাকে বেশ ভালো লেগেছে ওর। এই বয়েসেও ভদ্রতাবোধ শিখেছে বেশ।

চোখের সামনে থেকে জাহিদ দূর হতেই মোস্তফা কামালকে প্রশ্ন করে, ‘ঈপ্সিতা রুদ্রপ্রতাপ রায়ের ব্যাপারে কতটা জানে?’
‘ও ব্যাপারে খুব বেশি আলোচনা ছেলেমেয়ের সামনে তো করি নি।’ অবাক হয়ে যান মোস্তফা কামাল, ‘কেন?’
‘বাইরের মানুষ কেউ জানে?’
‘অনেক পুরোনো অধিবাসী যারা আছে। আর যারা আমার বাসায় ভাড়া থাকতে গিয়ে সাফার করেছে। তবে তাদের সাথে তো আমার ছেলে-মেয়েদের দেখা হয়নি। তখন ওরা ঢাকায় ছিল।’ অস্থির হয়ে উঠলেন মোস্তফা, ‘ঈপ্সিতা রুদ্রপ্রতাপের কথা জানে?’
‘শুধু জানে না। মেয়েটা ওকে দেখতেও পায় – যতদূর বুঝলাম।’

ঈপ্সিতার সাথে যা কথা বার্তা হয়েছে খুলে বলে রায়হান ওদের।
শুন্য চোখে তাকিয়ে থাকেন দম্পতি। মেয়ের সমস্যাটা কোনদিকে গেছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না এখনও।

‘তা কি করে সম্ভব? আপনি নিশ্চিত ঈপ্সিতা রুদ্র বলতে আমাদের পূর্বপুরুষকে বুঝিয়েছে?’
‘জমিদারবাবু ছাড়া আপনাদের পরিচিত আর কোন রুদ্র কি আছে?’ পাল্টা প্রশ্ন করে রায়হান, ‘তাছাড়া সে শুধু রুদ্রের কথাই বলেনি – বলেছে এ বাড়িতে এসে সে তার পরিবারকে ফিরে পেয়েছে। এর অর্থ একটাই – ঈপ্সিতা রুদ্রকে দেখতে পায়।’

কেঁপে উঠলেন মিসেস মোস্তফা, ‘লোকটা একশ আগে মারা গেছে!’
হাসল রায়হান, ‘এবং মরেই আছে। ঈপ্সিতা দেখতে পায় বলে আমি বোঝাইনি সে মানুষটি এখনও হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। অথবা তার আত্মা এই বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব আজগুবি কিছু দেখিনি আমি আজতক। কাজেই – সমাধানটা সহজ, মেয়েটির ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।’

‘এ থেকে ওকে কিভাবে বাঁচাবো, মি. রায়হান!’ প্রায় কেঁদে ফেলেন মিসেস মোস্তফা।
‘শান্ত হও।’ পাশ থেকে আলতো করে বলেন মোস্তফা সাহেব।

দুইজনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রায়হান, ‘ওকে সুস্থ করতে হলে আমাকে তার সমস্যাটা পুরোপুরি জানতে হবে। ঈপ্সিতা যখন স্কুলে ছিলো ওর ভেন্টিলেটরের কিছু অংশ ভেঙ্গে ফোকরটা বড় করেছি।’
‘আপনি নিশ্চয় আমার মেয়ের ওপর –’
‘জ্বি, নজর রাখতেই চাইছি।’ মেয়ের বাবার আপত্তিকে দুই পয়সার মূল্যও না দিয়ে বলল রায়হান, ‘পেরিস্কোপের সাহায্যে। ওকে টের পেতে দেওয়া যাবে না। রাতের বেলাতে যেহেতু পাগলামি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো ওর – কাজেই ওকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে তখনই।’

৫.
আড়াল থেকে একজন মানুষের দিকে তার অনুমতি ছাড়া তাকিয়ে থাকার চেয়ে অসভ্য কাজ আর নেই। আর যদি সেটা কোন মেয়ের দিকে তাকানো হয় – মানসিক রোগী হোক আর যাই হোক – সেটি আরও বিতৃষ্ণার। তার ওপর সে তাকাচ্ছে একজন মেয়ে-শিশুর দিকে। এগারো বছর বয়স যার। এর থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে না।

রায়হানের ভদ্রতাবোধ বাংলাদেশীদের মত না হতে পারে – অন্যের ব্যক্তিগত অধিকার নিয়ে সে একটু বেশিই সচেতন। কাজেই যখন পেরিস্কোপে রাত সাড়ে বারোটার সময় ও চোখ রাখল, ভেতর থেকে কেউ একজন বলে উঠল, ‘কাজটা ঠিক করছো না, রায়হান।’

অস্বস্তিটা কিছুক্ষণের মাঝেই কাটিয়ে ফেলা যায়। পেরিস্কোপে চোখ রাখাটা একটা সময় স্রেফ দায়িত্ব বলে মনে হতে থাকে।
মেয়েটা অসুস্থ। তাকে তোমার সাহায্য করতে হবে!

প্রথম এক ঘণ্টাতে ঈপ্সিতার মাঝে কোন অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করে না রায়হান। ছোট্ট একটা মেয়ে যেভাবে ঘুমায় ঠিক সেভাবেই ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। বুকের কাছে চেপে রেখেছে একটা পুতুল।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল কবে থেকে ঈপ্সিতা তার ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমায় – সেটা তার বাবা-মা লক্ষ্য করেননি। হঠাৎ এটা শুরু হয়েছে। একদিক দিয়ে এটা ভালো হয়েছে। তার অজান্তে তার ওপর চোখ রাখা যাচ্ছে। তবে এগারো বছরের একটা বাচ্চার কাছ থেকে এই দরজা লাগিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস ও আশা করে নি।

কিশোরীর কোন বৈশিষ্ট্য তার শরীরে ফুটে ওঠেনি এখনও। ঘুমালে ঈপ্সিতার মুখে নিষ্পাপ একটা ভঙ্গী ফুটে ওঠে – ওদিকে পেরিস্কোপ ঘুরিয়ে তাকাতে রায়হানের ভীষণ মায়া হয়। এই মেয়েটি একজন পুরুষের গোপন অঙ্গ কেটে নিয়েছে এটা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না। কোন পর্যায়ের মানসিক চাপে থাকলে কোন শিশু এই কাজটি করতে পারে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, হাতের কাছে ছুরিই বা সে পেল কোথায় প্রয়োজনের সময়? এমন হতে পারে – কাজের ছেলেটা এখানে ভিক্টিম নয়, হয়তো মেয়েটিকে একা পেয়ে কোন কু-ইচ্ছে চরিতার্থ করতে চেয়েছিল সে। কাজেই প্রতিরক্ষার জন্য মেয়েটিকে কাজটা করতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। কিন্তু ও ব্যাপারে পরে ঈপ্সিতা কিছুই মনে করতে পারে নি। ব্যাপারটা পোস্ট-ট্রমাটিক ডিজঅর্ডার হতে পারে।

নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। আরও কিছু থাকার সম্ভাবনা দেখে বলেই আজকে পেরিস্কোপে এসে দাঁড়াতে হয়েছে ওকে। মোস্তফা কামাল অবশ্য তাকে বসার জন্য একটা চেয়ার দিয়ে গেছেন।

একেবারেই হঠাৎ চোখ মেলে উঠে বসে ঈপ্সিতা এসময়। এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে হল ব্যাপারটা – চমকে উঠল রায়হান। সাধারণতঃ ঘুম থেকে উঠলে একজন মানুষ কিছুক্ষণ সময় নেয় নড়ে ওঠার ক্ষেত্রে। আর সাথে সাথে নড়ে উঠলেও এক ধরনের জড়তা কাজ করে। ঈপ্সিতার মাঝে কোনটাই কাজ করে না। সে এমনভাবে উঠে বসেছে – যেন চোখ বন্ধ করে গত দুই ঘণ্টা শুয়ে ছিলো। এখন শুধু তাকিয়েই উঠে পড়েছে।

ঘড়ি দেখে রায়হান – রাত তিনটা বাজে প্রায়।
বিষয়টা ডানহাতের কাছে রাখা নোটবুকে টুকে রাখল ও। ঈপ্সিতার দিকে মনোযোগ দিল আবার, ভূতে পাওয়া মানুষের মত বিছানা থেকে নেমে পড়েছে মেয়েটা। বিড় বিড় করছে – এখান থেকে তাই মনে হয় রায়হানের। ও ঠিক করে রেখেছে, মেয়েটা দরজার দিকে এগিয়ে আসলেই পেরিস্কোপ নিয়ে সটকে পড়বে পাশের বাথরুমে। যত দ্রুত সম্ভব। দরজা খুলতে ওর একটু সময় লাগার কথা। সেই সময়ের মধ্যে পগার পার হয়ে যেতে পারবে।

ভেন্টিলেটরের খুব কাছ দিয়ে পায়চারী করে যায় মেয়েটা।
ঠিক তখনই স্পষ্ট শুনতে পায় রায়হান, মেয়েটা বলছে, ‘রুদ্র! অ্যাই রুদ্র। আজ আসবে না তুমি। রাগ করেছ, না? অ্যাই, রুদ্র ডাকছি তো তোমাকে -’

অতিপ্রাকৃত কিছুতে বিশ্বাস করে না রায়হান – তবে এই মুহূর্তে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর। রোজ কি এসময় আসে ঈপ্সিতার ‘রুদ্র’? আজ ও নজর রাখছে বলে আসতে পারছে না?
মৃত্যুর পর কি যোগাযোগ করা সম্ভব এই জগতের সাথে? আসলেই সম্ভব?

ঘাড়ের কাছে কাঁপা দীর্ঘশ্বাসটা শোনার সাথে সাথে জ্ঞান হারায় রায়হান।

৬.
চোখ মেলতেই রায়হান দেখতে পেল, ঠাণ্ডা একটা মেঝেতে শুয়ে আছে ও। দেওয়ালের কাছে ঝুলছে ওর ডিজিটাল পেরিস্কোপ। অন্যমাথা ভেন্টিলেটরের সাথে আটকানো।

এক মুহূর্ত লেগে যায় একটু আগে ঠিক কি হয়েছে সেটা মনে করতে – তবে মনে পড়তেই লাফিয়ে ওঠে ও। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার সময় হাত থেকে ছুটে গিয়ে দেওয়ালের সাথে বাড়ি খেয়েছে – ডিসপ্লের কাছে কিছু আঁচরের দাগ – এছাড়া ঠিক আছে যন্ত্রটা। পেরিস্কোপের নজর ঘুরে আছে ছাদের দিকে।

দ্রুত হাতে ওটাকে সরিয়ে আনতে থাকে রায়হান, খাটে দৃষ্টি দিতে ঈপ্সিতাকে ওখানে দেখা যায় না। ব্যস্ত হাতে ঘোরায় ওটা আবার। দূরবর্তী দেওয়ালের কাছে পড়ে আছে শরীরটা – দেখেই কেঁপে ওঠে রায়হান।
ঈপ্সিতার শরীরে একটি সুতোও নেই।

হাত থেকে পেরিস্কোপটা ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে উঠেছে ও – দরজাটা ভাঙ্গতে হবে।
তখনই প্রথমবারের মত লক্ষ্য করে – খুলে আছে ওটা। ভেতর থেকে এখন লাগানো নেই।

ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ে রায়হান, ব্যস্ত পায়ে মেয়েটার কাছে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। শ্বাস ফেলছে এখনও।
তলপেটের নীচটা ভিজে আছে। বোঝা যাচ্ছে সামান্য সময় আগে যৌনসংগম করা হয়েছে মেয়েটার সাথে। জামা কাপড়গুলোকেও এবার দেখতে পায় রায়হান। কাছেই পড়ে আছে।

আচমকা ওর নিজেকে হতবুদ্ধি লাগে। এ অবস্থাতে মোস্তফা কামাল ওকে দেখতে পেলে তিনি কি ভেবে বসবেন না – রায়হান নিজেই অপকর্মটা করে বসেছে মেয়ের একাকীত্ব আর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে? আর যদি এখান থেকে ও বের হয়ে গিয়ে মোস্তফা সাহেবকে খুলে বলে ঘটনাটা – তাতেই কি তাঁকে বিশ্বাস করানো যাবে আর কিছু?

ঈপ্সিতাকে নজরে রাখছিলো রায়হান – তাকে চোখ এড়িয়ে আর কারও ঢোকার কথা নয় ভেতরে। রায়হান নিশ্চিত – অন্যকোন মানুষ ওই ঘরের সামনে আসে নি। চোখ পেরিস্কোপের ডিসপ্লের দিকে থাকলেও সামান্য নজর ও রেখেছিলো আর কেউ আসে কি না দেখার জন্য।

যে বা যা তাকে অজ্ঞান করেছে সে কী কোন বাস্তব কিছু? না – হলে ও দেখতে পেতো। আবার সেটা যদি সত্য হয়, সে কীভাবে অজ্ঞান হতে পারে? মানসিক কোন জটিলতা?

যদি মানসিক কোন সমস্যা তাকে ‘ব্ল্যাক আউটে’ নিয়ে যায় সেটাও ভালো কোন লক্ষণ নয়! প্রথমতঃ রোগির চিকিৎসা করতে এসে নিজের রোগ নিয়ে লড়াই করার মুডে ছিল না সে।

দ্বিতীয়তঃ ব্ল্যাকআউটে থাকা অবস্থাতে সাবজেক্ট অনেক কিছু করে আসতে পারে। সেটা তার স্মৃতিতে থাকে না।

এমন কি হতে পারে – অচেতন রায়হান হয় নি – বরং ওখানে সে অন্য একটা সত্ত্বাতে ঠিকই কর্মক্ষম ছিলো? ছোট্ট মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছে, নিজেকে পরিষ্কার করে বাইরে গিয়ে আবার শুয়ে পড়েছে? বাবা-মার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা ওর মনে পড়ে।
ঘাড় ঝাঁকিয়ে চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরিয়ে ফেলে ও, এখন নিজের সাথে নিজের লড়াইয়ের সময় নয়।

ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে বাড়ির অন্য কোণে ছোটে ও – মোস্তফা কামাল নিশ্চয় স্টাডি রুমে আছেন। মেয়ের কর্তন-কর্মের পর থেকে তিনি ঘুমাতে পারেন না। রায়হানের সাথে তিনিও বসতে চেয়েছিলেন, তবে তাকে মানা করে দিয়েছিল সে। রোগির আত্মীয়স্বজন তদন্তে নামলে বায়াস বাড়ে। কাজের কাজ কিছু হয় না, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জানে।

স্টাডিরুমের দরজা ধাক্কিয়ে যখন ভেতরে ঢুকে ও – লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।

রায়হানকে ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কি হয়েছে? কোন প্রগ্রেস?’
ও এবার চুপ হয়ে যায় , একজন বাবাকে কিভাবে সে বলবে, ‘আপনার মেয়েকে একটু আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। আমি দেওয়ালের ওপাশে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। তাই কিছুই করতে পারিনি।’

চুপ থাকতে দেখে মোস্তফা কামালের মুখ প্রথমে দুশ্চিন্তার ছাপ– তারপর আতঙ্ক এসে ভর করে। কিছু একটা বলা দরকার, রায়হান শুধু বলে, ‘চলুন, আপনি দেখতে চাবেন এটা।’

মোস্তফা সাহেব ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলেন। তারপরই জোরে পা চালালেন মেয়ের ঘরের উদ্দেশ্যে। তাঁকে হেঁটে অনুসরণ করতে গিয়ে হাঁফ ধরে যায় রায়হানের। বুকের ভেতরটা দুপ দাপ লাফাচ্ছে।

আরও জটিল হয়েছে রহস্য। আর বলা চলে ঈপ্সিতার বলা কথাগুলোর অর্থ ও খুঁজে পেয়েছে।

এজন্য জায়গাটাকে তার ভালো লাগে। রুদ্রের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে সে নিজের ঘরে। এই রুদ্র তার কল্পনার অংশ হতে পারে – তবে রতিক্রিয়ার চরম পুলকে এই কল্পনাটি নিয়ে যেতে পেরেছে ঈপ্সিতাকে। বিষয়টাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই।

এমন একটা অবস্থা হয়েছে – রায়হান নিজেই বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা কি স্বতঃমিলন ছিলো? নাকি একজন সঙ্গী ছিলো ওখানে মেয়েটির? ও নিজেই অজ্ঞান হয়ে গেছিলো কেন?
নাকি ওটা অজ্ঞান ছিলো না? নিজেই সে ধর্ষণ করে বসেনি তো ছোট্ট মেয়েটাকে?

ওর ভেতরে কি রুদ্রের আত্মা ভর করেছিলো?

জোর করে চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিল রায়হান। এখন রুদ্রের প্রেতাত্মা-কাহিনী বিশ্বাস করার অর্থ এই রহস্যের সমাধান কখনোই হবে না।

মোস্তফা কামাল থেকে বেশ পিছিয়ে গেছে রায়হান। আগে ভাগে পৌঁছে গেছেন তিনি পেরিস্কোপের কাছে। ডিসপ্লেতে চোখ রাখছেন।
রায়হান তাঁকে বলতে গেছিলো, ‘দরজা খোলাই আছে।’

থেমে যায় ও দরজার দিকে চোখ পড়তেই।
অনড় দরজা একেবারেই বন্ধ হয়ে আছে। একটা ধাক্কা দিয়ে দেখে রায়হান। একচুল নড়ল না বিশাল পাল্লা।

‘মি. রায়হান?’ গমগমে কণ্ঠে ডাকলেন মোস্তফা কামাল। ‘এসব কী? কোন ধরনের প্র্যাংক?’

চমকে ওঠে রায়হান। মেয়ের অবস্থা তিনি দেখে ফেলেছেন, এবং বিশ্বাস করতে পারছেন না? তাঁর দিকে এগিয়ে যায় ও। আস্তে করে ওর হাতে ডিসপ্লেটা ধরিয়ে দেন মোস্তফা।

চোয়াল ঝুলে পড়ে রায়হানের।
ঈপ্সিতা বুকের মাঝে একটা পুতুল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। চোখে মুখে নিষ্পাপ একটা ছাপ।
পোশাক সব পরেই আছে মেয়েটা। এটা স্বস্তি দেয় রায়হানকে।

কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়।
রুদ্রপ্রতাপ রায় তার ট্রেস মুছে ফেললেও – রায়হান জানে, একটু আগে ও ভুল দেখেনি।

৭.
ডায়েরীর পাতা খুলে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে রায়হান। এখন ওর ঘুমানো উচিত। ভোর হতে শুরু করেছে। মোস্তফা কামাল তাঁর ঘরে ফিরে গেছেন।

ইতস্তত হলেও মোস্তফা কামালকে সবকিছু খুলে বলেছে ও। শুনে তিনি মুখে কিছু না বললেও রায়হান জানে এক বর্ণও বিশ্বাস করেন নি তিনি। ধরেই নিয়েছেন ওই ভাড়া নিতে আসা বেকুবগুলোর মতো মাথা গেছে এই ছেলেরও। রায়হান জানে না, তবে মোস্তফা কামাল ওই মুহূর্তেই ঠিক করে ফেলেছেন, এই ছেলেকে তিনদিনের বেশি প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। বাঁদরকে কোলে বসতে দিলে ঘাড়ে উঠে বসে। বাঁদর বিদেয় করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। নিজের এগারো বছরের মেয়েকে নিয়ে রতিক্রিয়ার বাজে গল্প শোনার জন্য একে তিনি ভাড়া করেন নি।

এ বাসাতে ঢোকার পর থেকে দুটো চরিত্র রায়হানকে ভাবাচ্ছে। ডায়েরীতে সাবধানে কলম চালায় ও।

মোস্তফা কামালঃ
শুচিবায়ু। সৌখিন। মেয়েকে ভালোবাসেন। কুসংস্কারে বিশ্বাসী, তবে স্বীকার করেন না। পারিবারিকভাবে সুখী। পারিবারিক তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে স্পর্শকাতর। দরকার ছাড়া বহিরাগত কাউকে বলতে অনাগ্রহী। জমিদার রুদ্রপ্রতাপের ডায়েরিতে কি এমন কিছু ছিলো যা বাইরের কেউ পড়লে মোস্তফা কামালের পরিবারকে ঘৃণা করবে? তিনি ঠিক কি লুকোচ্ছেন?

ঈপ্সিতাঃ
কল্পনাবিলাসী। অতিকল্পনার ফলে হ্যালুসিনেশনের শিকার।
ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। শ্রেণিতে প্রথম।
বয়ঃসন্ধিকাল পেরুচ্ছে, শারীরিকভাবে এ বয়েসেই সক্ষম।

দুই সেকেন্ড লেখাটির দিকে তাকিয়ে থাকে রায়হান। একটু ভেবে বাকিদের ব্যাপারেও তুলে ফেলে।

রাইসা (মিসেস মোস্তফা কামাল)ঃ
সাধারণ গৃহিণী। স্বামীর প্রতি অন্ধবিশ্বাস আছে। ছেলের সাথে একটা কথাও বলেননি বিকেলে। অর্থাৎ মেয়েকে নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছেন। নিশ্চয় তাকে অতিমাত্রায় ভালোবাসেন। অতি ভালোবাসা সাবজেক্টের ক্ষতির কারণ?

জাহিদঃ
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলে। পারিবারিক মায়া-মমতা প্রবল। খোলা মনের। বন্ধু মাহফুজের সাথে এর সম্পর্ক ভালো।

কলম থামায় রায়হান। মনে পড়ে একবার মাহফুজের সাথে দেখা করাটা দরকার। শহরের এপ্রান্তে এসেছে, তার রেকমেন্ডেশনেই এই কেস পেয়েছে, এরপর তার সাথে দেখা না করা অভদ্রতা হবে। কেসটা সলভ করেই দেখা করবে – ঠিক করল।

বিছানাতে পিঠ ঠেকানোর সাথে সাথেই ঘুমের অতলে চলে যায় রায়হান। তারমাঝেই যেন মনে পড়ে কিছু একটা নেই – কিছু একটা নেই –

*
মাত্র এক ঘণ্টা পর ঘুম ভেঙ্গে গেল ওর। এখন সে কোথায়? বুঝতে কিছুক্ষণ লাগলো রায়হানের। তারপর আরও গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নটা জাগল, ঘুম ভাঙ্গল কেন?

দরজার নকটা শুনতে পেয়ে লাফিয়ে উঠে ও। দরজা খুলে যোবাইদাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। চোখের নিচে আচরের দাগ।

‘সাহেব অপেক্ষা করতেছেন। খাওয়ার টেবিলে।’ শুকনো কণ্ঠে জানায় মেয়েটা।
‘চোখে কি হয়েছে?’ জানতে চায় ও ভদ্রতার খাতিরে।
‘রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়া কাটছে একটু।’

মেয়েটা একদিকে রওনা হয়ে গেলো। আর কথা বলার ইচ্ছে নেই। অদ্ভুত প্রশ্নটি রায়হানের মাথাতে আচমকাই উদয় হয়, ‘ভাড়াটেদের মাঝে নারী সদস্যারা অস্বস্তি বোধ করত।’ – বলেছিলেন মোস্তফা কামাল।
ঈপ্সিতাকে কেমন অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে সেটা দেখেছে ও। যোবাইদাও কি এরকম কোন সমস্যায় ভুগছে?

প্রশ্ন করলে জবাব মেলার সম্ভাবনা নেই। এই মেয়ে মুখে তালা মেরে রাখবে সেটা তাকে স্পষ্টই বুঝিয়ে দিয়েছে।
একটু প্রস্তুত হয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে রওনা দেয় ও। বাইরের রোদটা আজকে কড়া।
ডাইনিং টেবিলে ভেজা চুলে মোস্তফা কামালকে বসে থাকতে দেখা গেলো। রায়হানকে দেখে আগের দিনের মত হাসলেন না তিনি। চারপাশে তাকিয়ে মিসেস কামালকে খুঁজল রায়হান। তাঁকে দেখা গেলো না।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে টেবিলে বসে পড়ে ও, ‘গুড মর্নিং, মি. কামাল।’
মোস্তফা চোখ তুলে তাকালেন, দায়সারা ভাবে বললেন, ‘গুড মর্নিং।’
‘আর কাওকে দেখছি না।’
‘ওরা দেরী করে নাস্তা করে।’ আগের ভঙ্গীতেই বললেন ভদ্রলোক।
‘বেশ।’ রায়হান বসে পড়ল।

গতকাল রাতের কথা মনে পড়তে ভদ্রলোকের অস্বস্তির কারণ বুঝতে পারে ও। মেয়ের ব্যাপারে ওভাবে বলার পর যে কোন বাবাই স্বাভাবিকভাবে নেবেন না, যে বলেছে তাকে যত দ্রুত সম্ভব চিরস্থায়ীভাবে খেদাতে চাইবেন। কাজেই বিষয়টা এখানেই চাপা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হল রায়হান।

‘মি. কামাল, একটা বিষয় আমি খোলাখুলি জানিয়ে দিতে চাই।’ শুরু করল ও, ‘আপনার যদি আমার ওপর আস্থা না থাকে – আমাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল জন্মেছে এই কেসটা নিয়ে। তার অর্থ এই না – এই কাজটা আমি করতে বাধ্য। আপনি সাবজেক্টের বাবা এবং আমার কেসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আপনার সাথে মন কষাকষি করে এই কেসটা সলভ করার ক্ষমতা আমার নেই। আসলেই নেই। এখন আপনার বিবেচনা।’

মোস্তফা কামাল ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকালেন। সময়ের সাথে সাথে সেই দৃষ্টি উষ্ণ হয়। অবশেষে একচিলতে হাসি ফোটে তাঁর মুখে।
‘সত্যিই দুঃখিত। আসলে, বাবা হলে বুঝতে পারবেন। গতকাল রাতটা ছিলো আমার জন্য শকিং।’
এবার একটু হাসে রায়হানও, ‘আপনার মেয়ে একটা সমস্যায় আছে। যতই ঝামেলার হোক, যতই অস্বস্তির হোক, এই সমস্যাটা আমরা সমাধান করব। কিন্তু সেজন্য আপনাকে শক্ত হতে হবে।’

মোস্তফা কামাল এই স্বল্প পরিচিত যুবকের দিকে তাকিয়ে থাকেন এক মুহূর্তের জন্য। নেহায়েতই তরুণ একজন মানুষ। জাহিদের চেয়ে দশ বছরের বড়ও হবে না। সুদর্শন বলা চলে একে অনায়াসে। তবে সেটা নয় – যে কারণে এই ছেলেকে ঈপ্সিতার কেসটা দিয়েছেন তিনি, সেটা এর চোখ।

ছেলেটা জানে তার কোন অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট নেই, তবুও সে যে কাজটা করেছে তাকে অনেকটা জীবনে মেডিকেল কলেজে না গিয়ে ক্লিনিক খুলে ডক্টর হিসেবে বসার মত বলা চলে। তার পরও তার পসার হয়েছে যথেষ্ট। তিন দিনের জন্য সে ত্রিশ হাজার দাবী করে নিঃসংকোচে। পুলিশ যখন কোন অপরাধীকে ধাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় এর কাছেই তারা আসে। সাসপেক্টের নেক্সট মুভ এই ছেলে অনায়াসে বলে দেয়।
এই সাফল্যের পেছনে আছে ওই চোখ দুটো। ওখানে জ্বল জ্বল করছে আত্মবিশ্বাস। এ জানে কোনদিন পরাজিত হবে না সে। এবং সম্ভবতঃ এখন পর্যন্ত হয়ওনি।

এই মুহূর্তে ওই চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, আসলেই মেয়ের সমস্যা তেমন কিছু তো নয়! দুইজনে একসাথে কাজ করলে কি এর সমাধান করা যাবে না?

মৃদু কণ্ঠে মোস্তফা কামাল শুধু বললেন, ‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, মি. রায়হান। ঈপ্সিতার মেন্টাল সাপোর্ট দরকার। আর আপনাকে সে জিনিস দিতে হচ্ছে তার বাবাকে। আমি দুঃখিত। এরপর থেকে বাস্তববাদী আচরণই পাবেন আমার কাছ থেকে।’

পরিবেশ হাল্কা হয়ে যেতে রায়হান হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। খাওয়ার ব্যাপারে দুইজনই মন দিতে পারে এবার।
সুযোগটা দেখতে পেয়ে ছাড়ে না ও, দৃঢ় গলাতে বলে, ‘আপনাদের পারিবারিক ডায়েরিটা আমাকে পড়তে হবে। রাত ছাড়া ঈপ্সিতা কিছু করবে না। কাজেই দিনের বেলাটা সময় পাচ্ছি। রুদ্রপ্রতাপ সম্পর্কে ভালোমত না জানতে পারলে আমার কিছুই করার থাকবে না। ঈপ্সিতা তাকে দিয়ে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত।’
শান্তভাবে পানি খেলেন মোস্তফা কামাল, ‘আমি দুঃখিত। ডায়েরিটা আপনাকে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাকে প্রশ্ন করবেন। আমি আপনাকে জানিয়ে দেবো যা জানতে চান।’

রায়হান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। প্রচণ্ড রাগে চোখ কুঁচকে উঠেছে ওর। এই লোক কি পারিবারিক ইতিহাস লুকিয়ে রাখার জন্য নিজের অসহায় মেয়েটির চিকিৎসাতেও অসহযোগিতা করবে নাকি? প্রাচীন ইতিহাস গোপন করা তার কাছে বেশি জরুরী নাকি বর্তমান সময়ের নিজের সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষা?

‘আমার ডায়েরিটা দরকার।’
‘আপনাকে আমি অযথা হয়রানি করছি না, মি. রায়হান।’ মোস্তফার গলা এখনও শান্ত, ‘ডায়েরিটা আমার কাছে গত কয়েক মাস ধরেই নেই। হারিয়ে ফেলেছি।’

রায়হানের মাথা যেভাবে হুট করে গরম হয়ে গেছিলো – সেভাবেই ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মিথ্যে বলছেন মোস্তফা কামাল? চুরি হয়ে গেলে আগের বার কেন উল্লেখ করেননি?

মোস্তফা সাহেবের চেহারাতে অবশ্য শঠতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অসহায় একটা অনুভূতির ছাপ ওখানে। সম্ভবতঃ এই মুহূর্তে ডায়েরিটা দিতে পারলে রায়হানের তথা তাঁর মেয়ের কাজে আসতো। দিতে না পারার কারণে তিনি দুঃখিত?

নাকি ডায়েরি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করার পরও বার বার রায়হান ওটা চাইছে দেখে অসহায় লাগছে তাঁর নিজেকে?

কোন একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারে না রায়হান। তবে আপাতত এই তথ্যটিকে সত্য ধরেই এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল সে। মাথা দোলাল নিজের অজান্তেই।

‘চমৎকার। খেয়ে চলুন বের হই। আপনাদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি দেখা যাক। সেই সাথে ডায়েরির যা মনে আছে – আমাকে শোনাবেন।’

৮.
তবে বের হতে হতে বিকেল হয়ে গেলো।

ডক থেকে জরুরী ভিত্তিতে ফোন এসেছিলো। কাজেই নাকে মুখে নাস্তাটা ঠেসে ছুটতে হয়েছিলো কামালসাহেবকে। দুপুরে খাওয়ার পর রোদের তেজ কমে আসার জন্য ঘণ্টাদুয়েক অপেক্ষা করেছে ওরা। জমিদার রুদ্রপ্রতাপ রায়ের সম্পত্তির পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। রোদে রোদে ঘুরে দেখতে হলে বাষ্প হয়ে যেতে হবে।

শহরের শেষ প্রান্তে ওদের এলাকাটা। এখনও মফস্বলের কাতার থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি পুরোপুরি। দূরে শুধুই পাহাড় আর পাহাড়। এদিকটাতেও টিলার অভাব নেই। মাটি এখানে পাথুরে। শক্ত মাটির সাথে পাকা রাস্তার তেমন কোন পার্থক্য নেই।

দূরের পাহাড়গুলর মাথায় থাকা গাছগুলোর গোড়া কোনটার কোথায় – বোঝার বৃথা চেষ্টা করল রায়হান। অন্যপাশে সমুদ্রের দিকে তাকায় চোখ কুঁচকে। সূর্য ওই বিশাল জলাধারে ডুব মারতে যাচ্ছে। রায়হানের প্রিয় দুটো প্রাকৃতিক উপহার এই সমুদ্র আর ওই পাহাড়। সেই সাথে চলছে প্রিয় বিষয় সাইকোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন।

এই মুহূর্তে মন মেজাজ খাসা হয়ে আছে। মোস্তফা কামালের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল হুট করে। এ বাড়িতে আসার পর থেকে সিগারেট তেমন খাওয়া হয়নি।

‘রুদ্রপ্রতাপ রায়ের ইতিহাসে রক্ত আর প্রজাদের চোখের পানির পরিমাণটাই বেশি। একটা ব্যাপার জেনে অবাক হবেন, একবার এই জমিদার প্রজাসংকটে পড়ে গেছিলেন।’ নাক কুঁচকে ফেললেন মোস্তফা কামাল সিগারেটের ধোঁয়া নিজের দিকে আসতে দেখে, ‘কয়েক বছরে এত পরিমাণ নরহত্যা চালিয়েছিলেন তিনি, চাষবাসের জন্য প্রজা পাওয়া যাচ্ছিলো না।’
‘এই সমস্যার সমাধান কিভাবে হল?’ চোখ কুঁচকেছে রায়হানেরও, তবে প্রবল বাতাসে। সিল্ক সুতোর মত উড়ছে চুল।
‘তাঁর এলাকাতে যত নারীপ্রজা ছিলো তাদের মাঝে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য যাদের আছে – তাদের বেছে নিলেন তিনি। পুরুষের সমান মাঠে খাটতে বাধ্য করলেন নিজের বাহিনীকে দিয়ে।’
‘এমনটাই ভেবেছিলাম।’ মুখ বাঁকায় রায়হান, এই জমিদারের ব্যাপারে যতই শুনছে ততই বিতৃষ্ণা এসে যাচ্ছে ওর।

‘আরেকটা দিক ছিলো ডায়েরীতে।’ বলে চললেন মোস্তফা কামাল, ‘তিনি নিজের বাদে আর সব ধর্মবিদ্বেষী ছিলেন। গোঁড়া হিন্দু ছিলেন তিনি। দেবতাদের সবাইকে না মানলেও কারও কারও প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা ছিলো নজর কাড়ার মত।’
‘এলাকাতে অন্য ধর্মের কারা ছিলো?’
‘মুসলমান ছিলো কিছু। ওই যে ওই দিকে।’ হাত বাড়িয়ে দেখালেন মোস্তফা কামাল, ‘আর বৌদ্ধদের একটা মঠ ছিলো ওদিকে।’
‘মঠ গেছে কোথায়?’ চোখ কুঁচকে বিরানভূমিটার দিকে তাকায় রায়হান।
‘আগুন লাগিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিলেন তিনি সবাইকে। মঠের ভেতরে। তারপর মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন ওটা।’
সিগারেট বাতাসের কারণে দ্রুত শেষ হয়ে গেছে, প্যাকেট থেকে আরেকটা বের করতে করতে জানতে চায় রায়হান, ‘কেন?’
‘মঠপ্রধান এই বিপুল পরিমাণ নরহত্যা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। নিজে এসে জমিদারবাবুকে আহ্বান জানিয়েছিলেন নৃশংসতা বন্ধের জন্য।’
তিক্ত হাসিটা ফিরে আসে রায়হানের মুখে, ‘এহেন ঔদ্ধত্য দমন করতে জমিদারবাবুর তো তৎপর হওয়ার কথা ছিলোই।’

‘মঠের চেয়ে এলাকাবাসী মুসলমানদের ভাগ্যই ভালো বলতে হয়।’
‘এঁরা জমিদারবাবুর মতিগতি বুঝে আগে থেকেই ‘ভদ্র’ হয়ে গেছিলেন নিশ্চয়?’ অনুমান করে রায়হান সিগারেটে টান দিতে দিতে।
‘ঠিক তা নয় – গোপনে কোরবানীর সময় গরু জবেহ করেছিলেন মুসলিমদের মাঝে কয়েকজন। কিভাবে জানি খবরটা চাউর হয়ে গেছিলো।’

উঁচু আরেকটি ঢিপির কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন মোস্তফা কামাল – ‘এই জায়গাটাকে বলা হত দেবীকাঠ। এখানে নাকি কাঠের তৈরী একটা মঞ্চ ছিলো সে সময়। মুসলিম সেসব প্রজাদের ধরে আনেন জমিদার রুদ্রপ্রতাপ রায়। মুসলমানদের মাঝে সবাই পশু জবাইয়ে দক্ষ ছিলেন না। পাঠা বলির মত মাথা কেটে ফেলাটা তো আর ইসলাম ধর্মের নিয়ম না। গলা কাটার সময় পশুর সুবিধার্থে সর্বোচ্চ আরামের মৃত্যুর ব্যবস্থা করার কথা কোরবানীর সময়। বুড়ো এক কসাই ছিলেন মুসলিমপাড়ায় – তাকে নিয়েই পড়লেন জমিদারবাবু।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটে লম্বা টান দেয় রায়হান। পরের ঘটনা কেমন হবে সেটা ও ভালোই বুঝতে পারছে।
‘বুড়ো কসাইকে উলঙ্গ করে দেবীকাঠে বাঁধেন জমিদার। একে একে দুটো পা-ই কেটে নেন বড় একটা ছুরি দিয়ে। অত্যাধিক রক্তক্ষরণে লোকটা মারা যাওয়ার আগে হাত দুটোও কেটে নেন মাংসের তালের মত করে। গোটাগ্রামবাসীকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে বাধ্য করা হয়েছিলো দৃশ্যটা। রক্তক্ষরণে সামান্য সময় পরই মারা যায় বুড়ো। তখন শুরু হয় জমিদারের আসল খেলা। হাড্ডি কোপানোর দা দিয়ে মৃত কসাইয়ের শরীরটা কেটে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেন তিনি। ডায়েরি লেখেছিলেন আমার দাদা – তাঁর মতে, লাশটার প্রতিটা টুকরোই ছিলো হাতের মুঠোর চেয়েও ছোট। অসংখ্য টুকরো নিজ হাতে করে দেবীকাঠের ওপর সেগুলো সাজিয়ে রাখেন তিনি। একতাল মাংসের মতো।’
‘ভয়ংকর প্রতিশোধ।’ মন্তব্য করে রায়হান।
‘শেষ হয় নি তো।’ মাথা নাড়েন মোস্তফা কামাল, ‘পুরো গ্রাম ওখানে উপস্থিত ছিলো – জমিদার বলী কাঠে দাঁড়িয়ে জানতে চান সবচেয়ে সমর্থ পুরুষদের ভেতর থেকে আটজনকে এগিয়ে আসতে। স্বাভাবিকভাবেই আটজন যোগাড় হয়ে যায়। বুড়ো কসাইয়ের মাঝবয়েসী স্ত্রীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করতে হুকুম করেন তিনি। মহিলা গর্ভবতী ছিলো। আটজন পালাক্রমে ধর্ষণ শুরু করলে ঘণ্টা দেড়েক পর ওখানেই অত্যাধিক রক্তক্ষরণে মারা যায় মহিলা।

জমিদারের খেলা সেদিন তখনও শেষ হয় নি – কোরবানীর সাথে জড়িত থাকা আরও নয়জন পুরুষ ছিলো বলীকাঠের সাথে বাঁধা। প্রত্যেকে ভয়ে কাপড় খারাপ করে ফেলেছে। দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে আমার দাদা নাক চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাছেই।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরেকটা সিগারেট ধরায় রায়হান। বাংলাদেশের জমিদারদের ইতিহাসে এরকম নিষ্ঠুর জমিদারের কথা আগে সে কখনও শোনেনি। ডায়েরিটা উদ্ধার করা গেলে অবশ্যই এটা প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

‘জমিদার এবার একজন একজন করে উলঙ্গ করলেন। তারপর আধহাতি একটি চাকু দিয়ে একজন একজন করে পুরুষাঙ্গ কাটা শুরু করেন আধ ঘণ্টা অন্তর অন্তর। আগের মতই আটজন করে সমর্থ পুরুষ এনে পুরুষাঙ্গ কাটা স্বামীর সামনে জমিদারের শিকারের স্ত্রী অথবা কন্যাকে ধর্ষণ করা হয় ওখানে। গ্রামবাসীরা আতংকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলো।’

‘একেবারে ডিটেইলস মুখস্থ করে রেখেছেন। কতবার পড়েছেন?’ প্রশ্নটা করেই ফেলে রায়হান।

‘গুণিনি। শ’খানেকবার হবেই।’ নির্লজ্জের মত হাসলেন মোস্তফা কামাল, ‘যে কোন হরর বইয়ের চেয়ে ওই ডায়েরি আপনার কাছে বেশি ভয়ংকর লাগবে। কারণ ওসবই ঘটেছিলো বাস্তব জীবনে। যাই হোক, এ ঘটনার পর থেকেই মুসলমানদের প্রতি একটা আগ্রহ জন্মে আমার দাদার ভেতরে। পরে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি।’
‘ধর্ম সম্পর্কে আপনার মতামত কি?’ রায়হান জানতে চায়।
‘আমি নাস্তিক।’ সংক্ষেপে জানালেন মোস্তফা সাহেব। একটু বিরতি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘এই যে, এটা হল গোলা-ঘর। গুদামও বলতে পারেন। শুনেছি ওই সময় আস্তাবল ছিলো এখানে একটা। এখন এই আধ-ধ্বংস বাড়িটাই দাঁড়িয়ে আছে।’

রায়হান ভালো করে তাকাল। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে এসেছে ওরা। এদিকে কোন বাড়ি ঘর নেই। ঘন ঘন গাছপালা চলে গেছে এখান থেকে পাহাড়ের দিকে। মোস্তফা কামালের দিকে একবার তাকায় ও, চকচকে চোখে তাকিয়ে আছেন তিনি বাড়িটার দিকে। একটা প্রায় ভেঙ্গে পড়া বাড়ি। এখানে সারা বছরের খাদ্য মজুদ রাখা হত এক সময়। এখন পুনর্নির্মাণ আবশ্যক।

‘নিশ্চয় এখানেও অসংখ্য অত্যাচারের কাহিনী আছে। আমরা জানি না হয়ত, তবে আছে, নিশ্চয় আছে!’ লোভীর মত একবার তাকালেন তিনি রায়হানের দিকে।

রায়হান সতর্কভাবে তাকায় তার দিকে। ভদ্রলোকের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। যেরকম দৃষ্টি তার মাঝে ফুটে উঠেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে পূর্বপুরুষের আচরণ তাকে ভালোই প্রভাবিত করেছে। লোকটা কি ছুরি-টুরি নিয়ে বের হয়েছে নাকি? রায়হানকে এতদূরে নিয়ে এসেছে কেন? এখানে নিজেকে রুদ্রপ্রতাপের মত খেলিয়ে দেখতে চায়?

মোস্তফা কামাল চকচকে চোখে আরেকবার রায়হানকে দেখে একধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেললেন। ভেতরের অবস্থা বাইরের মতই করুণ। পেছনের দিকের দেওয়ালের বড় একটা অংশ তো ধ্বসেই পড়েছে। স্মাগলারদের জন্য স্বর্গ হতে পারে। বর্ডারও তো মাত্র ছিয়াশি কিলোমিটার দূরে!

বাইরের আকাশে আরেকবার চোখ বোলায় রায়হান। রাত প্রায় নেমে এসেছে। গোধূলির আলো চারপাশে। এসময় একজন মুড ডিজঅর্ডার সাবজেক্টের সাথে পরিত্যক্ত গোলাঘরে ঢুকে পড়াটা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে সেটা ভেবে দেখল। খুব একটা নয়।

তবে উপায় কী? এই চরিত্রটিকে চূড়ান্তভাবে জানার জন্য কাজটা করতেই হবে ওকে। দীর্ঘশ্বাসের সাথে সিগারেটটা ফেলে দেয় রায়হান।

মোস্তফা সাহেব মাথা ঘুরিয়ে ডাক দিয়েছেন, ‘কই আসুন?’
এর পরে আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না।

ভেতরে অন্ধকার বেশ। কালিগোলা। চৌবাচ্চায় দুই পিঁপে আলকাতরা ছুঁড়ে মারার মতো। এই আধবুড়ো লোকের মাথায় কি ধরনের সমস্যা থাকলে সে এই অন্ধকার এক পুরোনো গোলাবাড়িতে ঢুকতে পারে? অন্তত সাপের ভয় তো থাকা উচিত।

মুখ ফুটে কথাটা বলতে যাবে ও মোস্তফা কামালকে – ঠিক তখনই হোঁচট খেলেন তিনি। তারপর সড়াৎ-জাতীয় একটা শব্দের সাথে সাথে দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়লেন।

দ্রুত তার দিকে এগুতে যাবে রায়হান – পা পিছলে গেল তারও। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় নি ও – কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলো, পা কিসে পিছলেছে।
রক্ত!
মানুষের রক্ত!

গুঙিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করছেন মোস্তফা কামাল – রায়হান পকেট থেকে মোবাইলটা দ্রুত বের করল। পিছলে গেলেও মাটিতে আছড়ে ও পড়েনি। ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়েছে কাঁপা হাতে।

আলোটা প্রথমে পড়ল যোবাইদার বিস্ফোরিত দুই চোখের ওপর। তারপর কেটে আলাদা করে ফেলা স্তনদুটোতে সরে আসে আলো। রক্তে গোলাঘরের মেঝে একেবারে ভিজে চুপসে আছে এদিকটা।

হেঁচকি তোলার মত একটা শব্দ করে বমি করে দিলেন মোস্তফা কামাল।

৯.
বুম বুম বুম।

দ্বিতীয়বার দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিলেও কেউ খুলে দিলো না। মোস্তফা কামালের চেহারা হয়েছে দেখার মত। কাতল মাছের মত হাঁফাচ্ছেন তিনি। একটু আগে অতি সাহসী আর যন্ত্রণার রসালো বর্ণনা দিতে থাকা মানুষটা সত্যিকারের নৃশংসতার একটিমাত্র দৃশ্য দেখেই চুপসে গেছেন।

বাড়িটাতে এখনও সব জায়গাতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়নি। কলিংবেল এখনও বসাতে পারেননি। দরজার ওপরের কড়া আবার জোরে জোরে নাড়েন মোস্তফা কামাল।

গোলাঘরের লাশটা আবিষ্কারের পর প্রথম যে কাজটি রায়হান করেছে তা হল – টেনেহিঁচরে ওখান থেকে ভদ্রলোককে বের করে এনেছে। তারপর গোলাঘর থেকে সরেও এসেছে যত দূরে পারে, খুনী অন্ধকারে ওত পেতে বসে থাকতে পারতো। না জেনে নিজেদের নিরাপত্তার ওপর ঝুঁকি নেওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না।

তারপর মূল বাড়িতে ফিরে এসে পাগলের মতো দরজায় থাবাথাবি শুরু করেছে ওরা।

দরজা খুলে গেল তৃতীয় ধাক্কার পর। সব মিলিয়ে হয়ত মিনিটখানেক দেরি হয়েছে। বড় বাড়ি। এটা স্বাভাবিক সময়। কিন্তু ওদের মনে হয় কয়েক যুগ লেগে গেছে ওটা খুলতে।

জাহিদের মুখটা দেখা যায় মৃদু আলোতে, পিটপিট করে তাকিয়ে ওদের একবার দেখে সরে ঢোকার জায়গা করে দেয়। পেছনে আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এগিয়ে আসছিলেন মিসেস কামাল – রায়হানকে দেখে সামলে নিলেন।

‘কি হয়েছে – তোমার এই রকম চেহারা কেন?’ রীতিমত আঁতকে উঠলেন পরের মুহূর্তেই। স্বামীপ্রবরের জামায় লেগে থাকা রক্ত দেখে ফেলেছেন।

মোস্তফা সাহেবকে একটা শব্দ উচ্চারণেরও সময় দেয় না রায়হান, বোমা ফাটানোর মত জোরালো কণ্ঠে জানতে চায়, ‘ঈপ্সিতা কোথায়?’
বিভ্রান্ত দেখায় মহিলাকে, ‘ওর ঘরেই তো ছিলো।’
‘যোবাইদার সাথে আজ বিকেলে বের হয়ে ছিলো ও?’ দ্রুত জানতে চায় ও, কপালের শিরা ফুলে উঠেছে একটা।
‘প্রতিদিনই তো বের হয়।’ সমস্যাটা কি হয়েছে এতে বুঝলেন না মিসেস কামাল। যোবাইদা ছেলেও নয় যে মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববেন।

যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে ওর। ছুটে যায় ঈপ্সিতার ঘরের দিকে।
পেছনে হাহাকার করে ওঠেন মোস্তফা কামাল, ‘যাবেন না! শেষ হয়ে যাবেন, ওদিকে যাবেন না!’

নিজের মেয়েকে কি পরিমাণ ভয় পেয়ে মানুষটা একথা বলছে বুঝতে পেরে মনটা খারাপ হয়ে যায় ওর। বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে ঈপ্সিতার বদ্ধ ঘরের দরজাতে ধাক্কা দেয় ও।
ভেজানো ছিলো। ভেতর থেকে ছিটকিনি তোলা ছিলো না। হা হয়ে খুলে যায় দরজাটা। মুখ ঘুরিয়ে পড়ার টেবিল থেকে ওর দিকে তাকায় মেয়েটা। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

‘আপনাকে বলেছিলাম – আর কখনও আমাকে প্রশ্ন করতে আসবেন না।’ চোখ পাকায় সে।
গায়েই মাখে না রায়হান, হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘বিকেলে কোথায় ছিলে তুমি?’
‘তা দিয়ে তোমার দরকার কি?’ আচমকা গম্ভীর হয়ে ওঠে মেয়েটা। ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে এলো সে।

পেছন থেকে ওকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়েছেন মিসেস কামাল, মেয়ের দিকে ছুটে যান তিনি, ‘কোথায় ছিলে তুমি?’
মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঈপ্সিতা, ‘আম্মু দেখো, ভদ্র মেয়ের মত হোমওয়ার্ক করছি না আমি? ওই লোকটাকে সরাও তো এখান থেকে। অসহ্য লাগছে আমার ওকে।’

আস্তে করে বের হয়ে যায় রায়হান। এখানে থেকে এখন কোন লাভ হবে না। হয়ত মেয়েটা কিছু জানেই না। সত্ত্বার পরিবর্তনের সাথে সাথে সবকিছু ভুলে যায় ও। অথবা, জেনে শুনেও না বোঝার ভান করছে!
মনে মনে শুধু মেয়েটাকে বলল ও, ‘যতই চালাক হও তুমি, বিচ্ছু মেয়ে! কাল রাতের মাঝেই এর সমাধান করে তারপর এই বাড়ি থেকে বের হবো আমি।’

*
আধশোয়া হয়ে নিজের ডায়েরিটা খুলেছে রায়হান – দরজা দিয়ে মাথা গলিয়ে দিলো জাহিদ।

‘রায়হান ভাই, আপনি নাকি রাতে খাবেন না? আরেকবার ভেবে বলেন। আম্মু পাঠালো জানার জন্য।’
হাসে রায়হান ছেলেটার দিকে তাকিয়ে, ‘ধন্যবাদ তোমাদের। আসলেই খাবো না। খিদে নেই।’
জাহিদ ভেতরে ঢুকে পড়ে, ‘এগুলো রাখেন। কারেন্ট গেলে কাজে দেবে।’

মোমবাতির মত কিন্তু কাঠের দুটো জিনিস টেবিলে নামিয়ে রাখে ও। অবাক হয় রায়হান, ‘আগুন জ্বলবে কিসে?’
লাইটারটা বের করে মুখের কাছে ধরতেই আগুন জ্বলে ওঠে ওপরে, ঝকঝকে হাসি দেয় জাহিদ, ‘টেকনিকটা আমাদের বিজ্ঞান স্যারের শেখানো। দাহ্য কেমিকেল আছে ভেতরে। ওটাই জ্বলে। তারপর শেষ হয়ে গেলে রিফিল করে নেওয়া যায়।’
‘কাঠে আগুণ ধরে না কেন?’
‘অদাহ্য পদার্থের প্রলাপ আছে ওখানে। জটিল ব্যাপার স্যাপার। ক্লাসে বসে তিনদিন চেষ্টা করে দুটো করে বানিয়েছি আমরা।’

দেশের এই কোণে এমন অভিনব বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হচ্ছে জেনে মন ভালো হয়ে গেল রায়হানের। বাংলাদেশে স্কুল লেভেল থেকে প্র্যাকটিকাল শিক্ষাটা হওয়া প্রয়োজন। বই পড়ে পড়ে ছাইপাশ বিদ্যে অর্জনে দেশের বা জাতির কোন উন্নতি ঘটার প্রশ্নই আসে না।

মোস্তফা কামাল ঢুকলে এসময় ঘরে। বাবার দিকে একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় জাহিদ।

মোস্তফা সাহেবও বলে দিলেন এর ফাঁকে, ‘বেশি রাত জেগো না, জাহিদ।’

জাহিদকে যোবাইদার কথা জানানো হয় নি। আড়ালে ডেকে শুধু রাইসাকে বলেছেন মোস্তফা সাহেব। সব শুনে সিঁটিয়ে গেছেন মহিলা। রাতে না খাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছে রায়হান। তবে মোস্তফা সাহেবকে ডেকে পাঠিয়েছে খাওয়া হয়ে গেলে।

এই মুহূর্তে খাটে আয়েশ করে বসলেন তিনি। মুখে এখনও রঙ ফিরে আসে নি।
অনুমতির তোয়াক্কা না করে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলে রায়হান। মোস্তফা কামাল কিছু বললেন না। ভাষা ইনি হারিয়েছেন।

‘আমার মেয়েটা কি এরকম দানব হয়েই থাকবে, মি. রায়হান?’ একেবারেই ভেঙ্গে পড়া একজন মানুষের মত মনে হয় তাঁকে এই মুহূর্তে।
‘আপনার মেয়ের সমস্যাটা আমি ধরতে পেরেছি খুব সম্ভব।’ ধীরে ধীরে বলে রায়হান, ‘মন্দের ভালো নয়। বেচারির কপাল মন্দ। সিজোফ্রেনিয়াতেই আক্রান্ত হয়েছে সে।’
‘রুদ্রপ্রতাপ বলে কাওকে দেখতে পাচ্ছে, তার কথা শুনতে পাচ্ছে তাহলে আমার মেয়ে।’ চোখ বড় বড় করে ফেলেন মোস্তফা সাহেব।
‘শুধু তাই নয়, নিজেকে সক্ষম একজন নারী বলে মনে করছে সে। নিয়মিত তার কল্পনার সাথে যৌনমিলন ঘটাচ্ছে।’ বাবার সামনে মেয়েকে নিয়ে এভাবে বলতে খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই রায়হানের, বলে যায় ও, ‘রুদ্রপ্রতাপ রায়ের চুরি হয়ে যাওয়া ডায়েরিটা আপনার মেয়ের ঘরের কোথাও আছে – এ ব্যাপারে দুইশভাগ নিশ্চিত হতে পারেন। মেয়েটি ওই ডায়েরি চুরি করে নিয়ে পড়েছে। তারপর সেখানে লেখা কথাগুলো তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। যে মেয়ের বয়েস মাত্র এগারো তাকে ওরকম কথা প্রভাবিত করবেই। আপনার মত বয়স্ক লোককেও প্রভাবিত করতে পেরেছে সেটা। তাছাড়া যতটা বুঝতে পেরেছি বেশ রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাগুলো লিখেছেন আপনার দাদা।’

প্রতিবাদ করলেন না মোস্তফা কামাল। রায়হান বোঝে ওর অনুমান এক্ষেত্রেও সত্য হতে যাচ্ছে।

‘কাজেই – ঈপ্সিতা লক্ষ্য করল, ডায়েরির সাথে একটা বিষয়ে তার মিল আছে। রুদ্রপ্রতাপ দশ থেকে বারো বছরের সুন্দরী মেয়ে পেলে তার সাথে সঙ্গম করেই ছাড়তেন। তখন একজন পূর্ণবয়স্কা নারীকে যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করতেন, কন্যাসন্তানের মাকে। কারণ, আপনিই বলেছেন – ডায়েরি অনুযায়ী ওটাই ছিলো জমিদারবাবুর রুচি। বিষয়টা ঈপ্সিতাকে আকৃষ্ট করলো।’

মোস্তফা কামাল হাল্কা হাল্কা কাঁপছেন। গোটা বিষয়টাই তাঁর কাছে দুঃস্বপ্নের মত লাগছে।
সিগারেটের গোড়ায় বার দুয়েক জোরে টান দেয় রায়হান।

‘ঈপ্সিতা রুদ্রকে তার কাল্পনিক প্রেমিক বানিয়ে ফেলে। রাত হলেই নিজের কাল্পনিক প্রেমিকের সাথে রতিলীলাতে মেতে ওঠে সে। প্রাথমিকভাবে ব্যাপারটা এরকমই ছিলো। কিন্তু এতে করে রুদ্রপ্রতাপের ব্যাপারটা সে ঠিকমতো উপভোগ করতে পারল না। রুদ্র ছিলেন নিষ্ঠুর। নিজের সাথে নিজে সঙ্গম করলে নিষ্ঠুরতা করা যায় না। এখানেই আসল বাদল নামের কাজের ছেলেটি। আবার বলুন, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তাকে আক্রমণ করে ঈপ্সিতা?’

‘চা বানাতে দেরী করে ফেলেছিলো ছেলেটা। ভুলে গেছিলো আসলে। রান্নাঘরে গিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে ওকে ঈপ্সিতা। আমরা গিয়ে দেখতে পাই ছুরি নিয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে ও, তার পায়ের কাছে ছটফট করছে বাদল।’
‘নিজে সে আক্রমণ করেনি – এমনটাই তার ধারণা।’ হাল্কা ভাবে বলে রায়হান, ‘এজন্যই তার মাঝে অপরাধবোধ দেখিনি কখনও। ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন দিয়ে সে দেখেছিল তার প্রেমিক, পূর্ণবয়স্ক এক পুরুষ, রুদ্রপ্রতাপ আক্রমণ করছে তার শিকারকে। ঠিক যেভাবে রুদ্র আক্রমণ করেছিলো তার প্রজাদের। কাজের ছেলেটির পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার পেছনে একটাই যুক্তি – আপনার ডায়েরি মেয়েটির হাতে আছে।’
‘তাহলে, নিজেকে রুদ্রের প্রেমিকা মনে করছে ও। রুদ্র চরিত্রটাকে বাস্তব করে তোলার জন্য সে যা করেছে তা নিজেই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে?’
‘কিন্তু -’ মোস্তফা কামালকে সায় দেয় রায়হান, ‘-সে নিজেও জানে না কাজগুলো তার করা। ও দেখতে পায় রুদ্র ছুরি তুলছে। রুদ্র আক্রমণ করছে।’
শুনতেই পেলেন না যেন মোস্তফা, ‘রুদ্রের কাছাকাছি নিয়ে গেছে সে তার কাল্পনিক মানুষটিকে। বয়েসে তার চেয়ে বড় যোবাইদাকে ভিক্টিম বানিয়েছে গোলাঘরে। নির্ঘাত তখন তার মনে হয়েছে জমিদারবাবু তার সাথে যৌনসঙ্গমের ফাঁকে পূর্ণবয়স্ক যোবায়দাকে হত্যা করেছে?’
‘এক্স্যক্টলি।’ মাথা দোলায় রায়হান।
‘এর সমাধান কি, মি. রায়হান?’ প্রায় ফিস ফিস করে জানতে চাইলেন মোস্তফা।

‘অবশ্যই – মেয়েটির কাছ থেকে ডায়েরিটা উদ্ধার করা। তবে সেটা আগামীকালের কাজ। আজ রাতে আমরা আবার চোখ রাখবো ঈপ্সিতার ওপর।’
‘আমরা? গতকাল আমাকে স্টাডিরুমে বসিয়ে রেখেছিলেন।’ মুখ বাঁকান তিনি।
‘গতকালের মত অদ্ভুতভাবে জ্ঞান হারাতে আমি চাই না। আমি চাই আজ আপনি আমার দিকে একটা চোখ রাখবেন। তবে একটু দূরে থেকে। ডাইনিং রুম থেকে চেষ্টা চরিত্র করলে তো ঈপ্পির দরজাটা দেখা যায়। ওখানেই থাকবেন আপনি। আমি হুঁশ হারালে আপনি ইন করবেন। সারা রাত অবজার্ভে রাখতে হবে ওকে। ’

এক মুহূর্ত ভাবলেন মোস্তফা কামাল, তারপর মাথা ঝাঁকালেন, ‘ফাইন।’

১০.
ভদ্রলোককে তার পজিশন বুঝিয়ে দিয়ে ঈপ্সিতার ঘরের কাছে চলে আসে রায়হান। দরজা আজকেও ভেতর থেকে বন্ধ। পেরিস্কোপটা ভেন্টিলেটরের ওপরে জায়গা মত লাগায় ও চেয়ারে দাঁড়িয়ে। তারপর চোখ রাখে আবারও।

গতকালের মতই শান্ত মেয়ের মত ঘুমুচ্ছে মেয়েটা। বুকের কাছে তার প্রিয় পুতুলটাকে ধরে রেখেছে।

দৃশ্যটা দেখে মন খারাপ হয়ে যায় রায়হানের। মেয়েটা নিজেও জানে না তার জীবনটা স্বাভাবিক নয়। ও জানে না সে এমন কিছু দেখতে পায় যার কোন বাস্তবতা নেই। চোখের সামনে সে একটা মানুষকে দেখতে পায়, তাকে স্পর্শ করতে পারে, তাকে আদর করতে পারে, তার সাথে কথাবার্তা বলতে পারে – অথচ তার কোন অস্তিত্বই নেই – এটা সে কিভাবে মেনে নেবে?
রায়হান জানে তাকে সব কিছু খুলে বলা হলেও সে মেনে নেবে না। এখন মোস্তফা কামালকে যদি বলা হয়, ‘আপনার জীবনে কোনদিনও রাইসা বলে কেউ আসে নি। ছেলে মেয়েগুলো আপনার নয়, আপনি তাদের কল্পনা করে এসেছেন আজীবন।’
মোস্তফা নিঃসন্দেহে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। একই ব্যাপার ঘটবে ঈপ্সিতাকে বোঝাতে গেলেও। কাজেই এখন তার ওপর চোখ রাখাটা দরকার।

আজকে এখানে এসেছে গতকাল অদ্ভুতভাবে জ্ঞান হারানোর ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে।
ঈপ্সিতা কি করবে সে ব্যাপারে ধারণা হয়ে গেছে ওর। রাত তিনটের সময়ই উঠে বসবে কি না তা ও জানে না। তবে আজকেও রুদ্রকে কল্পনা করবে মেয়েটা। তার সাথে বিছানাতে বা মেঝেতে রতিক্রিয়াতে লিপ্ত হবে। তারপর বেহুঁশের মত ঘুমাবে কিছুক্ষণ। এরপর ঘোর কেটে যেতে পোশাক পরে আবার বিছানাতে ফিরবে সে।
গতকাল এটাই হয়েছে – জানে রায়হান। আর কোন ব্যাখ্যা থাকতে পারে না। চোখে যা দেখেছে তা ভুল কিছু ছিলো না। যদিও মোস্তফা কামাল পুরোপুরি কথাগুলো বিশ্বাস করেছেন বলে মনে হয় না। তাঁকে রায়হান দোষ দেয় না। নিজের এগারো বছর বয়েসের মেয়েটির ব্যাপারে আজেবাজে কিছু ভাবার ব্যাপারে কোন বাবাই শতভাগ নিশ্চিত হতে পারবেন না।

তিনটার দিকে যতই এগিয়ে আসছে ঘড়ির কাঁটা – ততই উত্তেজনা বোধ করছে রায়হান। আজও কি আগের মতই আচরণ করবে মেয়েটা? নাকি ওকে ভুল প্রমাণ করে স্বাভাবিক একটা রাত কাটাবে সে? চোখ আটকে রাখে ও পেরিস্কোপের ডিসপ্লেতে।

তিনটা বাজলো।
নড়ল না মেয়েটা। দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকল রায়হান।
দুই মিনিট পেরিয়ে গেল।
তিন।

ঝট করে চোখ দুটো খুলে গেল মেয়েটার। আগের রাতের মতই স্বাভাবিকভাবে উঠে বসে ও। আগেও দেখেছে – তবুও দৃশ্যটা মেরুদণ্ড শীতল করে দেয় রায়হানের।
মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করে না মেয়েটা – সোজা হেঁটে যায় টেবিলের দিকে। তারপর এগিয়ে আসতে থাকে দরজার দিকে।
পিলে চমকে গেছে রায়হানের – মেয়েটা ঘুম থেকে উঠেই এভাবে বের হয়ে আসতে চাইবে – এটা তার মাথাতে একবারের জন্যও আসে নি।
সরে যাওয়ার সুযোগ ও পায় না – খট করে ছিটকিনি খোলার শব্দ পায়। নিজের জায়গাতে জমে যায় রায়হান।

এলোমেলো চুলে হেঁটে বের হয়েছে ঈপ্সিতা, এই ঘুম ঘুম অবস্থাতেও পরীর মত লাগছে মেয়েটাকে।
‘আড়াল থেকে নজর রাখছিলেন!’ ফেটে পড়ে মেয়েটা।
সাবধানে এক পা পিছিয়ে যায় রায়হান, ঈপ্সিতার রুদ্রমূর্তি নয়, তার হাতের ছুরিটা দেখে পেছানো ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না ওর।

ছুরিটা সামনে তুলে ধরে না মেয়েটা । আলগোছে ধরে আছে এমনভাবে – বোঝা যায়, আগেও ব্যবহার করেছে অস্ত্রটা এই মেয়ে।
‘ঈপ্সিতা, তুমি ঘুমের ঘোরে আছো।’ শান্ত কণ্ঠে বলে রায়হান, কে জানতো টেবিলে একটা ছুরি লুকিয়ে রেখেছে এ?
চোখ জ্বলে ওঠে ওর, ‘নজর রাখার জন্য তোমাকে ফল পেতে হবে, রায়হান!’
‘আজ বিকেলে যোবাইদাকে খুন করেছো কেন?’ সরাসরি প্রশ্ন করে রায়হান।

মেয়েটা চমকে গেছে।
থমকে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে পড়ল ও, ‘আমি কাওকে খুন করিনি।’
‘প্রথমে বাদল। পরে যোবাইদা।’ মেপে মেপে শব্দ গুলো উচ্চারণ করে রায়হান।
বিস্ময়ের ভাব ফুটে ওঠে ওর মুখে, ‘আমি তো ওদের ছুঁইনি।’
‘তবে কি রুদ্র করেছে খুনগুলো?’ ঠাণ্ডা গলাতে জানতে চায় রায়হান, জানে উত্তরটা কি হবে।

ঝাঁঝিয়ে ওঠে মেয়েটা, ‘রুদ্র তার কাজের জন্য কাওকে জবাব দিতে বাধ্য না। তোরা সবাই ওর কুকুর। পোষা কুকুর। কথাটা মনে রাখবি!’

চোখ সরায় না রায়হান, কড়া করে তাকায় মেয়েটার দিকে। ঈপ্সিতাও তাকিয়ে আছে ওর দিকে সরাসরি। এবার গলার সুরটাই পাল্টে যায় ওর, ‘আমাকে বিছানায় নিয়ে যাবি তুই এখন। সুখ দিবি। যেভাবে দিতো রুদ্র। তোর জন্যই আজকে আমার কাছে আসতে পারেনি ও। চল, ঘরের ভেতরে চল। আমার জামা খুলবি।’

রায়হান থমকে গেছে একেবারে। শরীরের প্রতিটা পেশী প্রস্তুত একটা আক্রমণের জন্য। যে কোন সময় ছুরি চালাবে মেয়েটা। আর কেটে নিতে চেষ্টা করবে ওর পুরুষাঙ্গ। এটুকু বুঝতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই! সরে যাওয়ার সময় নেই, এখনও ঈপ্সিতার নাগালের ভেতরেই আছে সে। ওরকম মতলব টের পেলেই হামলা করতে পারে মেয়েটা।

বাদলকেও কি একই প্রস্তাব দিয়েছিলো মেয়েটা?
বাদল কি জবাব দিয়েছিলো?
“হ্যাঁ” বলায় আক্রমণ করেছিল ঈপ্সিতা?
নাকি “না” বলায়?

রায়হান আর কিছু ভাবার সময় পায় না। ডাইনিং রুমের অপর প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন মোস্তফা কামাল। মেয়ের প্রতিটা কথা কানে গেছে তার। রায়হানের প্রতি যেটুকু অবিশ্বাস ছিলো – সবটুকু সরে গেছে তাঁর ভেতর থেকে।

‘হারামজাদী! তোর মুখ থেকে এধরনের কথা কিভাবে বের হল?’ ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে হুংকার ছাড়েন তিনি।
সমান তেজে জবাব দেয় ঈপ্সিতা, ‘তুই চুপ থাক, কুত্তার বাচ্চা!’
‘ঈপ্সিতা!’ মোস্তফা কামালের চিৎকার বোধহয় ছাদ উড়ে যাবে, ‘মুখ সামলিয়ে কথা বল তুই! আমি তোর বাবা!’

দূরে খটাখট আরও দুটো দরজা খুলে যায়। ঘুম ঘুম চোখে বের হয়ে আসেন মিসেস কামাল আর জাহিদ।
ছুরি নিয়ে ঈপ্সিতার একক প্রদর্শনী দেখে প্রত্যেকেরই ঘুম ছুটে যায়। ছুটে আসছে ওরা। ঈপ্সিতার নাম ধরে ডাকছে। বার বার বলছে ছুরিটা ফেলে দিতে।
মেয়েটার মনোযোগ সরে যেতেই দুই পায়ের সব শক্তি একত্র করে দৌড় দেয় রায়হান – ঝড়ের বেগে সরে গেছে ঈপ্সিতার নাগালের বাইরে।

ছুটতে ছুটতেই চিৎকার দেয় ও, ‘জাহিদ, মাই বয়, বোনের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নাও তো। সবাইকে নিয়ে ড্রইং রুমে বস। ঈপ্সিতার ছুরি সরানো হলে আমাকে ডাক দেবে! কেসটার সমাধান করে ফেলেছি আমি।’

সামনে যে ঘরটা পেলো তাতে বুলেটের মত সেঁধিয়ে যায় ছেলেটা। দড়াম করে দরজা লাগিয়ে ছিটকিনি তুলে দিয়েছে।
রায়হানের গমনপথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন মোস্তফা কামাল, ছেলেটাকে অনেক কিছুই ভেবেছিলেন তিনি।

কাপুরুষ ভাবেননি।

১১.
ড্রইং রমে যখন ফিরে আসে রায়হান – প্রত্যেকের চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেছে।

ঈপ্সিতা ভদ্রসমাজে শোনার তো দূরে থাকুক – পড়ার অযোগ্য গালি গালাজ ছুড়ছে সবাইকে। বাকি সবাই চুপচাপ তা শুনছে। মেয়েটার হাত থেকে জাহিদ চাকুটা সরিয়ে নিয়েছে। কাজেই আপাতত তার গালি শোনার ব্যাপারে কারও আপত্তি নেই।

মোস্তফা কামাল রায়হানকে দেখেই লাফিয়ে উঠলেন, ‘প্লিজ বলবেন এর কোন সলিউশন আছে? সমস্যাটা আমরা জানি এখন। আমাদের সলিউশন দরকার – প্লিজ!’
ঈপ্সিতা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চোখের সামনে থেকে দূর হ, বাইনচোদ!’
মিসেস কামাল কেঁদে ফেললেন।

রায়হান বসল না, দাঁড়িয়ে থেকেই মিসেস কামালের দিকে তাকায় ও। মোস্তফা কামালই বরং বসে পড়লেন দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা দেখে।
‘কান্না করার অধিকার এখানে সবার আছে। আপনার নেই, মিসেস কামাল। আপনার উচিত ছিলো আমাকে সহযোগিতা করা – সন্তানের মঙ্গল চাইলে। অথচ তথ্য লুকিয়ে রেখেছিলেন আপনি।’
মোস্তফা সাহেব অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন দেখে তার দিকে তাকায় রায়হান, প্রথমবারের মত রীতিমত গম্ভীর এখন ও।
‘আপনার জন্য শকিং কিছু ব্যাপার জানবেন এখন, মি. কামাল। কাজেই মানসিক প্রস্তুতি নিন, আপনি ছাড়া এই সিচুয়েশনটা কেউ হ্যান্ডল করতে পারবে না।’

ঈপ্সিতাও গালি দিতে ভুলে গেছে। রায়হানের এই মূর্তিটা একেবারেই অন্যরকম। তেমন কিছুই বলে নি ও – কিন্তু ঘরের সবার ওপর একটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে হেঁটে আসে রায়হান। দুই হাত পেছনে বেঁধে রেখেছে।

‘রুদ্রপ্রতাপ রায় – আপনাদের পূর্বপুরুষ। মানুষটির জমিদারি ছিলো। সেই সাথে ছিলো নিষ্ঠুরতার ক্ষেত্রে নামডাক। এঁর ছেলে বাস্তবজীবনে নিষ্ঠুরতা পছন্দ না করলেও – কল্পনা করতে ভালো বাসতেন সেসব। এই মানুষটি হলেন আপনার দাদা, মি. কামাল। রসিয়ে রসিয়ে তা লিখেছিলেন তিনি। আর বলতে হচ্ছে, বংশগত ভাবে নিষ্ঠুরতার এই অংশটা আপনিও পেয়েছেন। আপনি বাস্তবজীবনে কাওকে নিষ্ঠুরের মত কষ্ট দেওয়ার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। তবে এসব নৃশংসতা কল্পনা করতে আপনার অসম্ভব ভালো লাগে। ঠিক যেমনটা লাগত আপনার দাদার। তিনি সেজন্য তেল-ঝাল-মশলা দিয়ে বাবার কুকীর্তির কথা লেখে গেছেন। প্রতিটা শব্দ লেখার সময় তিনি উপভোগ করেছেন বিষয়গুলো। আর আপনি উপভোগ করেছেন প্রতিটা লাইন পড়ে পড়ে।’

মিসেস কামাল একটা তেরছা দৃষ্টি দেন এবার মোস্তফা কামালের দিকে। ওদিকে রায়হান বলে চলেছে-

‘আপনার কাছ থেকে পূর্বপুরুষের ডায়েরিটা হাতছাড়া হয়ে গেলো কয়েক মাস আগে। এ বাসার কেউই চুরি করল সেটা। তার পূর্বপুরুষও রুদ্রপ্রতাপ রায় – কাজেই বিষয়টাকে ঠিক চুরি বলা চলে না অবশ্য। রুদ্রের জীবনকাহিনী খুব বেশি আকর্ষণীয় মনে হল তার কাছে। বংশধারাতে আপনার এই সন্তানও নিষ্ঠুরতার ব্যাপারটা পেয়েছেন, মি. কামাল। আপনাদের মাঝে কমন একটা মেন্টাল ডিজঅর্ডার আছে। অ্যান্টিসোশিয়াল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার।’

সবার মুখের দিকে তাকায় রায়হান, ‘অ্যান্টিসোশিয়াল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারদের একাংশকে সাইকোপ্যাথ বা সোশিওপ্যাথ বলা হয়। এরাই মানসিক রোগের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এদের মাঝে এমপ্যাথির ব্যাপারটাই নেই। আর সহানুভূতি না থাকলে যা হয়, একটা অন্যায় আচরণ দেখলে আপনাদের মনে অনুকম্পার সৃষ্টি হয় না। অন্যায় ভাবনাতেও আপনাদের মনের কোন ধরনের অনুশোচনা আসে না। মিসেস কামালের ব্যাপারে জানি না – তবে আপনারা তিনজনই এই বৈশিষ্ট্য পেয়েছেন।’

গুষ্টিশুদ্ধ দোষারোপ করে যাচ্ছে ভেবে রায়হানের কানেই কেমন জানি ঠেকে কথাগুলো। কিন্তু কিছু করার নেই – এখানে একটা দায়িত্ব নিয়ে এসেছে ও আর তা শেষ না করে যাবার উপায় নেই।

‘মি. কামাল শতবার ডায়েরি পড়েছেন আনন্দ পেতে। বিকৃতিরুচির একজন মানুষের ডায়েরি শতবার পড়ে আনন্দ পায় কে? আরেকজন বিকৃতরুচি। তবে যোবাইদার লাশ দেখার পর আপনার প্রতিক্রিয়া আমি দেখেছি। আপনি শুধু কল্পনাতেই নিষ্ঠুর। বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ করার মত নার্ভই আপনার নেই।’
‘কিন্তু ঈপ্সিতার আছে।’ থমথমে গলাতে বলেন মোস্তফা, ‘আগেই সব নিয়ে কথা হয়েছে আমাদের। সিজোফ্রেনিয়া আছে আমার মেয়ের। এর চিকিৎসা কিভাবে করা যেতে পারে – সেটা বলুন।’

পেছন থেকে হাত সামনে আনে রায়হান। মাঝখানে রাখা টি-টেবিলটার ওপর দড়াম করে আছড়ে ফেলে একটি পুরোনো ডায়েরি।

‘চন্দ্রপ্রতাপ রায়ের ডায়েরি।’ ঘোষণা দেয় রায়হান, ‘এই বাড়িতে একজন সিজোফ্রেনিয়ার রোগীও নেই, মি. কামাল।’
‘আপনি আজ রাতেই বলেছিলেন -’
‘আমার ভুল হয়েছিলো।’ শান্ত কণ্ঠে স্বীকার করে ও।

‘ডি আই ডি। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার। এ রোগটাও ভয়ংকর। রোগী নিজেকে দুটো বা তার চেয়ে বেশি চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে এখানে। নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কোন মানুষ ভেবে বসে এবং সেভাবেই চালিয়ে চায় কর্মকান্ড। দেখা যাবে একজন বৃদ্ধ মানুষ নিজেকে পাশের বাসার শিশুটি মনে করছেন – এবং সেরকম আচরণই করছেন। তাকে বোঝাতে পারবেন না আপনি যে সে ঠিক ওই চরিত্রটি নয় – কারণ যখন সে একটি চরিত্রের মাঝে থাকে – অন্য চরিত্রগুলো সে হয়েছে, এমনটা মনেই করতে পারে না ও।’

‘একে তো মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বলা হত?’ ভ্রু কুঁচকে ফেলেন মোস্তফা কামাল।

‘এখন আর বলা হয় না। ডিআইডিই বলে একে। যা হোক, আপনাদের সমস্যা এখানেই। আপনার মাঝে পর্যাপ্ত নিষ্ঠুরতা না থাকলেও ডায়েরি-চোরের মাঝে ছিলো। সে বাস্তবেও প্রয়োগ করে দেখাতে পেরেছে সবকিছু – কারণ সে পরিমাণ নার্ভ ছিলো তার। যদিও তার কিছুই মনে পড়বে না এখন – কারণ, যখন ও রুদ্র হয়, তখন অন্য চরিত্রটার কথা তার মনেই থাকে না। আবার যখন যে জাহিদ হয় – সে মনে করতে পারে না কোনদিনও নিজেকে রুদ্র বলে পরিচয় দিয়েছিলো সে।’

জাহিদ এবার ভয়ানক চমকে গেছে, ‘আমি – আমি রুদ্র বলে নিজের পরিচয় দেব কেন – এসব কি বলছেন?’

ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় রায়হান, ‘ডায়েরিটা তোমার টেবিলের ড্রয়ারের ফলস বটমে পেয়েছি, জাহিদ। ঈপ্সিতা নয় – চুরিটা করেছিলে তুমি। আমাদের রোগী ঈপ্সিতা নয়, এ বাড়িতে মূল সমস্যা তোমার। রোগি নির্ণয়ে ভুল করেছি আমি প্রথমেই, রোগ নির্ণয়ে নয় – কাজেই সবকিছু ঘোলাটে মনে হচ্ছিলো। ঈপ্সিতার একটি মানসিক সমস্যা এখন হয়েছে বটে– তবে সেসবই তোমার আচরণের রেজাল্ট।’
অবাক হয়েছেন মোস্তফা কামালও, ‘ও কিভাবে -’
‘গত কয়েক মাস ধরে ডায়েরি ওর কাছে। রুদ্রপ্রতাপের চরিত্র জাহিদকে শিহরিত করে ও। চৌদ্দ বছর বয়স ওর – মানসিক অস্থিরতার জন্য সময়টা একেবারে নিখুঁত। কাজেই পা পিছলালো জাহিদ, তাছাড়া জেনেটিক কারণে ভেতরে তার নিষ্ঠুর সত্ত্বাটা লুকিয়ে ছিলোই। এবার সেটা আত্মপ্রকাশ করলো। বয়েসটা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রবল টান আসার – জাহিদ ডায়েরির যৌনতার অংশগুলোকে প্রাধান্য দিলো সবার প্রথমে।’

কপালে ঘাম জমেছে রায়হানের, একহাতে মুছে নেয় ও সেটা, ‘সবার সামনেই বলছি – কারণ এখন আর লুকোছাপার কারণ নেই কোন। ডায়েরি থেকে জাহিদ জেনেছে রুদ্রপ্রতাপের সদ্য বালিকা শয্যাসঙ্গীনি হিসেবে বিশেষ পছন্দ। জাহিদ নিজেকে ততদিনে রুদ্র আর জাহিদের মাঝে গুলিয়ে ফেলছে। সে নিজেও জানে না কোন সময় নিজের মাঝে আরেকটা আইডেন্টিটি তৈরী করে ফেলেছে ও – রুদ্র! আর তারপর সদ্য বালিকাকে সঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার জন্য রুদ্ররূপ একেবারে উন্মাদ হয়ে ওঠে। হাতের কাছেই সমাধান পেয়ে সেদিকেই এগিয়ে যায় জাহিদের ‘রুদ্র’ ভার্সন। ঈপ্সিতার বয়েস মেলে সেসব মেয়েদের সাথে।’

‘ওহ গড!’ বিড় বিড় করেন মোস্তফা কামাল।
‘ঈপ্সিতার বয়েস কম, মেয়েটা ভালোমত এসব বোঝেও না। জাহিদ তাকে বোঝায় সে জাহিদ নয়, সে রুদ্র। রুদ্রের হাতের মুঠোতে সব কিছু। প্রতিটা মানুষ তার পোষা কুকুরের অধম। আর মেয়েরা রুদ্রের কথামত মরতেও রাজি থাকবে – এটাই স্বাভাবিক। ঈপ্সিতার সাথে নিয়মিত সঙ্গম করতে থাকে জাহিদ।’

মুখ চেপে ধরেছেন মোস্তফা কামাল, দুই চোখে স্রেফ অবিশ্বাস।

‘মেয়েটা প্রথমে এটা একটা খেলা হিসেবেই নিয়েছিলো। ধীরে ধীরে বাচ্চাটার মস্তিষ্কে চাপ পড়ে – দিনের বেলাতে জাহিদকে জাহিদ, নিজের ভাই হিসেবে দেখতে পায়। রাত হলেই জাহিদকে সে ‘রুদ্র’ নামে চেনে। ফলে বাস্তবতা আর কল্পনার মাঝে হারিয়ে যেতে শুরু করে ঈপ্সিতাও। কয়েক মাস ধরে নিয়মিত সঙ্গমের ফলে বিষয়টা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ততদিনে দুইজনের। কিন্তু এবার রুদ্ররূপের মনে হতে শুরু করে – কিছু একটা মিসিং। রুদ্রপ্রতাপ রায়ের চরিত্রটা নিয়েছে সে – অথচ শুধু নারীসঙ্গের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে।’
‘অতি সামান্য কারণে বাদলের পুরুষাঙ্গ কেটে নেয় এবার জাহিদ। রুদ্রের মত আচরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায় ওর। ভুল সময়ে পৌঁছেছেন আপনারা – ছুরিটা তুলে নিয়ে অপরাধীর নজরে পড়ে যায় বেচারি ঈপ্সিতা। নিষ্ঠুরতার আনন্দ ওদিকে জাহিদ পেয়ে গেছে ততদিনে। রতিলীলাতে নিষ্ঠুরতা আনতে পারে নি তখনও – তৃতীয় বলী সঙ্গী যোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে রাতের জাহিদ। ধারণা করছি – সম্ভবতঃ এই স্টেজে এসেই নিজের মায়ের সাথে অশালীন আচরণ করে বসে ও। প্রথমে ভেবেছিলাম মেয়ের দুশ্চিন্তাতে তিনি ছেলের সাথে কথা বলছেন না। তবে ডিআইডির ব্যাপারে নিশ্চিত হতেই জাহিদের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার কারণ আমি বুঝে ফেলি। যেটার কথা মিসেস কামাল চেপে গেছেন।’

মিসেস কামাল এবারও কোন কথা বললেন না। সন্তানের মুখ থেকে অশ্লীলতা শোনার একটা সীমা আছে । তার বাইরে কিছু শুনলে মুখ থেকে কথা বের হওয়ার কথা নয়।

‘মায়ের কাছ থেকে সাহায্য না পেয়ে যৌনসঙ্গী হিসেবে যোবাইদাকে বেছে নেয় জাহিদরূপী রুদ্র। মেয়েটা গ্রুপ সেক্সে রাজি হয় নি বলে মারধর করে রাজি করায় তাকে। সম্ভবতঃ মোটা অংকের টাকার অফারও দিয়ে থাকবে সে। এরপরে যোবাইদা ঈপ্সিতাকে নিয়ে গোলাঘরের দিকে গেলে ছুরি নিয়ে চলে আসে জাহিদও। ওরা তিনজন মিলে ওখানে যা ইচ্ছে তাই করে – তারপর যোবাইদাকে আক্রমণ করে জাহিদ – ঠিক রুদ্রের মতই। মেয়েটিকে হত্যা করে রেখে ওরা দুইজনে ফিরে আসে বাড়িতে।’

‘আমি -’ দুই হাতে চুল খামচে ধরেছেন মোস্তফা কামাল। কিছু বলতে পারলেন না।
জাহিদের মুখ মেঝের দিকে এখন। ঈপ্সিতাও চুপচাপ তাকাচ্ছে সবার দিকে। সব কথা মেয়েটা বুঝেছে বলে মনে হয় না।
আর মিসেস কামাল কাঁদছেন। রায়হান সবার দিকে তাকায় একবার।

‘রোগটা মূলতঃ জাহিদের মাঝে ছিল। তবে দিনের পর দিন তার এধরনের বিকৃত রুচির শিকার হয়ে ঈপ্সিতার ওপরও বাজে প্রভাব পড়েছে। মেয়েটা এখন জানে না সে যে পৃথিবীতে আছে তাতে এটা স্বাভাবিক নয়। ভাইবোনের সম্পর্কের ব্যাপারে গভীর ধারণা আসার আগেই একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে ওর।’
‘এর উপায় কি, কিভাবে ওদের নরমাল লাইফে ফিরিয়ে আনবো আমি?’ চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি বেয়ে পড়ে মোস্তফা কামালের।
‘সাইকোলজিক্যাল থেরাপিস্টের কাজ এটা। হয়তো কগনিটিভ বিহ্যাভিয়রাল থেরাপি বা সিবিটি দেয়া লাগবে ওদের। আমি সমস্যা কোথায় ধরিয়ে দিতে পারি – তবে ভুলে যাচ্ছেন, ডাক্তার নই আমি। থেরাপিস্ট তো নই-ই। একজন স্বঘোষিত সাইক-ইনভেস্টিগেটর মাত্র।’

‘এক সেকেণ্ড – মি. রায়হান, আপনাকে তাহলে অজ্ঞান করেছিলো কে? আমি?’ প্রশ্ন করে জাহিদ শান্ত গলাতেই, ‘কিভাবে?’
‘কেমিস্ট্রিতে তুমি একজন জিনিয়াস, জাহিদ। মোমবাতির বিকল্প আবিষ্কার – বাংলাদেশের স্কুলের ক্লাস এইটের বাচ্চাদের কোন শিক্ষকই ক্লাসরূপে করতে দেবেন না, তাও তিনদিন ধরে। কাজটা তোমার নিজের করা। তোমার ঘরে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম একটু আগে – সবার বিমূঢ় ভাবটা কাজে লাগাতে হয়েছিলো। অনুমতি তুমি দিতে না আমাকে কখনই। ঘরভর্তি কেমিক্যালের মজুদ দেখে বুঝেছি – ও ব্যাপারে তোমার প্যাশন আছে। আমাকে কোনধরনের কেমিক্যালের সাহায্যে অজ্ঞান করেছ তুমি, খুব কাছে থেকে স্প্রে করে। এটাও অনুমান।’
‘চমৎকার।’ উঠে দাঁড়ায় জাহিদ, আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই এখন ওর মাঝে, ‘এই মুহূর্তে বেড়িয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে এবার।’

অবাক হয়ে তার দিকে তাকান মোস্তফা কামাল, তাকে ইশারাতে কিছু বলতে মানা করে রায়হান।

শান্ত গলাতে জাহিদের উদ্দেশ্যে বলে ও, ‘তুমি মরে গেছ, রুদ্র। মরে গেছ ১৯০৩ সালে। প্রজাদের একাংশ তোমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলো, মাই ডিয়ার।’
‘আমি বাঁচতে এসেছি, মি. ইনভেস্টিগেটর।’ হাল্কা চালে হাসে জাহিদ। পেছনের পকেটে হাত দিয়েছে।

এক সেকেন্ড লেগে যায় রায়হানের ব্যপারটা বুঝতে – তবে এর মাঝেই ভাঁজ করা ছুরিটা এক ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলেছে ছেলেটা। তারপরই নাক মুখ কুঁচকে ছুটে আসতে থাকে নরকের পিশাচটা। গর্জন ছেড়েছে, ‘হারামজাদা, তোর মুখে মুখে তর্ক আমি -’

অন্যপাশের সোফা থেকে জোরে টি-টেবিলের ওপর লাথি কষালেন মিসেস কামাল – মেঝের ওপর বিশ্রী শব্দ করে পিছলে এগিয়ে এল ওটা জাহিদের গতিপথে – হাঁটুর নীচে খারাপভাবে বেঁধে গেল।

কোনমতে সরে গেছে রায়হান – বাতাসে উড়ে ওর পাশ দিয়েই চলে যায় ছেলেটা। এর মাঝেই দুর্বলভাবে কোপ বসাতে চেষ্টা করে ওর শরীরে। বাম হাতের বাহু চিরে গিয়ে টপাটপ রক্ত গড়িয়ে আসে – সেটা অগ্রাহ্য করে রায়হান এগিয়ে যায় ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে মাত্র পড়ে যাওয়া ছেলেটার দিকে।
এক লাথিতে ছুরিটা সরিয়ে দিয়েছে – ওর টুঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁপ দেয় জাহিদ। ডান হাত মুষ্ঠিবদ্ধই ছিলো – এবার প্রকাণ্ড ঘুষিটা বসিয়ে দেয় রায়হান। মেঝেতে ফিরে গেল জাহিদ।

‘ক্লিনিকে নিয়ে যাবার আগতক বেঁধে রাখুন ওকে। সবার নিরাপত্তার জন্য এটি জরুরী।’ দম্পতির দিকে তাকিয়ে বলল ও, ‘থ্যাংকস, মিসেস কামাল।’
বাচ্চা ছেলেটাকে আঘাত করার জন্য খারাপই লাগছে ওর।

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ঈপ্সিতা ভাইয়ের দিকে, ফিস ফিস করে বলল, ‘রুদ্র! আমার রুদ্র!’

_ পরিশিষ্ট _
‘চলে যাচ্ছেন?’ বিষন্ন গলাটা শুনে তাকিয়ে মিসেস কামালকে দেখতে পায় রায়হান।
মৃদু হাসে ও, ‘তিনদিনের আল্টিমেটাম নিয়ে এসেছিলাম। এর মাঝে কাজও শেষ হয়েছে। কাজেই -’

জিনিসপত্র গুছানো হয়ে গেছে। এক হাতে তুলে নেয় রায়হান বড় ট্রাভেল ব্যাগটা।

রাইসার দিকে তাকায় ও, ‘আপনাদের জীবনটা হয়ত তছনছ করে দিয়ে গেলাম। সেজন্য দুঃখপ্রকাশ করছি না। সবকিছু ভালোর জন্যই হয়েছে।’
সামনে এগিয়ে আসে মহিলা, চোখে স্পষ্ট কৃতজ্ঞতা।
‘আপনার কাছে আমরা চিরঋণী হয়ে থাকলাম, মি. রায়হান। দুঃখপ্রকাশের কোন দরকার দেখি না।’

চোখ দিয়ে মহিলাকে মাপে রায়হান। বয়েস ত্রিশের বেশি হবে না। মোস্তফা কামাল বিয়ের সময় বয়েসের ভালো ব্যবধান রেখেছিলেন মনে হয়। বিয়ে করেছিলেন এক কিশোরীকে! সন্তানও নিয়েছিলেন ঐ বয়সেই। রুদ্রপ্রতাপ রায়ের প্রভাব কি তাঁর মাঝেও ছিলো?

কাঁধ ঝাঁকায় রায়হান নিজের অজান্তেই – হয়ত। এখন গুরুত্ব দেওয়ার মত ব্যাপার ওটা নয়।

‘একটা কথা, মিসেস -’
‘আমি বাঙ্গালী অতিথেয়তার চেয়ে ইংলিশ আতিথেয়তাকে বেশি পছন্দ করি। আমাকে মিসেস কামাল বলে ডাকবে না আশা করি। নাম ধরেই ডাকতে পারো।’ একটু হেসে রায়হানের অনুকরণ করেন তিনি।
হেসে ফেলে রায়হান, ‘ঠিক আছে, রাইসা, এসব নোংরা ছবি সরিয়ে ফেললে ভালো হয়।’ ঘরের চারপাশটা দেখিয়ে বলে ও, ‘আন্ডারএজড দুটো বাচ্চা আছে এ বাড়িতে।’
‘সরিয়ে ফেলবো।’ বিষন্নতা নেমে আসে চোখদুটোতে, ‘আরেকবার বলছি – তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।’

পরক্ষণেই এগিয়ে আসলেন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। দুই হাতে আলিঙ্গন করলেন রায়হানকে। ও কিছু বোঝার আগেই নিজের ঠোঁটে ভদ্রমহিলার ঠোঁট অনুভব করে। ভিজিয়ে ছেড়ে দিলেন একেবারে।

তারপর রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যান মিসেস মোস্তফা কামাল।

মিনিট দুয়েক নিজের জায়গাতে স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে থাকে রায়হান।
ঘটনার আকস্মিকতাতে হতভম্ব।
এক মুহূর্ত পরেই মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর। মহিলাটি ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার। ডিজঅর্ডার এঁর মাঝেও আছে। ঠিক কি ডিজঅর্ডার সেটাই ধরতে পারছে না ও – কাজেই হাসিটা ফুটেছে।
সহজে বোঝা যায় না – এমন কোন কেস পেলে এধরনের একটা হাসিই ফুটে ওঠে আবু মোহাম্মদ রায়হানের ঠোঁটে।

এলোমেলো চুলগুলোতে একবার হাত চালিয়ে দুই হাতে ব্যাগগুলো তুলে নেয় ও। তারপর লম্বা পায়ে বেড়িয়ে যায় ঘরটা থেকে।

— ০ —

রচনাকাল : অক্টোবর ০৩, ২০১৪

ট্রিপল এ

হাঁটুর ভেতর থেকে লম্বা পিনটা খুলে ফেলার সময় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সশব্দে হাঁফাচ্ছি আমি।
মুখ থেকে লালা ঝড়ছে তীব্র ব্যাথা সহ্য করে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করার ফলে। তবুও টানতে থাকি পিনটা ধরে। অবশেষে! সড়াৎ জাতীয় একটা শব্দ করে হাঁটু থেকে খুলে গেল যন্ত্রণাদায়ক জিনিসটা।
চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তেই টের পেলাম বাম কাঁধে বসে থাকা দ্বিতীয় পিনটার অস্তিত্ব। ওহ খোদা – চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসে আমার। একই সাথে ডান হাতে চেপে ধরেছি ওটাকে।
হাতে খুব একটা জোর পাচ্ছি না। পিনগুলো এমনিতেও সুবিধের নয়। চার ইঞ্চির মত হবে একেকটা লম্বায়। এসব দিয়ে আস্ত গরুকেও বসিয়ে দেওয়া যাবে। সেখানে আমার মত একজন মানবসন্তান মোচড়ামুচড়ি করছে, পিনের সাথে লড়াইয়ের চেষ্টা করছে। লড়াইটা একতরফা হতে চলেছে এখন।
এক হাত দিয়ে জোর-ই পাচ্ছি না। হাঁটুর পিন বের করার সময় বাম হাতের সাহায্য কিছুটা পেয়েছিলাম, এখন আর পাচ্ছি কোথায়?
তবুও ডান হাত দিয়ে টানাটানি করতে থাকি। এগুলোকে বের করতেই হবে।
হাঁটুর দিকে তাকাচ্ছি না ভুলেও।
রক্তগঙ্গা এখন আমার তালিকার শেষ বস্তু – যেটা দেখতে চাবো এই স্নায়বিক দুর্বলতার সময়। তবুও একবার চোখ পড়ে গেল।
রক্তে ভেসে যাচ্ছে হাঁটুটা।
আমার হাঁটু।
আমার ডান হাঁটু!
জ্ঞান ফেরার পর প্রবৃত্তি থেকে দুটো চিন্তা মাথায় একেবারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসেছিল –
১. প্রথমে হাঁটু থেকে পিন খুলে ফেলো
২. এবার কাঁধের পিনটা বের করো
তৃতীয় চিন্তাটা মাথাতে আসতেই আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে!
শহর জুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে বেড়ানো সিরিয়াল কিলার ট্রিপল-এ কি এবার আমাকেই তার পঞ্চম ভিক্টিম হিসেবে বেছে নিয়েছে?

 

১.
কুল কুল করে ঘামছি।
ছোট একটা ঘরে বসে আছি এই মুহূর্তে। চারপাশে এক নজর দেখেই বুঝে গেছি, ঘরটা মাটির নিচে। স্রেফ কোন জানালা দেখছি না বলে এই সিদ্ধান্তে চলে এলাম এমন নয়। বাতাসটা বদ্ধ।
টলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। এখানে কিভাবে এসেছি মনে নেই। সম্ভবতঃ ট্রিপল-এ ভিক্টিমদের সেটা মনেও থাকে না। তবে যে করেই হোক এখনই এখান থেকে বের হতে হবে!
তারপর হাত-পা জমে গেল আরেকটা বিষয় মনে আসতে। বের হয়ে যেতে পারলে সম্ভবতঃ আমিই ট্রিপল-এর প্রথম ভিক্টিম, যে বেঁচে ফিরতে পারবে!
নিরাশ হলাম। এখনও দাঁড়াতে পারিনি। হাঁটুর যন্ত্রণা প্রচণ্ড কষ্ট দিচ্ছে আমাকে। দাঁড়াবার মতো যথেষ্ট পেশি কি অক্ষত আছে? জানি না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিদ্যাদিগগজ ছিলাম না কখনও। সেই সাথে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে আছে কাঁধের ক্ষতটা।
তাছাড়া খুনি আশেপাশেই কোথাও আছে হয়ত। একটু খেয়াল হতেই ফিরে আসবে ও। এবং তার বাকি থাকা কাজটুকু শেষ করে দেবে। বেঁচে যাচ্ছি বা যাবো – এমন কিছু মনে করার কারণ দেখলাম না।
চকিতে মনে পড়ে যায়, প্রথম আঘাত যখন এই খুনি হেনেছিল, তখন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মৃতের প্রতি কি টিটকিরিই না মেরেছিলাম আমরা!
ভার্সিটি থেকে মাত্র বের হয়ে মনের সুখে সিগারেট খাচ্ছিলাম আমরা চারজন।
ছোট সার্কেল। সুখী সার্কেল।
প্রীতি আমাদের মাঝে নতুন সিগারেট খেতে শিখেছে। মেয়েটা দুই টান দেয় আর তিনবার করে কাশে।
একটা সময় বেশ বিরক্ত হয়ে সোহান বলে ফেলল, ‘বারবি ডল হয়ে সিগারেট টানতে কে বলেছিলো তোকে? জুস চুষতি, ওটাই ঠিক ছিল।’
প্রীতি একবার হাল্কা ‘ইয়াক’ শব্দ করে নাক মুখ কুঁচকে আরেকটা টান দেয়।
তারপর নীতি মেনে কেশে ফেলেছিল, আমি বললাম, ‘ধারাটা দেখো। খক খক, খক খক খক।’
রাগ করে প্রীতি সিগারেটই ছুঁড়ে মেরেছিল। এভাবে খেয়ে ওর পোষাবে না, বেশ বুঝতে পারি।
ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘লুকিয়ে টানিস। বাসাতে প্যাকেট নিয়ে যা। অভ্যাস হলে পাবলিকলি, ওকে?’
মেয়েটা আমার দিকে একটা কৃতজ্ঞ দৃষ্টি দিয়েছিলো শুধু। তখনই কাপ পিরিচ ভাঙ্গার শব্দে চোখ ফেরাতে হয় আমাদের।
যে ছেলেটা এই মাত্র টঙের সাধারণ টেবিলটার ওপর থেকে কোমরের ধাক্কায় একটা গ্লাস আর একটা পিরিচ ফেলে দিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছে– সে আমাদের দিকে তাকিয়ে একটা ভদ্রতার হাসি হাসে। তারপর দ্রুত ভাঙ্গা গ্লাসের দেহাবশেষ তুলতে গিয়ে পাছার ধাক্কায় পেছনের কাস্টোমারের হাতের চায়ের কাপও দেয় ছলকে।
ছটফটে ছেলেটার কাণ্ড দেখে আমরা হাসলাম। এই মানুষটা আমাদের মাঝে সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট।
তারেক।
হন্তদন্ত হয়ে সব সময় ছোটাছুটি সে করে না। তবে উত্তেজিত হয়ে গেলে এমনটা সে করবেই। এতদিনে আমরা তাকে যথেষ্ট চিনেছি।
কাজেই সোহান হাল্কা ভ্রু নাচালো, বাড়িয়ে দিয়েছে সিগারেট, ‘নিতম্ব সামলাও, বৎস। টান মেরে গান গাইতে শুরু করো। কিসের জন্য উত্তেজনা এত? নতুন কোন ডাউনলোড?’
বাতাসে অজ্ঞাত কাওকে খামচিয়েছিল তারেক, ‘আরে না! লিতিসার বয়ফ্রেন্ড গন!’
আমরা সবাই লাফিয়ে উঠলাম এ কথাতে।
তারেক আজকে থেকে লিতিসাকে ভালোবাসে না। সেই ক্লাস সেভেন থেকে সে এই মেয়ের প্রতি দুর্বল। এখন একেবারেই ‘অথর্ব’ হয়ে গেছে সে এই মেয়ের প্রেমে। কিন্তু সমস্যা আর সব ‘প্রেমের টান’-এর মত এখানেও ছিল।
লিতিসার একজন বয়ফ্রেন্ড আছে।
নাম জিহান , লোক খারাপ। চরিত্র একেবারেই পবিত্র।
যতটা হলে আমাদের নাক কুঁচকাতে পারতো, ঠিক ততটাই।
এবার প্রীতির গলা থেকে গদ গদ কথা বের হয়ে আসে, ‘লিতিসার ব্রেক আপ? তোর রাস্তা ক্লিয়ার?”
আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল, “এখনই লাফ দিসনে। দুই দিন পর এসবের প্রেম আবার উথলে ওঠে। দেখা যাবে, প্যাচ আপ করে আবার ঘুরে বেড়াচ্ছে কপোত-কপোতী। শালা ফেরত আসলে?’
শার্টের হাতা গোটাতে গিয়ে সোহান ছিঁড়েই ফেলল, ‘আসুক, এবার শালার পুতকে দুই টুকরো করে দেব না?’
বসতে গিয়ে পেছনের টেবিল কাঁপিয়ে ফেলল তারেক, তবে বড় কোন কেলেঙ্কারী না ঘটিয়েই বসতে পারলো এবার। এতক্ষণে বোমাটা ফাটালো সে।
‘শালার পুত একরকম দুই টুকরোই হয়ে গেছে। মরে পড়ে ছিলো ওদের বাগানে। কে যেন দুই হাঁটুতে আর দুই কাঁধে পিন পুঁতে দিয়েছিল। তারপর বুক ফেঁড়ে দিয়েছে। ব্যাঙদের মতো। একেবারে শেষ।’
আমাদের চা খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
আমরা তিনজনই একবার করে প্রশ্নটা করি, ‘তুই শিওর?’
আমাদের প্রত্যেককে নিশ্চিত করে তারেক, ‘শতভাগ।’
প্রীতি চট করে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলে এই আনন্দে, ‘আজকে সিগারেট পার্টি হবে, ব্রাদার!’
সোহান এবার উত্তেজনাতে নিজের পিরিচেই ফাটল ধরিয়ে দেয়। চায়ের কাপ নামানোর সময় হাতের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলো না বোকাটার।
তারপর ওদিকে তাকিয়েই বলে ফেলে, ‘একেবারে ঠিক হয়েছে। লুচ্চামির শাস্তি। কেউ না কেউ জেনে গেছিলো হয়ত চরিত্রটা কেমন ছিলো ওর।’
আমিও সায় দিলাম, ‘ঠিকই আছে, লুচ্চামির কারণে ওকে আরও ভালো শাস্তি দেওয়া তো দরকার। ফাঁসী দিতে হবে। তবে গলাতে বেঁধে নয়। লাশটা ঝোলানো যাবে এখন?’ জবাবের আশাতে তারেকের দিকে তাকালাম।
চায়ের দোকানদার মামা আমাদের দিকে তেরছা দৃষ্টি দেয়। কারও মৃত্যুতে এমন আনন্দিত মানুষ সে আগে দেখেনি মনে হয়! সে তো আর জিহানকে চেনে না!
মাথা নেড়ে আস্তে করে বলেছিলো তারেক, ‘খুশি হওয়ার কিছু নাই। লিতিসাকে খুনের সন্দেহে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।’

 

২.
তৃতীয়বারের মত হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম।
এবার একটা চেয়ারসহ পড়েছি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছিলাম ঠিক মতই। তারপর দাঁড়ানোর অযথা চেষ্টা করতে করতে একবার মাটিতে গড়িয়ে এসেছি। চারপাশটা অন্ধকার ছিল। সুস্থ স্বাভাবিক লোকের জন্যই উষ্ঠা খাওয়া স্বাভাবিক। সেখানে আমি একজন সিরিয়াল কিলারের ভিক্টিম!
দ্বিতীয়বার মাটিতে পড়িনি। একটা বাক্সের ওপর ডিগবাজি খাচ্ছিলাম বলা চলে। রক্তমাখা হাতটা দিয়ে ডালা তুলে দেখেছি, ভেতরে বিভিন্ন মাপের পিন আছে।
সাইজে তারা এমনই – এদের ঠিক গজাল বলা চলে না। পিন বললে আবার বেশি ছোট মনে হয়। ওগুলো কোন মহৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে ব্যবহার করা হয় সেটা বোঝার জন্য আমার কোন সুপারন্যাচারাল ক্ষমতার দরকার ছিলো না।
কাজেই, আরেকবার নিজেকে তুলে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলাম। বাইরে যেতে হবে। পুলিশে জানাতে হবে। বাঁচাতে হবে প্রাণ।
হলঘরটার মাঝে এসেই ব্যালান্স হারিয়ে হুড়মুড় করে তৃতীয়বারের মত মাটিতে ছিটকে পড়ে গেলাম। এবার সাথে একটা চেয়ার নিয়ে।
বার দুয়েক ওঠার বৃথা চেষ্টা করে পারলাম না। শুয়ে শুয়ে ছাদের কাছে পুরোনো আমলের ঝাড়বাতি দেখতে থাকি। খুনি সিরিয়াল কিলার হোক আর যাই হোক, নবাব পরিবারের বংশধর বলেই মনে হচ্ছে। হারামজাদার দাদা জমিদার ছিলো নাকি?
অত্যাধিক রক্তক্ষরণের কারণেই হয়তো, একটু বিশ্রাম পেলেই আমার মাথায় এসব হাবিজাবি চিন্তা চলে আসছে। জোর করে খুনির সাথে নবাব পরিবারের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা বাদ দিলাম।
মাথা খাটানোর চেষ্টা করছি, এখানে আমি এলাম কিভাবে? স্মৃতি সব মুছে গেছে। পরিচিত কেউ কি নিয়ে এসেছিলো? নাকি অজ্ঞান করে ট্রিপল-এ এনেছে আমাকে?
খুনিটার চেহারা মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা আমি করতে থাকি।
মানুষটা দেখতে কেমন? আমার পরিচিত?

দূরে কারও পায়ের শব্দ শুনতে পাই এ সময়।
নাকি, পেলাম না?
আমার কাছে তো মনে হয়েছে কেউ শব্দ করেছে। বুটজুতো?
নড়তে গিয়ে ডান হাঁটুতে বেশি চাপ ফেলেছি বোধহয়। আবারও কুল কুল করে রক্ত বের হওয়া শুরু করেছে ওখান থেকে। দাঁতে দাঁতে চেপে গোঙ্গানিটা আটকালাম।
আরেকটুক হলেই মুখের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল ওটা।
আর এখানে, খুব কাছে দেশের সবচেয়ে ভয়ংকর খুনিটা লুকিয়ে আছে। তার জুতোর শব্দও পাচ্ছি আমি! যখন পালাবার জন্য হামাগুড়ি দিচ্ছেন, গোঙ্গানির জন্য খুব দারুণ সময় এটা নয়।
পায়ের শব্দ আরও এগিয়ে আসছে। উঠে বসার চেষ্টা করলাম। বাম কাঁধটা চির চির করে ওঠে। যেন বেশ কয়েকটা হাড় ওখানে এই মাত্র কুচি কুচি হয়ে গেল!
অনুভূতিটা আমার চেনা আছে। ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের হাড় ফাটিয়েছিলাম। অর্থাৎ আমার ডান কাঁধের হাড় ভাঙ্গে নি।
ফেটেছে।
আর প্রথমবারের মত হাল্কা গুঙ্গিয়ে ফেলেছি আমি!
সাথে সাথে ঘরের দরজাটার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে পায়ের শব্দ।
নিজের অবস্থা দেখে চোখে পানি আসার জোগাড় হয় আমার।
এক কাঁধ আর এক হাঁটু নড়াতে পারছি না, একেবারেই বাজে অবস্থা আমার। এর মাঝে দৌড়াদৌড়ি করার চেষ্টা করা উচিতই হয়নি।
তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার মনে হতে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়! আমি কোনভাবেই ট্রিপল-এর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রথম ভিক্টিম নই!
এই উন্মাদ সিরিয়াল কিলারের কাছ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ বাঁচে নি।
আর সমীকরণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমার বাঁচার কোন সম্ভাবনাও দেখি না।
তার মোডাস অপারেন্ডি বা এম.ও. এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করেছে সন্দেহাতীতভাবে। দুই কাঁধে আর দুই হাঁটুতে পিন ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে হত্যা করে ট্রিপল-এ! আমার জন্য তার ‘স্পেশাল গেস্ট লিস্ট’ খুলে দেওয়া হয়েছে তা তো না।
এর অর্থ একটাই। আমার ক্ষেত্রে কাজে(!)র মাঝখানে উঠে যেতে হয়েছে বেচারাকে। এক হাঁটু আর এক কাঁধে গাঁথানোর পরই তাকে কোন দরকারে উঠে পড়তে হয়েছে। তাই এখন পর্যন্ত এখানে টিকে গেছি।
লিতিসার কথা মনে পড়ে আমার এই পর্যায়ে। মেয়েটাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিয়ে গেছিলো ঠিকই। তারপর সে বাসাতে ফিরে আসেনি আর।
ট্রিপল-এর দ্বিতীয় শিকার ছিলো লিতিসা।
খুনি কে হতে পারে, সে প্রশ্নটা নিজেকে আর করা লাগে না এবার আমার।
মনের পর্দায় কেঁপে ওঠে একটা চেহারা। মানুষটা না লিতিসাকে সেদিন থানা থেকে উদ্ধার করে আনতে গেছিলো?
তারেক?

৩.
‘জাহান্নামে যাক সবাই!’, গর্জে ওঠে সোহান।
জবাবে বিকট লাথিটা মেরে দেই আমি, টি-টেবিলের ওপরের গ্লাসটা ঘরের অন্য কোণে গিয়ে পড়ে ভেঙ্গে চুর চুর হয়ে যায়!
‘লিতিসার লাশ?’ প্রীতি আরও একবার জানতে চাইলো।
মাত্রই সোহান এসে খবরটা দিয়েছে। এখনো আমরা কেউ হজম করতে পারিনি।
গর্জে ওঠে সোহান জবাবে, ‘ডেফিনিটলি! মেয়েটার শরীরে ছিলো চারটা পিন, কাঁধে দুটো এবং হাঁটুতে দুটো! এবার বোঝ!’
‘এটা কি? সিরিয়াল কিলার? একদিনে দুইজনকে …’ ফিস ফিস করে শুরু করা বাক্যটা শেষ করতে পারলো না প্রীতি।
বিকেলে আড্ডা দিতে এসেছিলাম আমরা। সোহান খবরটা নিয়ে ঢুকেছে একটু আগে। আমাদের মুড নষ্ট হয়ে গেল। প্রীতির দিকে তো একেবারেই তাকানো যাচ্ছে না। কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে তার মুখ।
সোহান আরও বাজে একটা খবর আমাদের জন্য তুলে রেখেছিল, ‘তারেককে ওরা গ্রেপ্তার করেছে। লিতিসাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে সে, বিষয়টা জানতে তো আর কারো বাকি নেই। প্রথমে বয়ফ্রেন্ড তারপর লিতিসা – পুলিশ কানেকশনটা এভাবেই দেখছে।’
‘তারমানে, তাদের ধারণা, তারেক প্রথমে বয়ফ্রেন্ডকে সরিয়ে দিয়েছে, তারপর লিতিসাকে প্রপোজ করেছে বা এজাতীয় কিছু? মেয়েটা না রাজি হওয়ায় তাকেও খুন করে ফেলেছে?’ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাই আমি।
‘তাদের তাই ধারণা।’ স্থির হয়ে যায় সোহান।
দুই হাতে মুখ ঢাকে প্রীতি, ‘এটা তো সম্ভব না! তারেকের মত একটা ছেলে – কিভাবে সম্ভব? ওহ গড!’
কাঁধ ঝাকালাম আমি আর সোহান। বিষয়টা প্রীতির মত ‘ওহ গডে’ সীমাবদ্ধ রাখার মত অবস্থাতে নেই।
খতিয়ে দেখতে হবে সব ধরণের সম্ভাবনা।
মুখে কেবল বললাম, “পুলিশ সন্দেহভাজনের তালিকায় রাখার মানেই তো আর অপরাধী নয়। হতে পারে কালই তাকে ছেড়ে দেবে। সত্যিকারের খুনি ধরা পড়লেই সবটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
গাড়িতে করে যখন থানার দিকে যাচ্ছিলাম, সোহান জানতে চেয়েছিল, ‘পুলিশ শালারা ঘাঘু আছে। দেখা করতে না দিলে কিভাবে কথা বলবি?’
জবাবটা সরাসরি না দিয়ে আমি একটু করে মানিব্যাগটা দেখিয়ে দেই।
তারপর দুইজনে শুকনো হাসলাম। বাংলাদেশ।
সোহানের কাছে জানতে চাই, ‘তারেক কাজটা করেছে বলে কি তোর মনে হয়? মোটিভ দেখ, মেলে। এই দুইজন মারা গেলে তার লাভ আছে।’
মাথা নাড়ে অবশ্য সোহান, ‘এই এক মেয়েকে ভালোবাসার জন্য দুটো খুন করবে না তারেক। খুন করা কি মুড়ি-মুড়কি খাওয়ার মতো ব্যাপার? আমার কথা ভুলে যাচ্ছিস? লিতিসাকে আমিও তো ভালোবাসতাম? আমি কি তাই বলে খুন করে বেড়াবো এখন?’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে ফেলি, ‘আরে তুই তো আর অল্পে মাথা গরম টাইপ না।’
কথাটা বলেই গাড়ির মাঝে থমকে গেলাম।
সোহান স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। শরীর একেবারে শক্ত হয়ে থাকে ওর, যখন ড্রাইভ করে। সতর্ক শয়তান। এই মুহূর্তে ওকে দেখে একটু উদ্বিগ্ন না হয়ে পারলাম না। ছেলেটা ঠাণ্ডা মাথাতে একবার দুই বছরের সিনিয়র এক ছেলের পা ভেঙ্গে দিয়েছিল।
কেন জানি দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে বার বার। লিতিসাকে সোহানও ভালোবাসতো!
আমি কি করে ভুলে গেলাম?
থানার সামনে থেমে যেতে আমার মনে প্রথম যে প্রশ্নটা আসে, ‘সোহান দৌড়াদৌড়ি করে থানাতে কেন আসছে? তৃতীয় শিকার তারেককে সরিয়ে দিতে? না তাকে সাহায্য করতে?’
উত্তরটা নিশ্চিত করে পাইনি।
এবং আমরা সেরাতে থানাতে পাই নি তারেককেও।
তার মামা এসে হাজত থেকে জামিনে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। প্রথমে ব্যাটার মোবাইলে, এবং তারপর বাসায় ফোন দিয়ে তাকে পেলাম না।
সোহান আমাকে বলল, ‘তুই বাসায় যাবি?’
মাথা নাড়লাম।
‘তাহলে প্রীতির বাসায় একবার যা পারলে। লিতিসার খবরটা শোনার পর কী অবস্থা হয়েছিল ওর মনে আছে? একা থাকতে দেয়া উচিত হবে না এখন ওকে।’
সোহানের কথায় যুক্তি আছে। তবে আমার মনটা খচ খচ করতে থাকে। জানতে চাইলাম, ‘তুই কী করবি?’
স্টিয়ারিংটা ধরলো সোহান, ‘গাড়িটা আছে যখন, আমি দেখি তারেককে খুঁজে পাওয়া যায় কি না!’
আমার বুক ধক ধক করছিল।
যদি তারেক খুনি হয়ে থাকে, তাহলে তার লিস্টে নিশ্চয় আছে সোহান। বন্ধুকে ‘সাবধানে থাকিস’ বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না।
কারণ, যদি সোহান খুনি হয়ে থাকে, তাহলে তার লিস্টে নিশ্চয় আছে তারেক!
প্রিয় দুই বন্ধুকেই সন্দেহের তালিকায় দেখতে ভালো লাগছিল না আমার। তবে উপায় কী? মানুষের মন তো এভাবেই কাজ করে!
প্রীতিকে অবশ্য রাতে স্বান্তনা ভালো মতই দিয়েছিলাম। ওকে সব কিছু ভোলাতে এবং নিজের মাথা থেকেও আজকের স্মৃতিগুলো দূর করার জন্য প্রথমবারের বিছানাতে উঠে এসেছিলাম আমরা।
গতকাল সারারাত ও আর আমি ছিলাম আবেশে। প্রীতি মেয়েটা এরকম তৃপ্তিদায়ক হবে জানলে আরও আগেই ওকে গার্লফ্রেন্ডের কাতারে টেনে নিতাম। বোকার মত বন্ধুত্ব করেছি এতদিন ধরে!
পরের চিন্তাটা আমাকে থমকে দেয়!
এবার সবটা মনে পড়েছে।
সবকিছুই।
প্রীতির সাথে উদ্দাম রাতের পরই আমি এখানে জেগে উঠেছি!
দুটো পিন শরীরে নিয়ে!
এখন আমি জানি ট্রিপল-এ নামের সিরিয়াল কিলারটি আসলে কে!

৪.
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে মানুষটা। আর সেই সাথে থেমে যায় তার পদশব্দ।
চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখেই চিনতে পারলাম।
শুকনো গলায় বলি, ‘হাই, দোস্ত!’
কাঁধ ঝাঁকাল সোহান, কিছু বলে না।
আমাকে পড়ে থাকতে দেখে তার চেহারার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। যেন এমনটাই হওয়ার কথা!
সোহানের হাতের হাতুড়িটা তখনই চোখে পড়ে আমার। চকিতে ঘরের একপ্রান্তের বড় বাক্সটার দিকে তাকাই , হাতুড়ির সাথে লম্বা পিনের সম্পর্ক সবাই জানে।
শুয়ে থেকেই বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠি আমি, ‘শুরু থেকেই তাহলে তুই আর প্রীতি একসাথে কাজ করেছিস? ওহ মাই … আমি ভেবেছিলাম ট্রিপল-এ একজন মানুষ! লোন উলফ!’
কোন মন্তব্য করে না সোহান এবারও। ঠান্ডা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে দরজা থেকে।
‘ওহ গড! তারেক … তারেক কোথায়?’
মুখ বাঁকায় সোহান, ‘রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে তাকে গতকাল রাতে। গেস হোয়াট? শরীরে চারটা পিন ছিলো ছেলেটার।’
মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায় আমার, ‘তারমানে, তারমানে যখন আমি প্রীতির বাসাতে – আর তুই খোঁজ করার নাম করে বের হয়ে গেলি … তারেককে ঠিকই খুঁজে বের করেছিস তুই!’
একটু হাসে সোহান, ‘খুঁজে বের করতে আমি দক্ষ। দেখ, সময়মত কাওকে পাওয়া যায় না!’
ঢোক গিলি আমি, ‘কেন? লিতিসা আর জিহানের ব্যাপারটা বুঝলাম। ওদের রিলেশন ছিল। ওদের খুন করেছিস সেটাই যথেষ্ট ছিল। আবার তারেককে কেন মারতে হলো তোর? লিতিসাকে ভালোবাসে বলে?’
‘কাউকে খুন করার কথা তো মনে করতে পারি না। হয়তো করেছি, অজান্তে। তবে জানি না আসলেই করেছি কি না!’ বিড় বিড় করে বলে সোহান।
ফিস ফিস করলাম , ‘তুই … পাগল হয়ে গেছিস!’
মুচকি হাসে সোহান, ‘কথাটা আমার না। কেনেথ এরকসাইনের। তাকে মানুষ চিনতো স্টকওয়েল স্ট্র্যাংগ্লার নামে।’
আমি এবার আর কিছু বললাম না, শুনছি।
‘বেচারা এখন জেলখানায়। ৭ থেকে ১১ জনকে খুন করেছিলো এই সিরিয়াল কিলার। সবাই ছিল প্রাপ্তবয়স্ক। অ্যান্টি-সোশিয়াল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে ভুগছিলো লোকটা। সেই সাথে ছিলো সিজোফ্রেনিয়া।’
মাথা নাড়ি আমি, চোখ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
‘হাহ!’ অবাক হয় সোহান। তোকে আরেকটা উক্তি শোনাই, ‘ “দানবটা আমার মাথাতে যখন ঢুকে গেল, আমি জানি এটা থাকতেই এসেছে! নিজেকে কিভাবে চিকিৎসা করব আমি? আমি তাকে থামাতে পারি না। দানবটা তার কাজ করেই যায়! আমাকেও কষ্ট দেয়, সমাজকেও। হয়তো তোমরা একে থামাতে পারো। আমি পারবো না!” বলেছিলো ডেনিস রেডার। একে অনেকে দ্য বিটিকে কিলার বলে থাকেন। ’
‘আই জাস্ট ক্যান্ট বিলিভ দিস! চার চারটা খুন হয়ে গেছে আর তুই আমাকে এখানে বসে বসে সাইকো কিলারদের ইতিহাস শোনাচ্ছিস? নট দ্য টাইম নর দ্য প্লেস, সোহান!’
চোখ সরু হয়ে যায় সোহানের, ‘চারটা?’
গর্জে উঠি আমি, ‘ন্যাকা আর কি? জানিস না ট্রিপল-এ চারবার হিট নিয়েছে এখন পর্যন্ত!’
‘আর কাকে মেরেছিস, রাতুল? প্রীতিকে? ওহ গড!’, হাতুড়িতে হাত শক্ত করে চেপে ধরে সোহান, ‘প্রতিটা খুন তুই করেছিস, গর্দভ! আর তোর প্রতিবারই মনে হয়েছে আর কেউ খুনগুলো করছে! ঠিক ডেনিস রেডার অথবা কেনেথ এর্কসাইনের মত!’
চোখ বাষ্পারুদ্ধ হয়ে আসে আমার, ‘না। এসব আমি করিনি।‘
সোহান কিছুই বলল না। তীব্র দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে।
‘মারবি তো আমাকে, মার। কিন্তু এসব বাজে কথা শোনাতে আসিস না।’
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে সোহান, দুই চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
‘শহরের সবাই জানে তিনটা খুন হয়েছে। কিন্তু কেউ জানে না সিরিয়াল কিলারটি কে, অথবা তার নাম কি। এই মাত্র জানলাম আমাদের খুনি নিজেকে ট্রিপল-এ বলে ডাকতে পছন্দ করছে।’
চট করে নিজের হাঁটুর দিকে তাকাই। এক ফোঁটা রক্ত নেই ওখানে এখন।
নেই কোন ক্ষতও।
কাঁধের কাছটাও ঠিক হয়ে গেছে।
‘তিনজন ভিক্টিম – লিতিসা, জিহান আর তারেক। তোর মুখেই শুনলাম সিরিয়াল কিলার মহাত্মা চতুর্থ কাওকে খুন করেছে। চারটা শিকার, না?’
সোহান আমার কাছে থেকে কাছে চলে আসছে।
ডান হাতে ধরে থাকা পিন দুটো দেখলাম একবার। রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে ওরা। একটু আগেই আমার কাঁধ আর হাঁটু থেকে টেনে তুলেছি। রক্ত থাকবেই।
খুনিটার হাত থেকে বাঁচতে হবে! মাথাতে আর কিছু কাজ করে না এই মুহূর্তে!
সোহান সতর্ক পায়ে আরেকটু এগিয়ে এসেছে। হাতে তার প্রস্তুত হাতুড়ি।
চোখের পলক ফেলার আগে উঠে আসলাম আমি। একটা পিন সজোরে গাঁথিয়ে দিয়েছি সোহানের ডান কাঁধে। অপর পিনটা বুকের পাঁজর ভেদ করে ভরে দিলাম হৃৎপিণ্ড বরাবর। নিজের দ্রুতগতি দেখে এবার আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই!
সোহানের দুই চোখে ফুটে উঠেছে অবিশ্বাস। আমার দিকে বার কয়েক চোখের পাতা ফেলে দড়াম করে মাটিতে পড়ে যায় ও।
হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেছে হাতুড়ি। আমার সখের ফ্লাওয়ার ভাসটা তিন টুকরো হয়ে যায় সেই সাথে।
চারপাশে তাকিয়ে জায়গাটা আর অচেনা লাগে না। আমার বাসারই নিচের দিকে এই ঘরটা।
বিষয়টা বুঝতেই আমার ভয় কেটে গেছে। প্রাণপণে ছুটলাম বেজমেন্টের দিকে।
ছোট একটা ঘর তো ওখানে ছিলো?
এক ধাক্কাতে দরজাটা খুলে ফেলেই প্রীতিকে দেখতে পেলাম।
বড় বড় সুন্দর চোখগুলো খোলা। সোজাসুজি তাকিয়ে আছে ওগুলো ছাদের দিকে।
বাম হাঁটু আর ডান কাঁধে রক্ত ভরে আছে। তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে পিন দুটো। বড় একটা হাতুড়ি তার পাশেই পড়ে আছে।
বাম কাঁধ আর ডান হাঁটু অবশ্য পিনমুক্ত। পিনদুটো আমার হাতে ছিল।
একটু আগেই টেনে বের করি নি আমি?
পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছে আমার।
প্রাণপনে আমি চেষ্টা করতে থাকি ঘোলা হয়ে আসা চোখগুলো খুলে রাখতে।

পরিশিষ্ট
বুকের ভেতর থেকে লম্বা পিনটা খুলে ফেলার সময় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সশব্দে হাঁফাচ্ছি আমি।
তীব্র ব্যাথা সহ্য করে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করার ফলাফল হিসেবে মুখ থেকে লালা ঝড়ছে। তবুও টানতে থাকি পিনটা।
সড়াৎ জাতীয় একটা শব্দ করে হাঁটু থেকে খুলে গেল যন্ত্রণাদায়ক বস্তুটি। হৃৎপিণ্ডের খুব কাছে গেঁথেছিলো! এখনও বেঁচে আছি ভেবেই আশ্চর্য লাগলো।
চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তেই টের পেলাম ডান কাঁধে বসে আছে আরেকটি পিন।
ওহ খোদা – চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসে আমার। বাম হাতে একই সাথে চেপে ধরেছি ওটাকে।
হাতে খুব একটা জোর পাচ্ছি না। পিন জিনিসটা এমনিতেই সুবিধের নয়। চার ইঞ্চির মত হবে একেকটা লম্বায়। এসব দিয়ে আস্ত গরুকেও বসিয়ে দেওয়া যাবে। সেখানে আমার মত একজন মানবসন্তান মোচড়ামুচড়ি করছে, পিনের সাথে লড়াইয়ের চেষ্টা করছে।
লড়াইটা একতরফা হতে চলেছে এখন।
এক হাত দিয়ে জোর খাটাতেই পাচ্ছি না। বুকের পিন বের করার সময় ডান হাতের সাহায্য কিছুটা পেয়েছিলাম, এখন আর পাচ্ছি কোথায়?
তবুও বাম হাত দিয়ে টানাটানি করতে থাকি। পিনগুলো বের করতেই হবে।
বুকের দিকে তাকাচ্ছি না ভুলেও।
রক্তগঙ্গা এখন আমার তালিকায় শেষ বস্তু – যেটা দেখতে চাবো এই স্নায়বিক দুর্বলতার সময়।
তবুও একবার চোখ পড়ে গেল।
রক্তে ভেসে যাচ্ছে বুক।
আমার বুক!

জ্ঞান ফেরার পর ইন্সটিংক্ট প্রথম দুটো চিন্তা মাথাতে একেবারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনে দিয়েছিল –
১. প্রথমে বুক থেকে পিন খুলে ফেলো
২. এবার কাঁধের পিনটা বের করো
তৃতীয় চিন্তাটা মাথাতে আসতেই আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে!
শহর জুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে বেড়ানো সিরিয়াল কিলার ট্রিপল-এ কি এবার আমাকেই তার ষষ্ঠ ভিক্টিম হিসেবে বেছে নিয়েছে?

— ০ —

রচনাকাল : ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৪

নারী

“সরি ভাই।”

পা মাড়িয়ে দেওয়া আঠারো-উনিশ বছরের ছেলেটি শশব্যস্ত হয়ে বললো। ঢিলেঢালা শার্ট, কাঁধে একটা ঢাউস ব্যাগ। ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে তার খুব ঝামেলা হচ্ছে। পায়ের ব্যথাটা টের পেলাম কয়েক সেকেন্ড পর। অমায়িক হাসি দিয়ে ছেলেটাকে বললাম, “ইট’স ওকে।”

কাদামাখা জুতো পায়ে পড়লে এতো মধুর কন্ঠে আমি ইট’স ওকে বলি না। তবে আজকের কথা আলাদা। দুই ভদ্রলোক পরে বাদামি ফতুয়া পরা এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে বেশ, সিল্কি চুলে লালচে ভাব, দুধসাদা ত্বক। তালতলা থেকে উঠেছে, তখন থেকে তার দিক থেকে আর চোখ সরাতে পারছি না।

মেয়েদের দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকা আমার স্বভাবের বাইরে। এই মেয়ে আমাকে স্বভাবের বাইরে বের করে এনেছে। চারপাশে আড়চোখে তাকালাম, তবে সরাসরি তাকালেও সমস্যা হতো না। বাসের প্রতিটি পুরুষের দৃষ্টি এখন তার দিকে। মেয়েটির ভিউয়ারের সংখ্যা লক্ষ্য করলে সালমান মুক্তাদিরও ঈর্ষান্বিত হতেন। এদের মধ্যে একজনের মনোযোগ অন্যদিকে দেখা গেলো। কর্কশ ভাষায় কটুক্তি করে বসলেন বাঁদিকে বসে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব এক ভদ্রলোক।

“সরি আংকেল।” দ্বিগুণ শশব্যস্ত হয়ে বললো ঢাউস ব্যাগওয়ালা ছেলেটা।

“ব্যাগটা হাতে রাখতে পারো না!” কড়া গলায় বললেন যাত্রীটি, “মুগুরের বাড়িতেও তো কম ব্যথা লাগে। ভেতরে কি কামানের গোলা নিয়ে ঘুরছো নাকি?”

সদ্য তারুণ্যে পা রাখা ছেলেটির মুখ কাঁচুমাচু হয় গেলো। খুব সম্ভব ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া কোনো যোদ্ধা। কোচিং থেকে ফিরে আসছে। বাইরে বিকেলের শেষ আলো।

হট্টগোলের শব্দ শুনে দুধসাদা মেয়েটি ফিরে তাকালো। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য তার চোখে আটকে গেলো আমার চোখ। হাল্কা বাদামি চোখ একেবারে ম্যাচ করে গেছে ফতুয়ার সাথে। দুম করে প্রেমে পড়ে গেলাম। মেয়েরা নাকি ছেলেদের চোখ দেখে সব বুঝে ফেলে। তাচ্ছিল্যের একটা ভঙ্গি করলো সে, পেছনে আমার প্যাকাটির মতো ফিগার আর বাদুড়ের মতো চেহারা দায়ী। তাও খানিকটা আশাভঙ্গের শিকার হলাম।

মেয়েটি আবারও সামনের দিকে মুখ ফেরাতেই ঘটে গেলো ঘটনাটা। তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা চট করে ডান হাত বাড়িয়ে পেলব নিতম্বে হাত বুলিয়ে দিয়েছে। দৃশ্যটা দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো। মেয়েটি আবারও ফিরে তাকিয়েছে, তবে এবারের লক্ষ্য আমি নই, যার একটি লম্বা হাত আছে, সে। তার দিকে আমিও তাকালাম।

সুপারম্যানের টি-শার্ট পরা এক যুবক। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে। ভুরভুর করে পারফিউমের গন্ধ বের হচ্ছে, চুল স্পাইক করা। ‘স্মার্ট-অ্যাস’ ভঙ্গি চেহারায়। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। যেনো ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না।

দুধসাদা ত্বকের সুন্দরীও বিষয়টিকে দুর্ঘটনা হিসেবে ধরে নিলো। বাসের মধ্যে এখন মাছের বাজারের মতো ভিড়। তার মধ্যে উচ্চস্বরে হেল্পারের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে, “বাড়াগুলা হাতে হাতে লন, ভাই। বাড়াগুলা হাতে হাতে লন!”

আমার নিঃশ্বাস এখনও বন্ধ হয়ে আছে। হেল্পার এখন মেয়েটির সামনে। গলা যতোদূর সম্ভব ভদ্র-লয়ে নামিয়ে এনে সে বললো, “আফা, ভাড়াটা দিয়েন।” আমি নিশ্চিত শাপলা চত্বর থেকে তার হুঙ্কার শোনা যাবে তাও।

হৃপিণ্ডটা গলার কাছে লাফিয়ে উঠে এলো। ত্রিশ-ছুঁই-ছুঁই করা যুবক আবারও হাত বাড়িয়েছে। এবার মেয়েটির নিতম্বে চেপে বসলো তার হাত। নরম মাংস ভেতরে দেবে যেতে দেখলাম পরিষ্কার। কানের নিচে আগুনের হল্কা বয়ে গেলো আমার। খানিক বাদে বুঝতে পারলাম, ওটা ক্রোধ ছিলো!

মেয়েটি এবার সরাসরি তাকালো না, ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরেছে। এখান থেকে দেখতে পেলাম, তার দুধসাদা ত্বক লালচে হয়ে উঠেছে অপমানে, লজ্জায়।

ঢাউস ব্যাগটা আমার বুকে দড়াম করে বাড়ি খেলো। হার্ড ব্রেক কষেছে বাস। ছেলেটা মুখ থেকে থুতু ছিটাতে ছিটাতে বললো, “সরি ভাইয়া!”

তার দিকে আমি তাকালাম পর্যন্ত না। আমার চোখের খুনে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছেলেটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। এক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলো, সে দৃষ্টি তার জন্য নয়। ফিরে তাকালো সে, এবং বিশ্বাস করুন, পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, ছেলেটির শরীর শক্ত হয়ে গেছে।

হার্ডব্রেকের সুযোগ নিয়ে মেয়েটির পেছনের লম্পট আরও কাছে ঘেঁষে গেছে। তার হাত এখন মেয়েটির কোমরে যেনো অধিকারবলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাত সরিয়ে নেওয়ার অভিনয় করতে করতে পেছন থেকে হাল্কা করে তার স্তনের একপাশ ছুঁয়ে দিলো দিব্যি।

আমার দু’হাত এখন মুষ্ঠিবদ্ধ। যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণ হারাবো, ঝাঁপিয়ে পড়বো লোকটার ঘাড়ে, ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দেবো নাক, থেঁতলে দেবো ইতরটির চেহারা, গলা টিপে ধরবো যতোক্ষণ পর্যন্ত তার জিভ বেরিয়ে না আসে! অজান্তেই ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছি, রাগ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছে।

সামনে থেকে বেআক্কেল রিকশাওয়ালা সরে যেতেই বাস আবারও ছুটতে শুরু করলো। লোকটি মেয়েটির শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে, তবে যথেষ্ট দূরে নয়। অতি লোভে তাঁতী নষ্ট, এই প্রবচন তার জানা। ধরা পড়তে সে চাইছে না।

যাত্রীদের দিকে তাকালাম। মুগ্ধ পুরুষগোষ্ঠির প্রায় সবারই চেহারা এখন টকটকে লাল। কোনো সন্দেহ নেই, বিষয়গুলো তারা লক্ষ্য করেছে। ঢাউস ব্যাগটা আরেকবার আংকেলের মাথায় গিয়ে লাগলো। বেমক্কা আঘাতে ভদ্রলোকের মগজ নড়ে গেলেও তিনি তরুণ ছেলেটিকে এবার আর কিছু বললেন না। তাঁর চোখ স্পাইক করা চুলের ভুরভুরে সুবাস ছড়িয়ে দেওয়া লম্পটের ওপর নিবদ্ধ।

ব্যাগ বহন করা ছেলেটিও লক্ষ্য করেনি তার ‘আংকেল’কে সে ফাটিয়ে দিয়েছে। তার নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পেলাম, আমার মতোই ভারি আর গাঢ়, ফোঁস ফোঁসে। মেয়েটির চামড়া টকটকে লাল হয়ে গেছে এখন, ঘাড়ের কাছটা পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছি। তাকে আর দুধসাদা বলার উপায় নেই।

সামনের নিউ ভিশনটিকে ওভারটেক করার সময় সামান্য হেলে গেলো বাস, কোনোমতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে যা দেখলাম তাতে করে মাথার ভেতর কিছু একটা ছিঁড়ে গেলো। ত্রিশের কাছাকাছি বয়সের যুবক পড়ে যাওয়ার অভিনয় করতে করতে মেয়েটির একপাশের স্তন খামচে ধরেছে। নিমেষের জন্য, তারপরই ছেড়ে দিলো।

আমার সামনের ঢাউস ব্যাগ নিয়ে থাকা ছেলেটির দুই হাত এখন মুষ্ঠিবদ্ধ। আমারই মতো। ব্যাপারটা সে আর সহ্য করতে পারছে না। আবার এগিয়েও যেতে পারছে না। এই ছেলে নেহায়েত পড়ুয়া একজন মানুষ, তার অভিব্যক্তিতে অনভিজ্ঞতা পরিষ্কার। মানুষ পেটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা দু’জনেই জানি সামনে দাঁড়ানো লোকটা মানুষ নয়, পিশাচ। তবুও তার গায়ে হাত তোলা আমাদের অনভ্যস্ততার কারণে সম্ভব হচ্ছে না।

গাড়ি এখন আসাদগেটের একটু পেছনে। মেয়েটি হেল্পারকে উদ্দেশ্য করে বললো, “মামা, নামায় দিয়েন।”

তার গলায় ক্রোধ কিংবা লজ্জার ছোঁয়া নেই, একদম নিস্তেজ, পরাজিত এক কন্ঠস্বর!

ড্রাইভার গাড়ির গতি কমাচ্ছে। অপমানে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসছে। নিজেকে এখন আর পুরুষ মনে হচ্ছে না, কাপুরুষের রক্ত বইছে সারা শরীরে। সুপারম্যানের টি-শার্ট পরা লম্পটও তরুণীর পেছনে পেছনে রওনা দিলো। নধর শরীরের নেশা তার দেহে, বাস থেকে মেয়েটিকে একা একা নামতে দিতে সে চাইছে না।

বাসের গতি পুরোপুরি কমে যেতেই ঘটনাটা ঘটে গেলো। নিচে এক পা রাখা তরুণী আচমকা ঘুরে দাঁড়ালো, শেষ পা-দানিতে তখন স্পাইক করা বদমাশ। হাত ব্যাগ থেকে ছয় ইঞ্চি ফলার একটি ছুরি চোখের পলকে তার গলায় বিঁধিয়ে দিলো মেয়েটি। সামান্য সরে এসে সর-সর করে টেনে নিলো আবার।

ঘরঘর জাতীয় শব্দ উঠছে, লম্পটের রক্তে ভেসে গেলো রাস্তা। সামনে টলে উঠেই দড়াম করে পিচঢালা পথে আছড়ে পড়লো তার দেহ। মেয়েটি ছুরি হাতব্যাগে ভরে দ্রুত উঠে এলো বাসে। হেল্পারকে বললো, “আরেকটু সামনে নামবো।”

স্থবির বাস, তার মধ্যেই পেছনের সিট থেকে একজন চিৎকার করে উঠলো, “খুন! খুন!”

দুইপাশ থেকে দুইজন তরুণ তাকে মৃদু ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো।

পাল্টা কোনো প্রশ্ন হেল্পার বা ড্রাইভার করছে না, এক ফোঁটা রক্তও তাদের বাসে পড়েনি, লম্পটের রক্তে কলুষিত হয়নি যানবাহন, কৃতজ্ঞতার সাথে বাস ছাড়লো ড্রাইভার।

“আসাদগেটে নাইমেন না, চেকপোস্ট আছে। ওইহানে গাড়ি থামানো যাইবো না।” হেল্পার এখন আসলেই মৃদুস্বরে বলছে। এই লোক তাহলে গলা নামিয়ে কথা বলতেও পারে! “আপনারে আমরা ফার্মগেটে সাইড কইরা নামায়া দিমু।”

কোনো প্রশ্ন ভেসে আসলো না, কোনো আপত্তিও না। ঘটনা সবাই দেখেছে।

মেয়েটি একবার ঘুরে তাকালো বাসের ভেতরে, উদ্ধত তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, গর্ব ঝিলিক দিচ্ছে চোখেমুখে, নারীর রূপ তো এমনই হওয়া চাই!

গালের ওপর রক্তের মৃদু ছোপটুকু বাদে, দুধসাদা ত্বক আবারও তার জৌলুস ফিরে পেয়েছে।

মানাচ্ছে বেশ। শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে এলো।

রচনাকাল – মে ০৮, ২০১৬

ক্ষিধে

হেডলাইটের আলো দেখে আড়ালে সরে যায় ইরিনা। পুলিশ বা র‍্যাবের গাড়ির সামনে পড়া চলবে না।

আজ সারা রাতেও শিকার পায়নি ও। পেটে অসম্ভব ক্ষুধা। অলরেডী সাড়ে এগারটা বাজে। রাত বারোটার মধ্যে কাওকে না পাওয়া গেলে বিপদ হয়ে যাবে। মনিপুর এলাকাটার রাস্তাঘাট যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর বলেই যা ভরসা। 

ভাগ্যটা মনে হয় ততটা খারাপ না ইরিনার জন্য। গাছের নীচে সিগারেট টানতে দেখা যায় এক তরুণকে। 

হাতে আলতো করে আরেকবার স্প্রে করে ইরিনা। ইটস শো টাইম। 

‘এক্সকিউজ মি।’ চার হাতের মধ্যে এসে মুখ খোলে ও, এটাকে ও বলে’ডিসট্র্যাকশন স্টেপ’। ’চব্বিশ নম্বর বাসাটা কোন দিকে বলতে পারেন?’

সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায় ছেলেটা। ’সম্ভবতঃ ডানদিকের রাস্তা ধরে গেলে পাবেন। ’

‘নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না?’ হাত নাড়ে ইরিনা হতাশার ভঙ্গীতে। ’ইনফিল্ট্রেশন স্টেপ’।

‘সরি আপু, আমি এখানে থাকি না। আন্টির বাসায় এসেছিলাম। আপনাকে একটু খুঁজে নিতে হবে’ বলতে বলতেই টলে ওঠে তরুণ। 

পড়ে যাওয়ার আগেই ধরে ফেলে ওকে ইরিনা। আলতো করে গলায় দাঁত বসিয়ে দেয়। দাঁতের নীচে গরম প্রবাহিত রক্ত ওর ক্ষিধেটা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাগলের মত রক্ত খেয়ে চলে ও। হাল্কা ধাক্কা দেয় ছেলেটা। কিন্তু ক্লোরোফর্মের প্রভাবে শক্তি বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই তখন তার। আরও জোরে ওকে চেপে ধরে বুক ভরে টান দেয় ইরিনা। বেশি সময় নেওয়া যাবে না। কেউ চলে আসলে বিপদ। 

পেট কিছুটা ভরতেই ছেড়ে দেয় ছেলেটাকে। কাটা কলাগাছের মত মাটিতে পড়ে যায় সে অসহায়ের মত। 

*

ইরিনা শখের ভ্যাম্পায়ার। প্রথমে ওর মাথায় যখন আইডিয়াটা আসে তখন ভেবেছিল রক্তের মত জঘন্য জিনিস তার কিছুতেই সহ্য হবে না। কিন্তু প্রথম শিকারকে ধরার পর সম্পূর্ণ ধারণাটাই ভুল বলে প্রমাণিত হল। মানুষের রক্ত খাবার হিসেবে ততটা খারাপ নয় যতটা লাগে দেখতে। নোনতা-মিষ্টি একটা স্বাদ। 

কিন্তু শিকারের সংখ্যা দশকের ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতে নেশা ধরে যায়। মানুষের শরীরের প্রবাহিত রক্ত ছাড়া কিছুতেই স্বাদ পায় না ইরিনা। ফিরে আসতে যে ইচ্ছে হয়নি তার তেমনটাও নয়। কিন্তু একবার মানুষের রক্তের নেশা ধরে গেলে ছাড়ার সাধ্য কি আর থাকে? হেরোইনের নেশার চেয়েও ভয়ংকর এ নেশা। 

শিকার থেকে দ্রুত রক্ত খেয়ে কেটে পড়ার জন্য নিজেই শিকার-পদ্ধতির কিছু নিয়মকানুন বের করেছে। এতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা যেমন কমে পুরো ব্যাপারটা অতি অল্প সময়ে ঘটিয়ে ফেলাটাও হয় সহজ। 

প্রথমত হাতের আঙ্গুলে ক্লোরোফর্ম স্প্রে করে নেয় ও। তবে ভুলেও এই হাত নিজের নাকের সামনে আনা চলবে না। কথার ছলে একবার জায়গা মত হাত নিয়ে গেলেই কাজ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, মুখের চারটি চোখা দাঁতের মাথায় বিশেষভাবে বসিয়ে নিয়েছে ও সুহ্ম চারটি পিন। অতি সহজে ফুটো করে ফেলা যায় ধমনী। তৃতীয়তঃ নিজেকে আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে বের হতে হয়। ছেলেদের অন্যমনস্ক করে ফেলাটা সহজ এভাবে, যার অর্থ নাকে ক্লোরোফর্ম ধরার মত দূরত্বে আসা সহজ।

এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে ধরার পড়ার ক্ষেত্রগুলো আইডেন্টিফাই করাটা সহজ হয়ে গেছে। প্রথমে ও রোজ রাত দশটায় বের হত। হাঁটত স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকের মত। তবে একদিন বিপত্তি ঘটেই গেল। 

গত তিনদিন কোন শিকার পায়নি তখন ইরিনা। রাজ্যের ক্ষিধে পেটে। পৌনে বারোটায় পুলিশের গাড়িটাকে পাত্তা না দেওয়ার ফলাফল হাতেনাতেই পেয়ে যায় ইরিনা। 

ঘ্যাচ করে ব্রেক কষে লাফিয়ে নামে অফিসার। পেছনে বসে থাকে চার কনস্টেবল।

‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’ জলদগম্ভীর কন্ঠে বলে মোটাসোটা পুলিশ অফিসার। 

‘নান অফ ইয়োর বিজনেস।’ ক্ষুধার চোটে মেজাজ ঠিক রাখা সম্ভব হয় না ইরিনার পক্ষে। 

‘স্মার্ট মাল, অ্যাঁ?’ তরল কন্ঠে বলে পুলিশ। ’এলাকায় নতুন মনে হচ্ছে। কার হয়ে কাজ কর?’

‘আমি কারও হয়ে কাজ করি না।’ ভাববাচ্য থেকে পুলিশ অফিসারের সরাসরি’তুমি’-এ নেমে যাওয়া দেখে পরিস্থিতি আঁচ করে কিছুটা। 

‘বাহ! তা এ লাইনে নতুন বলেই বুঝতে পার নি, সুন্দরী। আমাদের রাস্তায় ব্যাবসা করবা ভাল কথা। কিন্তু রাস্তা যে আমরা পরিষ্কার রাখছি সেটা কিন্তু ফ্রিতে না। দিনে কত করে দিচ্ছ সেটা ক্লিয়ার কর এখানে নাহয় থানার দরজা খোলায় আছে। গাড়িতে ওঠো। ’

বিষয়টা স্পষ্ট হয় ইরিনার কাছে। পতিতা বলে তাকে সন্দেহ করা হয়েছে। ঘাবড়ায় না ও মোটেও। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে চোখ টিপ দেয়, ’দেনা-পাওনার হিসেবটা কি এদের সামনে না করলেই নয়?’ ইঙ্গিতে গাড়িতে বসে থাকা কন্সটেবলদের দিকে দেখায় ও। 

ইরিনার চোখের দিকে তাকিয়ে ঢোক গেলে পুলিশ অফিসার। এরকম সুন্দরীকে এ লাইনে আসার উদাহরণ কমই দেখেছে সে। 

‘তোমরা আরেক রাউন্ড দিয়ে এসে আমাকে এখান থেকে উঠিয়ে নিও।’ হাতের ইশারায় ড্রাইভারকে কেটে পড়তে বলে অফিসার। 

রাতের অন্ধকারে মিশে যায় ইরিনা আর অফিসার। 

আড়াল পেয়েই শিকারের গলা লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইরিনা। ক্লোরোফর্ম ব্যাবহারের কথা মাথায় থাকে না আর। 

তিনদিনের ক্ষিধে পেটে পাগলের মত রক্তও টেনে চলে। মিনিট পাঁচেক পর রক্ত আর আসে না মুখে। 

তবুও টানে ইরিনা। 

পায় না কিছুই। 

পালস চেক করে থমকে যায়। নেই। 

*

শিকারের রক্ত খেয়ে একেবারে মেরে ফেলার ঘটনা সেটাই প্রথম ছিল। 

এরপর থেকে আরও সতর্ক হয়ে যায় ইরিনা। প্রতিদিন একটা শিকার লাগবেই ওর। নাহলে তিনদিন পর কাওকে ধরলে জান বের করে ফেলবে!

গত কয়েক মাস ধরে শুধু রক্তের ওপরই বেঁচে আছে ও। চেষ্টা করে দেখেছে সলিড কিছু খাওয়ার। 

পেটে আর সহ্য হয় না। বমি হয়ে বের হয়ে যায় সব। 

আজ রাতে প্রথম শিকার পেলেও পেটের ক্ষিধে মেটেনি ইরিনার। 

আরেকটা শিকার পেলেই আজকের মত খাবারের চিন্তা দূর করে ফেলতে পারবে ও।

দূরে আরেক বাড়ি সংলগ্ন কংক্রিটের বসার জায়গায় বসে থাকতে দেখে আরেক তরুণকে। 

এই বয়েসী ছেলেগুলো শিকার হিসেবে খুবই ভাল হয়। সহজেই সৌন্দর্য্যের ফাঁদে ফেলা যায় এদের। 

কাছাকাছি দাঁড়িয়ে গলায় কিছুটা বিস্ময় তুলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ইরিনা, ’আরে! আরিফ! তুমি এখানে কি করছ?’

ডিসট্র্যাকশন। 

‘সরি আপনি ভুল করছেন।’ ভ্যাবাচেকা খেয়ে উঠে দাঁড়ায় তরুণ। ’আমার নাম আরিফ না। ’

‘সরি। এখন বুঝতে পারছি।’ দুঃখপ্রকাশ করে ইরিনাও। ’বসে থাকা আপনাকে আমার এক বন্ধুর মতই লাগছিল। ’

‘ইটস ওকে।’ অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে মাথা চুলকায় ছেলেটা। ইনফিলট্রেশন। 

মাথা ঘুরে ওঠে ইরিনার। কিন্তু ও পড়ে যাওয়ার আগেই ওকে ধরে ফেলে তরুণ। 

আলতো করে দাঁত বসিয়ে দেয় ইরিনার গলায়।

পেটে তার তিনদিনের জমে থাকা ক্ষিধে …

কনফেশন অফ আ রাইটার 

‘অ্যাই ছেলে, জামাটা কতদিন ধরে ধোস না তুই?’

আফরিতার কথা শুনে একটু হাসলাম। তারপর উদাস ভঙ্গিতে জবাব দিলাম, ‘যতদিন ধরে গোসল করি না।’

দ্বিগুণ বিস্ময়ের সাথে মেয়েটা প্রশ্ন করে, ‘কতদিন ধরে গোসল করিস না?’

পরীর মত মেয়েটার কথার উত্তর না দিয়ে আমি হাই তুলতে থাকি। আমার অসময়ে বেশরমের মত হাই তোলা দেখে পরীটি বিরক্ত হল। 

‘বলবি না?’

গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে উত্তর দিলাম, ‘সাত দিন।’

আফরিতার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে।  

মুখ বন্ধ হওয়ার জন্য তাকে দোষ দিলাম না। অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর। 

পাশে একটা পাথর-পরী নিয়ে বসে থাকার অনুভূতিটা খারাপ না। 

পার্কের ভেতর বসে আছি। আশেপাশে একটা ভূতও নেই। মানুষ তো দূরে থাকুক। 

একটা ছেলে আর একটা মেয়ে এরকম একটা পরিবেশে আসলে মিষ্টি মধুর আলাপ করে। আর আমরা এখানে আলাপ করছি জামার দুর্গন্ধ কত হতে পারে, কয় দিনের পুরোনো হতে পারে তা নিয়ে। 

খারাপ কি? 

বন্ধু পিয়াসের কথা মনে পড়ল। 

ভূতুড়ে বাড়িতে কেস স্টাডি করতে যাব শুনে আমাকে ছেলেটা প্রশ্ন করেছিল, ‘ভূত যদি আসলেই চলে আসে – কি করবি?’

ঘাস চিবুতে চিবুতে বলেছিলাম, ‘মেরে ফেলব।’

অবাক হয়ে পিয়াস জানতে চেয়েছিল, ‘কিভাবে মারবি?’

থু থু দিয়ে ঘাসটুকু ফেলে দিয়ে বললাম, ‘থাপ্পড় দিয়ে।’

ফিক ফিক করে হেসে পাজিটা বলে দেয়, ‘এত কষ্ট করতে হবে না তোর জামার গন্ধ শুঁকিয়ে দিস। ওখানেই মরে যাবে।’

ফিক ফিক হাসিটা সহ্য করতেই হল। আমার জামার গন্ধে ভূত পালালে সেটা অবাক করার মত ব্যাপার। 

কারণ, এই গন্ধে ওদের মরার কথা। একেবারে স্পট ডেড!

পালানোর প্রশ্নই আসতে পারে না!

ভূত মরে যাওয়া গন্ধের জামা কাপড় নিয়ে বসে থাকলেও আফরিতা মরে যাচ্ছে না। এমনকী পালাচ্ছেও না। 

পিয়াসের চেহারাটা দেখতে ইচ্ছে করছে। আফরিতাকে অক্সিজেন মাস্ক ছাড়াই আমার ছয় ইঞ্চি দূরে বসে থাকতে দেখলে ও স্রেফ হার্টফেল করবে। 

আফরিতাকে বড় করে শ্বাস নিতে দেখলাম। বুঝলাম মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। 

মেয়েটা এখন বিশাল একটা ভাষণ দেবে। 

যেটা শুনলেও আমার বিপদ। আবার না শুনলেও বিপদ। 

উভয় সংকট আর কাকে বলে! 

‘তোকে আমি আজ সাবান কিনে দেব। আর শ্যাম্পু। আমি জানি এগুলার কিছুই তোর রুমে নাই। কন্ডিশনারও কিনে দেব তোকে। আর হুইল পাউডার। তারপর তুই তোর রুমটা ধুয়ে পরিষ্কার করবি। এর পর তোর জামা কাপড় সব ধুয়ে দিবি। তারপর তুই গোসল করবি। তারপর পরের দিন ক্লাসে আসবি। নোংরা জামা কাপড় পরে ক্লাসে আসলে তোর জামা আমি ছিঁড়ে ফেলব। বুঝতে পেরেছিস?’

আমি মাথা ডানে-বামে নাড়িয়ে মেয়েটাকে আশ্বস্ত করলাম তার কোন কথা আমি বুঝতে পারিনি। 

অথবা বুঝতে চাইনি। 

আফরিতা কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। 

আমি ওর দৃষ্টিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে আরেকটা হাই তুললাম। তারপর পকেট থেকে গোল্ডলীফের প্যাকেটটা বের করে কসরত করে সিগারেট ধরালাম একটা। 

ধুঁয়ো উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা আমার কাছে অসাধারণ লাগে। আমি হা হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। 

ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে। 

ডান দিকে তাকাতে না তাকাতেই খপ করে আমার হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিল কেউ। 

‘এখন আমি এটা টানি?’  ফোঁস ফোঁস শব্দের ধারা অব্যাহত রেখে জানতে চাইল আফরিতা।

‘ক্ষেপে আছিস কেন?’ জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না। সিগারেট হারানোর বেদনা প্রশ্নটার উদ্ভাবক হতে পারে আমি নিশ্চিত নই। 

‘রাতে ঘুমাবি না। দিনে গোসল করবি না। নোংরা একটা ঘরে থাকবি। খাবি না ঠিকমত। আবার সিগারেটও টানবি! তারপর আবার জানতে চাইবি ক্ষেপে আছি কেন?’

‘হুঁ।’ মাথা নীচু করে বললাম। 

সিগারেটটা একদিকে ফেলে দিয়ে আমার কলার ধরে নিজের দিকে ফেরায় ও। 

‘আমার দিকে তাকা!’

তাকালাম। নতুন কিছু নেই। 

পরীর মত দেখতে একটা মেয়ে। দুই চোখে রাগ। ঠোঁট দুটো চেপে আছে একটা আরেকটার সাথে।

কান দিয়ে ধোঁয়া বের হলে আরও মানাত। 

এই মেয়েটা কি আমাকে দেখলেই রেগে যায়? নাকি রেগে গেলে আমার সাথে দেখা করে? 

রেগে না থাকা অবস্থায় ওকে আমি একদিনও দেখিনি। 

আফরিতা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। একই ইউনিভার্সিটির একই সেকশনে  পড়তে থাকা আমরা একজন আরেকজনকে চিনতাম না প্রথম কয়েক মাসেও। 

ধীরে ধীরে যত দিন গেল মেয়েটার ব্যাপারে আমি জানলাম। আমার ব্যাপারেও অনেক জানল বলে মনে হল মেয়েটার। 

কিন্তু আসলে কতটুকু জানতে পেরেছে ও সেটা নিয়ে এখনও আমি দ্বিধাগ্রস্থ। 

এই যেমন এখন আমাকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে গেছে ও কাজেই যে শব্দ দুটো শোনার জন্য ও অপেক্ষা করছে সেটা আমাকে বলতেই হল, ‘বলে ফেল।’

‘হাই তুলছিস যে মনের সুখে কাল সারারাত কি করেছিস?’

আরেকবার হাই তুলে কোনমতে জানালাম, ‘লিখছিলাম।’

কলার ছেড়ে দেয় ও, ‘দিনে কয়টা করে গল্প লিখলে তোর পেট ভরে?’

‘কালকে তুই রাগ করে আমাকে ঘুমাতে ডাকিসনি। তাই ঘুমাতে পারিনি। সেজন্য গল্প লিখছিলাম।’ জানালাম ওকে। 

‘তুই তো বেয়াদবী করে ফোন বন্ধ করে রেখেছিলি। ডাকব কেন?’ অভিমানী কন্ঠে বলে আফরিতা। 

‘হুম।’ মন খারাপ করে বলি আমি। 

ঘুমাতে আমি পারি না। চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে কিন্তু বিছানাতে মরার মত পড়ে থেকেও ঘুমাতে পারি না আমি। ঘুমাতে দেয় না আমাকে আমার ভয়ানক সব অভিজ্ঞতা। তার মাঝেই পরিচয় আমার এই পাগলী মেয়েটার সাথে। 

আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম আফরিতার কন্ঠ আমার স্নায়ুগুলোকে কি অদ্ভুতভাবেই না শীতল করে দেয়! ঘুম চোখ থেকে মনের মধ্যে চলে যায় অনায়াসেই আর টুপ করে ঘুমিয়ে পড়ি আমি।

‘আজ তোকে একটা কথা বলতে এখানে ডেকেছি।’ শান্ত গলাতে বলে আফরিতা। 

‘বল।’ পরবর্তী হাইটা কোনমতে চেপে ধরে বলি আমি। 

এর পর আর হাই তুললে এই মায়াবী মেয়েটা আক্রমণাত্মক ভূমিকাতে অবতীর্ণ হতে পারে! 

‘একটা প্রশ্ন করব। সোজা সাপ্টা অ্যানসার দিবি?’

‘আমি সোজাসাপ্টাই অ্যানসার দেই।’ 

এবার আর চাপতে না পেরে হাই তুলে ফেলেছি। কুকুরের ডাকের মত শব্দ হচ্ছে। 

আফরিতাকে দেখা যায় চিন্তিত মুখে সেটা শুনতে। 

‘তুই তো দিন দিন কুকুর হয়ে যাচ্ছিস!’ অবাক হয়ে বলে ও। 

‘হু।’ সায় দিয়ে বলি আমি, ‘সোজাসাপ্টাই অ্যানসার দিয়েছি কিন্তু!’

যারপর নাই অবাক হল এবার মেয়েটা, ‘কই? প্রশ্নই তো করতে পারলাম না!’

‘কুকুর হয়ে যাচ্ছি কি না জানতে চাইলি না?’ 

‘ওটা একটা কমপ্লিমেন্ট ছিল!’

কমপ্লিমেন্টের বাহার দেখে আমার মূর্ছা যেতে ইচ্ছে করলেও মূর্ছা যেতে পারলাম না। কারণ আফরিতা তার প্রশ্নটা করে ফেলেছে। 

‘তুই কি আমাকে ভালোবাসিস?’

অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলাম। 

মেয়েটার গলা গতকাল রাতে শুনতে না পেরে এমনিতে নির্ঘুম চোখ নিয়ে হুতুম প্যাঁচার মত বসে আছি। তার মাঝে উল্টাপাল্টা জেরাও চলছে। 

পকেটের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠতে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম অ্যানোনিমাস নাম্বারটাকে। এবং আফরিতার প্রশ্নটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মেসেজটা ওপেন করে উঠে দাঁড়ালাম। 

‘সরি। যেতে হচ্ছে।’ বলে নাক বরাবর হাঁটা। 

‘উত্তরটা তো দিয়ে যা!’ পেছন থেকে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে আফরিতা।

আমি উত্তর দেই না। টাইম শিডিউলে এমনিতেই পিছিয়ে আছি। আর আছে মাত্র নয় মিনিট চৌত্রিশ সেকেন্ড। 

আমি ‘কিশোর পাশা’ নামক একজন ছদ্মনামী লেখক। আমার আসল নাম হাতে গোণা কয়েকজন জানেন। আর বাকিরা জানলেও জানেন নিকনেমটুকু। সারপ্রাইজিং রেটে গল্প লিখি আমি। আর ধুমাধুম পোস্ট করি ফেসবুকে। 

আমার পোস্টের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে প্রায় চারহাজার জন আমাকে ব্লক করেছেন। 

আর সাড়ে তিনশ করেছেন আত্মহত্যা! 

পৃথিবীবাসীর কাছে আমার পরিচয় এতটুকুই। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আমার একই নাম প্রচলিত আছে, অথচ দুই জগতের কেউই ব্যাপারটা ধরতে পারেন না। কারণটাও অনুমেয়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজন গল্প পড়েন না, এবং গল্প-পড়ুয়ারা সত্যিকারের জগতে কী চলে সে ব্যাপারে ঘণ্টাটাও জানেন না। কিছু ডকুমেন্টারি আর পেপার কাটিং পড়ে একেকজন যদিও নিজেদের ভাবেন বিদ্যাদিগগজ।

আমি একজন ফ্রি-লান্সার খুনী। খুন করার জন্য আমি টাকা নেই না। বরং কখনও কখনও খুব জটিল সিচুয়েশনে করা খুনগুলোর জন্য আমি টাকা অফার করি। কাজেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে আমার কদর আছে। 

সেখানে আমার পরিচয় খুবই সাদামাটা, ‘কিলার কেপি।’

কে দিয়ে কিশোর, পি- দিয়ে পাশা। 

আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘উহা’রা যদি জেনে ফেলে কিশোর পাশা নামের একজন গল্প লিখে ফেসবুকে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে তাহলে আমার আসল লোকেশন বের করে ফেলত নিশ্চয়। অথবা পুলিশ বাহিনী যদি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করত সেই ‘কিলার কেপি’ আর রাইটিং মেশিন ‘কিশোর পাশা’ একই মানুষ! তাহলেই অবশ্য আমাকে আর দেখতে হত না!

আমার মেসের চারপাশে স্নাইপার বসিয়ে খুলি উড়িয়ে ঘিলু বের করে সেই খুলিতে করে চা খেতেন বাঘা বাঘা সব ক্রিমিনালরা। বিশেষ করে পেশাদার খুনীদের এই কাজটা উৎসাহের সাথে করতে দেখা যাবে। 

কারণ, ফ্রি-তে মানুষ মেরে কেটে সাফ করে আমি তাদের একরকম বেকার বানিয়ে দিয়েছি। 

আমার প্রতি তাদের যে ভালোবাসার অনুভূতি সেটাকে আমরা সোজা বাংলাতে বলি ‘খিঁচ’। 

আমার ওপর তাদের খিঁচ আছে। 

আমার লোকেশন বের করতে পারলে তাদের অনেককেই সানন্দে আমাকে ‘ডাউনটাউনে’ পাঠানোর জন্য ভলান্টিয়ার হতে দেখা যাবে। 

দেখা যাবে আমাকে ভূত বানিয়ে দেওয়ার পর আমার নিতম্ব দিয়ে বানানো কুশনে বসে পা দোলাচ্ছে ‘স্ট্রাইকার’ ইদরিস। এই পাকনা ছেলেটা রাজশাহীর রাস্তাতে ভাড়া খাটে। 

‘ভাড়া খাটে’ শুনে নাক কোঁচকাবেন না ইদরিস মেল-স্ট্রীপার নয়। ভাড়াটে খুনী। 

একটা লাশ ফেলতে ও নেয় দশ হাজার। 

দুটো ফেলতে বাইশ হাজার। 

খুনের ক্ষেত্রে খুচরো পাইকারীর হিসেব উল্টো। যত পাইকারী অর্ডার তত লস। 

খুচরো খুনের অর্ডারেই ক্লায়েন্টের লাভ। 

ক্লায়েন্টদের আরেকটা লাভের ক্ষেত্র হল ‘কিলার কেপি’। এই ব্যাটা যে একটা পয়সা চায় না কাওকে খুন করতে সেই খবর আন্ডারওয়ার্ল্ডে দাবানলের মত ছড়িয়ে গেছে মাত্র কয়েক মাসে। খুব স্বাভাবিক এটা, মাগনার খবর বাতাসের আগে ধায়।  

অনেক শিল্পপতি আমাকে তাঁর মেয়ের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য খুঁজছেন বলে শুনেছি। তাঁদের কোটি টাকার ঝামেলা আমি এক লহমাতে সরিয়ে দিয়েছি তাও বিনামূল্যে। আমার প্রেমে শিল্পপতিরা পড়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু তো দেখি না। 

প্রেম বিষয়টা উঠতে আফরিতাকে মনে পড়ে গেল। 

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই – মেয়েটাকে আমি ভালবাসি। 

আমার লেখা গল্পের এক তৃতীয়াংশই তাকে ভেবে নায়িকার চরিত্র সাজিয়েছি। 

একই সাথে ইন্সপায়রেশন এবং প্রেম যেখানে কাজ করে লেখক ব্যাটার না ফেঁসে উপায় নেই। 

গভীর কুয়োতে ছিটকে পড়তে বেচারা বাধ্য। 

আমি গভীর কুয়োতে না পড়ে সামনে এইমাত্র বিকট শব্দে ব্রেক কষা গাড়িটার ভেতরে পড়লাম। 

আমাকে পেটে নিয়েই গাড়িটা ছুটতে শুরু করল। আর আমি আড়চোখে সময় দেখলাম। 

ঠিক দুইমিনিট বাকি আছে আমার গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। 

ড্রাইভারের পাশের সীটে বসে আছি চটপট একটা জিনিস বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় ড্রাইভার এক হাতে। 

অন্যহাতে প্রাণটাকে মুঠো করে ধরে রাখার মতই স্টিয়ারিং মুঠো করে ধরে আছে ও। আমি আর দেরী না করে ‘জিনিস’টাকে হাতে নিলাম। 

আমার চুল-মূল খাড়া হয়ে যেতে চাইল রিভলভারটার চেহারা দেখেই। 

মাই গড!

একটা আরমিনিয়াস এইচডব্লিউ-ফাইভ! হাতে নিয়েই আমি আফরিতাকে ভুলে গেলাম।

এমন সুন্দরী একটা পয়েন্ট টুটু এলআর ক্যালিবারের অস্ত্র হাতে থাকলে মানবকন্যাদের কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাওয়া দোষের কিছু নয়। 

আটটা রাউন্ড থাকে এতে। পয়েন্ট টুটু এলআর ক্যালিবারের রিভলভারগুলোতে সাধারণত সিক্স-শুটার, আরমিনিয়াসের হিসাব আলাদা। ওজনেও যেকোন সেম ক্যালিবারের রিভলভারের চেয়ে কম। 

রূপবতীই নয় শুধু, ‘মাল’টা সেরকম গুণবতীও বটে!

গুনবতীকে কোমরে গুঁজে জানতে চাইলাম, ‘টার্গেট?’

হোৎকামুখো ড্রাইভার আমার হাতে এবার একটা খাম তুলে দেয়। 

চমৎকার চেহারার একজন যুবক। ছবিটি উল্টালাম। পেছনে ডিটেইলস লেখা আছে ছোকরার ব্যাপারে। 

পাঁচ ফিট নয় ইঞ্চি।

আটাত্তর কেজি।

ডান কানের নিচে ক্ষত চিহ্ন আইডেন্টিফিকেশন মার্ক ইত্যাদি, ইত্যাদি – ইত্যাদি। 

হানিফ সংকেতকে মনে মনে একটা স্যালুট ঠুকে নিচের লোকেশনটা দেখলাম। 

ডেথ রিকুয়েস্ট – বুলেট থ্রু হিজ ফরহেড। 

তার নিচে ‘মে বি হেভিলি গার্ডেড’ লেখাটা পড়ে আমার চোখ হাল্কা কোঁচকায়। 

তবে হাল্কাই কোঁচকায়। শুডন’ট বি আ প্রবলেম। 

গাড়িটি থেমে গেছে। 

ঘড়িতে দেখলাম মাত্র দুই সেকেন্ড আগে পৌঁছেছি। 

তবুও দেরী তো হয়নি!

আফরিতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে দেরী হয়েই যেত। মেয়েটা নিশ্চয় আমাকে ভুল বুঝেছে। 

গাড়ি থেকে নেমে বাইরে পা রাখতে না রাখতেই দুই সেকেন্ড পার হয়ে গেল। পারফেক্ট টাইমিং যাকে বলে। 

বাড়িটা বিশাল। কোন শালায় রাজশাহীর বুকে এত বড় বাড়ি বানিয়েছে কে জানে!

ওটা আমার মাথাব্যথা না। 

আমার মাথাব্যথা বাড়িটার সামনে হাল্কা পায়ে পায়চারি করতে থাকা দুইজন গার্ড। 

টার্গেট হারামজাদা কি সামনের বার ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছে নাকি? এত কড়াকড়ি কিসের? 

তবে দারুণ ব্যাপারটা। নিখুঁতভাবে এই ব্যাটাকে মেরে ফেলতে পারলেই আগামী চারটা গল্পের জন্য মশলাপাতির অভাব হবে না আমার। 

ফ্রি-লান্সার কিলার আমি এজন্যই হয়েছি। মাগনা প্লট পেলে ক্ষতি কি? 

কোনদিকে না তাকিয়ে বাড়িটার পেছন দিকে চলে আসলাম। এদিকে বেশ কিছু গাছগাছরা আছে দেখা যাচ্ছে! সেই সাথে দেখা যাচ্ছে আরও একজন গার্ডকে, ওটা বোনাস। 

তবে গাছগুলো কাজে দেবে। 

গার্ড ব্যাটা অন্যদিকে হেঁটে যেতেই লাফিয়ে বেড়া টপকে বাড়ির ত্রিসীমানাতে ঢুকে পড়লাম। 

তারপর সাপের মত দৌড় দিয়ে একটা মিনি-ঝোপের আড়ালে। 

ফাঁকফোকর দিয়ে দেখতে পাচ্ছি গার্ডের বাচ্চা আবার এদিকেই আসছে। আর আমি আমার দুর্গন্ধযুক্ত প্যান্টের বেল্টের নিচ থেকে পাতলা কিন্তু শক্ত ইস্পাতের তারটা বের করে ফেললাম। 

কুকুরের মত শব্দ করে একটা হাই তুলে সারতে না সারতেই দেখতে পাই হারামজাদা গার্ড ব্যাটা আমার ঝোপ ক্রস করে আরও এগিয়ে গেছে। কাজেই আমি পড়ে গেছি তার পেছনে। 

মাথা ঘুরালেই আমাকে দেখতে পাবে এই গার্ড এখন। তবে মাথামোটাটা মাথা ঘোরায় না। 

অনায়াসে তার পিছনে পৌঁছে গেলাম। 

আর দেরী কিসের? 

চটপট তারটা ব্যাটার গলাতে পেঁচিয়ে ফেলে প্রচন্ড জোরে নিজের দিকে টানছি যন্ত্রণায় হারামজাদা একেবারে বাঁকা হয়ে গেল!

আরে বাবা গলাতে তার পেঁচিয়েছি একটু ব্যথা তো লাগবেই। হ্যাক-হ্যাক জাতীয় শব্দ কেন করছে বদমাশটা?

আরও জোরে নিজের দিকে টেনে ধরলাম তারটা। 

এবার কাজ হয়েছে। গলার নরম চামড়া কেটে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে তারটা। ভোকাল কর্ড কেটে তবে থামল।

হ্যাক হ্যাক শব্দ থেমে গেছে। বুঝলাম, বহুদিনের চর্চায় সদ্য জবাইজাত গার্ডের রক্ত আমার দেহ স্পর্শ করেনি। 

মরাটাকে ঝোঁপের একেবারে গভীরে ঢুকিয়ে দিয়ে আস্তে করে বাড়িটার পেছনের দরজার দিকে হাঁটা দিলাম। 

দরজাটা খোলা ছিল না। কাজেই পিনের মত শক্ত কিন্তু বেশ লম্বা তারটা বের করে পিকলক করতেই হল। 

ঘরবাড়ি বিশাল বানালেও ভেতরে কাওকে চোখে পড়ে না। কোনমতে দোতলাতে পৌঁছাতে পারলেই আমার টার্গেটকে পেয়ে যাব। তারপর স্রেফ কপালের মাঝে একটা বুলেট।

মানে মক্কেল যেটা চাইছে আর কি! 

তবে তার আগে আমি আমার মত খেলতে পারি। তাতে কেউ মানা করেনি। 

আর ওটাই আমার বোনাস। ওটা দিয়েই চমৎকারভাবে লিখে ফেলব পরের থ্রিলারটা।

নিচ থেকে হাল্কা উঁকি দিয়েই পাথরমুখো গার্ড দুইজনকে দেখা যায়। ব্যাটারা একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কোন মহামান্যকে পাহাড়া দিচ্ছে বুঝতে বাকি থাকে না।

এখানেই আছে আমার টার্গেট মহাশয়!

দুই গার্ডকে মেরে ফেলে ওই শালাকে মারতে আমার মিনিট তিনেকের বেশি লাগবে না। 

কিন্তু তাতে তো আর সাইকো-থ্রিলার লিখতে পারছি না! কাজেই সুড় সুড় করে বাইরে বের হয়ে আসলাম।

পাইপ বেয়ে বেয়ে দোতলায় উঠেছি গরাদ বিহীন জানালাগুলো নিচ থেকেই দেখেছিলাম। প্রাচীন বাড়ি বলেই কি না, এরা আজকের যুগেও গরাদহীন জানালার বাড়িতে থাকে। বিষয়টা আমার জন্য দারুণ হয়েছে, যে কোন একটা দিয়ে ঢুকে পড়া যাবে।

তবে আমি যেকোন একটা দিয়ে ঢুকতে এখানে আসিনি। খুঁজে খুঁজে বের করলাম টার্গেটের রুমটা। 

গাধাটা আমার দিকে পিঠ দিয়ে টেবিলে ঝুঁকে পড়ে কি যেন লিখছে। 

জানালা একটা খোলাই ছিল, দো’তলার জানালা বলে নিরাপত্তা নিয়ে হয়তো শঙ্কিত নয় লোকটা। এসি আর ফ্যান বন্ধ করে প্রাকৃতিক হাওয়া খাওয়া হচ্ছে! সুড়ুৎ করে সেঁধিয়ে গেলাম। 

সামনের পকেট থেকে টেপটা বের হয়ে এসেছে আগেই। 

এবার পেছন থেকেই ঝটপট আমার টার্গেটের মুখে পেঁচিয়ে ফেলি ওটা। মদন মানুষ! নড়ারও সুযোগ পেল না আর এখন সুযোগ পাচ্ছে না চিৎকার করার। সব সময় দেখেছি, আক্রমণ করা মাত্র মানুষ প্যারালাইজড হয়ে যায়। এমনটা নাকি রেইপ ভিক্টিমের সাথেও হয়। আতঙ্ক। শুনেছি প্রখর বুদ্ধিমত্তা যাদের আছে, তারা ট্রমাতেও বেশ নড়াচড়া করে থাকে। তবে আমার কপালে তেমন কেউ নেই। এত গাধা গাধা টার্গেট আমাকে কেন দেওয়া হয়?

হোয়াই মি? হোয়াই অলয়েজ মি? 

হারামজাদার মুখ পেঁচানোর সাথে সাথে ট্রমার প্রাথমিক ধাক্কা থেকে বেরিয়ে এল বোধহয় মদন-মোহন। ছটফট করে চেয়ার ছেড়ে বের হয়ে এসে আমার মুখ বরাবর একটা ঘুষি চালিয়ে দিল। চট করে সরে গিয়ে ব্যাটার হাঁটুর বাটিতে গায়ের জোরে লাথি মারলাম। 

কড়াৎ করে একটা বিচ্ছিরি শব্দের সাথে সাথে পা-টা বেকায়দাভাবে বেঁকে গেল। হাঁটুর বাটি একেবারে ছুটিয়ে দিয়েছি! চোখের পলকে জিপ-টাইয়ে আটকে দিলাম হাত।

তারপর দুমড়ে মুচড়ে মেঝেতে এই মাত্র পড়ে যাওয়া মানুষটার দিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টি না দিয়ে আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে ফিরে আসলাম। 

দরজা লাগানোর দরকার ছিল। ওপাশে গার্ডদ্বয় খানিকবাদেই বুঝে ফেলবে এখানে খুব সুবিধের কিছু হচ্ছে না। বাগড়া দিতে আসবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই! 

দারুণ একটা ওয়াকিং স্টিক টেবিলে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। সেটা আস্তে করে তুলে নিয়ে ফিরে আসছি আমার টার্গেটের চোখে মুখে মৃত্যুভয় দেখতে পেলাম। জিপ-টাই কেটে বসেছে চামড়ায়, কারণ সে এখন চেষ্টা করছে হাতটা ছুটিয়ে নেবার। পারছে না। 

মনটা আনন্দে ভরে গেল সাথে  সাথেই। 

গায়ের জোরে ওয়াকিং স্টিকটা দিয়ে পড়ে থাকা শালার আরেক পায়ের হাঁটু আর গোড়ালির মাঝে মারলাম। 

কড়াৎ জাতীয় শব্দের সাথে সাথে ভেঙ্গে গেল হাড়টা। 

শব্দটা আমার কানে মধুবর্ষণ করে! আর একই সাথে বাইরে থেকে গার্ডরা দরজা ধাক্কাচ্ছে। 

‘স্যার আপনি ঠিক আছেন?’ জানতে চায় কেউ একজন। 

‘এভরিথিং ইজ অলরাইট!’ হুংকার ছেড়ে জানাই আমিও।

দরজা ধাক্কানো থেমে যেতেই ওয়াকিং স্টিকটা মাথার ওপর তুলে এনে টার্গেটের ডান হাতের কব্জিতে মেরে দিলাম। 

কড় মড় করে অনেকগুলো হাড় একসাথে ভেঙ্গে গেল। সেই সাথে মুখের টেপ ভেদ করে গোঁ গোঁ করে চেঁচানোর চেষ্টা করতে থাকে বেয়াদবটা। 

আরে হাড় ভেঙেছে তো চেঁচানোর কি আছে? 

আমার রাগ হতে থাকে। 

ওয়াকিং স্টিকটা দিয়ে দমাদম কিছুক্ষণ বুকে পেটালাম। 

মট- জাতীয় একেকটা শব্দ হতেই বুঝে গেলাম পাজরের হাড় কয়টা ভেঙ্গেছে। 

ভোঁতা শব্দটাই সম্বল কারও পাজরের ভাঙ্গা হাড় গুণতে। এমন শব্দই হয় এখানে মারলে। 

এখানে শব্দ হল মোট আটবার। 

মানে – ইনার হাড় ভেঙ্গেছে আটটা। 

চির নিশ্চয় সবগুলোতেই ধরেছে কমবেশি। 

সাথে সাথে দরজাতে আবারও দমাদম শব্দ। 

সিকিউরিটি গার্ডদের মাথা মোটা হতে পারে তবে রেডিয়াসে যত হবে ভেবেছিলাম তার চেয়ে কম বলেই প্রমাণিত হল।

ভেতরে যে ঘাপলা চলছে সেটা বুঝে ফেলেছে এরা এতক্ষণে!

আর বেশিক্ষণ মজা নেওয়া যাবে না। টার্গেটের বাম হাতটাই ভালো লাগল। 

কারণ মেঝের সাথে আঁকড়ে ধরে রাখা হয়েছে ওটাই। 

ওয়াকিং স্টিকটা ওপরে তুলে লম্বভাবে নামিয়ে আনলাম ওই হাতের ওপর। 

কড়মড় শব্দের সাথে সাথে প্রতিটি আঙুল ভেঙ্গে গেল। 

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যন্ত্রণাকাতর মুখটা দেখি। 

হুম মুখের ভাজগুলো এভাবেই পাল্টে যায় তাহলে তীব্র যন্ত্রণায়? 

দারুণ লাগছে অনুভূতিটা। নিজেকে দানব দানব মনে হচ্ছে। 

আলগোছে ওয়াকিং স্টিকটা আবার তুলে চট করে ডানহাতেও নামিয়ে আনলাম। 

একটু বেশিই জোরে মেরেছি মনে হয় এবার। 

মধ্যমাটা ছিটকে আলাদা হয়ে গেল। গল গল করে রক্ত বের হচ্ছে ওখান থেকে। 

একই সাথে দড়াম করে খুলে গেল দরজাটা। 

পাঁই ঘুরতে ঘুরতে কোমর থেকে আরমিনিয়াসটা বের করে দ্রুত বেগে ঢুকতে থাকা গার্ডদুইজনের একজনের কপাল বরাবর গুলি করলাম। 

রিভলভারের গুলির শব্দ। একেবারে কাঁপিয়ে দিল বাড়িটা। 

আর স্রেফ সেমি-ডিগবাজি খেয়ে ছিটকে পেছন দিকে পড়ে গার্ড। দ্বিতীয়জনের হাতেও উদ্যত পিস্তল আর সেটা দ্রুত গতিতে আমার দিকে ঘোরাচ্ছে হারামজাদা। 

একই সাথে গুলি করলাম দুইজনে। 

আমি দুইবার। ও একবার। 

বুকের ওপর হাতুড়ির বাড়ি মেরেছে আমার বুলেট দুটো বাম দিকে গুলি খেয়ে শরীরের ওই অংশটা পেছনের দিকে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ডান হাত সরে যায় আরও বামে। 

গার্ডের বুলেটটা আমার অনেকটা ডানদিক দিয়ে বেড়িয়ে গেল। ওপাশের জানালার গ্লাসে একটা ফুটো করে চলে গেছে বাগানের ওপর দিয়ে। 

আমিও একই সাথে লাফিয়ে বের হয়েই বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি। 

ভুলটা এজন্য নয় যে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দুইজন ছুটে চলে এসেছে ভেতরে।

ভুলটা এজন্যও নয় তাদের গর্জে ওঠা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে নিরেট কাভার পাচ্ছি না আমি। 

বরং ভুলটা এজন্য টার্গেটের কপালে গুলি করা হয় নি এখনও। ক্লায়েন্টের আবদার!

মক্কেল আমার ওপর ভরসা করে আছে ব্যাটাকে কবরে পাঠানোর জন্য। হাসপাতালে নয়। 

কিন্তু এখন ওসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। 

উৎসাহী গার্ড দুইজনের বুলেট থেকে বাঁচার জন্য ছয়ফিট দূরের পিলারটিকে বেছে নিলাম। সেটার দিকে ডিগবাজি খেয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে গার্ডব্যাটাদের দিকে দুটো গুলি করেছি। 

একটা লাগল। 

অপরটা লাগল না। 

একজন গার্ডের গলায় বিশাল এক ফোকড় সৃষ্টি হয়েছে সেটা থেকে চমৎকার ভাবে রক্ত বেরিয়ে আসছে সেদিকে একবার তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু অন্য গার্ড সেক্ষেত্রে আমার তরমুজের মত মাথাটাকে একেবারে বিস্ফোরিত করে দেবে। 

কাজেই পিলারের আড়ালে নাক লুকালাম। 

‘একক’ গার্ড প্রাণের সুখে গুলি চালাচ্ছে পিলার বরাবর। পায়ের শব্দ শুনে বুঝতে পারছি ভালো একটা অ্যাংগেল খুঁজছে। 

গার্ড ব্যাটা বামে যায়, তো আমিও ঘুঘুর মত একপা ডানে সরি। গার্ড ব্যাটা ডানে যায় আমিও ঘুঘুর মত একপা বামে সরি। 

ঘুঘুও দেখতে পায় না লোকটা, ফাঁদও পাততে পারে না। 

ঠিক তারপরই এতক্ষণ যার জন্য আমার এত অপেক্ষা সেই ‘ক্লিক’  শব্দটা শোনা যায়। 

ম্যাগাজিন খালি করে ফেলেছে গার্ড উত্তেজনা তে নিশ্চয় মনে ছিল না কয়টা ফায়ার করেছে? 

উত্তেজিত গার্ড নড়ার আগেই কাভার থেকে বেড়িয়ে আসি আমি। 

বিল্ডিং কাঁপানো আরেক গুলিতে একেবারে উড়িয়ে দিলাম হারামজাদার ডান চোখ। 

দড়াম করে মাটিতে পড়ে গেল মরাটা। আর আমিও লাফিয়ে ঢুকলাম টার্গেটের রুমে। 

এতগুলো ভাঙ্গা হাড় নিয়েও অজ্ঞান হয় নি শালা গোঙ্গাচ্ছে। 

কাজেই তার কপালে পিস্তল ঠেকালাম এবং চোখে মুখে ফুটে ওঠা মৃত্যুভয়কে পাঁচ সেকেন্ড ধরে রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করলাম পরে কোন গল্পে কাজে লাগবে। 

তারপর টেনে দিলাম ট্রিগার। 

একেবারে ছাতু হয়ে গেল মাথাটা। ঘিলু আর রক্তের স্প্রে আমার হাতে মুখেও লেগেছে। হাল্কা ছড়িয়ে এসে ভরিয়ে দিয়েছে বুকেও। 

কাজেই ওখানে আর সময় নষ্ট না করে টার্গেটের বাথরুমে ঢুকে রক্ত পরিষ্কার করছি দূরে কোথাও সাইরেন শোনা যায়। 

দিন দিন রাজশাহীর পুলিশ বাহিনী তৎপর হয়ে যাচ্ছে দেখা যায়!

দ্রুত আবার বাগানে বেড়িয়ে এসে পেছনের দিক দিয়ে বাড়ির চৌহদ্দি টপকে  পার হয়ে যাই। 

মোবাইল বের করে টাইপ করছি, ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ পাশ দিয়ে তীর বেগে ছুটে গেল দু-দুটো পুলিশের গাড়ি। 

*

বিকেল বেলা। মিজান  মামার দোকানে চা খাচ্ছি। লোকে লোকারণ্য জায়গাটা। 

মিজান মামার হাতে যাদু আছে। কী দিয়ে চা বানায় দেখার আমার সখ ছিল বহুদিনের। 

একদিন চুরি করে দেখেও ফেললাম এবং হতাশ হলাম। 

লোকটা চা বানায় একেবারে আর সবার মতই। কিন্তু পরিমাণটা এমন নিখুঁতভাবে দেয় অমৃত হয়ে যায় এক কাপ চা। 

একটা গল্পের মাঝামাঝি এসে এখানে বসি আমি। চমৎকার এক কাপ চা খাই। তারপর ফিরে আসি আমার ডেরায়। 

চিশতিয়া নিবাস (প্রাঃ) লিমিটেড।

একটি ছাত্রাবাস। 

একটি মেস। 

একটি জঞ্জাল। 

আজও সেই উদ্দেশ্যেই এখানে আসা। সকালের মিশনটা দারুণভাবে শেষ করেছি বলে মনটাও ফুরফুরে। 

চমৎকার এক কাপ চা খাওয়া ছাড়া আমার আর কোন বদমতলব ছিল না। সেই সাথে চলছে মেসেজিং। 

আফরিতার সাথে। মেয়েটা মন খারাপ করে মেসেজ দিচ্ছে। 

আমিও টুকটাক হিবিজিবি রিপ্লাই দিয়ে ওর মন ভালো করার চেষ্টাতে আছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। মন কেন খারাপ তা-ও ঠিক করে বলছে না।

তখনই ঢুকতে দেখলাম ওদের। 

রাফি, সজল আর প্রান্ত। 

আফরিতার মত এরাও আমার সেকশনেই পড়ে। কাজেই আমাকে না চেনার কোন কারণ নেই। 

যদিও অতিরিক্ত ভীরের কারণেই খুব সম্ভব আমাকে তাদের চোখেই পড়ে না। 

অন্যদিন হলে হয়ত হাই-হ্যালো দিতাম। তবে আজ দিলাম না। 

মাথাতে অর্ধসমাপ্ত প্লট। ওদের সাথে পরে অনেক কথা বলা যাবে। আজ থাকুক। 

ডিটেক্টিভ আসিফের পরবর্তী গল্প নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। মার্ডার লুপ-থ্রি লিখতে চলেছি। 

খুন তো এতদিন মার্ডার লুপগুলোতে রাখতাম তিনটা। এবার রাখব পাঁচটা। 

পাঁচ খুনের হ্যাপা সামলাও এবার ডিটেক্টিভ আসিফ আর জিয়া মিয়া। ঠেলার কি দেখেছে এতদিন হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে? 

বিশাল একটা ওয়েব মাথাতে। এর সাথে ও তার সাথে সে চক্র! 

কার সাথে কার কানেকশন দিলে ভালো হবে? প্রস্টিটিউশন চ্যাপ্টারটাকে বাদ দিতে চাচ্ছি;  

পরে আবার আনলাম মাথায়। থাকুক প্রস্টিটিউশন। পাঠকের সন্দেহ ওদিকেই যাক কিছুক্ষণের জন্য। 

‘শরীরটাও কিন্তু দেখার মত। সব ঢেকে রাখে শালি নাহলে সেই হত।’ কারও মুখ থেকে শুনে আগ্রহ অনুভব করলাম। 

প্রস্টিটিউশন নিয়ে ভাবতে না ভাবতেই এসব গরম গরম বর্ণনা শোনা লাগলে কান পাতব না?

আফটার অল আমি রাইটার মানুষ। 

খেয়াল করে বুঝলাম তিন বেঞ্চ সামনে বসা সজলের কথা এটা। 

কান খাড়া করে আরেকটু শুনি এবার, কোন মেয়ের ব্যাপারে এই কথা বলছে? 

‘চরম বলেছিস, দোস্ত। প্রেম করতে পারলে হত!’ নিজের পায়ে হতাশায় একটা থাবা মারে রাফি। 

‘হুম একদিনের জন্য পটিয়ে রুম ডেটে নিতে পারলেই উইসস -’ জিভ দিয়ে একটা বিশ্রী শব্দ করে সজল। 

‘ফোন না দেওয়ার কথা ছিল ওটার কাহিনী বল ব্যাটা আগে!’ প্রান্ত তাড়া দেয় সজলকে।

‘মাগনা কি আর শোনা যায় রে? চা আর বেনসন খাওয়া। বলছি সব।’ হাসিমুখে বলে সজল। 

ঠান্ডা একটা বাঘের মত পেছনে চুপচাপ বসে থাকি আমি। 

সজলের চা এল। সজলের বেনসনও এল। 

আয়েস করিয়ে সেটাতে ধোঁয়া ধরিয়ে একটা টান দেয় ও। তারপর দুলে দুলে হাসে। 

‘রাফি তো ক্রাশ খাইসিলো মাইয়াটার ওপর। ক্লাস টেস্ট কালকে কিন্তু দুপুর থেকে পড়তে পারছিল না। মাথাতে শুধু আফরিতা ঘুরতেছে ওর।’

রাগের একটা হল্কা বয়ে যায় আমার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত। 

আফরিতাকে নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারছে আমারই সেকশনের ছেলেরা? আফটার অল আফরিতা ওদেরও ক্লাসমেট। 

অ্যাটলিস্ট! 

অসামান্য ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে তবুও শান্ত হয়ে বসে রইলাম। 

‘নাম্বারটা দে তো মাইয়ার। শালির পড়াশোনাও থামিয়ে দেই।’ চট করে মোবাইল বের করে প্রান্ত। 

‘রাখ ব্যাটা। ওই কাজে দেরী করতে আছে নাকি? বাজায় দিসি না টান্ডি?’ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে সজল। 

তারপর আরাম করে বেনসনে ও যখন টান দিচ্ছে আমি পকেট থেকে গোল্ডলীফ বের করে ধরাই একটা। 

আফরিতার মন খারাপের রহস্য এখন একটু একটু বুঝতে পারছি। 

‘সেই টান্ডি বাজানোর কাহিনী শোনার জন্যই কিন্তু তোকে চা আর বেনসন খাওয়ানো হচ্ছে।’ ঝুলে থাকতে থাকতে বিরক্ত প্রান্ত বলে। 

সুন্দরী ক্লাসমেট সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য শোনার জন্য কানের ফুটো একেবারে বড় বড় হয়ে আছে শালার পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমি। 

রাগে থর থর করে কাঁপছি সেই সাথে টানছি সিগারেটের শলাটা। 

এখানে মাথা গরম করা যাবে না। পরে সবাই আমাকে সন্দেহ করবে। 

কিশোর পাশা ইমন কাঁচা কাজ করে না। 

‘রাফির রুম থেকে এসেই ফোন লাফালাম আফরিতাকে। ধর দেড় ঘন্টা আগে। ফোন ধরতেই জানতে চাইলাম, “আফরিতা না?” শালী বলে, “জেনেশুনেই তো ফোন করেছিস। বল কি বলবি?” শালীর দেমাগ দেখ! ধীরে সুস্থে প্রশ্নটা করে ফেললাম, “একটা ব্যাপার জানার ছিল।” মেয়ে বলে, “বল।” আমিও সুযোগ ছাড়লাম না, চট করে বলে ফেললাম, “তুমি তো খানকি একটা। আমিও জানি, ক্লাসের সবাইও জানে। শুধু জানি না তোমার ভাড়া কত। ওটা যদি বলতে ”’

হাহা করে হাসিতে ফেটে পড়ে রাফি আর প্রান্ত। সজলের পিঠও চাপড়ে দেয় দুই বার। 

আর এদিকে প্রচন্ড রাগে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি আমি। 

মাথা নীচু করে দুই হাতের মুষ্ঠি শক্ত করে আটকালাম। নখের চাপে কেটে গেল হাতের তালু। 

তবুও নিজেকে ধরে রাখলাম। কন্ট্রোল হারালে চলবে না। 

মাথা রাখতে হবে ঠান্ডা। 

বরফের মত ঠান্ডা। 

ওদিকে সজল বলেই চলেছে, ‘আমার কথা শুনে মাগী একেবারে চুপ। আমি আরও উৎসাহ দিলাম, “বলে ফেল সোনা টাকার কোন সমস্যা নাই এদিকে।”’

আবারও হাসিতে ফেটে পড়ে ওরা তিনজন। আর আমি দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরাই। 

তারপর আস্তে করে পেছনের দিক দিয়ে বের হয়ে যাই দোকান থেকে। 

এখানে আর পাঁচ মিনিট থাকলে সবার সামনেই খুন করে ফেলব সজল নামের একটা কুত্তার বাচ্চাকে। 

রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ওখান থেকে দুটো জিনিস নিতে হবে। চট করে কোমরে আবার আরমেনিয়াসটা ভরে ফেললাম। ক্লায়েন্ট ফেরত চায়নি আর জিনিসটা। 

এখন ওটা আমার। 

আরেকটা ছোট ব্যাগ ব্যাকপ্যাকে ভরে সেটা কাঁধে চাপিয়ে সোজা চলে যাই তালাইমারির মোড়ে। 

বন্ধুরা আছে। এদের সামনে নিজের চেহারা দেখাতে হবে কিছুক্ষণ। অ্যালিবাই। 

ধুমিয়ে আড্ডা দিলাম টানা দুই ঘন্টা। 

চোখ ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছে। তবুও জোর করে টেনে জেগে আছি। 

গতরাতে এমনিতে ঘুমাতে পারিনি আফরিতার সাথে ঝগড়া করাটাই উচিত হয়নি। 

তারওপর সকাল সকাল আফরিতার সাথে দেখা করতে গিয়ে আবার ক্লায়েন্টের কল। 

ওখান থেকে ফিরে এসে পরবর্তী থ্রিলারের অর্ধেকটা লিখে আবার সজলের এই কাহিনী শোনা লাগল!

শালার লাইফটা তেজপাতা বানিয়ে ফেলেছে!

ঘড়ি ধরে দুটো ঘন্টা পার হয়ে যেতেই আবার ফিরে আসলাম মুন্নাফের মোড়ে। এখানেই একটা মেসে থাকে সজল।

এদিকে রাত নেমে এসেছে।

সজল ছেলেটার সাথে আমার পারতপক্ষে কথা হয় না। একই ক্লাসে থাকলেও শালা একটা সাপের মত। মুখে কোন শব্দ নাই। চেহারাতে স্পষ্ট আঁতেলত্বের ছাপ। এই হারামজাদা যে আমার আফরিতাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করতে পারে বিশ্বাসই হতে চায় না। 

মেসটা দেখা যাচ্ছে। 

আস্তে করে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। 

সৌভাগ্য আমার নিচের মেইন সুইচটার কাছে একটা মানুষও নেই। 

পকেট থেকে কলমটা বের করে বাটনে চাপ দিয়ে অ্যাসিডটুকু ঢেকে দিলাম মেইনসুইচের ফাঁক দিয়ে। 

ঢেলেই দ্রুত সরে গেছি। 

সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এই সময় ‘বুমম’ জাতীয় শব্দের সাথে সাথে একগাদা স্পার্ক ছড়িয়ে দেয় মেইন সুইচটি। 

সাথে সাথে কালিগোলা অন্ধকারে ডুবে গেল গোটা মেসটা। 

ভেবেছিলাম সবাই আতঙ্কিত হয়ে উঠবে কিন্তু তা হল কই? 

একজন জুনিয়র ছেলেকে নামতে নামতে বিড় বিড় করতে শুনলাম, ‘গেল আবার! এক মাসে তিনবার! অসহ্য!’

মনে মনে ভাগ্যকে একবার ধন্যবাদ দিয়ে তিনতলায় উঠে পড়লাম। একেবারে শেষ রুমটা সজলের। 

একা থাকতে পছন্দ করে। 

কাজেই সজলকেও একটা ধন্যবাদ। 

আর আমাকেও আমার পরিচিত কেউ দেখেনি এখনও। সবকিছু ঠিকমতো যাচ্ছে।

সজলের রুমে পৌঁছে গেছি। 

যেয়ে ধীরে ধীরে নক করতেই ভেতর থেকে মেঘ গর্জন করে ওঠে সজলের কন্ঠটা, ‘কে?’

‘আমি কেপি, দোস্ত। কালকের ক্লাসটেস্টের জন্য তোর খাতাটা দরকার ছিল। ছবি তুলতাম।’

চট করে দরজাটা খুলে গেল। কেপির নামে সকল দরজা উন্মুক্ত। 

জনতার সেবাতে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে আমার সুনাম আছে। শত্রুদের জন্য আমি যতটা কঠোর বন্ধুদের বেলাতে ততটাই কোমল। 

‘আরে দোস্ত আয় আয়।’ ভেতরে ডেকে নিয়ে যায় আমাকে সজল। 

শালার চেহারাটা দেখে মেজাজ খারাপ হতে থাকে আমার। 

এই হারামজাদাই আমার আফরিতাকে নিয়ে বাজে কথা বলেছে আজ দুপুরে। এমন কিছু কথা কোন ক্লাসমেটেরই সহ্য হওয়ার কথা না। 

আর, আমি? আমি তো ওকে ভালোবাসি। কাজেই সজলের প্রতি ‘ভালোলাগা’ বেড়ে গেছে আরও কয়েক গুণ। 

‘অসময়ে চলে এসেছি রে। কারেন্ট উড়ে গেছে তোদের মেসের।’ দুঃখপ্রকাশ করি আমি। 

‘আরে ব্যাপার না। ফ্ল্যাশ আছে না তোর মোবাইলের? ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে পিক তুলে নিতে হবে।’

আমি কিছু না বলে ঘরের চারদিকে তাকাই। 

একটা টেবিল ল্যাম্পের আলোতে আলোকিত ঘরটা। 

বিছানা থেকে টেবিল পর্যন্ত সবখানে ইলেক্ট্রিক্যালের বই খাতা। চমৎকার পড়াশোনা চলছে এদিকে, আফরিতাকে ফোন করেছিলাম কাঁদার কাছাকাছি পর্যায়ের মন খারাপ মেয়েটার। একটা লাইনও পড়তে পারছে না। 

মেয়েটার পড়া নষ্ট করেই আঁতেল সজল কি ভীষণ খুশি!

আরে হারামজাদা এটা করার জন্য তো আরও অনেক কিছু বলে একটা মেয়ের মেজাজ খারাপ করানো যায়। 

সেসব করলে আমার মেজাজ খারাপ হতে পারত কিন্তু এখানে আসতে হত না। 

কিন্তু বিশাল ভুল করে ফেলেছে সজল। আফরিতার চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলেছে ও। 

কয়েকবার! 

‘এই যে আমার ইলেক্ট্রিক্যাল খাতা।’ আমার দিকে খাতাটা বাড়িয়ে দেয় ও। আর আমি সাবধানে একবার দরজাটা দেখি। বন্ধ করেছে হারামজাদা ভেতর থেকে। 

পিঠ থেকে ব্যাকপ্যাক নামাই আমিও। আস্তে করে ডাক্ট টেপের ওপর হাত রেখে সজলের দিকে তাকিয়ে কোমল গলাতে বলি, ‘আফরিতাকে আজ দুপুরে ফোন দিয়েছিলে।’

প্রশ্ন নয় ঠিক। বিবৃতিমূলক বাক্য। 

সজলের মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে যায়। নীচ থেকে বাম হাতের প্রচন্ড ঘুষিটা বেজন্মাটার মুখ একেবারে বন্ধই করে না শুধু কামড় লেগে জিহ্বা একটুখানি কেটেও যায়। 

আক্রমণটা এতটাই আচমকা করেছি প্রতিরক্ষার কথা মাথাতেও আসে নি শালার। 

পরের ঘুষিটা একেবারে দেওয়ালে আছড়ে ফেলে জারজ সন্তানটিকে। কোনমতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে হারামজাদা তবুও। 

পেছন থেকে এই সুযোগে মুখে টেপ পেঁচিয়ে ফেললাম ভালো মত। আমার ধরণটাই এমন, কী আর করার!

সহজাত প্রবৃত্তিতে হাত মুখের কাছে চলে গেছে শালার মুখ থেকে টেপ খুলে ফেলতে চায়। 

সুযোগটা ছাড়লাম না ব্যাগ থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা পিনটা বের করে সড়াৎ করে হাঁটুর পেছনে ঢুকিয়ে দিলাম ওটা। 

সজলের দুই হাত মুখ থেকে বাম হাঁটুতে চলে গেছে। তীব্র যন্ত্রণাতে মুখ কুঁচকে উঠেছে ছেলেটার। প্রাণপনে চিৎকার করতে চাইছে কিন্তু মুখে টেপ থাকায় মৃদু একটা গোঙ্গানি ছাড়া আর কিছুই আসছে না এখন। 

সবার অজান্তে ছাত্রাবাসের একটি বদ্ধ রুমে চলছে প্রকৃতির প্রতিশোধের খেলা। 

পিনটা টেনে বের করলাম। টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলোতে পিনটায় লেগে থাকা তাজা রক্ত হাল্কা ঝিলিক দিয়ে উঠে। 

পিনটা বের করে ফেলাতে সজলের দুঃখ কমল এমনটা নয়। ভেতরের সবকিছু ফুটো হয়ে গেছে এবং চমৎকারভাবে ইন্টারনাল ব্লিডিং চলছে সেখানে। ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে যায় আমার। ভেরিকোজ শিরার বারোটা বাজিয়ে দিতে পেরেছি কি না সন্দেহ হয় তবে আশা করতে কোন দোষ দেখি না। 

সজলের চোখের মাঝে তীব্র আতঙ্ক কাজ করছে। 

এখনও দুই হাতে হাঁটুর পেছনের ক্ষতটা ধরে গোঙ্গাচ্ছে। মুখের টেপ খোলার খায়েশ উড়ে গেছে আরও আগেই। 

ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলাম। 

‘আফরিতার শরীর দেখতে তোমার খুব ভালো লাগে। তাই না?’ চমৎকার হাসিটি মুখে ধরে রেখেই জানতে চাইলাম আমি। 

প্রচন্ড ভয়ে দ্রুত মাথা নাড়াচ্ছে সজল তীব্র ব্যথা ওকে পাল্টা আক্রমণের অপশন যে আছে একটা সে কথাটাই ভুলিয়ে দিয়েছে। 

আমিও সময় নষ্ট না করে দড়াম করে একটা ঘুষি মারলাম শালার মুখে। টেপের ওপর দিয়েই। 

দ্বিতীয় ঘুষিতে আবারও দেওয়ালের ওপর আছড়ে পড়ল ও। ওপাশে আর কোন রুম নেই শেষ রুমটা সজলের। কাজেই কেউ টের পাচ্ছে না ব্যাপারগুলো। 

তৃতীয় ঘুষিটা বেজন্মাটার মুখের ওপর ল্যান্ড করতেই কেঁপে ওঠে ওর সারা শরীর। 

মুখের মাঝে রক্তের ধারা। সেটা বের হতে পারছে না টেপের কারণে। 

চতুর্থ ঘুষিটা ওর দুটো দাঁত ফেলে দিল। বাইরে থেকে চোয়ালের নাড়াচাড়া দেখে অন্তত সেটাই মনে হল আমার। 

পঞ্চম ঘুষির সাহায্যে ওকে ওর মুখেরই রক্ত মিশিয়ে দাঁতদুটো খেয়ে ফেলতে বাধ্য করলাম। 

কাটা মুরগীর মত লাফানোর চেষ্টা করছে ছেলেটা প্রচন্ড যন্ত্রণাতে। আমার দিকে দুটো রক্ত মাখা হাত বাড়িয়ে রেখেছে। 

ক্ষমা প্রার্থনা করছে কি? 

রক্তটা এসেছে ওরই হাঁটুর পেছন থেকে। ভেরিকোজ ভেইন তাহলে ফুটো হয়েছে, অ্যাঁ? 

ভ্রু কুঁচকে ছেলেটাকে দেখছি। একটা বিষাক্ত সাপকেও এত ঘৃণার সাথে দেখি নি আমি। 

মেয়েটাকে আমি ভালোবাসি তার ব্যাপারে বাজে কথা বলার সাহস কোন দিক থেকে পায় এই কুকুর-প্রসূত মানুষটা? 

আফরিতাকে ফোন দিয়ে কষ্ট দেওয়ার সাহসই বা এর বুকে ধরে কিভাবে? 

‘সরি, সজল।’ আমার হাসি হাসি গলাতে অবশ্য আমাকে মোটেও দুঃখিত মনে হয় না, ‘আর কোন মেয়ের শরীর দেখার উপায় থাকছে না তোমার।’

দুই চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এসেছে সজলের। আতঙ্ক আর যন্ত্রণা। 

আমার হাত থেকে মুক্তি নেই বুঝতে পারছে। 

অনবরত পানি বের হতে থাকা চোখ দুটোতে একেবারেই আচমকা ডানহাতের তর্জনী আর মধ্যমা গেঁথে দিলাম। 

ঘিনঘিনে একটা অনুভূতি হচ্ছে আঙুলের নিচে। পিচ্ছিল পিচ্ছিল কি সব জানি আমার আঙুল বেয়ে উঠে আসতে থাকে। 

আসলে উঠে আসছে না ফিনকি দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে চোখ থেকে। 

আর এসবের মাঝেই আমি আরও জোরে ঠেসে ধরি আঙ্গুলদুটোকে চোখের আরও গভীরে নেমে যাওয়ার চেষ্টায়। 

পারলাম না।

শক্ত কিছুতে আটকে গেছে আঙুল দুটোই। 

আর এবার সমগ্র শক্তি একত্র করে আমার হাতটাকে চোখ থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে সজল। 

তারপর শুরু হয় লাফালাফি। তীব্র যন্ত্রণাতে চেঁচাতেও পারছে না কুকুরটা সেই সাথে দাঁপাচ্ছে। 

কেন? আফরিতার দিকে তাকানোর সময় মনে হয় নি কেপি নামের কোন সাইকো থ্রিলার রাইটার মেয়েটিকে ভালোবাসে? 

মনে হলেও মোটা মাথাটা খাটিয়ে কথাটার তাৎপর্য কি সে বের করতে পারেনি?

ছেলেটার প্রতি আমার ঘৃণা বেড়েই চলেছে। 

আরে ব্যথা তো লাগবেই এত লাফালাফির কি আছে? 

আর এত লাফালে আমিই বা বেজন্মাটাকে গুলি করব কি করে? 

কাজেই জোর করে হারামজাদাকে চেপে ধরলাম ওর ওপর উঠে পড়েছি। 

অন্ধ সজল প্রাণপনে সরানোর চেষ্টা করছে শুধু আমাকে নয়, বিভিন্ন অঙ্গের মরণ যন্ত্রণাটুকুও।

কিন্তু ও কোনটাই সরাতে পারে না। 

আর ব্যাগ থেকে তৃতীয় বস্তু হিসেবে বের করা ছুরিটা ঘ্যাচ করে বসিয়ে দিলাম পশুটার ডান হাতে। 

তীব্র বেগে রক্ত বের হচ্ছে তার মাঝেই ডান হাতে আবারও গাঁথিয়ে দেই ওটা। কাঁধের কাছে। 

মূল্যবান কিছু রগ কেটে গেছে। চাইলেই আর তিড়িং বিড়িং করতে পারবে না বেয়াদবটা। 

সবকিছু পলিথিনে ভরে ব্যাগে ভরে ফেললাম। আর চার নম্বর জিনিস হিসেবে বের করলাম হিরোইনের প্যাকেটটা। 

আস্তে করে বিছানার তোষকের মাঝে ভরে ফেলি ওটা। 

পুলিশ আর সাংবাদিকদের জন্য সহজ সমীকরণ। 

দুই যোগ দুই। 

চার। 

খবরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিঃ হেরোইন চালান নিয়ে সংঘর্ষে রুয়েটেরর মেধাবী ছাত্র খুন। 

পিঠে ব্যাগটা ফেলে চট করে রিভলভারটা বের করলাম। 

সজলের নিম্নাঙ্গে পর পর তিনবার গুলি করলাম। পুরুষ হলে কেউ মেয়েদের সাথে এধরণের ভাষা ব্যবহার করে না। 

চতুর্থ গুলিটি করলাম সজলের গলায়। 

পঞ্চম গুলিটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিল টেবিল ল্যাম্পটি আর দরজা খুলে বের হয়ে সরে পড়লাম রুমটি থেকে। 

গুলির শব্দে দুনিয়াবাসী ছুটবে এখন ওদিকে। 

ধারে কাছে থাকা যাবে না। 

কিশোর পাশা ইমন কখনও কাঁচা কাজ করে না। 

*

ক্লাসে বসে বসেই ঘোড়ার মত ঘুমাচ্ছি।

গতকাল রাতে মেসটা থেকে বের হয়ে পাশের পুকুরে রক্ত ধুয়ে ফেলেছিলাম শরীরের। 

তারপর হাতের গ্লাভস দুটো খুলে শান্ত পায়ে ফিরে এসেছিলাম নিজের মেসে। 

তারপরও তো শান্তি ছিল না ক্লাসটেস্টের জন্য পড়ব কী আফরিতার মন ভালো করতে করতে রাত চারটা বেজে গেল। 

আজকে আফরিতা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে সজল আসলেই তার ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে  – কিন্তু ছেলেটা না আসাতে হতাশই হল বেচারি। 

একটা বিশাল চিৎকারে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। 

রাফি চেঁচাচ্ছে। 

এ তো আরেকটা বেয়াদব। চেঁচায় কেন? 

কান খাড়া করলাম আফরিতার সামনে গিয়েই তো চেঁচাচ্ছে দেখা যায়!

‘তুই তুই খুন করিয়েছিস আমার সজলকে। তুই করিয়েছিস খুনটা! ফোনে বাজে বলার ঝাল ঝেড়েছিস -’

সারা ক্লাস স্তব্ধ হয়ে যায়। সজলের মৃত্যুর ব্যাপারে জেনে গেছে এতক্ষণে সবাই। 

আস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম। 

রাফির আঙুল আফরিতার মুখের সামনে নাচানাচি করছে ওটা মুচড়ে ধরে নিরেট একটা ঘুষির সাহায্যে স্টেজের ওপর ফেললাম রাফিকে। 

‘সজল ড্রাগ কার্টেলের সাথে জড়িত ছিল। পুলিশের রিপোর্ট পড়েছিস তোরা?’ গমগমে গলায় হুংকার ছাড়ি, ‘ক্লাসের মাঝে নিজেদের মাঝে ঝগড়া বিবাদ করার কোন মানে হয় না। সজলের মৃত্যুতে আমরা কেউই কম কষ্ট পাইনি।’

অনেকে সায় দেয় এই কথাতে। রাফি উঠে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে থাকে তবে তাকে পিয়াস ধরে সরিয়ে নিয়ে যায় অন্য দিকে। 

আস্তে করে বাইরের বারান্দায় বেড়িয়ে আসি আমি। আজ ক্লাসটেস্ট তো দূরে থাকুক ক্লাসও হবে না। 

আমার পাশে এসে দাঁড়ায় কেউ। 

আফরিতা। 

‘দিনের বেলায় হাই তুলিস। দিন দিন চিকণ হচ্ছিস। সারাদিন সিগারেট খাস রাতের বেলাতে ঘুমাতে পারিস না। তাই না?’

মেয়েটার গলাতে প্রচ্ছন্ন একটা সুর আছে। আমার কানে আটকে যায়। এই প্রথমবারের মত ভয় পাই আমি। 

জীবনটা এমন কাওকে কাছে আনাটা ঠিক হয়নি। এজন্যই পতন হতে পারে আমার!

কথা ঘুরাই আমি, ‘একটা প্রশ্ন করেছিলি মনে আছে?’

‘সজলের ব্যাপারটাতে তোর হাত আছে!’ ফিস ফিস করে বলে আফরিতা। 

‘সোজাসাপ্টা উত্তর দেব। এখনও জানতে চাস কি না সেটা শুধু বল?’ আমি ওই টপিকটা ইগনোর করি এবারও। 

অদ্ভুত একটা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকায় মেয়েটা। 

‘চাই।’ আবার ফিস ফিস করে বলে ও। 

পেছনে গোটা ক্লাস আছে তার তোয়াক্কা না করে আলতো করে হাত তুলে নেই আমি ওর, ‘আই লাভ ইউ, আফরিতা।’

রচনাকাল এপ্রিল ২১, ২০১৪ 

মিথরাস 

বিশাল বাড়িটার সদর দরজাতে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে চারপাশটা একবার দেখে ক্রিশ্চিনা।

ঘন কালো চুল ওর তবে ছোট করে কাটা কোঁকড়া চুলগুলো ফর্সা কপালে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। ডান হাতটা একবার ওই চুলে চালিয়ে ফিরে তাকায় ও জারাফের দিকে।

‘তুই শিওর?’ কটমট করে বয়ফ্রেন্ডের দিকে তাকায় ও।

জবাব না দিয়ে এক পা এগিয়ে বাড়িটায় ঢুকে পড়ে জারাফ। বিশাল বাসাটা এখন শুধুই ওদের। অন্তত উপস্থিতির দিক থেকে।

পোড়োবাড়ি বলে খ্যাতি আছে এই জায়গাটার। ঠান্ডা দৃষ্টিতে চারপাশে তাকায় জারাফ। শুভ্র মুখটা এখন বরফের মত চকচক করছে। দস্তানা পড়া হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে আসে ওর। ফিরে তাকায় ক্রিশ্চিনার দিকে।

‘বাচ্চাটাকে নিয়ে আয়। কুইক!’

বাড়িটার সামনে থেমে আছে কালো গাড়িটা। ওটার ট্রাংকে আটকে রাখা হয়েছে তিন বছরের একটা খ্রিস্টান মেয়েকে। পাঁচ মিনিটের মাঝেই ওকে নিয়ে ফিরে আসে ক্রিশ্চিনা। বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে শিশুটি। মার্গারেট এর নাম জানে ওরা। তবে এখানে তার উপস্থিতিকে গায়ে লাগায় না জারাফ।

পুরোনো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে ওপরের দিকে। পিছু নেয় ক্রিশ্চিনা। একহাতে ধরে আছে মার্গারেটের একটা হাত।


এক

ক্লাসরুমে বসে দুই হাতের তালু ঘষছে নীরব। এসির ঠান্ডা বাতাস তার সহ্য হয় না।

সহপাঠীদের বলে লাভ নেই। সবগুলোর গন্ডারের চামড়া। ভবিতব্য ধরে নিয়েই এখানে বসে আছে ও।

প্রতিদিন তাই করে।

সহপাঠীদের দিকে এক ঝলক তাকায়। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। ফারহা আর ইকরাকে দেখা যাচ্ছে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে কথা বলছে। এই মাত্র রোকনকে আঁচড়ে দিল প্রিয়াংকা। শাহেদ যথারীতি এই হট্টগোলেও একটা বই খুলে বসে আছে। ছেলেটা গল্পের বইয়ের পোকা একেবারে!

মৃদু হাসে নীরব ওদিকে তাকিয়ে।

তারপরই ওর চোখ পড়ে ক্রিশ্চিনার দিকে। মেয়েটা অসাধারণ দেখতে। ওকে দেখলেই বুকের ভেতরে একটা হাহাকার বয়ে যায় নীরবের। বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে অন্যদিকে তাকায় ও।

ক্রিশ্চিনার বয়ফ্রেন্ড জারাফ মেয়েটার চুলে মুখ ডুবিয়ে কিছু বলছে, ক্লাসের মধ্যেই। গা জ্বলে যায় নীরবের।

তবে এখানে নীরব দর্শক হওয়া ছাড়া নীরবের আর কি-ই বা করার আছে?

ও কিছু করেও না। হেলান দেয় নিজের সীটে। স্যার আসুক। ক্লাস শুরু হোক। তারপর হতচ্ছাড়া ইউনিভার্সিটিটা থেকে বের হয়ে যেতে পারলে হয়। এখানে আর মন টেকে না নীরবের।

আস্তে করে ওর পাশে চলে এসেছে দিনার। তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে ও।

ওর পিঠ চাপড়ে দেয় দিনার, ’খবর কি, ফ্রেন্ড?’

‘ভালো। খুব ভালো। তোমার?’ ভদ্রতা করে জানতে চেতেই হয় নীরবকে।

‘জোসিলা। দারুণ একটা জিনিস নিয়ে তোমার সাথে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। আগের দিনই বলতাম কিন্তু কি একটা ঝামেলা শুরু হয়ে গেল দেখলেই তো!’

একটু বিব্রত বোধ করে এবার নীরব। গতকালকের ঘটনাটা খুব একটা গর্ব করার মত কিছু না।

ক্লাসমেট একটা ছেলের নাক-মুখ ফাটিয়ে দিয়েছে নীরব। সুইমিং পুলের ধারে।

বিষয়টা কেউ তুলবে আজ ক্লাসে আসলে এটা আশা করেছিল ও। তবে ছেলেটা যে দিনার হবে সেটা আশা করেনি। এটা একটা কারণ বটে আজ একটু বেশিই চুপচাপ সবাই ওর প্রতি।

সায়েম ছেলেটা একেবারে নিখুঁত একজন প্লে বয়। ভার্সিটির মেয়েদের মাঝে একটা লিস্ট আছে তার। চার বছর পার হওয়ার আগে এদের সাথে সে অন্তত তিনবার করে বিছানাতে শোবে।

তেইশ জনের লিস্টের পনেরজনকে জিতে ফেলেছে সে।

অদ্ভুত ব্যাপার হল মেয়েগুলো জানত সায়েমের বেডলিস্টের কথা। তবুও তারা না করেনি। স্বেচ্ছায় এসেছে। ওদের চিন্তাভাবনা ছিল এক কাঠি সরেশ। তাদের প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস ছিল সায়েম তাদের সাথে একবার অন্তরঙ্গ হলে আর অন্য দিকে মন দিতেই পারবে না!

প্রত্যেকের ধারণাই ছিল ভুল।

‘কাজ’ হয়ে গেলে সায়েম নিত্যনতুন টার্গেট ধরে গেছে।

এবারের টার্গেট তার ভার্সিটির হটেস্ট মেয়েটাকে। মেয়েটির নাম ক্রিশ্চিনা। নীরব যার ওপর প্রথম দিন থেকে ক্রাশ খেয়ে বসে আছে।

সুইমিং পুলের ওখানে সায়েম যখন ক্রিশ্চিনার শরীর নিয়ে বাজে রসিকতা করে শোনাচ্ছিল তার বন্ধুদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল নীরব। বন্ধু কিরণকে খুঁজতেই পুলের এদিকে আসা। এসময় তার কানে চলে আসে সায়েমের রসিকতা।

নীরব ঠান্ডা চোখে একবার তাকিয়েছিল সায়েমের দিকে। দৃষ্টিটা খেয়াল করে উঠে এসেছিল সায়েমও। ঠাট্টার সুরে জানতে চেয়েছিল, নীরব এখনও অন্যের গার্লফ্রেন্ডের পেছনে ঘুর ঘুর করে কি না।

তারপর হাসিমুখেই ক্রিশ্চিনার সাথে মেলে এমন একটা নোংরা জোকস শুনিয়ে দেয় নীরবকে।

মাত্র দুইবার মেরেছিল নীরব ওকে প্রথমে পেটে তারপর মুখে। এতেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় সায়েম।

সায়েমের সার্কেল এগিয়ে আসতে চাইলেও পরক্ষনেই থমকে যায়। নীরবের মত একটা ছেলে সায়েমকে দুই ঘুষিতে নক আউট করে দেবে এটা তারা ভাবেনি।

তবুও লাফিয়ে এসেছিল মিফতাহ একহাতে টেনে ধরে ছিল চলে যেতে থাকা নীরবের শার্ট বাম হাতটা ছিঁড়ে তার হাতে চলে গেছিল তখন।

ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর বুকে একটা ঘুষি বসাতেই নিঃশ্বাস আটকে যায় মিফতাহের। মারামারির সখ উধাও হয়ে গেছে সঙ্গে সঙ্গে।

কোনদিকে না তাকিয়ে চলে এসেছিল নীরব।

তবে দূর থেকে অনেকেই এটা দেখেছে। তাদের মাঝে যে দিনারও ছিল সেটা জানত না ও। এখন জানল।

ঝুঁকে পড়ে ও দিনারের দিকে।

‘লিসেন, সায়েমের মুখ ফাটানোর জন্য আমার কোন অনুশোচনা নেই। ওটা যদি জানতে চাও এটাই বলব।’

হাসে দিনার, ’আমারও নেই। আমার পছন্দের মেয়েটার সাথে একাধিকবার শুয়েছে বাস্টার্ডটা।’

অন্যদিকে তাকায় নীরব রাগত মুখ নিয়ে।

আঙুল ফোটায় দিনার, ’যাই হোক। আমি এখানে এসেছি তোমার সাথে ক্রিশ্চিনা মেয়েটাকে নিয়ে কথা বলা দরকার। তোমার সাহায্য আমার প্রয়োজন। গতকাল বাম হাতে একটা উল্কি দেখেছিলাম। আশা করছি তোমার থেকেই সাহায্য পাবো আমি।’

‘ক্রিশ্চিনা?’ চোখ কুঁচকে তাকায় নীরব।

‘হুঁ। ওর বাসায় গেছিলাম আমি কয়েকদিন আগে। একটা অদ্ভুত বিষয় দেখে এসেছি। একটা রহস্য তো আছেই। মেয়েটার বয়ফ্রেন্ডকেও সুবিধের কেউ বলে মনে হয় না।’

একবার জারাফ আর ক্রিশ্চিনাকে দেখে নীরব। নিজেদের নিয়ে একেবারেই মেতে আছে ওরা। কোন দিকেই খেয়াল নেই তাদের!

দিনারের দিকে তাকায় আবার, ’এই যদি হয় তোমার মন্তব্য আমি বলব, আমি আগ্রহ বোধ করছি। কথা তো আর ক্লাসরুমে বলা যায় না। কোথায় বলবে?’

ইতস্তত করে দিনার, ’আমাদের একটা সোসাইটি আছে। সিক্রেট সোসাইটি। আসলে শুধু আমি না ওদের একজনের চোখেই প্রথমে অসঙ্গতি চোখে পড়ে। আমরা সেখান থেকেই কাজ করে যাচ্ছি। তদন্ত চলছে। তোমাকে এর সভ্য করা যাবে?’

‘কেমন সোসাইটি?’ চোখ বাঁকা করে জানতে চায় নীরব।

‘এ-এম-এস। অ্যান্টি ম্যাজিকাল সোসাইটি। আমরা যাদুবিদ্যার বিরুদ্ধে। তবে ক্লাসের সবাই তা না। পৃথিবীতে এখন তো ওই দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষের সংখ্যাই বেশি!’

ধীরে ধীরে মাথা দোলায় নীরব।

‘এই যদি হয় তোমাদের উদ্দেশ্য তাহলে আমি খুবই আগ্রহী। তোমাদের সাথেই আছি। কিভাবে সভ্য হতে হবে?’

‘হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাবো তোমাকে আজ রাতে। প্রতিজ্ঞা করতে হবে ওখানে।’

‘অলরাইট।’ মেনে নেয় নীরব, ওদিকে ক্লাসে স্যার ঢুকে পড়েছেন।

সেদিকে মনোযোগ দেয় ওরা।


দুই

‘তোমার হাতের উল্কিটা দেখাও ওদের।’ হেডকোয়ার্টারে বসে হাসিমুখে বলে দিনার।

বাম হাতা গুটিয়ে সবাইকে দেখায় ওটা নীরব।

সবাই বিস্ময়সূচক একটা শব্দ করে।

ব্যাখ্যা দেয় দিনার, ’চমৎকার একটা উল্কি। এটাতে কিছু  ল্যাটিন আর কিছু সিম্বল আছে। এক কথায় যদি বলি, এখানে বলা হয়েছে, “যাদুবিদ্যার বিরুদ্ধে অশান্তির উর্ধ্বে”। আমার এরকম একটা উল্কি করানোর ইচ্ছে ছিল তবে সঠিক মাপ পাইনি। শুধু ইন্টারনেটে দেখেছিলাম এ জিনিস। প্রাচীন পুঁথিতে আঁকা, অ্যাকুরেট নয় কোনটাই।’

নীরব এসব শুনছে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের তিনজনের দিকে।

চঞ্চল প্রিয়াংকা, ভদ্র দিনার আর বইপড়ুয়া শাহেদ! এরা মিলেই কি না সিক্রেট সোসাইটি এ-এম-এস খুলে বসে আছে!

‘আমাদের কাজের কথাতে যাওয়া উচিত।’ বলে নীরব। একটু আগে সভ্য হয়েছে ও এই সংঘের।

‘হুঁ। প্রিয়াংকা, প্রথমে তুই বল। ক্রিশ্চিনা সম্পর্কে কি কি জানিস?’

ক্রিশ্চিনার নাম শুনেই বুকের কোথাও হাল্কা একটা খোঁচা অনুভব করে নীরব। মেয়েটাকে ও কতটা ভালোবাসে সেটা ও নিজে জানে। অন্য কেউ কি বুঝতে পারবে সেটা?

ক্রিশ্চিনার নামে ম্যাজিকের অভিযোগ শোনা যখন যাচ্ছে এখন নীরব আরও বেশি আগ্রহী। মেয়েটাকে রক্ষা করতে হবে।

‘ক্রিশ্চিনা মেয়েটা খ্রিস্টান। অথচ আচার আচরণে তাকে খ্রিস্টান বলে মনে হবে না। এই যুগে ধর্মকর্ম কেউই মানতে চায় না। আমি সে কথা বলিনি। সেটা বোঝাতেও চাইনি। বলছি যদি সে খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন হত তাহলে  মেনে নেওয়া যেত। তাকে অন্য কিছু নিয়ে উৎসাহী দেখা যায়। সেটা খ্রিস্টধর্ম না।’

দুই হাত এক করে নীরব, ’সেটা কি?’

শুন্য দৃষ্টিতে তাকায় প্রিয়াংকা, ’আমি জানি না ঠিক। তবে সূর্যের প্রতি মেয়েটার দুর্বলতা আছে। সবার চোখের আড়ালে তাকে স্যালুট করতে দেখেছি। সূর্যের দিকে মুখ করে।’

‘আচ্ছা।’ মাথা দোলায় নীরব।

বাকিরা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আগে থেকেই জানে ওরা এসব বুঝতে পারে নীরব।

তবে ওদের কাছে খুব সম্ভব কোন ব্যাখ্যা নেই।

‘আরও কিছু আছে তো মনে হয়। ব্যাখ্যা দেবে এবার দিনার। তুমি বলেছিলে, ক্রিশ্চিনার বাসাতে গিয়ে এমন কিছু দেখে ফেলেছ যা তোমার মাঝে সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে?’

নড়ে বসে দিনার, ’হুঁ। ক্রিশ্চিনা আর আমার বাসা পাশাপাশি। ছোটবেলা থেকেই আমি ওকে চিনি। তবে সেরকম বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠতা কোনদিনই গড়ে ওঠেনি। সেদিন তার কাছে আমাকে যেতে হয়েছিল কারণ রাত তখন আটটা। আমার ইন্টারনেট কানেকশন কাজ করছিল না। পরের দিনের অ্যাসাইনমেন্টের অনেক কাজ পড়ে ছিল।’

মনোযোগ দিয়ে শোনে নীরব, ’তারপর?’

‘তারপর আমাকে দেখে ওর আম্মু খুশি হয়ে গেলেন। ওদের বাসাতে খুব কম যাই আমি। আর আমাকে কেন জানি আন্টি বিশেষ পছন্দ করেন। সোজা আমাকে ক্রিশ্চিনার রুমে চলে যেতে বললেন উনি। আমিও গেলাম। রুমটা চিনি। নক করেছিলাম কয়েকবার।’

‘দরজা খুলল না?’ জানতে চায় নীরব।

‘না। খুলল না। তখন বাধ্য হয়েই আস্তে করে নব ঘুরিয়ে খুলে ফেলি আমি দরজা। দেখলাম -’

দিনার থেমে গেছে।

ওর চোখ দেখে বোঝা যায় যে কথাটা বলতে চাইছে সে সেটা নিজেই বিশ্বাস করে না।

‘একটা পেন্টাকল আঁকা ঘরের মাঝে। সেখানে হিবিজাবি অনেক কিছু লেখা ছিল ল্যাটিনে। আর পেন্টাকলের ঠিক মাঝে একটা কালো ছায়া। পুরো ঘরে আর কেউ নেই। শুধু ওই ছায়াটা। ছায়াটা মোটেও মানুষের মত কিছু না। আকৃতিতে একটা পিলারের মত বলা চলে। গোল, আর লম্বা এক পিলার। সেখান থেকে আমি স্পষ্ট শুনলাম ক্রিশ্চিনার গলা, অসন্তোষ সেখানে, “দূরে সরে দাঁড়াও, দিনার!” তারপর হঠাৎ সব কালো অন্ধকার হয়ে যায়। আমার মনে হয় আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম।’

ঢোক গেলে দিনার সেদিনের অভিজ্ঞতা মনে পড়াতে।

তারপর আবার বলে যায়, ’মেয়েটাকে আমি পরের সেকেন্ডে দেখি। ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একই ঘরে। তবে কোন পেন্টাকল সেখানে নেই। আমাকে একটা পেনড্রাইভ ধরিয়ে দেয় ও তাড়াহুড়ো করে, শুধু একবার বলল, “অ্যাসাইনমেন্টের পুরোটাই আছে। নিজের মত এডিট করে নাওগে।” অথচ ওকে আমি তখনও বলি নি আমার অ্যাসাইনমেন্ট দরকার।’

সবাই চুপ হয়ে যায়, মাথা দোলায় নীরব।

‘ইন্টারেস্টিং। বুঝতে পারলাম।’

একসাথে প্রশ্ন ছুটে আসে ওর দিকে, ’কি?’

‘ক্রিশ্চিনা।’ উঠে দাঁড়ায় নীরব, ’নিজেও একটা সিক্রেট সোসাইটির সাথে যুক্ত। তোমাদের কথা যদি ঠিক হয়ে থাকে মেয়েটা একসাথে দুই নৌকাতে পা রেখেছে। আমি জানি না এর পরিণাম কি হতে পারে। হয়ত একেবারেই উন্নতির শীর্ষে চলে যাবে ও পাবে প্রচন্ড ক্ষমতা। অথবা টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে ও।’

‘আমাদের কি জানাবে ঠিক কি নিয়ে কথা বলছ তুমি?’ অধৈর্য হয়ে যায় সদানিশ্চুপ শাহেদও।

ওর দিকে তাকায় নীরব, ’মিথরাস। সিক্রেট সোসাইটি মিথরাসের নাম শুনেছে এখানে কেউ?’

সুন্দর চুলগুলো দোলায় প্রিয়াংকা, ’আমি শুনেছি। সূর্যদেবতা। তাই না?’

প্রশংসার দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায় নীরব, ’ঠিক সূর্যদেবতা বলেই রেখে দিলে হবে না মিথারাসের পরিধি অনেক বিস্তৃত। প্যাগানিজম নিয়ে জানো তোমরা?’

ক্লাস নেওয়ার মত করে সবার দিকে তাকায় নীরব।

‘পেগানিজম আর খ্রিস্টধর্ম একে অপরের সাথে কিছুটা জড়িত, ডিয়ার ফেলোস। পেগানিজম হল সেই বিশ্বাস যেখানে একেশ্বরবাদকে সম্পূর্ণ বিরোধীতা করা হয়। পেগানিজমে বিশ্বাসীদের বলা হয় পেগান। এরা যে কোন শক্তিকেই তাদের প্রভু হিসেবে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল। বহু-ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলেও এদের ঈশ্বরদের কিন্তু সনাতন ধর্মের মানে, হিন্দুদের দেবতাদের মত নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। পেগানরা ক্ষণে ক্ষণে তাদের ঈশ্বর পাল্টে ফেলত। যখন যা তাদের প্রভাবিত করছে সেটাকেই তারা দেবতা বলে মেনে নিত। কারণটা সহজ, ওরা পাগল ছিল না। তবে ওদের ধারণা ছিল ঈশ্বর নিজেকে পাল্টে ফেলেন তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী। এজন্যই অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ওরা দিত তাদের প্রয়োজনে আসা সব প্রভাব রাখার মত বস্তুকেই।’

মাথা চুলকায় দিনার, ’পেগানদের রোমের শাসকরা ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দিয়েছিল না? খ্রিস্টধর্মে নবদীক্ষিত সম্রাটদের মতে বহু-ঈশ্বরে পূজো করা স্রেফ ভন্ডামি। এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড এরকম কঠোর হস্তে তাদের দমন করা হয়েছিল। দলে দলে লোকেরা গ্রহণ করেছিল খ্রিস্ট ধর্ম। তাই না?’

মাথা দোলায় নীরব, ’বন্দুকের নল সব সময় ক্ষমতার উৎস হয় না হে। পেগান থেকে খ্রিস্টান হয়েছিল এমন সবাই সম্ভবতঃ খ্রিস্টান বলে নিজেদের মানেনি। শুধু ভেক ধরেছিলেন নিজেদের খ্রিস্টান পরিচয় দিয়ে। মনেপ্রাণে থেকে গেছিলেন পেগান। পরবর্তীতে এদের অনেকের বংশধররাই খ্রিস্টধর্মকে মেনে নেয়। কারণ, বাবাদের বা দাদাদের মনের মাঝে কেনই বা পেগানিজম লুকিয়ে আছে তার তাৎপর্য তাদের জানার কথা নয়। চারপাশে খ্রিস্টান পরিবেশ। কেনই বা পেগান হবে তারা? জেনারেশন বাই জেনারেশন খাঁটি খ্রিস্টান হয়ে ওঠে তারা। যদি খ্রিস্টধর্মকে খাঁটি বলা যায় আর কি!’ মুখ বাঁকায় নীরব।

‘কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছ?’ পাশ থেকে জানতে চায় শাহেদ।

‘পেগানদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে বড় ধরণের ভুল করেছিলেন সম্রাটরা। খ্রিস্টধর্মে পেগান বিশ্বাস চলে এসেছে অনেকগুলোই। তাদের মাঝে অনেকগুলো আজ প্রতিষ্ঠিত।’

হাত তোলে দিনার, ’আমি যতদূর জানি, ঈসা(আঃ) যাকে খ্রিস্টানরা যীশু খ্রিস্ট বলে তাঁর জন্ম এপ্রিলে। অথচ পেগান উৎসবের তারিখ ২৫ শে ডিসেম্বর মেনে নিয়ে তারা সেটাকেই আজও ক্রিসমাস ডে বলে বিবেচনা করে। পেগান ক্রস একটু পাল্টে ক্রিস্টানদের ক্রসে পাল্টে গেছে আজ। খ্রিস্টানদের প্রার্থনাভঙ্গী আসলে পেগানদের প্রার্থনাভঙ্গীই। পেগানদের অনেক কিছু এক অর্থে আজকের খ্রিস্টধর্মে ঢুকে গেছে পুরোপুরি।’

মাথা নাড়ে নীরব, চেহারাতে স্পষ্ট বিরোধীতার ভাব, ’এখানেই মাই ডিয়ার দিনার, ভুল করে সবাই। পেগানদের দিকে সবার নজর। কিন্তু আসলে, পেগান নয় খ্রিস্টধর্মে ঢুকে গেছে মিথরাসের বিশ্বাস।’

চমকে ওঠে প্রিয়াংকা, ’মিথরাস?’

সম্মতিসূচক মাথা দোলায় নীরব, ’মিথরাস।’


তিন

মৃদু আলোতে তিনজোড়া চোখের আগ্রহী দৃষ্টি দেখতে ভালো লাগে নীরবের।

‘মিথরাস আগেই বলেছিলাম, সূর্যের দেবতা বলা যায় একে। পেগান সভ্যতার ধর্ম পেগানিজম ছিল না। ধর্মটা ছিল মিথরাস। ইন্দো-ইরানিয়ান সূর্য দেবতা। পারসিয়ানদের মাঝে এই ধর্ম প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে। বুঝতেই পারছ পেগানদের উৎস কোনটা? এই মিথরাস। পারসিয়ানরা বল একে’মেহের’। মেহের ছিল তাদের রক্ষাকর্তা। অসীম ক্ষমতা ছিল মেহেরের অন্তত পারসিয়ান ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী।’

ওদের শ্বাস টেনে নেওয়ার শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোন শব্দ নেই। সবাই কান পেতে শুনছে নিরবের কথা।

‘হিন্দু ধর্মের দিকে যদি চোখ ফেরাই এবার আমরা, ’মিত্রা’ বলে একজন দেবতাতে তারা বিশ্বাস রাখে। যদিও’বরুণ’ দেবতার সাথে একে স্মরণ করা হত। এজন্যই বরুণের ছায়াতে ধীরে ধীরে কালক্রমে ঢেকে গেছে মিত্রা। তবে এই মিত্রাটি হল সেই সূর্যদেবতা যেটা কিনা পারসিয়ানদের মেহের। ঋদ্বেগে আছে মিত্রাকে নিয়ে স্তুতিবাক্য। পারসিয়ানরা যখন নিজেদের ধর্ম থেকে সব দেবতাদের অস্বীকার করছিল তখনও মিথরাসকে তারা রেখে দেয়। তাকে ওরা মেহের বলে যার অর্থ হল বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং সূর্য। মজার ব্যাপার হল মিশরীয়দের সূর্যদেবতা “হোরাস” কিন্তু অনেকটা এমনই ছিলেন।’

বাঁধা দেয় প্রিয়াংকা এবার,

‘মিথরাস নিয়ে জানাটা দরকার কেন? ক্রিশ্চিনা সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে পারে? আমার জানা মতে মিথরাস শয়তানের বিরোধী সত্ত্বা বলে বিশ্বাস করা হয়। আর এদিকে দিনার যা দেখে এসেছে তা কিন্তু স্পষ্ট করে আমাদের ক্রিশ্চিনা শয়তানের পূজো করে।’

ওর দিকে তাকায় নীরব, ’পেন্টাকল আর ল্যাটিন প্রমাণ করে না ক্রিশ্চিনা শয়তানের পূজারী। আমাকে একবার দেখতে হবে ওটা। তবে সেটা তো সম্ভব না। এখানে বসে যদি আমাকে অনুমান করতে বল তোমরা আমি অনুমান করব ক্রিশ্চিনা শয়তানের পূজারী।’

অবাক হয় প্রিয়াংকা, ’এই মাত্র না বললে, তুমি পেন্টাকল আর ল্যাটিন দেখে মানতে চাওনা ক্রিশ্চিনা শয়তানের পূজারী।’

হাসে নীরব, ’না। মানা উচিতও না। তবে আমার বিশ্বাস ও শয়তানের পূজো করছে কারণ, ওই মিথরাস।’

‘মিথরাস শয়তানের বিরোধী সত্ত্বা।’ আবার বলে প্রিয়াংকা। শক্ত হয়ে আছে মুখ।

‘চাইনিজ মিথোলজী তাই বলে। মিথরাস শয়তানের হাত থেকে ত্রাণকর্তা। তবে শয়তান আসলে কে? শয়তান কাকে বলা হচ্ছে এখানে? আবার ফিরে যাই যদি আমরা ভারতীয় ’মিত্রা’র দিকে? বরুণ আর মিত্রার মিলিতরূপ হল অসুর। এখানেই আসছে শয়তান।’

হা হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে শাহেদ আর দিনার। প্রিয়াংকা একটু কষ্ট করে মেনে নেয় ওর কথাগুলো এতক্ষণে।

‘এবার মাই ডিয়ার ফেলোস, আরেকটা চমকের জন্য অপেক্ষা কর। পেগানদের কথা বলেছিলাম। তবে তারা কিন্তু শুধুই মিথরাসদের শাখা বা বিবর্তিত রূপ বলা চলে। অনেকে মনে করে পেগান উৎসবের তারিখ ২৫ শে ডিসেম্বর? আরে না মিথরাস দেবতার জন্মদিন ২৫ শে ডিসেম্বর। সূর্যদেবতা। মনে আছে? ২৫ শে ডিসেম্বরই পৃথিবী সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে। শীতের চরম রূপ। এরপর ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে এগিয়ে আসে পৃথিবী। শীত দূর হয় ল, গ্রীষ্ম আসে। সূর্যের কাছে এগিয়ে আসাটাই কি সূর্যের জন্মদিন নয়? সেখান থেকেই খ্রিস্টধর্ম প্রভাবিত। মিথরাস দেবতার জন্ম ভার্জিন মাতা থেকে। মিথরাস  রবিবারকে পবিত্র মনে করে। ওদের হতে হয় ব্যাপ্টাইজড। যেটা খ্রিস্ট ধর্মে ঢুকে গেছে ওতোপ্রোতভাবে। তারপর মিথরাস ফাদার আর ক্যাথলিক ফাদারদের মাঝে মিল তো আছেই। খেয়াল করে দেখ পেগানদের সাথে মিল খুঁজলে পাবে কিছু, তবে সবটা নয়। অথচ মিথরাসের সাথে খুঁজলে সব বের হয়ে আসছে ওদের সদৃশ।’

একটু কেশে নেয় এবার শাহেদ, ’তাহলে, মিথরাস হল খ্রিস্টধর্মের ভেতর পর্যন্ত প্রভাব রাখা একটা ধর্ম। তারওপর শয়তানের রাস্তা এর থেকে খুবই কাছে? ক্রিশ্চিনার ব্যাপারটা তাহলে কি?’

‘ক্রিশ্চিনা দুই নৌকাতে উঠছে। ওকে সূর্যের দিকে তাকিয়ে কি চোখে রোদ না পড়ে এমন করতে দেখেছিলে? নাকি স্যালুট করছিল?’

কাঁধ ঝাঁকায় প্রিয়াংকা, ’স্যালুট করছিল। আর্মিদের মত।’

‘মাই গড!’ বিড় বিড় করে নীরব।

ধরে ফেলে ওটা দিনার, ’কি হয়েছে? স্যালুট করাটা কি বিশেষ অর্থ?’

তার দিকে না তাকিয়েই বলে নীরব, ’অবশ্যই। ধারণা করা হয় রোমান মিথরাসের কাছ থেকেই আসে স্যালুট আর হ্যান্ডশেকের ধারণা। মুসলমানরা এজন্য হ্যান্ডশেকের ঘোর বিরোধী তারা করে মুসাফাহা। খ্রিস্টান প্রথাতে ওটা আছে আবার। মিথরাসরা সূর্যের দিকে তাকিয়ে স্যালুট দেয়। এটাই ওদের প্রথা। প্রথার বাইরে যায় নি ক্রিশ্চিনা। আমার ধারণা ক্রিশ্চিনার পরিবার মানে, ওর পূর্বসূরীদের কেউ ছিলেন মিথরাস। আজকের যুগে তারা ক্রিস্টান নাম নিয়ে চলছে কারণ তাঁদেরও কেউ জোরপূর্বক চাপে এনে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহন করিয়েছে।’

মাথা চুলকায় শাহেদ, ’এখানে শয়তানের সম্পর্কটা ঠিক বুঝলাম না।’

হাসে নীরব, হাসিতে তিক্ততা, ’বলেছিলাম না আরেকটা চমক আছে তোমাদের জন্য? পেগানদের বিশ্বাস ছিল আগুন,মাটি, পানি, বাতাস মানে ইলুমিনেটাস নিয়ে। আর আসলে ওটা ছিল মিথরাস ধর্ম মিথরাস বিশ্বাস। মিথরাসদের আরও দুটো শাখার নাম শুনবে? নাইট টেম্পলার এবং ফ্রি-মেসনারী।’

এবার তিনজনই প্রায় লাফিয়ে ওঠে।

চিৎকার দিয়ে ওঠে দিনার, ’ফ্রি মেসন? ফ্রিমেসনরা এসেছে মিথরাস থেকে? এরাই কি তারা না যারা শয়তানের পূজো করে দাজ্জালকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য? শয়তানের একনিষ্ঠ পূজারী তারা! ধারণা করা হয় আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের প্রত্যেকেই এর সদস্য ছিলেন। পৃথিবীটাকে যদি কেউ গ্রাস করে নেয় তবে এই ফ্রি মেসন। ক্রিশ্চিনাও ফ্রিমেসনের সদস্য?’

‘সম্ভবতঃ।’ মাথা দোলায় নীরব, ’আমেরিকার প্রতিটি প্রেসিডেন্ট ফ্রিমেসন  ছিলেন কিনা তা হয়ত বলা যাবে না। তবে বিশতম প্রেসিডেন্ট গারফিল্ড যে নিঃসন্দেহে এজকন ফ্রিমেসন ছিলেন তা সন্দেহের উর্ধ্বে। এটাই ফ্রি-মেসনের সাথে মিথরাসের সম্পর্কের অকাট্য দলীল। ১৮৭০ সালে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে একেবারেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডকুমেন্টে কি লেখা ছিল জানো?’

একবার দম নেয় নীরব, ’Garfield, James Abram,. Address at the Mitharas Lodge of Sorrow, Washington, November 10, 1881’

মিথরাস লজ অফ সরো!

ওদের পিঠের শীতল একটা অনভূতি হয়। শয়তানের পূজারির আধিক্য অবশ্যই অ্যান্টি-ম্যাজিকাল সোসাইটির বিরুদ্ধে যায়।

সেই সাথে যাচ্ছে পৃথিবীর বিরুদ্ধেও।

‘আরও আছে ব্রিটিশ জাদুকর অ্যালিস্টার ক্রউলি বিখ্যাত তিনি। ইনি মিথারাস কাল্টের প্রধান ছিলেন সম্ভবত ১৯২২ সালে। এত সাল তারিখ মনে থাকে না। ওদিকেই কিছু একটা হবে। তবে কথা হল ইনি ফ্রিমেসন হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিতেন। শয়তানের কট্টর উপাসক ছিলেন এই লোক।’

শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করে দিনার, ’ক্রিশ্চিনার হতে বাধা কোথায় তাহলে?’

প্রিয়াংকার চেহারাও ফ্যাকাসে হয়ে আছে, ভয় পেয়েছে মেয়েটা।

মৃদুস্বরে বলে ও, ’ক্রিশ্চিনার ছোটবোনটা কয়েকদিন ধরে নিখোঁজ, পুলিশ অনেক খুঁজেছে। দুঃখ পেয়েছিলাম তখন শুনে। পরে দেখলাম ক্রিশ্চিনার মধ্যে বিকার নেই। ক্লাসে ধুমিয়ে প্রেম করে যাচ্ছে জারাফের সাথে। এখন তো মনে হচ্ছে কাজটা ক্রিশ্চিনারই।’

ঝট করে ঘুরে তাকায় নীরব, ’কি বললে?’

‘ক্রিশ্চিনার ছোটবোন কয়েকদিন ধরে নিখোঁজ। কেউ জানিস না?’ অবাক হয় প্রিয়াংকা এবার।

‘ম্যাগাস! ড্যাম ইট!’

নীরবের শান্ত চেহারা থেকে এরকম একটা চিৎকার বের হতে পারে ওরা না দেখলে বিশ্বাসই করত না।

চোখ দুটো জ্বলছে নীরবের প্রচন্ড রাগে। দরজার দিকে রওনা দেয় ও।

খপ করে ওর হাত আটকে ফেলে দিনার, ’কি হয়েছে? যাচ্ছ কোথায়?’

হাতটা ছাড়িয়ে নেয় নীরব, ’ক্রিশ্চিনার বাসাতে।’

‘কেন?’ এবার পথরোধ করে প্রিয়াংকা।

‘ম্যাজিস্টার টেমপ্লি ধাপে ছিল ক্রিশ্চিনা শয়তান সাধনাতে। এটা এখন সুনিশ্চিত! এরপর  একটি শিশুর বলী দিতে হয় পরের ধাপে উঠতে। ম্যাগাস স্তর। সেখানে উঠেছে বদ মেয়েটা। নির্ঘাত বলী দিয়েছে নিজের ছোটবোনকেই! পিশাচিনী!’

ক্রোধে মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে যায় শাহেদের হাতও, ’এখন ওর বাসাতে গিয়ে কি লাভ?’

‘অর্ডার অফ দ্য সিলভার স্টার!’ ব্যস্ত স্বরে বলে নীরব, ’ম্যাজিস্টার টেমপ্লি হল অষ্টম স্তর। নবম হল ম্যাগাস। আরেকটা ধাপ পিছিয়ে দশম আর সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছতে ওর! ইপসিসিমাস স্তরে একবার পৌঁছে গেলে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে মেয়েটা। স্রেফ শয়তানের পূজারী থেকে শয়তানের বন্ধুতে রূপান্তরিত হবে ও! যেখানে সেখানে নিমেষে চলে যাওয়ার ক্ষমতা সে পাবে! আর ঠেকানো যাবে না ওকে!’

ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলে নীরব, ’তাছাড়া, এই কাজে সফলতার জন্য একজন কুমারী মেয়েকে বলী দিতে হবে ওর। আসছ তোমরা?’


চার

চারজনের ছোট্ট দলটা যখন গাড়িতে করে এসে থামে ক্রিশ্চিনাদের বাসার সামনে চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

দিনার যেহেতু আন্টির কাছে পরিচিত ওকেই ভেতরে পাঠায় ওরা।

একটু পরেই হতাশ হয়ে ফিরে আসে ও।

‘কি হল?’ জানতে চায় নীরব।

‘আন্টি বলল, আজ রাতে বাইরে থাকবে ক্রিশ্চিনা। আন্টির মন মেজাজ ভালো দেখলাম না। ছোট্ট মার্গারেটকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনও।’

ড্যাসবোর্ডে ঘুষি মারে শাহেদ, ’বদ মেয়েটা বলী দিয়েছে নিজের বোনকে! মার্গারেটের মত ফুটফুটে একটা মেয়েকে জবাই করতে ওর হাত কাঁপে নি?’

ওকে স্পর্শ করে শান্ত করে নীরব। একবার তাকায় দোতলা বাড়িটার দিকে।

‘দিনার, আমাকে তথ্য দাও। কোন ঘরটা ক্রিশ্চিনার?’

ভ্রু কুঁচকে তাকায় দিনার, ’তুমি নিশ্চয় ভাবছ না -’

অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় নীরব।

আর বাক্যবিনিময় না করে দোতলার একটা ঘর দেখিয়ে দেয় এবার দিনার।

কোনদিকে  না তাকিয়ে একটা পাইপ বেছে নেয় নীরব। তারপর বেয়ে বেয়ে উঠতে থাকে।

দশ মিনিটের মাঝেই অবশ্য যে পথে গেছিল সেপথেই নেমে আসে নীরব।

‘পেয়েছি। একটা ঠিকানা। পরিত্যক্ত এই বাসাটার ছবি আর ডিটেইলস কেন রাখবে ক্রিশ্চিনা তার ল্যাপটপে?’

একটা ঠিকানা দেখায় নীরব তার স্মার্টফোনে। ঝুঁকে আসে সবাই।

‘চলো, যাওয়া যাক।’ গাড়ি স্টার্ট দেয় শাহেদ।

‘খালি হাতে? সম্ভবতঃ ওখানে আজ কুমারী বলী দিতেই গেছে ক্রিশ্চিনা।’ বিড় বিড় করে বলে নীরব।

‘তাহলে?’ শুকিয়ে যাওয়া গলা নিয়ে তাকায় প্রিয়াংকা।

‘একটা কাজ কর তোমরা পুরো শহরকে জাগিয়ে নিয়ে আসো ওখানে। সবাই যাতে হাত মশাল আর পবিত্র পানি রাখে। ঠিক আছে? একটি প্রাণ হয়ত বাঁচবে। শুধু দিনার আসো আমার সাথে। আমরা আগে গিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করব ওদের।’

মেনে নেয় ওরা। গাড়ি হাঁকিয়ে ছুটে চলে দিনার আর নীরব।

উদ্দেশ্য শয়তানের আখড়াতে ঢোকা।

*

বিশাল বাড়িটার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে চারপাশটা একবার দেখে দিনার। ছেলেটা ভয় পাচ্ছে।

ওর কাঁধে দুইবার চাপড়ে দেয় নীরব।

‘কি?’ প্রশ্ন করে দিনার।

‘দিনার, ছেলে হিসেবে খুব একটা মন্দ নও তুমি। তোমাকে আমি ভেতরে ঢুকতে দিতে পারি না। প্রাণ হারাবে নিঃসন্দেহে।’

নীরবের চকচকে চোখের দিকে তাকিয়ে দিনারের বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যায়। অশুভ একটা দৃষ্টি ফুটে আছে নীরবের চোখে। যেন বহুদিনের ক্ষুধার্ত।

সেই সাথে হাতে বের হয়ে এসেছে একটা পিস্তল। নীরব পিস্তল সাথে রাখে কবে থেকে?

‘আমি কি করব তাহলে?’ শুকিয়ে যাওয়া গলা দিয়ে কোনমতে বলে দিনার।

‘এখানে অপেক্ষা কর। এলাকাবাসী আসলে একসাথে ঢুকবে। আমি ঢুকছি এখনই। তবে আমাকে ফলো করার চেষ্টা করবে না।’

মাথা ঝাঁকায় দিনার। নীরবের যে চেহারা সে দেখছে তাতে আর ফলো করার ইচ্ছে থাকার কথাও না।

দিনারের বড় বড় হয়ে যাওয়া চোখের সামনে দিয়ে অন্ধকারে ঢুকে যায় নীরব।

ঠক ঠক করে কাঁপে দিনার এতক্ষণে। কেন জানি তার মনে হয় হঠাৎ করেই তাপমাত্রা কমে গেছে এলাকার।

এর একটা কারণ হতে পারে পুরোনো এই বিল্ডিংটা থেকে ভেসে আসছে একটা গমগমে শব্দ। ভেতরে কেউ মন্ত্র পড়ছে।

নির্ঘাত বলী দেওয়া হবে এখানে আজকে। কেউ মারা যাচ্ছে আজ রাতে যদি না নীরব সেটা ঠেকায়। অথবা এলাকাবাসীকে নিয়ে প্রিয়াংকা ঢুকে পড়তে পারে সময়মত।

পরমুহূর্তেই একটা প্রশ্ন ধাক্কা দেয় দিনারকে, নীরব এত দ্রুত কিভাবে ক্রিশ্চিনার ল্যাপটপ হ্যাক করে ঠিকানা পেয়ে গেল?

তাও হাজার হাজার মেগাবাইটের ভেতরে ঠিক ওই তথ্যটাই? এই বাসার ঠিকানা?

নীরবের মাথায় এখন প্রশ্ন আসার সম্ভাবনাই নেই। খুব সাবধানে একটা একটা পা ফেলছে ও। হাতে তুলে রেখেছে উদ্যত পিস্তলটা।

ছাদের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ও। সিঁড়িঘর থেকে হাল্কা উঁকি দিয়ে দেখে ছাদটা।

চকচকে পরিষ্কার একটা ছাদ। ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল বৃত্ত এঁকে রাখা হয়েছে। বৃত্তটার আশেপাশে রক্তের ছাপ।

যদিও এখানে মৃত বা আহত কেউ নেই। ধরে নেয় নীরব, এসব মার্গারিটের রক্ত। ক্রিশ্চিনার ছোটবোনের।

এই মুহূর্তে ছাদের মাঝে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়ছে একজন মানুষ।

আর বৃত্তে বেঁধে রাখা হয়েছে একটি মেয়েকে। অসামান্য সৌন্দর্য্য এখন হয়ে গেছে ম্লান।

ছাদের মাঝে উঠে আসে নীরব। ঘুরে তাকাচ্ছে মন্ত্র পড়তে থাকা মানুষটা টের পেয়ে গেছে পেছনে কারও উপস্থিতি!

একটি মাত্র গুলির সাহায্যে তার মাথাটা বিস্ফোরিত করে দেয় নীরব।

বিড় বিড় করে বলে, ’টোমা মি রিগ্যালো!’

গুলির শব্দটা দূর থেকে দূরে প্রতিধ্বনীত হয়। সেই সাথে দূরে কোথাও হৈ হৈ শব্দ শোনা যায়। ছুটে আসছে এলাকাবাসী।

গুলির শব্দ তাদের কানে গেছে!

চক্রের মাঝে হাত পা বাঁধা মেয়েটা কাঁদছে। চাঁদের আলোতে ফিরে তাকায় নীরব ওর দিকে।

‘ডিয়ার ক্রিশ্চিনা! তুমি ভার্জিন!’ কৃত্রিম বিস্ময়টা ফুটিয়ে তোলে নীরব।

তারপর ফেটে পরে হাসিতে। যেন এর চেয়ে বড় রসিকতা আর কিছুই হতে পারে না!

পড়ে থাকা জারাফের শরীরটাকে জোরে লাথি দেয় নীরব।

চিত হয়ে যায় মানুষটা।

‘তোমাকে কেন বের করছি না আমি এখান থেকে? সেটাই ভাবছ তো? না না নিজের বোনকে জবাই করে ম্যাগাস স্তরে ওঠার জন্য তোমাকে আমি দোষ দেই না। এই কাজ আমাকেও করতে হয়েছে একদিন।’

হা হয়ে তাকিয়ে থাকে ক্রিশ্চিনা। হাসে নীরব সুন্দর করে।

‘আমি একজন ফ্রিমেসন, ক্রিশ্চিনা। এবং মিথরাস। ঠিক তোমারই মত। তোমার সাথে আমার জমত ভালো! তবে কুমারী পাওয়া তো আর চারটি খানি কথা না। এলাকায় তোমাকে শয়তানের পূজারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিতও করেছি। আমাকে আগেও কেউ খোঁজেনি। এখনও খুঁজবে না।’

আস্তে করে জারাফের লাশের হাতে ধরে রাখা ছুরিটা তুলে নেয় নীরব। ক্রিশ্চিনার চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসে।

মন্ত্র পড়ছে নীরব। এলাকাবাসীর হুংকার আরও কাছে এখন।

দরজা থেকে যখন আর মাত্র বিশ গজ দূরে জনতার কোলাহল মন্ত্র আবৃত্তি শেষ হয় নীরবের।

ছুরিটা তুলে ধরে ও।

কোমল গলাতে বলে, ’একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। আমিও ম্যাগাস স্তরে। তবে আর কয়েক মুহূর্তের জন্য! দশম স্তর ইপসিসিমাস না আমি চলে যাব একাদশ স্তরে আজ রাতে যেটার কথা কেউ জানেই না। তোমার গাধা বয়ফ্রেন্ড জারাফকে ধন্যবাদ। নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে ও। জোড়া বলী দিতে পেরেছি আমিও। ধন্যবাদ, ক্রিশ্চিনা।’

তীব্রবেগে নামিয়ে আনে নীরব ছুরিটা।

একবার মুচড়ে উঠে স্থির হয়ে যায় ক্রিশ্চিনা। সুন্দর চোখ দুটোতে বেদনার চেয়ে বেশি কাজ করছে বিস্ময়!


পরিশিষ্ট

কাঁপা গলাতে শুধু বলতে পারে দিনার, ’ভেতরে। ও ভেতরে।’

প্রিয়াংকা এক হাত খামচে ধরে ওর। তারপর এলাকার সবার সাথে ঢুকে পড়ে ওরাও বাসাটাতে। সবার হাতে জ্বলছে মশাল। আগুণের সামনে দুর্বল হবে প্রতিপক্ষ!

দিনার নিজেকে দোষারোপ করে যাচ্ছে।

মনে মনে।

একটা উল্কি দেখে কিভাবে ও বিশ্বাস করতে পারল নীরবের মত একটা উচ্চপর্যায়ের সাধককে?

সবার সাথে টলতে টলতে ছাদে যাচ্ছে ও ঠিকই জানে ওখানে কি পাওয়া যাবে।

কানে বাজছে নীরবের কথা, ’অর্ডার অফ দ্য সিলভার স্টার! ম্যাজিস্টার টেমপ্লি হল অষ্টম স্তর। নবম হল ম্যাগাস। আরেকটা ধাপ পিছিয়ে দশম আর সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছতে ওর! ইপসিসিমাস স্তরে একবার পৌঁছে গেলে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে মেয়েটা। স্রেফ শয়তানের পূজারী থেকে শয়তানের বন্ধুতে রূপান্তরিত হবে ও! যেখানে সেখানে নিমেষে চলে যাওয়ার ক্ষমতা সে পাবে! আর ঠেকানো যাবে না ওকে!’

ছাদে উঠে সবাই চুপ হয়ে যায়।

পড়ে আছে দুটো মৃতদেহ।

কোথাও চিহ্নও নেই নীরবের।

রচনাকাল – জুলাই ০৩, ২০১৪ 

আলকেমি

এক

‘লিওনার্ডো দ্য ভিঞ্চি আর আইজ্যাক নিউটনও চর্চা করেছেন আলকেমির।’ স্পষ্ট স্বরে বলে উজ্জ্বল।

চিন্তিত মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে স্নিগ্ধ।

‘তাঁরাও বিশ্বাস করতেন এসব গাঁজাখুরীতে?’ না বলে পারে না ও।

একমত হয় না উজ্জ্বল, ’গাঁজাখুরী বলা তো ঠিক না। এই আলকেমি না থাকলে আজকের দিনে রসায়ন শাস্ত্র বলেই কিছু থাকত না। ’

এটা অবশ্য মানতেই হয় স্নিগ্ধকে, ’তা ঠিক। জাবির বিন হাইয়্যানকে আগে রাখতেই হবে। তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ আলকেমিস্ট তবুও রসায়নশাস্ত্রের জন্ম দিয়েছেন ওসব থেকেই। ফিনিক্স পাখির ছাই যেন। ’

সরু চোখে তাকায় উজ্জ্বল এবার বন্ধুর দিকে, ’তবুও কিভাবে আলকেমিদের ব্যাপারে অবিশ্বাস তোর? এটা তো প্রতিষ্ঠিত সত্য। ’

বড় করে নিঃশ্বাস নেয় এবার স্নিগ্ধ।

‘দ্যাখ আলকেমিস্টদের ব্যাপারে কম বেশি আমিও জানি। ঠিক আছে? জ্ঞান দেওয়ার দরকার নেই। আলকেমির শুরুটা জানিস তো? সক্রেটিসের যুগ বলা চলে ওটাকে। জ্ঞান বিজ্ঞান ছিল মাত্রাতিরিক্ত পিছিয়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কারা ছিল তখন জানিস? দার্শনিকরা। তাহলে বোঝ প্রাকৃতিক দর্শন যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তখন প্রকৃত বিজ্ঞানের শাখাগুলো যেমন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এদের অবস্থানটা কোন পর্যায়ে ছিল?’

উঠে দাঁড়ায় উজ্জ্বল, জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকায়, ’তোর কথা ঠিক আছে। এই যুগে দাঁড়িয়ে সেটাকে নিতান্তই গাধামী বলে মনে হবে। এটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের ওই পাগলামীগুলো না থাকলে আজকের বিজ্ঞান তো পেতি না। এটাও সত্য। জ্ঞানেরও বিবর্তন ঘটে। ’

ক্ষেপে ওঠে স্নিগ্ধ, ’তুই নিজেই খেয়াল করে দেখ আলকেমিতে বিশ্বাস করার কিছু নেই। রসায়নে আছে। আলকেমির বিবর্তিত রূপ এটা অলরাইট। মানলাম। এটাতে আমি বিশ্বাস করি। আলকেমিতে না। শব্দটার উৎপত্তি আর সংজ্ঞাতেই তো আছে ভুল। এসেছে আরবী’আলকিমিয়া’ থেকে অর্থ হল কালোমাটি। ব্ল্যাক ম্যাজিকের গন্ধ নামেই। তারপরে আছে সংজ্ঞা! ’

পকেটে হাত রেখেই ঘুরে দাঁড়ায় উজ্জ্বল, ’ভালোই ঘেঁটেছিস দেখা যায় আলকেমি নিয়ে। সংজ্ঞাটা আমারও জানা আছে। আলকেমি হল সেই শাস্ত্র যার শেখার উদ্দেশ্য হল পরিপূর্ণতা লাভ করা। আধ্যাত্মিক ভৌতিক। এই শাস্ত্র ধাতু থেকে সোনা প্রস্তুত করতে শেখায়, মানুষের অমরত্ব লাভের কৌশল আছে এই শাস্ত্রেই। কেন? এতে অবিশ্বাসের কি আছে? লোহা থেকে সোনা নির্মানের কাহিনী তোর কাছে আজগুবী লাগছে? অথবা, অমরত্ব?’

‘অফকোর্স!’ হাতে কিল দিয়ে বলে স্নিগ্ধ।

হেসে ফেলে উজ্জ্বল, ’ধর্মপ্রাণ হিসেবে তোর খাতি আছে। তোকে এক ওয়াক্ত নামাজও কেউ মিস দিতে দেখেনি মসজিদে। রোজাও মিস করিস না কোনদিন। প্রেম করিস যদিও তাছাড়া তোর মত ধর্মের পথে আমরা কেউই থাকতে পারি না এতটা। আর সেই তুই কি না অবিশ্বাস করবি অমরত্বকে?’

‘বিশ্বাস করার কারণ কি আছে?’ কটমট করে তাকায় স্নিগ্ধ।

‘অবশ্যই। আলকেমিদের নিয়ে ঘাঁটতে গেছিলি ইসলাম ধর্ম যে একে সম্পূর্ণ সাপোর্ট দেয় তা তো জানিস। ’

‘জানি, ’ মাথা ঝাঁকায় স্নিগ্ধ, ’আলকেমির জন্য শুধু জ্ঞানই যথেষ্ট না। এমনকী পরীক্ষাতে আলকেমি বিশ্বাসী না। তারা যাদুবিদ্যা আর অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসী। এখানেই কেমিস্ট্রি আর আলকেমির মাঝে পার্থক্য। জাবির ইবনে হাইয়ান ছিলেন খাঁটি মুসলমান। তিনি নিজেই ছিলেন আলকেমিস্ট। শিখেছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বংশধর জাফর সাদিকের কাছ থেকে। এবং পজিটিভ-নেগেটিভ শক্তির কোন একটা ব্যবহার করা ছাড়া আলকেমির কাজ হবে না এটা তাঁরও বিশ্বাস ছিল। নেগেটিভ শক্তি যে নিচ্ছে যে চালাচ্ছে ব্ল্যাক ম্যাজিক। আর পজেটিভ শক্তি নিয়ে আল্লাহর অনুগ্রহে রসায়নের গবেষণা হল আলকেমি। ’

‘এক্স্যক্টলি।’ সাপোর্ট দেয় উজ্জ্বল, ’আর আলকেমির উদ্দেশ্যই হল ফিলোসফার স্টোন আর এলিক্সির অফ লাইফ প্রস্তুত করা। হ্যারি পটার লেখার সময় লেখিকা জে. কে. রোলিং কিন্তু এগুলোই বেছে নিয়েছিলেন বিষয় হিসেবে। নিকোলাস ফ্লামেলকে তিনি উপন্যাসে একটা চরিত্র দিয়েছিলেন। তবে মানুষটা কিন্তু আসলেই ছিলেন। ’

‘ছিলেন নাকি?’ এই তথ্যটা ধাক্কা দেয় স্নিগ্ধকে।

‘অবশ্যই। প্যারিসে ছিলেন তিনি। বইয়ের দোকান ছিল তাঁর। শুরুটা ওভাবেই। পরে এই স্কলার আলকেমি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। সোনা তৈরী করার জন্য তাঁর প্রচেষ্টার সীমা ছিল না। সোনা প্রস্তুত করাটা কিন্তু সব না। আসল চ্যালেঞ্জ হল একটা মৌল থেকে অন্য মৌলে পরিবর্তন করাটা। অতটুকু করতে পারলে সাধনা দিলেই হয়ে যাবে সোনার প্রস্তুতি। ’

‘তাহলে, সোনা তিনি বানিয়েছিলেন?’ ভ্রু কুঁচকে আছে স্নিগ্ধ। আলকেমিদের নিয়ে বেশ পড়াশোনা করলেও এই দিকটা সে জানত না।

মাথা ঝাঁকায় উজ্জ্বল, ’প্রথমে সাফল্য পেয়েছিলেন ইতিহাস যদি ঠিক থাকে ১৩৭৯ সালে প্রথমবারের মত দুইশ ত্রিশ গ্রাম পারদকে রূপাতে রূপান্তর করেছিলেন নিকোলাস ফ্লামেল। তিন বছর পর ওই পরিমাণ পারদকে তিনি সোনাতে পরিণত করতে সম্পূর্ণ সক্ষম হন। আর প্রসেসটা ছিল যতদূর বোঝা যায় বার বার পারদের হীটিং আর কুলিং দিয়ে। তবে যাই হোক পৃথিবীতে প্রথম মানুষ সম্ভবতঃ তিনিই যিনি আলকেমিতে সাফল্য পেয়েছিলেন। কাজেই অবিশ্বাসের কিছু নেই। ’

থতমত খেয়ে গেছে এবার স্নিগ্ধ। দেখে মায়া হল উজ্জ্বলের।

এবার ছেলেটাকে আরেকটু ডোজ দিতে হবে। আলকেমিতে অবিশ্বাসীদের একেবারেই সহ্য হয় না তার।

‘ইসলাম কি বলে? আলকেমি আছে নাকি নেই?’, আবারও নিজের টপিকে ফিরে আসে উজ্জ্বল।

‘আলকেমি ইসলামের সমর্থন না পেলে জাবির ইবনে হাইয়ান ওই পথে যেতেন না। তবে আরও কিছু প্রমাণ দরকার আমার।’ ঘুরিয়ে জবাব দেয় স্নিগ্ধ, ’রসায়নবিদ্যা তো ঠিক আছে। আমি সেটা বিশ্বাস করি আলকেমিতে বিশ্বাস রেখে অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন জাবির। যেমন হাইড্রোক্লোরিক এসিড। আরও কত যৌগ যে তিনি উৎপন্ন করেছেন যেগুলো ছাড়া আজকের রসায়নের মুখ দেখতে হত না আর। তবে কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি আমরা লোহাকে সোনা বানাতে পারব কি না? অথবা অমরত্ব? এগুলো কি বিশ্বাস করার মত?’

‘কেন নয়?’, এবার হেসে ফেলে উজ্জ্বল, ’খিজির (আঃ) এর কথা তুমি ভুলে যাচ্ছ? উনি কিন্তু মুসা(আঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেছেন। আবার পড়েছেন হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর জানাজা। তিনি কিন্তু মারা যাননি। এখনও পৃথিবীর কোথাও আছেন। কিভাবে সম্ভব?’

চমকে ওঠে স্নিগ্ধ, ’ওহ তাই তো। উনি’আবে হায়াত’ ঝর্ণার পানি খেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন অমরত্ব। ’

‘কাজেই মাই ডিয়ার স্নিগ্ধ, অমরত্বের অবিশ্বাসের কোন মানে আমি দেখি না। অন্তত তোমার মত ছেলের জন্য। আর অবিশ্বাসের কারণ দেখি না আলকেমিস্টদের নিয়েও। জাবির ইবনে হাইয়ান তো আছেনই। আরও আছে বয়েল আর নিউটন। কেমিস্ট্রি পড়তে গিয়ে বয়েলের সূত্র পড়েনি কে? দুইজনই ছিলেন আলকেমিস্ট। নিউটন তাঁর জীবনের একুশ থেকে সাতাশের মাঝেই যা বিজ্ঞান নিয়ে নাড়াচাড়া করে গেছেন। আজও আমরা তাই পড়ি। তারপর বাকি জীবন তিনি লাগিয়েছিলেন আলকেমি নিয়ে। বয়েলের সাথে তিনি শেয়ারও করতেন এসব ব্যাপার। তারপর আছেন জাবির ইবনে হাইয়ান ইনি তো সঞ্জীবনী সুধা বা এলিক্সির অফ লাইফের ব্যাপারে নামকরণই করেছেন। আল-ইকসির। যেটা খেলে অমরত্ব পাবে মানুষ। যেটাকে এখন পশ্চিমারা বলে এলিক্সির। ’

অবশেষে পরাজয় মেনে নেয় স্নিগ্ধ, ’আমি এসব জানি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই আলকেমির সত্যতা এখানে একটা প্রশ্ন চলেই আসে। জাবির ইবনে হাইয়ান বা নিউটনের মত বড় ধরণের মগজ আমাদের নেই। জ্ঞান তো ধরিনা তেমন। তাঁদের তৈরী করা পান্ডুলিপিও আমাদের হাতে নেই। এখানে আমাদের সোনা বানানোর প্রসংগ উঠালেই বা কি? সফলতা তো পাবো না। ’

এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই এত নাটক করেছে উজ্জ্বল। চমৎকার একটা হাসি ফোটে ওর মুখে, পকেট থেকে বের করেছে একফালি কাগজ।

‘পান্ডুলিপি নেই তবে ফিলোসফার স্টোন তৈরীর জন্য একটা ফর্মুলা পেয়েছি। এর ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে যাবে আমাদের কাজ। ’

 

দুই

‘ধ্যাত!’ হাতের ট্রেটা ছুঁড়ে মারে স্নিগ্ধ ঘরের এক কোণে।

ঘর না বলে এটাকে একটা ল্যাবরেটরি বলা যায়। পার্সোনাল ল্যাব। গত কয়েকদিন ধরে দুই বন্ধুর দিন রাত এখানেই অতিবাহিত হচ্ছে। কয়েকদিন বলাটা বোধহয় ভুল হবে। গত ছয় মাস ধরে দিনে অন্তত বারো ঘন্টা দিচ্ছে ওরা এখানে। ভার্সিটির হলে থাকার এই এক সুবিধে। বাসাতে গুতোগুতি করবে এমন কেউ আশেপাশে নেই।

মুক্ত একটা জীবন। একেবারে যথার্থ ব্যবহার করছে ওরা। একটা আলাদা বাসাতে ওরা কাজ করে ল্যাব হিসেবে। যন্ত্রপাতি সেই কবেই কিনেছে। স্পন্সরশীপ করে উজ্জ্বল। টাকার অভাব নেই ওর। শেয়ারমার্কেটে ভালো কিছু কোম্পানির শেয়ার কেনা আছে তার নামে। আর বাসাটাও নির্ঝঞ্ঝাট। স্নিগ্ধর গার্লফ্রেন্ড মহুয়ার মামার বাসা। মামা-মামী একেবারে আমেরিকা চলে গেছেন চিরতরে।

একই শহরে ভার্সিটি মহুয়ার ওদের সাথেই একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে মেয়েটা। কাজেই মামাটি তাকে দিয়ে গেছেন বাসা সামলানোর ভার। এই বিশাল বাসায় মেয়ে হয়ে একা তো আর থাকতে পারে না মহুয়া। তাই ও হলে উঠে আছে। আর চাবি দিয়েছে আপাতত উজ্জ্বল আর স্নিগ্ধকে।

বিজ্ঞানের একটা বিরল ধারাতে কাজ করছে ছেলে দুটো এতটুকুই জানে মেয়েটি। সব জানিয়ে নিজেদের পাগল প্রমাণের চেষ্টা করতে চায় নি ওরা কেউ। এই মুহূর্তে ট্রে রাগের চোটে ছুঁড়ে মারার কারণ আছে। প্রায় একমাস ধরে ওরা আটকে আছে এখানে। গবেষণার অগ্রগতিই নেই। প্রথম পাঁচমাসে তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছিল।

ধাপে ধাপে।

উজ্জ্বলের জোগাড় করা প্রসেসটার ব্যাপারে আগে থেকেই জানত স্নিগ্ধ। শুধু ও-ই নয় আলকেমি নিয়ে ঘাঁটে এমন প্রতিটা মানুষই জানে সে ব্যপারে। কিন্তু উজ্জ্বলের কাছে আরও কিছু ছিলো। এই প্রসেসকে বলা হয় ম্যাগনাম ওপাস। জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ নয়, আলকেমিস্ট যে পদ্ধতি অনুসরণ করেন তাকে ম্যাগনাম ওপাস বলা হয় টেকনিকাল টার্ম ধরে। এতটা ডিটেইলস পাবে সেটা আগে ভাবেনি স্নিগ্ধ , আর দেরী না করে গার্লফ্রেন্ডকে পটিয়ে বাসাটা ধার চেয়েছে।

ওদের দরকার নীরবতা। উটকো লোকের যন্ত্রণাতে কাজ করতে না পারলে কারোই লাভ হত না।  মহুয়ার মামা-মামীকে একেবারে সময়মত আমেরিকা ভেগে যাওয়ার জন্য ভাগ্যকে তখন ধন্যবাদ দিয়েছিল স্নিগ্ধ। এখন অবশ্য ভাগ্যের প্রতি ততটা সন্তুষ্ট না ও।

‘মাথা ঠান্ডা রাখ। মাথা গরম করলে ভাবতে পারবি না তো।’ পাশ থেকে বিড় বিড় করে বলে উজ্জ্বল।

‘মাথা ঠান্ডা! একটা মাস ধরে আটকে আছি এখানে। এই বালের ধাপে। তারপরও কি মনে হয়? ঠান্ডা থাকার কথা মাথা?’

স্বান্তনা দেয় উজ্জ্বল, ’নিকোলাস ফ্লামেল একুশ বছর ধরে শুধু কয়েকটা পৃষ্ঠার মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন। আমাদের মাত্র একমাস একটা ধাপে আটকে থাকাটা হতাশার কিছুই না। ’

চোখ গরম করে তাকায় স্নিগ্ধ, ’১৩৫০ সালের প্যাচাল আমার সামনে পাইড়ো না। তখন ইন্টারনেট ছিল না। রসায়নের কোন অগ্রগতি ছিল না। এখন আমাদের হাতে সব আছে। আমরা প্রাচীন আলকেমিস্ট না, উজ্জ্বল। আমরা এই শতকের আলকেমিস্ট। আমরা সব দিক থেকে সাহায্য নেব। নিচ্ছিও। রসায়ন আমাদের সাহায্য করছে দুই হাত ভরে। নাহলে কি তোর মনে হয় পাঁচ মাসে আটটা ধাপ পা হতে পারতাম আমরা?’

কিছু বলে না উজ্জ্বল। স্নিগ্ধের কথাতে যুক্তি আছে।

‘শোন, তোর আসলে নরটনের পদ্ধতি অনুসরণ করাই উচিত হয়নি। ধাপ এখানে ১৪টা। এর চেয়ে রিপলির পদ্ধতি ভালো ছিল। মাত্র বারো ধাপ। ’

বিরক্ত হয় উজ্জ্বল, ’আরে, ওর ধাপ কম দেখে তো ঝামেলা বেশি। জটিলতা বেশি। এরচেয়ে নরটনেরটাই ভালো। দেখ তুই এখানে আমাদের আটটা ধাপ পার হতে সমস্যা হয়নি। আটকেছি আমরা পিউট্রেফ্যাকশন স্টেজে। রাইট?’

‘তো? বালের ধাপ আমার। এখানে কি পচাচ্ছি আমরা? সালফারের সাথে? আমার মাথাতে আসছে না কিছু। এর পর বডিলি সালফারের সলিউশন পাওয়ার কথা। তারপর হোয়াইট লাইটের। আমরা পাচ্ছি কিছু?’

‘এটা নরটনের প্রসেস বলেই তবুও নবম ধাপে আমরা এসেছি, স্নিগ্ধ। রিপলির প্রসেস দেখতে পারিস ওখানে পিউট্রেফ্যাকশন পঞ্চম ধাপ। ক্যালসিনেশন, ডিসলিউশন, সেপারেশন আর কনজাংকশনের পরেই এই পিউট্রেফ্যাকশন। তারপরে আছে আরও ঝামেলা। আমাদের করতে হত কনজেলেশন। মানে, ঘনভবন আর কি। আমাদের সাবস্ট্যান্সটাকে গাঢ় করতে হবে, ভিসকোসিটি বাড়াতে হবে তাও এই পরিমাণে যাতে ক্রিস্টালাইজ বা সলিডিফিকেশন করা যায়। এখানে আমাদের পরশপাথর বা ফিলোসফার স্টোনের কঠিন অবস্থা পাওয়া যাবে। আরও আছে এটা হল তোর রিপলির প্রসেস। এর চেয়ে ধাপ বেশি হলেও কম ঝামেলার না এই নরটনের প্রসেসটা?’

স্বীকার করতে যাচ্ছে স্নিগ্ধ এই সময় পকেটে ফোন বেজে ওঠে ওর। বিরক্ত মুখে বের করে ওটা স্নিগ্ধ।

মহুয়ার ফোন পেলে ওকে এতটা বিরক্ত হতে আগে কোনদিনই দেখেনি উজ্জ্বল।

‘হ্যাঁ, মহুয়া, বল।’ গরম কন্ঠে বলে স্নিগ্ধ।

ওপাশ থেকে মহুয়ার গলাও শোনা যায়, ’তোমার না বিকেলে আসার কথা ছিল চিলিজ-এ? আমি বসে আছি কতক্ষণ ধরে!’

প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে স্নিগ্ধ, ’ক্যানসেল ইট! আমার এখন বের হওয়ার মুড নাই। ’

‘স্নিগ্ধ! প্রমিজ করেছিলে তুমি! আমরা দুইমাস কোথাও বের হই না!’ আর্দ্র হয়ে আসে মহুয়ার গলা।

‘দরকার হলে আরও দুইমাস বের হব না। আমি চিন্তাতে আছি, মহুয়া। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। তোমার মত শুধু মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স করি না আমি। সাথে এদিকে আমাদের গবেষণা নিয়ে বাড়তি সময় দিতে হয়। তোমার মত অবসর পাই না আমি দিনে। দুই দিক সামলাতে গিয়ে ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাই না। পরে কোনদিন বের হব, আজ না। ’

মহুয়াকে আর একটা কথা বলারও সুযোগ দেয় না স্নিগ্ধ। ছুঁড়ে ফেলে মোবাইলটা একদিকে।

ট্রে-টার পথেই গেল জিনিসটা। বাড়ি লেগে ভেতরের কলকব্জা সব বের হয়ে যায় ফোনটা থেকে।

এতে দুঃখ পায় না স্নিগ্ধ মোটেও। যদিও আটষট্টি হাজার টাকা ছিল ওটার দাম অনেক সখ করে দেড় বছর ধরে টাকা জমিয়ে কিনেছিল।

‘মোবাইলটা ভেঙ্গে ফেললি? তুই যেতে পারতি মহুয়ার সাথে দেখা করতে। আমি তো এখানে আছি। ল্যাব নিয়ে আমি ভাবতাম। ’

‘শাট আপ!’ হুংকার দেয় স্নিগ্ধ, ’এই স্টোন বানানোর আগে একচুল ডিস্ট্র্যাকশন যেন না আসে। মোবাইল ভেঙ্গে ঠিক কাজ করেছি। চাইলেও কেউ পাবে না আমাকে। অযথা সময় নষ্ট। মেয়েদের প্যানপ্যানানি শোনার চেয়ে অনেক জরুরী কাজ পড়ে আছে এই পৃথিবীতে। ’

একটু হাসে উজ্জ্বল, ’নিউটন কেন বিয়ে করেন নি বোঝাই যায় এখন তোকে দেখে। ’

‘শুধু আমার কথা বলিস না। নিজেকে জিজ্ঞাসা কর তোর কি এখন প্রেম, মেয়ে এসব নিয়ে ভাবার মুড আছে?’

গম্ভীর হয়ে যায় উজ্জ্বল, ’না, নাই। ক্লোরিনের সাপ্লাই আছে আমাদের? বের কর তো?’

‘সালফিউরিক এসিড দে ওই তিন নম্বর বিকারে।’ এগিয়ে দেয় স্নিগ্ধ।

‘কতটুকু?’

‘আড়াইশ মিলি। সামান্য বেশিও যেন না পড়ে। সাবধান। এবার আমার দিকে পার করে দে বিকারটা। ’

‘দাড়া যায়মান ক্লোরিন বানিয়ে রেখেছিলাম। ওটা কই? এদিকে পাঠা। ’

‘রেডিমেড কেনা লাগবে। বানিয়ে নিলে ঘনত্ব ঠিক থাকে না। ’

দূরের মসজিদে আজান দিচ্ছে। মাগরিবের আজান।

আড়চোখে একবার স্নিগ্ধকে দেখে উজ্জ্বল। ছেলেটা এক ওয়াক্ত নামাজও মিস দিত না একসময়।

এখন সে আলকেমি ছাড়া কিছু বোঝে না।

কিচ্ছু না।

 

তিন

সিগারেট ধরিয়ে আকাশের দিকে তাকায় স্নিগ্ধ। বসে আছে লেডিস হোস্টেলের সামনের পুকুরের পাড়ে। এই জায়গাটা নির্জন থাকে। ভাবতে সুবিধে।

পেছনে আরেকটা লাইটার জ্বালানোর শব্দ শোনা যায়, তাকিয়ে উজ্জ্বলকে দেখতে পায় ও।

‘কি রে? এখানে এসে কি করিস? আর দশ মিনিট পর আমাদের মেশিন শপ।’ উজ্জ্বলের প্রশ্নটা হাসি ফোটায় স্নিগ্ধের মুখে।

‘দশ মিনিট পর তোরও মেশিন ওয়র্কশপ। এখানে কি করছিস? একই পথের তো পথিক আমরা। ’

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজ্জ্বল, ’চলে যেতে ইচ্ছে করছে আমাদের আলকেমি ল্যাবে রে। এখানে কি আর মন টেকে? মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে কেমিস্ট্রি অনেক আগ্রহের একটা সাবজেক্ট। ’

‘একেবারে মনের কথা বলেছিস। আরেকবার যদি অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে পারতাম, ভার্সিটিগুলোতে কেমিস্ট্রির জন্য টার্গেট করতাম। বালের ইঞ্জিনিয়ারিং!’

‘ওই শব্দটা সব জায়গায় ব্যবহার করা বন্ধ কর।’ স্নিগ্ধের প্রতি বিরক্ত হয় উজ্জ্বল, ’তোর মেজাজ দিনকে দিন গরম হচ্ছে। হতেই আছে। সমস্যা কি তোর? ঠান্ডা মাথাতে ভাবতে না পারলে আমাদের সফল হওয়া লাগবে না। এটা তোর কল অফ ডিউটি না। মাথা গরমের কাজও এটা না। ’

উজ্জ্বলের ধমকে কিছুটা ঠান্ডা হয় স্নিগ্ধ।

‘পিউট্রেফ্যাকশন তো বা’ বলতে যেয়ে থেমে যায় স্নিগ্ধ, ’পিউট্রেফ্যাকশন তো আমার চুল! এখানেই আটকে আছি আজও। আমার মনে হয় না এই জীবনে এখান থেকে বের হতে পারব আর। দেড় মাস হয়ে গেল। কতভাবে ট্রাই করেছি আমরা তুই নিজেই বল?’

মাথা চুলকায় উজ্জ্বল, ’আমার মনে হয় আমাদের থামতে হবে। ’

উত্তেজনাতে লাফিয়ে ওঠে এবার স্নিগ্ধ, ’প্রশ্নই আসে না! সাতটা মাস! প্রায় সাত মাস ধরে কাজ করছি আমরা। দিন রাত এক করে দিয়ে। শেষ কবে শান্তিতে ঘুমিয়েছি জানি না। এখানে এসে কাজ থামিয়ে দেব? মাথা নষ্ট আমার?’

ওর কাঁধে হাত রাখে উজ্জ্বল, ’বোঝার চেষ্টা কর, স্নিগ্ধ। আমার হাতে থাকা টাকা শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। ফান্ড না থাকলে ল্যাবের ইকুয়েপমেন্ট আর সাবস্ট্যানস  কিনব কিভাবে?’

স্নিগ্ধের মুখটা ধীরে ধীরে হতাশাতে ঢেকে যায়।

‘আর কয় মাস চলতে পারবি এই রেটে খরচ হলে?’ জানতে চায় ও।

‘এক মাস। তারপর আমি ফুরুৎ।’ মন খারাপ করেই বলে উজ্জ্বল।

‘সরি দোস্ত রেজাল্ট দিতে না পারলে তোর টাকাগুলো স্রেফ পানিতে যাবে। আর রেজাল্ট দিতে পারিনি আমি। ’

‘তোর একার কোন কিছু না। ব্যর্থতা আমারও। আমরা একসাথে কাজ করছি। মনে আছে তোর সেটা?’

কিছু না বলে মাথা নীচু করে স্নিগ্ধ।

তারপর দূরে একবার তাকায়।

‘ফাক দিস নরটন’স প্রসেস। আমরা অন্য কোন ভাবে চেষ্টা করব। এভাবে কাজ হচ্ছে না। ’

‘আয়, বসি।’ পুকুরপাড়ের সিমেন্টের বেঞ্চটা দেখিয়ে বলে উজ্জ্বল।

সিমেন্ট খোদাই করে ১৯৯৩ সালে কেউ একজন ডেট লিখে রেখেছে। ২৭ জুন। কে লিখেছে কেনই বা লিখেছে সেটা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না ওরা। এটা দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে। বরং নিতম্ব চাপা দিয়ে লেখাটা ঢেকে ফেলল ওরা।

স্নিগ্ধের কাঁধে হাত রাখে উজ্জ্বল, গলা নামিয়ে বলে, ’শোন, তোকে এখন যা যা বলব, সেগুলো প্রাচীনতম আলকেমির ধাপ। এগুলোর সাথে রিপনি বা নরটনের থিওরির মিল তুই পাবি না। কারণ সম্পূর্ণ অন্য লেভেলের আলকেমির কথা বলতে যাচ্ছি তোকে আমি। ’

‘আমি প্রবল আগ্রহ বোধ করছি।’ সংক্ষেপে জানায় স্নিগ্ধ।

‘খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সেই সময়ে আলকেমিস্টদের ভালো প্রভাব ছিল, জানিস সেটা। জনগণ এদের শ্রদ্ধা করত যতটা তারচেয়ে বেশি পেত ভয়। কাঁপাকাঁপি লেগে গেলে তাদের দোষ দেওয়া যায় না। যাদুবিদ্যার সাথে সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত ছিল সেই আমলের আলকেমি। অন্তত সাধারণ জনতা সেটাই ভাবত। আর সেজন্যই ভয়টা একেবারে অমূলক না। ’

অধৈর্য্যের মত মাথা দোলায় স্নিগ্ধ, ’তা তো বুঝলাম। তবে  তখনকার আলকেমিস্টদের ব্যাপারে আমাদের জানাশোনা কম। তাদের মাঝে কেউ কেউ ছিলেন যারা পরশপাথর বানাতে পেরেছিলেন। সন্ধান পেয়েছিলেন এলিক্সির অফ লাইফের। তবে সেসব তাদের আয়ু বাড়িয়েছিল। অমর করতে পারেনি। দীর্ঘজীবন পার করেছেন এমন একটা গোত্রই ছিল তখন। বাকিরা তাদের করত সম্মান, ভয়ও পেত। মানে, আমরা ধরেই নিতে পারি আলকেমিস্ট ছিলেন তাঁরা। আর কোন ব্যাখ্যা নেই। তবে তাদের প্রসেস তো জানা সম্ভব না। প্রসেস না জানলে আমাদের কল্পকাহিনী শুনে উপকার হবে না কিছু। ’

স্নিগ্ধ এখন বলতে গেলে উজ্জ্বলের চেয়েও বেশি জানে বিষয়টা লক্ষ্য করে খুশি হয় স্নিগ্ধ। ছেলেটা যত জানবে ততই সুবিধে হবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে। আর এখানে বকতে হবে কম। এখানে ইন্ট্রো না দিলেও চলছে। ওদিকে মেশিন শপ শুরু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল নাহলে।

‘যদি তাদের মেথড জানা যায়?’ প্রশ্ন করে উজ্জ্বল।

অর্থবহ প্রশ্নটা গুরুত্বের সাথে নেয় স্নিগ্ধ, ’সেটা কিভাবে জানা সম্ভব? নিউটন আর বয়েলকে নিয়ে ঘাটতে গিয়েই আমাদের দম বের হয়ে যাচ্ছে। এরা ঈসা(আঃ) এর জন্মের পরের মানুষজন। উনার জন্মের আগের মানুষের জীবন ঘাটতে গেলে আমার যৌবন পেরিয়ে যাবে নিশ্চিত থাক!’

হাসে উজ্জ্বল, ’তাহলে বলি তোকে, আলকেমিস্টদের একাধিক গ্রুপ হয়ে গেছিল পরবর্তীতে। একদল মূল বিষয়, আধ্যাত্মিক দিকে থাকলেন। আরেকদল চলে গেলেন ভৌত দিকে। আধ্যাত্মিক আলকেমিস্টরা গবেষণা করতেন কিভাবে আত্মাকে সামান্য আত্মাকে বানানো যায় সোনার মত মূল্যবান সততা আর ন্যায়ের পথে দৃঢ়। আর ওদিকে ভৌতবিদরা সোজা নিমগ্ন হলেন ধাতু থেকে সোনা বানাতে। কিভাবে ফিলোসফার স্টোন বানাবে সেটা তাদের চিন্তা ছিল না, খেয়াল কর্‌। ’

বোকা বোকা দৃষ্টি দেয় স্নিগ্ধ, ’আচ্ছা, তারা ছিল সোনা বানানোর চিন্তাতে। পরশপাথর তাদের টার্গেট ছিল না। তাদের টার্গেট ছিল ট্রান্সমিউটেশন। এক পদার্থ থেকে অন্য পদার্থের রূপান্তর। সেটার জন্য পরশপাথর লাগবে তা কে বলেছে?’

‘রাইট!’ জ্বল জ্বলে চোখে বলে উজ্জ্বল।

‘তাহলে আমাদের জানার কথা কিভাবে সেই আদিযুগের ব্যাপারে? এটা ঠিক তোর কথা থেকে বুঝতে পারছি আমাদের পদ্ধতিতে ভুল আছে। আমাদের চিন্তা করা উচিত ট্রান্সমিউটশন নিয়ে। ’

উজ্জ্বল হাল ছাড়ে না, পানির দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে, ’তখন আমাদের আধ্যাত্মিক আলকেমিরা একটা সময় বুঝলেন এলিক্সির অফ লাইফ ছাড়া আত্মার উন্নয়ন সম্ভব না। তাঁরা মনোযোগ দিলেন ওদিকে। কিন্তু ভৌতবিদ্যাতে আগ্রহীরা বার বার ব্যর্থ তখন স্টোন তৈরীতে। ব্যর্থ এলিক্সির অফ লাইফ পেতেও। তখনই জনশ্রুতি ছড়ালো আধ্যাত্মিক বিদ্যাতে মগ্ন আলকেমিস্টরা চিরযৌবনে যাওয়ার সুধা পেয়েছেন, একই সাথে পেয়ে গেছেন পরশ পাথর। ’

‘ভৌতবিদেরা মেনে নিলেন সেটা?’ আগ্রহের সাথে জানতে চায় স্নিগ্ধ।

‘জানতে পারলেন। তারপর একে একে ধরে আনলেন আধ্যাত্মিক বিদ্যাতে পারদর্শীদের। চালিয়েছিলেন অবর্ণনীয় অত্যাচার। সহজে সোনা তৌরীর পদ্ধতিটা শেখার জন্য। প্রাণ গেলেও মুখ খোলেননি অনেকে। খুলেছিলেন একজন। আলকেমিস্ট ব্যাবেল। তিনি একটা পদ্ধতি দিয়েছিলেন বটে। ’

স্নিগ্ধ হা করে তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বলের হাতে থাকা পুরোনো একটা কাগজের দিকে।

‘ব্যাবেল’স মেথড?’

একটু হাসে উজ্জ্বল, ’ব্যাবেল’স মেথড। অলৌকিকত্ব ছিল আলকেমি আর কেমিস্ট্রির মাঝে পার্থক্য। মনে আছে? আমাদের ঝামেলা হল এই অলৌকিক পথে হাঁটতে গেলে আমাদের নিতে হবে ঝুঁকি। ফলাফল আমি জানি না। ’

হাতের সিগারেটটা পানিতে ছুঁড়ে মারে স্নিগ্ধ।

ছোঁ মেরে কাগজটা নেয় ও তারপর, ’বিশ্বাস করবি না আমি কতটা মরিয়া। আমি নেব এই ঝুঁকি। চল, মেশিন শপের দেরী হয়ে যাচ্ছে। ’

 

চার

অন্ধকার ঘরে বসে আছে উজ্জ্বল আর স্নিগ্ধ।

স্নিগ্ধের হাতে সিগারেট। উজ্জ্বলও একটা ধরায়। উত্তেজনাতে ওদের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে আজ।

বার বার!

এখন ওরা আছে মহুয়ার মামার পরিত্যাক্ত বাসাতেই। বাড়িটার চমৎকার একটা বেজমেন্ট ওদের জন্য একেবারে মানানসই পরিবেশ এনে দিয়েছে। এখানে বড় একটা চৌবাচ্চা সেট করেছে ওরা গত পনের দিন ধরে। সেটাতে রোজ ফুটিয়েছে সালফিউরিক এসিডের দ্রবণ। সব মিলিয়ে উজ্জ্বলের ফান্ড শেষ হয়ে গেছে এর মাঝেই। ত্রিশ দিন হয়ত এমনিতে চলত তবে এই পনেরদিনে ম্যাসিভ খরচ হচ্ছে ওদের।

‘অলৌকিক শক্তির সাহায্য আমাদের দরকার। অবশ্যই দরকার। এই পয়েন্টটা আমাদের মাথাতে আগে কেন আসেনি?’, আবার উজ্জ্বলকে বলে স্নিগ্ধ। আসলে আজকের দিনে ব্যর্থ হলে ওদের গবেষণা একেবারে পানিতে যাবে সেটা ও জানে। সেজন্য নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দিচ্ছে বলা যায়।

‘প্রসেস মনে আছে?’ জানতে চায় উজ্জ্বল।

‘আছে, ইনগ্রিডিয়েন্ট সব জোগাড় হয়েছে।’ টেবিলের দিকে ইঙ্গিত দেয় স্নিগ্ধ, ’আজ রাতেই আমরা অনেক অনেক সোনা নিয়ে ফিরতে পারব ঘরে। আমাদের গবেষণা সফল হলে আরও লার্জ স্কেলে চালাবো আমরা এটা। ’

‘প্রথমে কি করবি? আমাকে শোনা। সব পেঁচিয়ে ফেলিস না। সুযোগ একটাই। আর স্যাক্রিফাইসটাও বিশাল। ভুল করা যাবে না।’ গম্ভীর কন্ঠেই বলে উজ্জ্বল।

‘চার বার আউড়াতে হবে হিব্রু শ্লোক। যেটা তোর পার্চমেন্টে লেখা ছিল। পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল আমিও মুখস্থ করেছি ঠোঁটের আগাতে এনে একেবারে। তারপর আছে মটরের দানা ছিটিয়ে দেওয়া। আড়াইশ গ্রাম মটর দানা এনেছি। লাশের শরীরের বাম হাতের কানি আঙুল জোগাড় করেছি গোরখুঁড়েদের টাকা দিতে হইয়েছে যদিও। কালো মুরগীটা প্রস্তুত। আছে বাদুরের পা। আর তারপর আবারও হিব্রু শ্লোক আছে ছয়টা। ঠিকমত উচ্চারণ করতে হবে ওগুলোকেও। তারপর স্যাক্রিফাইস। ’

সন্তুষ্ট হয় উজ্জ্বল, ’সব  ঠিক আছে। শ্লোকগুলো মনে আছে তো?’

বড় করে নিঃশ্বাস নেয় স্নিগ্ধ, ’আছে। সব ঠিক আছে। ’

‘হুম। অপেক্ষা করছি আমরা ওর জন্য?’ ইঙ্গিত দেয় উজ্জ্বল।

ধরতে পারে স্নিগ্ধ, ’হুম, আর লাগবে হয়ত কয়েক মিনিট। চলে আসবে যেকোন সময়। আমি ভেবেছিলাম তুই বাঁধা দিবি আমাকে এই সিদ্ধান্তে। মহুয়া তোর স্কুল জীবনের বান্ধবী ছিল। আমার সাথে তো এই ইউনিভার্সিটিতে এসে পরিচয়। ’

একটু হাসে উজ্জ্বল, ’তারপর প্রেম। ’

‘হুঁ, প্রেম।’ উদাস হয়ে যায় স্নিগ্ধ, মনে পড়ছে মহুয়ার সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো, ’অর্থহীন সব। একেবারেই অর্থহীন। এর চেয়ে ওই সময়গুলো আলকেমিতে লাগালে ভালো কাজে দিত। একটা রেজাল্ট পেতাম হয়ত নরটনের প্রসেস ধরেই!’

‘অলৌকিক শক্তির প্রভাব যদি আমাদের স্পর্শ না করে? সোনা যদি না পাই?’ বিড় বিড় করে বলে উজ্জ্বল।

রাম ঝাড়ি মারে ওকে স্নিগ্ধ, ’এখানে এসে পিছিয়ে যাবি? মোটেও না। আমরা এখানে আজ রাতেই সোনা বের করব। প্রথমে সোনা বানাব আমার আইফোনটাকে। ভাঙ্গা আইফোন। ’

চৌবাচ্চাটাতে তরলের মিশ্রণ টগবগ করে ফুটছে। সেদিকে তাকায় ওরা। প্রসেসের ধাপ গুলো ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে এখানে যা দেবে ওরা তাই সোনা হয়ে ভেসে উঠবে। ওদের শুধু তুলে নিতে হবে।

আলকেমি। দারুণ একটা বিদ্যা।

ওপরে কোথাও একটা বেল বাজার শব্দ শুনতে পায় ওরা।

‘মহুয়া এসে গেছে। ’, ফিস ফিস করে বলে উজ্জ্বল।

‘আনছি ওকে আমি। ’, একবার ওর দিকে তাকিয়ে ছুটে যায় স্নিগ্ধ।

দরজা খুলতেই মহুয়াকে দেখতে পায় স্নিগ্ধ। চমৎকার লাগছে ওকে নীল রঙের ফতুয়া আর জিন্সে।

চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে। বড় বড় চোখ দুটোতে শুধুই ভালোবাসা। চোখ দুটো দেখছে স্নিগ্ধকে।

পরমুহূর্তেই জড়িয়ে ধরে মেয়েটা ওকে, ’ওহ! কতদিন পর তোমার সাথে ক্যাম্পাসের বাইরে দেখা। বল তো? কি না তুমি! গবেষণা শুধু!’

স্নিগ্ধের বুকে মুখ ডুবিয়ে ওর ঘ্রাণ নেয় মহুয়া। ওকে টেনে তোলে স্নিগ্ধ পরমুহূর্তেই।

‘চলো দেখবে। ’

বাধ্য মেয়ের মত পিছু নেয় ওর মহুয়া, ’আজ যদি রেজাল্ট না পেয়েছ পিট্টি দেব তোমাকে। বুঝেছ? গত কয়েক মাস ধরে আমার সাথে দেখা করার সময় পাও না এই গবেষণার জন্য। আজ দেখব কি এমন কাজ তোমরা কর। ’

ঠোঁট বাঁকা করে হাসে স্নিগ্ধ।

দেখবেই তো। মহুয়াই তো দেখবে। আর কে?

একেবারেই হঠাৎ মহুয়াকে ধরে নিজের দিকে ফেরায় স্নিগ্ধ। তারপর প্রচন্ড জোরে নিজের দুই আঙ্গুল ভরে দেয় মেয়েটার সুন্দর চোখ দুটোতে।

এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না মেয়েটা। সুন্দর বড় বড় চোখ দুটো থেকে পিচকিরির মত ছুটে বের হয়ে আসা সাদা আর লালচে তরলে মাখামাখি হয়ে যায় স্নিগ্ধের মুখ। ওই অবস্থাতেই টান দিয়ে আঙ্গুল দুটো বের করে ও মেয়েটার চোখে  থেকে। আর

গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে মহুয়া প্রচন্ড যন্ত্রণাতে। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ও! গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তরল সেটা টের পাচ্ছে। তবে চোখের পানি নয় সেগুলো।

অ্যাকুয়াস হিউমার বলে কিছু অবশিষ্ট নেই তো আর ওর। সব গেলে দিয়েছে নিষ্ঠুর স্নিগ্ধ।

দুই হাত চোখে চলে যাচ্ছে এক হাতে হাত দুটো চেপে ধরে স্নিগ্ধ। অন্য হাতে আটকে ধরে মেয়েটার মুখ। একে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলতে দেওয়া যাবে না।

শক্ত হাতে ওকে ধরে বেজমেন্টের দিকে নিয়ে যেতে থাকে স্নিগ্ধ। আজ রাতের মাঝেই ওর সোনা চাই। হাতের মাঝে ছটফট করতে থাকা মেয়েটার আর কি দাম ওর গবেষণা সফল না হলে?

রেজাল্ট চাই স্নিগ্ধের।

ল্যাবে ঢুকে ভারী দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এক পাশ থেকে লোহার দন্ডটা তুলে নেয় স্নিগ্ধ। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না মহুয়া তাই কোন প্রতিরক্ষা করতেই পারে না। কড়াৎ করে মেয়েটার বাম পায়ের ওপর আঘাত হানে স্নিগ্ধ লোহাটা দিয়ে।

পৈশাচিক একটা ক্রোধ অনুভব করে ও তারপর। এই মেয়েটা বার বার কাজের সময় ফোন দিয়েছে ওকে। সময় করেছে নষ্ট।

মহুয়ার যন্ত্রণাতে কাঁপতে থাকা মাথার ওপর সজোরে চালিয়ে দেয় ও লোহার দন্ডটা। মাথা রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝেতে পড়ে যায় মেয়েটা।

হাতের রডটা তুলে রাখে স্নিগ্ধ। এটাকে ও কাজে লাগাবে। পরে। এটাকে চৌবাচ্চাতে রেখে দিলেই লোহা থেকে এটাও হবে সোনা।

উজ্জ্বল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অজ্ঞান মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টে। তাকে পাশ কাটিয়ে চৌবাচ্চার সামনে আসে স্নিগ্ধ।

মুখ থেকে অনবরত বের হচ্ছে হিব্রু শ্লোকের গুরুগম্ভীর ধ্বনী। ছোট্ট ঘরটা গম গম করে ওঠে ওর গলার শব্দে।

চারবার উচ্চারণ করে মটরের দানাগুলো ছুঁড়ে দেয় ও চৌবাচ্চাতে। ফুঁসে ওঠে ওগুলো ওখানে পড়েই।

তারপর দ্বিধা ছাড়াই মানুষের কাটা একটা আঙ্গুল তুলে ছুঁড়ে দেয় ও চৌবাচ্চাতে। শ্লোকের আবৃত্তি চলছেই।

আরেকবার ফুঁসে ওঠে চৌবাচ্চাটা।

ওখানে মুরগীটাকে ধরে এনে নির্বিকার হয়ে জবাই করে দেয় ও পাশ থেকে ছুরিটা এনে। তারপর মুরগীর দেহটা ছুড়ে ফেলে।

ছয়বার আবারও শ্লোক উচ্চারণ করে তুলে নেয় বাদুরের পা। তারপর সেটাকেও চৌবাচ্চার গভীরে পৌঁছে দেয় ও।

চৌবাচ্চাটা যেন ফুলে ফেঁপে উঠছে। মেয়েটের কাঁধের নিচে হাত আটকে শরীরটাকে তুলে আনে চৌবাচ্চার কিনারে। গুঙিয়ে ওঠে মহুয়া। বেঁচে আছে এখনও।

চেহারাতে সেই লাবণ্য আর নেই। এক হাত বাড়িয়ে আবার ছুড়িটা তুলে নেয় স্নিগ্ধ। মহুয়ার গলাটা ঠেসে রেখেছে চৌবাচ্চার একপাশের বেড়ায়।

মুখে হিব্রু শ্লোকের আবৃত্তির বিরাম নেই।

আস্তে করে মেয়েটার গলার নিচে ছুরিটা ধরে চালিয়ে দেয় ও ছড় ছড় করে রক্ত ছুটে পড়ে চৌবাচ্চাতে। সেই সাথে প্রাণপণে হাত পা ছুড়ছে মহুয়া। চেষ্টা করছে আরেকবার নিঃশ্বাস নেওয়ার।

পারে না।

কন্ঠনালী নেই তো।

কেটে দিয়েছে স্নিগ্ধ।

এবার এক ধাক্কা দিয়ে মহুয়ার শরীরটাকে ফেলে দেয় ও এসিডের দ্রবণে। জ্বলে যেতে থাকে মেয়েটার শরীর। সেই সাথে অবিরাম হাত পা ছুড়ছে এখনও মেয়েটা।

যন্ত্রণা!

তবে অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে এসেছে ও।

কপালের ঘাম মুছে স্নিগ্ধ।

হাসিমুখে ফিরে তাকায় উজ্জ্বলের দিকে, ’এবার একটা কিছু ফেল চৌবাচ্চাতে। সোনা হবেই। আলকেমি ভুল নয়। ভুল হতে পারে না। ’

এক পা এগিয়ে আসে উজ্জ্বল। একটা কিছু তো ফেলতেই হবে।

টেস্ট করা তো দরকার।

বুকের ঠিক মাঝখানে উজ্জলের প্রচন্ড ধাক্কাটা খেয়ে ছিটকে ফুটন্ত চৌবাচ্চার মাঝে পড়ার পরও তিন সেকেন্ড পেরিয়ে যায় স্নিগ্ধের বুঝতে   চারপাশে আসলে কি হচ্ছে!

চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করতে চায় ও কিন্তু কঙ্কালসার একটা হাত চেপে বসেছে ওর মুখের ওপর ততক্ষণে।

কে ওটা?

মহুয়া না?

 

পরিশিষ্ট

তালাটা আবার ঠিকমত লাগিয়ে বের হয়ে আসে উজ্জ্বল।

মহুয়াকে স্নিগ্ধ আগেই বলেছিল ওদের গবেষণাটা গোপনীয়। মহুয়া, উজ্জ্বল আর স্নিগ্ধ ছাড়া কেউ জানত না এটার কথা। কাজেই খুনের অপরাধে কেউ উজ্জ্বলকে খুঁজবে বলে মনে হয় না। চাবিটা ড্রেনে ফেলে দেয় ও আস্তে করে।

মহুয়াকে স্কুলজীবন থেকে ভালোবেসেও বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু পায় নি ও। সেই মহুয়া  কি না গবেষণা-পাগল বলে খ্যাত স্নিগ্ধের প্রেমে পড়ে গেল? স্নিগ্ধও যদি মেয়েটাকে গুরুত্ব দিত একটা কথা ছিল। কাজ-ই সব তার কাছে।

কোন অধিকার রাখে সে এরপরও মেয়েটাকে নিজের করে রাখার? বা ভাবার? ওদের একসাথে দেখতে বুকে কাঁটা বেঁধার মত যন্ত্রণা হত উজ্জ্বলের তবুও কোনদিন কিছু বলেনি। প্রায় একবছর ধরে প্ল্যান করতে হয়েছে ওকে চোখের সামনে থেকে দুই আপদকে সরিয়ে দিতে। একবছরের প্ল্যানিং সফল হয়েছে আজকে।

স্নিগ্ধকে সোনা বানানোর জন্য ক্ষেপিয়ে তোলার পর বাকি কাজ ছিল সহজ!

তবে পরাজয়ের গ্লানি মুছে যায় নি উজ্জ্বলের। ধীরে ধীরে সেটা বাড়ছে আরও।

গাল চুলকে নিজের মেসের দিকে হাঁটা দেয় ছেলেটা। আগামীকাল পরীক্ষা আছে।

*

সার্চ পার্টি যখন মহুয়ার দেহটা খুঁজে পেল চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে আসার সাহস তাদের কারই হচ্ছিল না।

ঘরের মাঝে পাঁচজোড়া চোখ সেঁটে থাকে একটা প্রমাণ সাইজের পুরুষ মূর্তির দিকে।

চেঁচানোর ভঙ্গীতে চৌবাচ্চার মাঝে শুয়ে থাকা মূর্তিটি সোনার।

খাঁটি সোনার।

— ০ —

রচনাকাল জুলাই ০২, ২০১৪ 

ইলিউশন সাইকিয়াট্রিস্ট 

মেয়েটা সুন্দরী, কিন্তু একা দাঁড়িয়ে আছে। পড়নের পোশাক আর অভিব্যক্তিতে আভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে। সন্ধ্যাও নেমে আসছে চারপাশটা অন্ধকার করে দিতে দিতে।

এরকম একটা মালকে ছেড়ে দেওয়া যায় না।

চুপচাপ গিয়ে মেয়েটার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। একটু বিরক্ত হয় যেন ও। ভ্রু হাল্কা বাঁকিয়ে আরেকটু দূরে গিয়ে দেওয়ালে হেলান দেয়। অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি। ক্লান্ত হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কারও জন্য অপেক্ষা করছে? তাই হবে হয়ত। মোবাইলটা বের করে ঝড়ের বেগে ডিসপ্লেতে টাচ করতে শুরু করল এই মাত্র। নিশ্চয় যার আসার কথা তার পিন্ডি চটকাচ্ছে?

এগিয়ে গিয়ে কোন কথা না বলে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরলাম।

এতটাই হতচকিত হয়ে যায় মেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া করতে পারে না। মেয়েটার নিশ্বাস আমার গলায় অনুভব করতে পারছি স্পষ্টভাবে। বেশ ভারী নিশ্বাস পড়ছে এখন আতঙ্ক? একমুহূর্ত পরেই সম্বিত ফিরে পায় অবশ্য কিন্তু তখনও প্রতিক্রিয়া করে না।

আমার বাম হাতে বেড়িয়ে আসা ছুরিটাই যে এর কারণ সেটা বুঝে উঠতে বেশী জ্ঞানের দরকার নেই। একেবারে পেটের সামান্য ওপরে ধরেছি মুখ দিয়ে কিছুই বলতে হয় না আমার হাতটা চলে যায় তরুণীর হাতব্যাগের দিকে।

‘প্লিজ ব্যাগটা নেবেন না।’ মিষ্টি অথচ ভয়ার্ত কন্ঠে প্রথমবারের মত মুখ খোলে মেয়েটা।

টান দিয়ে ব্যাগটা মেয়েটার হাত ছেড়ে ছাড়িয়ে নিতে হল। এমনিতে দেবে না যখন কি আর করা? গোলাপী ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে সে হতাশায়। আস্তে করে ওর ওপর থেকে সরে আসি আমিও। চটপট আমার ব্যাকপ্যাকে গায়েব হয়ে যায় মেয়েটার হাতব্যাগ। একরাশ অপমান চোখে নিয়ে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

অতশত ভাবি না আমি। আমার ইয়াবার সাপ্লাই শেষ। অন্তত তিনহাজার টাকা পেলে তো দশটা কেনা যায়!

তিনদিনের জন্য একেবারে নিশ্চিত।

গলি ছেড়ে যখন বের হয়ে যাচ্ছি তখন একটু খটকা লাগে।

মেয়েটার দৃষ্টিতে কি আমি অপমান দেখে এসেছিলাম? নাকি ব্যর্থতা?

দুই

বাসে করে মিরপুর-১২ যাচ্ছি।

শফিক মামাকে পেলে হয়। আমার সাপ্লাই সেই কখন থেকে বন্ধ! ভেতরে অস্থিরতা কাজ করছে বেশ।

পাশের ঘাড়ে গর্দানে চেহারার লোকটা গল গল করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে। সে যে একটা পাবলিক বাসে আছে কে বলবে এই লোককে দেখলে? ইচ্ছে করেই ভোটকাটার পা মাড়িয়ে দেই আমি। বাসের মাঝে বসে সিগারেট খাচ্ছে! আনন্দের তো সীমা থাকা উচিত একটা!

কড়া চোখে একবার তাকায় শুধু মোটকু। কিন্তু কিছু বলে না।

তারপর একেবারে হঠাৎ গলা নামিয়ে জানতে চায়, ’সঙ্কেত দেওয়া লাগবে না। রেশমা কোথায়?’

এবার আমার ভিড়মি খাওয়ার জোগাড়। রেশমা কে? যার ভ্যানিটিব্যাগ নিয়ে সটকে পড়েছি তার নাম নাকি? এই ভোটকার সাথে তার সম্পর্ক কি? জানলই বা কি করে আমার কাছে মেয়েটার ব্যাগ আছে? কিন্তু, কিছু তো বলা লাগে।

বাসভর্তি মানুষের গণপিটুনী খেতে চাই না।

ভেবেচিন্তে গলা নামালাম আমিও, ’রেশমা আটকে গেছে।’

চুক চুক করে দুঃখপ্রকাশের শব্দ করল লোকটা, তারপর আমার দিকে না তাকিয়েই আস্তে করে আবার জানতে চায়, ’প্যাকেজ কার কাছে তাহলে?’

কোনকিছু না ভেবেই বলে দিলাম, ’আমার সাথেই।’

লোকটাও একথায় আশ্বস্ত হয় বেশ। আমার দিকে একটু ঘুরে জানায়, ’সামনের স্টপেজে নেমে যাব আমরা। রিফাজের লোকেরা পিছু নিয়েছে। একেবারে গলা ফাঁক করে দেবে নাগালে পেলে।’

এ তো দেখছি রীতিমত ঝামেলায় ফেলে দিল আমাকে! গলা কাটাকাটি কেন বাবা এর মাঝে আবার? আমি নিরীহ মানুষ। নেহায়েত ইয়াবার টাকাটার জন্যই মেয়েটাকে লুট করতে হল।

মেয়েটা কে ছিল?

সুবিধের কেউ ছিল না সেটা নিশ্চিত অন্তত। আগেই সন্দেহ হয়েছিল। সন্ধ্যার অন্ধকারে কেন দাঁড়াবে ওভাবে? মেয়ের মাথায় কুচিন্তা না থেকেই যায় না!

মাফিয়াদের লোক?

পেছনে আবার জনৈক রিফাজের উপস্থিতি আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দেয় বৈকি!

‘কাম অন!’ বাস থেমে যেতেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় লোকটা।

দুইজনই সুড় সুড় করে নেমে পড়লাম। এই লোককেও খুব একটা সুবিধের লাগছে না। কিন্তু অন্তত এই মুহূর্তে এ আমার গলার প্রটেক্টর।

বাস থেকে নেমে পড়তেই গলা খাদে নামিয়ে বলে লোকটা, ’তাড়াতাড়ি আমার হাতে প্যাকেজটা দাও। রিফাজের ওরা তোমাকে দেখলেই হামলা করবে। প্যাকেজ যে বাগিয়েছো, পিঠে টার্গেট মার্ক পড়ে গেছে তোমার। কিন্তু আমার দিকে লক্ষ্য করবে না।’

সখটা একবার দেখ! আমার গলা কেটে ফেলবে রিফাজবাহিনী তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই উনার। আছেন প্যাকেজ নিয়ে! চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। এলাকা সুবিধার না। চারপাশে মেইনরাস্তা থেকে ঢুকে যাওয়া গলিগুলো বেশ চিপা চিপা।

তারওপর নেমে এসেছে রাত।

বাবাটা ইয়াবার কথা জেনে ফেলার পর থেকেই শুরু হয়েছে এই হ্যাপা! টাকার উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। কোন কোন স্যারের প্রাইভেট না পড়েও টাকা মারি জেনে ফেলেছে। নয়তো জীবনের প্রথম ছিনতাইটা করা লাগত না আজ আমার। আর ওরকম ঝামেলায় পড়তেও হত না।

বিমর্ষ মুখে লোকটার হাতে আমার ব্যাকপ্যাক তুলে দিতেই চটপট পড়ে ফেলল ওটা। ভালুকের মত শরীরের মানুষটার গায়ে আমার ব্যাকপ্যাক নেহায়েতই ক্ষুদ্র দেখাচ্ছে!

‘ফলো মি! ফাইলটা নিতে পারলেই রিফাজবাহিনী একেবারে থেমে যাবে!’ বলে একটা কানাগলিতে ঢুকে যায় অদ্ভুত মানুষটা।

প্যাকেজ নিরাপদে রাখতে যাচ্ছে নিশ্চয়? আর ফাইলটা নিতে?

ভালো কথা, ফাইলটা কিসের?

আধো-অন্ধকারে গলির মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে থাকা ষন্ডামার্কা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলতে গিলতে ভালুকটার পেছন পেছন গলিতে ঢুকে পড়লাম আমিও।

তিন

আমার ব্যাগটা কাঁধে নেওয়া মানুষটা একজন ষাঁড়।

তবে গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর প্রত্যেকে দেড়জন ষাঁড়। কিন্তু তৃতীয়জন, এঁদের দলনেতা লোকটি বেশ প্যাকাটি গড়নের। প্যাকাটিটা সামনে আসল।

‘চমৎকার আব্রাহাম! নিজেই চলে এসেছ দেখছি!’ চিকণ মানুষটার মুখ থেকে কামানের গোলার মত গর্জন বের হয়ে আসে।

‘কি আর করা! ফাইলের তো আর পা নেই। তাই আমারগুলোকে ধার চেয়েছে কিছুক্ষণের জন্য।’ বেশ হাসিমুখেই বলে আব্রাহাম পিঠে ঝোলানো আমার ব্যাগটার একটা স্ট্র্যাপ ধরল একহাতে।

‘কোন ফাইল?’ চোখ সরু সরু করে জানতে চায় চিকণা।

‘আহা! ন্যাকা আরকি!’ দাঁত খিঁচায় আব্রাহাম, ’তোমাদের বস ভেতরে আছে?’

এ কথায় পেছনের তিন দেড়জন করে সাড়ে চারজন ষাঁড় এগিয়ে আসে কিছুটা।

‘বস কারও সাথে দেখা করবেন না।’  চাছাছোলা গলায় জানিয়ে দেয় ভদ্র চেহারার একজন’বস’-এর বডিগার্ড।

চুপচাপ সেদিকে তাকিয়ে একবার ঘাড় মটকালো শুধু আব্রাহাম। আমি পিছিয়ে আসি দুইপা। ষাঁড়ে ষাঁড়ে লড়াই দূরে সরে দাঁড়াই।

এবার প্যাকাটি দলপতি নিজেই এগিয়ে আসে।

‘গেট লস্ট, আব্রাহাম। ভাইয়ের সাথে দেখা করার আসা ছেড়ে দাও। আর যা ক্ষতি হয়েছে মেনে নাও। সাথে করে বাচ্চা পোলাপান নিয়ে এসেছ আমাদের ঘাঁটিতে সরাসরি? তোমার সাহস আছে বলতেই হচ্ছে।’

বাচ্চা পোলাপাইন আমার ঘাড় হাত-পা সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। আমাকেও দেখছি ওরা গোণায় ধরেছে! তিন ষন্ডার গঠন দেখে হাঁটুতে জোর পাচ্ছি না আর।

আল্লাহর কাছে একবার প্রার্থনা করলাম এখান থেকে জ্যান্ত পালাতে পারলে ইয়াবার জগত ছেড়ে চলে আসব। এরই মাঝে দেখি আব্রাহাম প্যাকাটির পেট বরাবর ঘুষি বসিয়ে দিয়েছে!

প্যাকাটি-টাইপ মানুষটা উড়ে গিয়ে এক ষন্ডাকে সাথে নিয়েই মাটিতে পড়ে।

রইল বাকি দুই।

চমৎকার মুখভঙ্গী করে ছুটে আসছে ওই ষন্ডাদ্বয় আমার নিজেরই গেয়ে উঠতে ইচ্ছে হল, ’ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে!’

আব্রাহাম আমার ব্যাকপ্যাক এক ষন্ডার মুখের ওপর দড়াম করে ফেলে দিতেই’উহা’র গতিবেগ রহিত হয়ে গেল! অপর ষন্ডার মুখে আব্রাহাম আর ব্যাগ নয়   নিজের ছয়মনি হাতই ফেলে দিচ্ছে দেখতে পেলাম। একপাক ঘুরে এক ষন্ডার পতনের সাথে সাথেই আমার ব্যাগ একপাশে ফেলে দ্বিতীয় ষন্ডা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে আব্রাহামের ওপর।

আব্রাহাম একটু কায়দা করে সরে যেতেই টার্গেটকে মিস করে সোজা আমার দিকেই ধেয়ে আসে দ্বিতীয় ষন্ডা। তবে কৌতুকপূর্ণ মুখ নিয়ে পেছন থেকে পা বাঁধিয়ে দেয় আব্রাহাম।

আমিও আব্রাহামের কাছে এইমাত্র শেখা  কায়দাটা করে একটু সরে যেতেই ঝপাত করে একেবারে নর্দমার মাঝে আছড়ে পড়ল ষাঁড়টি।

তৃতীয় ষাঁড়ের দিকে নজর ফেরাতেই দেখতে পেলাম প্যাকাটি-দলপতিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে এখনও  ছেলে! আব্রাহাম সেদিকে নজর দিতেই দড়াম করে সামনের বাসাটার দরজাটা খুলে যায়। প্যাকাটি-দলনেতার’এল্ডার-ভার্সন’ বেড়িয়ে আসে ভেতর থেকে।

‘বাইরে এত হট্টোগোল কিসের, অ্যা?’ সরু গলা দিয়ে সিংহের মত গর্জন করে বলল লোকটা।

চার

এই মানুষটাই যে ওই প্যাকাটি ছোকড়ার ভাই এটা বোঝার জন্য আমার তৃতীয়শ্রেণীর ঘিলুই যথেষ্ট। এর কাছেই তাহলে আছে একটা টপ সিক্রেট ফাইল! যেটা দিয়ে ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে পুরো রাফিজ বাহিনীকে। তবে এই লোক আমাদের ঠেকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করল না।

‘আরে আব্রাহাম যে! এতদিন পর হঠাৎ কি মনে করে?’

‘ফাইলটা লাগবে আমার। দিয়ে দাও। চলে যাই।’ ঝটপট দরখাস্ত করে ফেলে আব্রাহাম।

‘তুমি কি বলছ আমি বুঝতে পারছি না।’ গম্ভীর মুখে বলে দরজা লাগাতে শুরু করল প্যাকাটির বড় ভাই।

ঝট করে একটা পা বাড়িয়ে দরজার শেষ মাথা আটকে ফেলে আব্রাহাম, ’এত সহজে না, মাহমুদ। ভেতরে আসছি আমরা।’

মাহমুদের আপত্তি মোটেও কানে তোলা হল না।

বাইরের তৃতীয় ষন্ডা একেবারে থার্ড আম্পায়ারের মতই বেকুব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিতেই মাহমুদের কলার ধরে একটা ঝাঁকুনী দেয় আব্রাহাম।

‘সেনের ফাইলটা। কুইক!’

‘ওই ফাইল আমি পাবো কোথায়?’ অবাক হওয়ার ভান করতে করতে বলে মাহমুদ।

আমি শুধু নাটক দেখছি। আব্রাহামের মত বডি বিল্ড করতে পারলে হত। একাই দুটো ভোটকাকে শুইয়ে দিতে পারলে আমার ইয়াবার টাকার অভাব হত না আর।

পরক্ষণেই একটু আগে করা প্রার্থনার কথা মনে হতেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটলাম।

ফাঁড়া কেটেছে এই ঢের! এবার এখান থেকে বেরিয়েই বাবাকে বলে একটা রিহ্যাবে ঢুকে যাবো। রোজ রোজ মেয়েদের সম্পদ লুট করতে গিয়ে প্যাঁচে পড়ব নাকি?

‘আমি জানি না ওই ফাইল কোথায় গেছে। বহুদিন ধরেই মিসিং শুনেছি।’ বিড় বিড় করে বলে মাহমুদ।

‘তুমি ডিপার্টমেন্ট ছাড়ার পরদিন থেকেই মিসিং ওটা, মাহমুদ! বন্ধুত্বের খাতিরে তোমার দিকে নজর দেইনি এতদিন। কিন্তু এখন ফাইলটা আমার দরকার। আর একটা গান। নাহলে মারা পড়বে আরেকটা নিরপরাধ মেয়ে! মাস্টার তিরমিজির কথা মনে আছে নিশ্চয়? আর তাঁর ছোট মেয়ে ফাল্গুনীর কথা?’

ওদের কথা শুনে এবার আমার কান খাড়া হয়ে যায়। কাহিনীর প্যাঁচ ঘোরতর!

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহমুদ।

‘ফাইলটা নিতে পার। তবে মনে রেখ দিচ্ছি কেবল মাস্টার তিরমিজির কথা ভেবেই। আমার প্রাণরক্ষক তিনি।’

‘এখন তাঁর মেয়ের প্রাণভক্ষক হতে যেও না। রাফিজের চোখ কোনদিকে পড়েছে বুঝতে পারছ? ডাটা সব চলে যাবে একেবারে জায়গা মত। তুমি আমি অথবা মাস্টার তিরমিজি কেউই রক্ষা পারবে না সেটা হলে।’

ভেতরে ঢুকে পড়ি আমরা মাহমুদকে ফলো করে। রান্নাঘরে এনে একটা মাটির নিচে যাওয়ার রাস্তা বের করে ফেলে মাহমুদ মেঝের এক অংশ সরিয়ে।

তারপর নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়।

একটু পর বের হতেই হাতের ঢাউস ফাইলটা চোখে পড়তে আমিও ভড়কে যাই।

‘পদ্মার বুকে মাস্টার তিরমিজি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন সেই ম্যাসিভ গানফাইটের মাঝেও। সেই ঋণের কিছুটা শোধ দেয়ার প্রচেষ্টা শুধু, আব্রাহাম। তবে লড়াইটা তোমার। আমি আর ফোকাসে আসতে চাই না।’

কোমর থেকে খুলে একটা পিস্তলও বাড়িয়ে দেয় মাহমুদ আব্রাহামের দিকে।

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখি শুধু আমি।

পাঁচ

কোনমতে হেঁটে চলেছি আমি আব্রাহামের সাথে।

দুইজনেই চুপ একেবারে।

আমার মাথায় কিছুরই হিসেব মিলছে না। কোথা থেকে কি হয়ে গেল!

একটা মাত্র ভ্যানিটিব্যাগ চুরি করতে গিয়ে এত বড় ঝামেলায় পড়া লাগবে জানলে কি আর আগাই?

‘কিছু প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেওয়াই যায় তোমাকে।’ মুখ খোলে আব্রাহাম, ’ঘটনার সাথে একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে জড়িয়ে পড়েছ তুমি। আমি, মাহমুদ দুইজনই ছিলাম বাংলাদেশ অ্যান্টি-টেররিজম এজেন্সীর সাথে। কিন্তু আর সবার মতই আমাদেরও একটা কালো অধ্যায় আছে। আমাদের সুপিরিয়র ছিলেন মাস্টার তিরমিজি। উনার প্ল্যান অনুযায়ী আমরা কাজ করতাম যাকে বলে ইয়ে আইনে অবৈধ।’

তাকিয়ে থাকি আমি।

‘যেসব অপরাধীদের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব থাকত, যাদের জেলে ভরে রাখা সম্ভব নয় তাদের মাথাতে সোজা বুলেট ঢুকিয়ে দিতাম আমরা। অ্যারেস্ট করার ঝামেলায় যেতাম না।’

বলে কি! আমার তো রীতিমত গা গুলাচ্ছে। এই মানুষ এতবড় খুনী সেটাই বা কে জানত!

‘জেনে ফেলে শেষ শিকার অভিজিৎ সেন। পালটা আঘাত হানে সে তার লোকেদের নিয়ে। লোকটা ভূতের মত। ডিপার্টমেন্টের এজেন্টরা সিরিয়ালি মারা পড়ছিল মরিয়া হয়ে আমরাও ডাটা কালেক্ট করতে শুরু করি। কিন্তু তার আগেই কাজ হয়ে যায় মাস্টার তিরমিজির বাসায় হামলা চালিয়ে পার্সোনাল ড্রাইভ কেড়ে নেয় কেউ যেটায় আমার আর মাহমুদের সিক্রেট কিলিং মিশনের ডাটাগুলো সবই আছে।’

‘তারপর?’ গোগ্রাসে আব্রাহামের কাহিনী গিলছি আমি।

‘প্রাণপনে হামলা চালাই আমরা সেনের ঘাঁটিতে। সেনকে হত্যা করে উদ্ধার করে আনি হার্ডড্রাইভটা। কিন্তু ততদিনে ডিপার্টমেন্ট সন্দেহ শুরু করেছে। আমাদের তিনজনই চাকরিচ্যুত হতাম ফাঁসী-টাসীও হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র ছিল না। কিন্তু উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে আমাদের খুনগুলোর বিচার ঠিকমত হল না। আমাদের ফিল্ড থেকে সরিয়ে ডেস্কজব দেওয়া হল। কিন্তু অফিস ছেড়ে চলে গেল মাহমুদ এরপর, রেজিগনেশন দিয়ে। সেই সাথে কারও চোখে না পড়লেও আমার চোখে পড়ে গায়েব হয়ে গেছে সেনের ফাইল।’

‘ওই ফাইলের সাথে আজকের ছোটাছুটির সম্পর্ক কি?’ না জানতে চেয়ে পারলাম না।

‘সেনের ডানহাত রাফিজ এখন ক্ষমতায়, বাঁধন।’ হাঁটতে হাঁটতেই আমার নাম জেনে নিয়েছে আব্রাহাম।’গতপরশুই মাস্টার তিরমিজির মেয়েকে কিডন্যাপ করেছে ওরা। আজ জমা দেয়ার কথা ছিল হার্ডড্রাইভটা। তবেই জীবিত ফিরে পাওয়ার কথা ছিল ফাল্গুনীকে। শর্ত একটাই ফাল্গুনীর বোন অহনাকে নিয়ে যেতে হবে হার্ডড্রাইভ।’

‘কিডন্যাপাররা তাহলে মোবাইলে টেক্সটের মাধ্যমে যোগাযোগ করছিল?’ এবার বলি আমি। সবকিছু এখন স্পষ্ট।

যেই মেয়েকে ছিনতাই করেছি আমি, সে দেখা যাচ্ছে কিডন্যাপড ফাল্গুনীর বোন অহনা ছিল!

‘চালাক ছেলে। ঠিকই ধরে ফেলেছ।’

‘আপনাদের ডুবিয়ে দিয়ে কি লাভ রাফিজের?’

‘প্রতিশোধ! আমাদের কারণে ওদের অনেক সহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। রাফিজের বড় ভাই রিয়াদও মারা যায় মাহমুদের হাতে। যে করেই হোক আমাদের ডুবাবে ওরা। এর আগেই আমাদের ফাল্গুনীকে খুঁজে বের করতে হবে।’

‘আগাচ্ছেন কিভাবে?’ সন্দেহভরা কন্ঠে জানতে চাই আমি।

‘ফাইলের সব পৃষ্ঠার ছবি অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি। যথেষ্ট তথ্য আছে। মাহমুদ অহেতুক ভয় পেয়েছিল। সেনের ইতিহাস খুঁড়তে গিয়ে আমাদের কুকীর্তির কথা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য ফাইল সহই কেটে পড়েছিল ও। এখন দেখা যাক অফিস থেকে কোন লিড পাওয়া যায় কি না!’

‘ডেস্ক থেকে বেরিয়ে ছোটাছুটি করছেন কিভাবে?’ জানতে চেতেই হল।

‘স্পেশাল কোয়ালিফিকেশনের জন্য আমাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এই মিশনে। আমাদেরই কো-ওয়ার্কারের মেয়ের কিডন্যাপিং দেখে ডিপার্টমেন্ট তেঁতে রয়েছে। অবশ্য কিডন্যাপিংয়ের পেছনে কি রহস্য সেটা ওরা জানে না।’

‘তারমানে মুক্তিপণ হার্ডড্রাইভটা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল অহনা। ব্যাকআপ হিসেবে ছিলেন আপনি। তারমাঝেই হামলে পড়েছি গিয়ে আমি?’

‘হুঁ। শুধু তাই না আস্ত হার্ডড্রাইভ নিয়ে সটকে পড়েছ। কাজেই তোমাকে ফলো করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না আমার। আর বাসে একটু রহস্যের গন্ধ দিতেই একা একাই চলে আসলে সাথে। ধন্যবাদ তোমাকে।’

মোবাইল ফোন ভাইব্রেট করে ওঠে আব্রাহামের।

‘গট দ্যা লোকেশন। তোমার ব্যাকপ্যাকটা ধার নিতে পারি? শেষ অ্যাকশনে যাচ্ছি। আশা করি ফাল্গুনীকে নিয়ে বের হয়ে আসতে পারব।’

‘আমি যাচ্ছি না সাথে?’ আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে তাকালাম আমি।

‘তোমার এসবে ট্রেইনিং নেই, বাঁধন। মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট করেছ তুমি। এবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও।’

রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকি আমি।

সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা মানুষটা আমার জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে।

বুঝিয়ে দিয়ে গেছে একটা ব্যাপার হয়ত তাঁর নিজের অজান্তেই!

জীবন মোটেও হেলাফেলায় কাটানোর মত জিনিস না। জীবন একটাই।

নিজের জীবনকে ঘুরিয়ে ফেলব আমি।

আর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ অ্যান্টি-টেররিজম এজেন্সীতে গিয়ে ঢোকার একটা ভালো চেষ্টা দিতেই হবে!

ইয়াবার গুষ্টি আমি কিলাই। আজই বাবাকে বলে সোজা রিহ্যাব!

ছয়

ভ্রু কুঁচকে বসে আছেন লিয়াকত হোসেন।

কুঞ্চিত ভ্রুর পেছনে অষ্টম স্কেলের কারণ বিদ্যমান। একটু পর তিনি রেজাল্ট পাবেন।

লিয়াকত হোসেনের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। তবে তিনি কোন মেডিকেল চেক-আপের রেজাল্টের অপেক্ষাতে নেই। একমাত্র ছেলে শরীফ হোসেন বাঁধনের রেজাল্টের অপেক্ষায় আছেন। ছেলের বয়স কম মাত্র কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে  তবে এরই মাঝে ইয়াবা ধরে ফেলেছে!

ইলিউশন-সাইকিয়াট্রিস্ট ফারদিন আহমেদ চৌধুরী তাঁর বাল্যজীবনের বন্ধুর ছেলে। এই একটা কারণেই তাকে একটা সুযোগ দিয়েছেন। কারণ ইলিউশনিস্ট মনোরোগ বিজ্ঞান বলে কোন বিজ্ঞান এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। এটা ফারদিনের নিজের আবিষ্কার। আর তাতেই কি না নিজের ছেলেকে গিনিপিগ বানাতে সম্মত হয়েছেন লিয়াকত সাহেব!

বয়েসের সাথে কি তার বুদ্ধিশুদ্ধিরও লোপসাধন হচ্ছে?

‘নেশাগ্রস্থ ছেলেরা হতাশার আড়ালে লুকিয়ে আসলে অ্যাডভেঞ্চার খোঁজে।’ ফারদিন বলেছিল সেদিন, ’যদিও এই অ্যাডভেঞ্চারের ব্যাপারে তারা নিজেও জানে না। অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকে সেটা। অথচ অ্যাডিক্টের কোন আইডিয়াই নেই ঠিক কোন কারণে নেশার অতল সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে সে। জানতে চাবেন আপনি ফট করে বলে দেবে, “আমার জীবন নিয়ে আমার অনেক হতাশা।” যতসব ফালতু কথা বার্তা। এই ছেলেকেই নিয়মিত হান্টিং রাইফেল দিয়ে শিকারে পাঠান ঝটপট কমে যাবে ড্রাগস নেওয়ার পরিমাণ।’

‘তুমি সাজেস্ট করছ বাঁধনকে আমি শিকারে পাঠাই?’ সামনে বসে থাকা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মনে রোগ আছে কি না সে ব্যাপারেই সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পরেন লিয়াকত সাহেব।

‘না, স্যার!’ হেসে ফেলে ফারদিন, ’এখানেই কাজ করব আমি। বাঁধনকে একটা চমৎকার ইলিউশন দেব। প্রকৃত অ্যাডভেঞ্চারের। এতে ও জীবনের বিস্তৃতিটা বুঝতে পারবে। আশা করি কাজ হয়ে যাবে। আমাদের ওপর ভরসা রাখতে পারেন।’

‘তোমাদের মানে?’ ভারী গলায় জানতে চান লিয়াকত হোসেন।

‘আমাদের টিম আছে একটা। এটা নিয়ে কাজ করছি আমরা। আমি ছাড়া আরও পাঁচজন আছি। ইলিউশন দিতে হলে লোক তো কিছু লাগেই। আপনি শুধু বাঁধন বের হবে যখন আমাকে একটা মেসেজ দেবেন। বাকিটা আমরা দেখব।’

ভরসা রেখে তো ভুল করেছেন বলেই মনে হচ্ছে। সারাদিন বাঁধনের কোন পাত্তা নেই। যত্তসব অহেতুক তত্ত্ব!

উঠে দাঁড়ালেন লিয়াকত হোসেন। ছেলেটাকে রিহ্যাবে দেওয়াটা দরকার। কিন্তু নিজের ইচ্ছে না থাকলে দিয়ে কাজ হবে না। আবার বের হয়েই নেশাতে ডুবে যাবে!

খুট করে একটা শব্দ হয় পেছনে।

লিয়াকত হোসেন ঘুরে দেখতে পান তাঁর একমাত্র ছেলেকে। আজ ওর চোখে অন্যরকম একটা আভা বাঁধন জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছে!

*

পার্সটা উল্টে পালটে দেখছে ফারদিন। মেয়েটার নাম-ঠিকানা কিছু পাওয়া যায় কি না বের করা দরকার। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁধন ছেলেটার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে আছে ও। তবুও হাতের কিছু কাজ শেষ করতে হল।

রাত অনেক হলেও আজকের এক্সপেরিমেন্টটার রিপোর্ট লিখে ফেলেছে ও। প্রথম পরীক্ষাতেই সাফল্য!

বাঁধনের বয়েসী ছেলেদের জন্য বেশ কাজের হবে প্রক্রিয়াটা। এখন শুধু ছিনতাই করা পার্সটার মালিককে খুঁজে বের করলেই ওর কাজ শেষ। ভেতরে হাত দিতেই একটা হার্ডড্রাইভ উঠে আসে ওর হাতে।

সরু চোখে সেদিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে থাকে ফারদিন। তারপরেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে ও একটা নামের জন্য।

ছোট একটা কাগজে নাম ঠিকানা আটকানো আছে ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতরের পিচ্চি পার্সটায়।

সেদিকে তাকিয়ে নিশ্বাস নিতে ভুলে যায় ফারদিন আহমেদ চৌধুরী।

‘অহনা তিরমিজি’ নামটা যেন জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে!

 

ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৪